টেন্ডার পাইয়ে দেয়ার জন্য বিদেশি নম্বর থেকে একাধিক হুমকির পর জাতীয় ক্যান্সার হাসপাতালের উপ-পরিচালক ডা. আহমদ হোসেন (৫০) কে কুপিয়ে জখম করেছে দুর্বৃত্তরা। গতকাল বিকালে হাসপাতালের ডিউটি শেষে বাসায় ফেরার পথে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের পেছনের গলিতে পেছন থেকে এসে তাকে ছুরিকাঘাত করা হয়। পরে আহত অবস্থায় উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করে স্থানীয়রা।
ঘটনার সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, সোমবার বিকাল ৩টা ৩৯ মিনিটের দিকে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরাতন ক্যাম্পাসের পেছনের গলি দিয়ে সাদা পাঞ্জাবি-পায়জামা ও মাথায় সাদা টুপি পরে ঘাড়ে কালো ব্যাগ নিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন ক্যান্সার হাসপাতালের উপ-পরিচালক ডা. আহমদ হোসেন। তার পাশ দিয়ে আরও মানুষ ওই রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন। কিছু বুঝে ওঠার আগেই পেছন দিক থেকে মুখে মাস্ক পরে আসা দুই যুবক পকেট থেকে ধারালো ছুরি বের করে ডা. আহমদ হোসেনকে কোপ দেয়। মাথায় নীল রংয়ের রুমাল বাঁধা, অফহোয়াইট রংয়ের টি-শার্ট ও কালো প্যান্ট পরা যুবক প্রথম তার পকেট থেকে ছুরি বের করে ডা. আহমদ হোসেনের পিঠের পেছনে আঘাত করে। এরপরই ঘুরে দাঁড়ান ডা. আহমদ। চোখে চোখ রেখে গালি দিয়ে তাকে আবারো ঠান্ডা মাথায় একের পর এক ছুরি দিয়ে আঘাত করতে থাকে ওই যুবক। ওই সময় ডা. আহমদ যুবককে ঠেকানোর চেষ্টা করলে তার পাশে থাকা মাথায় সাদা টুপি, আকাশি নীল রংয়ের ফুল শার্ট ও কালো প্যান্ট পরা আরেক যুবক তার হাতে ছুরি দিয়ে আঘাত করতে থাকে। ডা. আহমদ বাঁচাও বলে চিৎকার দিলে ওই দুই যুবক সামনের দিকে হেঁটে চলে যায়। স্থানীয়রা বলেন, হাসপাতাল থেকে বের হওয়ার পর থেকেই ওই দুই যুবক ডা. আহমদ হোসেনকে অনুসরণ করছিল। হাসপাতালের সামনে থেকেই আহমদ হোসেনের পেছন পেছন আসছিল তারা। আর গলির মধ্যে ফাঁকা পাওয়া মাত্রই তার ওপর হামলা চালানো হয়। এই হামলা পূর্বপরিকল্পিত বলেই ওই দুই যুবক মুখে মাস্ক, মাথায় রুমাল ও টুপি পরে এসেছিল।
এদিকে ক্যান্সার হাসপাতালের উপ-পরিচালক ডা. আহমদ হোসেনের ওপর হামলার বিষয়টি নিশ্চিত করে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ-ডিএমপি’র বনানী থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মো. ফরিদুল ইসলাম বলেন, হাসপাতালের টেন্ডার দেয়ার জন্য বেশ কিছুদিন ধরে বিদেশি একটি নম্বর থেকে উপ-পরিচালক ডা. আহমদ হোসেনকে বিভিন্নভাবে হুমকি দিয়ে আসছিল একটি চক্র। এরই ধারাবাহিকতায় আজকে (সোমবার) ডিউটি শেষে বাসায় ফেরার সময় ব্র্যাকের পেছনের গলিতে তার ওপর হামলা চালায় দুই যুবক। আহত উপ-পরিচালক ডা. আহমদ হোসেনকে প্রথমে ক্যান্সার হাসপাতালে ভর্তি করে চিকিৎসা দেয়া হয়। এরপর উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রেফার করা হয়েছে। তার হাতে-পিঠেসহ শরীরের বিভিন্ন জায়গায় একাধিক ধারালো অস্ত্রের আঘাত রয়েছে। ওসি বলেন, টেন্ডারসহ পুরো ঘটনাটি জানার জন্য আমরা কাজ করছি। আশপাশের এলাকার সিসিটিভি ফুটেজও সংগ্রহ করে যাচাই বাছাই চলছে। এর পেছনে কে বা কারা রয়েছে তা জানতে আমাদের একাধিক টিম মাঠে রয়েছে। আশা করি তদন্ত শেষে দ্রুত সময়ের মধ্যেই আমরা বিস্তারিত জানাতে পারবো। বিষয়টি নিয়ে জাতীয় ক্যান্সার হাসপাতালের পরিচালক ডা. মোস্তফা আজিজ সুমন বলেন, আমি সবে মাত্র কিছুদিন হলো পরিচালক হয়ে এসেছি। তবে এরই মধ্যে জানতে পেরেছিÑ আমাদের টেন্ডার কার্যক্রমের সঙ্গে যারা যারা জড়িত তাদের প্রায়ই বিভিন্ন নম্বর থেকে হুমকি দেয়া হয়। যেহেতু আমাদের উপ-পরিচালক এই টেন্ডার কার্যক্রমের পুরো বিষয়টি দেখভাল করতেন তাই তাকেও ফোনে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন লোক হুমকি দেয়। তবে তিনি এসব ঘটনাকে তেমন একটা গুরুত্ব দিতেন না। গত কয়েকদিন হলো, টেন্ডার পাইয়ে দেয়ার জন্য একটি চক্র বিদেশি নম্বর থেকে তাকে বারংবার হুমকি দিয়ে আসছিল। তার প্রাণনাশের হুমকি পর্যন্ত দেয়া হয়। এরপরই আজকের এই ঘটনা। ‘ঠিক কোন টেন্ডারের জন্য এই ঘটনা ঘটতে পারে’Ñ এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আসলে বর্তমানে আমাদের অনেকগুলো টেন্ডার প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। তাই ঠিক কোন টেন্ডারের জন্য তার ওপর কারা হামলা করেছে এটা নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না।
তিনি বলেন, আমি আমার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাসহ স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালককে বিষয়টি জানিয়েছি। ঘটনার পরপরই স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আহত ডা. আহমদ হোসেনকে দেখতে আসেন। আমাদের স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেনও আমাদের হাসপাতালে আসেন আহত উপ-পরিচালককে দেখতে। সকলের পরামর্শে ডা. আহমদ হোসেনকে ঢাকা মেডিকেলে নেয়া হয়েছে। তিনি বলেন, এই বিষয়টি নিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা কাজ করছে। তাদের কাছে আমাদের চাওয়াÑ এই ঘটনার সঙ্গে যারাই জড়িত থাকুক না কেন তারা তাদের আইনের আওতায় নিয়ে আসবেন।
