জ্বালানি সঙ্কটের ধাক্কা শিল্পে, সক্রিয় এফবিসিসিআই জরুরি

জ্বালানি সঙ্কটের ধাক্কা শিল্পে, সক্রিয় এফবিসিসিআই জরুরি

ফন্ট সাইজ:

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান অস্থিতিশীলতা ও ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধের অভিঘাতে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, তার সরাসরি প্রভাব পড়ছে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে। দেশে জ্বালানি সঙ্কট তীব্র হওয়ায় শিল্প উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, বাড়ছে উৎপাদন ব্যয় এবং রপ্তানিতে তৈরি হচ্ছে নতুন অনিশ্চয়তা। এমন এক সংকটময় সময়ে ব্যবসায়ী ও শিল্পপতিদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছে না নির্বাচিত পরিচালনা পর্ষদের অনুপস্থিতির কারণে। ফলে সরকারের সঙ্গে সমন্বিত উদ্যোগ, নীতিগত সংলাপ ও সংকট মোকাবিলার পথ খুঁজে বের করার ক্ষেত্রে বড় ধরনের শূন্যতা তৈরি হয়েছে, যা ব্যবসা-বাণিজ্য ও সামগ্রিক অর্থনীতির জন্য নতুন করে উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠছে। উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, জ্বালানির অনিশ্চিত সরবরাহ এবং বৈদেশিক বাজারে চাহিদার ওঠানামার কারণে ব্যবসায়ীরা এখন এক ধরনের বহুমুখী চাপে রয়েছেন।

শিল্প সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গ্যাস ও বিদ্যুতের ঘাটতির কারণে অনেক কারখানাই পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন করতে পারছে না। আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে গিয়ে উদ্যোক্তাদের অতিরিক্ত খরচ বহন করতে হচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে ব্যবসার টেকসই অবস্থানকে ঝুঁকির মুখে ফেলছে।

ব্যবসায়ীরা মনে করছেন, এই সংকটময় সময়ে একটি শক্তিশালী ও প্রতিনিধিত্বশীল এফবিসিসিআই অত্যন্ত জরুরি ছিল। সংগঠনটি প্রায় সাড়ে ৪ কোটি ব্যবসায়ীর স্বার্থের প্রতিনিধিত্ব করে বলে দাবি করা হয়। কিন্তু নেতৃত্বহীনতার কারণে ব্যবসায়ীদের নানা সমস্যা, দাবি ও প্রস্তাব যথাযথভাবে সরকারের কাছে তুলে ধরা যাচ্ছে না। এতে করে নীতি নির্ধারণে ব্যবসায়ীদের অংশগ্রহণ কমে যাচ্ছে এবং বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্ত গ্রহণেও বাধা সৃষ্টি হচ্ছে।

ইন্টারন্যাশনাল চেম্বার অব কমার্স (আইসিসি) বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট মাহবুবুর রহমান সম্প্রতি বলেন, বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে ব্যবসা-বাণিজ্য পরিচালনা করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে জ্বালানি সঙ্কট যেকোন শিল্পের জন্য সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয়। এ ছাড়া সামনে এলডিসি গ্রাজুয়েশনের চ্যালেঞ্জ রয়েছে। ইতিমধ্যে আইসিসি থেকে আমরা এ বিষয়গুলো সরকারকে অবহিত করেছি। তবে এটা ঠিক, একটি কার্যকর এফবিসিসিআই থাকলে সরকার ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে সমন্বয় বাড়ত এবং সংকট মোকাবিলায় যৌথ উদ্যোগ নেয়া সহজ হতো।

ল্যাবএইড হাসপাতাল গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইকোনমিক রিসার্চ (সিএসইআর)-এর চেয়ারপার্সন সাকিফ শামীম বলেন, জ্বালানি সঙ্কট শুধু উৎপাদন ব্যয়ই বাড়াচ্ছে না, এটি বিনিয়োগ পরিবেশকেও ক্ষতিগ্রস্ত করছে। বিনিয়োগ কমে গেলে কর্মসংস্থানও ঝুঁকিতে পড়বে। তাই দ্রুত নীতিগত সহায়তা প্রয়োজন, যা একটি কার্যকর ব্যবসায়ী সংগঠন ছাড়া সম্ভব নয়। তিনি বলেন, এদিকে আগামী জুনে ঘোষিত হতে যাওয়া ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটকে কেন্দ্র করে ব্যবসায়ীদের প্রত্যাশা বাড়ছে। আগামী বাজেটে জ্বালানি খাতে স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা, উৎপাদন খরচ কমানো এবং রপ্তানি খাতকে প্রণোদনা দেয়ার মতো কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া হোক। পাশাপাশি বাণিজ্য সংগঠনগুলোর সক্ষমতা বাড়াতে বিশেষ বরাদ্দ দেয়া প্রয়োজন। বিশেষ করে এসোসিয়েশন ও জেলা চেম্বারগুলোর অবকাঠামো উন্নয়নে সরকারি সহায়তা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এ লক্ষ্যে আসন্ন বাজেটে এফবিসিসিআইয়ের অনুকূলে অন্তত ৫০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়া হউক। এতে করে সংগঠনগুলোর সক্ষমতা বাড়বে এবং তারা ব্যবসায়ীদের আরও কার্যকরভাবে সেবা দিতে পারবে। তিনি বলেন, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পখাত অর্থনীতির প্রাণ। তাদেরকে সহজ শর্তে ও স্বল্পসুদে ঋণ দিতে হবে। তিনি আরও বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বড় দাবি হচ্ছে, দ্রুত এফবিসিসিআইয়ের নির্বাচন আয়োজন করা। ব্যবসায়ীরা মনে করেন, একটি নির্বাচিত ও শক্তিশালী নেতৃত্বই পারে সরকারের সঙ্গে কার্যকর সংলাপ চালিয়ে যেতে এবং সংকট উত্তরণে বাস্তবসম্মত সমাধান বের করতে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক সায়মা হক বিদিশা বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে অর্থনীতিকে স্থিতিশীল রাখতে সরকারকে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করতে হবে। বৈশ্বিক অস্থিরতা, জ্বালানি সঙ্কট এবং অভ্যন্তরীণ কাঠামোগত দুর্বলতার কারণে দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য এখন এক কঠিন সময় পার করছে। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ ও কার্যকর নীতি সহায়তা। আগামী বাজেট প্রণয়নে এসব বিষয়ে গুরুত্ব দিতে হবে।

সাকিফ শামীম আরও বলেন, বাংলাদেশের অর্থনীতি এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে প্রতিটি নীতিগত সিদ্ধান্তের প্রভাব শুধু সংখ্যায় সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং তা সরাসরি স্পর্শ করবে বাজার, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে। ব্যবসা-বাণিজ্যের ওপর চাপ ক্রমশ বহুমাত্রিক রূপ নিচ্ছে। একদিকে মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা, অন্যদিকে জ্বালানি সরবরাহ সংকট, তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অভ্যন্তরীণ নীতিগত দুর্বলতা এবং ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর কার্যকর নেতৃত্বের অভাব। এই প্রেক্ষাপটে জাতীয় বাজেটকে ঘিরে উদ্বেগ বাড়ছে স্বাভাবিকভাবেই। তিনি বলেন, সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো-দেশের সর্বোচ্চ ব্যবসায়ী সংগঠন এফবিসিসিআই কি তার ভূমিকা যথাযথভাবে পালন করতে পারছে?

ব্যবসায়ী মহলের বড় একটি অংশের মধ্যে এখন এই উপলব্ধি তৈরি হয়েছে যে, নীতি নির্ধারণের গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে এফবিসিসিআইয়ের কণ্ঠস্বর আগের মতো দৃঢ় নয়। বাজারের বাস্তবতা, শিল্পখাতের চাপ, আমদানি ব্যয়, উৎপাদন ব্যয় কিংবা ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের উদ্বেগ-এসব বিষয় যথেষ্ট শক্তিশালীভাবে রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে প্রতিফলিত হচ্ছে না।

সাকিফ শামীম বলেন, একটি কার্যকর ব্যবসায়ী সংগঠনের প্রধান দায়িত্ব হলো- সরকার ও ব্যবসায়ী সমাজের মধ্যে একটি বাস্তবসম্মত সেতুবন্ধন তৈরি করা। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই সেতু যেন দুর্বল, কখনও কখনও প্রায় অদৃশ্য। এরই মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা বাংলাদেশের অর্থনীতির ওপর নতুন করে গভীর চাপ সৃষ্টি করেছে। বাংলাদেশের জ্বালানি আমদানির একটি বড় অংশ মধ্যপ্রাচ্যনির্ভর। ফলে সেখানে সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বৃদ্ধি পাওয়া শুধু সম্ভাবনা নয়, বরং তা এখন বাস্তবতা। ইতিমধ্যে দেশে ডিজেল, পেট্রোল ও অকটেন সরবরাহে চাপ স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে। বিভিন্ন অঞ্চলে ফিলিং স্টেশনে দীর্ঘ সারি, সীমিত বিক্রি এবং কৃষি ও পরিবহন খাতে ব্যাঘাত-এসব লক্ষণ অর্থনীতির ভেতরে বড় ধরনের ধাক্কার পূর্বাভাস দিচ্ছে। তিনি বলেন, জ্বালানি সংকটের অভিঘাত শুধু পরিবহন খাতে সীমাবদ্ধ থাকে না। এটি শিল্প উৎপাদনের ব্যয় বাড়ায়, বিদ্যুৎ উৎপাদনে চাপ সৃষ্টি করে, কৃষি সেচ ব্যবস্থাকে ব্যাহত করে এবং শেষ পর্যন্ত মূল্যস্ফীতিকে আরও ত্বরান্বিত করে। ইতিমধ্যে তৈরি পোশাক, টেক্সটাইল, স্টিল, সিমেন্ট, সিরামিকস, প্লাস্টিক ও ফার্মাসিউটিক্যালস খাতের উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়ার খবর সামনে এসেছে।

বাংলাদেশের অর্থনীতির সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো-এটি এখন একযোগে তিনটি চাপে রয়েছে। প্রথমত, আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি। দ্বিতীয়ত, ডলারের ওপর চাপ ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ উদ্বেগ। তৃতীয়ত, অভ্যন্তরীণ বাজারে উচ্চ মূল্যস্ফীতি। এই তিনটি উপাদান মিলেই ব্যবসা পরিবেশকে অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। ব্যবসায়ীরা এখন বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নিতে দ্বিধায় আছেন। শিল্প উদ্যোক্তারা নতুন প্রকল্পে যাচ্ছেন না। ব্যাংকঋণের উচ্চ সুদহার, জ্বালানি অনিশ্চয়তা এবং চাহিদা সংকোচনের ফলে বেসরকারি বিনিয়োগে স্থবিরতা তৈরি হয়েছে। এর প্রভাব কর্মসংস্থানেও পড়ছে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো আসন্ন জাতীয় বাজেট। এই বাজেট এখন আর কেবল আয়-ব্যয়ের বার্ষিক হিসাব নয়: এটি অর্থনীতিকে স্থিতিশীল রাখার জন্য একটি কৌশলগত দলিল। বাজেট যদি বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ না হয়, তবে বাজারে আস্থাহীনতা আরও বাড়বে। বিশেষ করে ব্যবসায়ী সমাজ আশা করছে কর কাঠামোয় যৌক্তিকতা, উৎপাদন খাতে প্রণোদনা, এসএমই সেক্টরে স্বস্তি এবং জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য সুস্পষ্ট রূপরেখা থাকবে। এখানেই এফবিসিসিআইয়ের ভূমিকা সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হওয়া উচিত ছিল। তারা যদি কার্যকরভাবে শিল্পখাতের বাস্তব সমস্যাগুলো তুলে ধরতে ব্যর্থ হয়, তবে বাজেট প্রণয়নে মাঠপর্যায়ের অর্থনৈতিক বাস্তবতা প্রতিফলিত হওয়ার সুযোগ কমে যায়।

তিনি বলেন, ব্যবসায়ী সংগঠন হিসেবে তাদের উচিত ছিল এখনই সেক্টরভিত্তিক বিশ্লেষণ তুলে ধরা-কোন খাতে কর ছাড় প্রয়োজন, কোথায় ভর্তুকি অপরিহার্য, কোথায় আমদানি শুল্ক পুনর্বিন্যাস দরকার, এবং কীভাবে শিল্প উৎপাদন সচল রাখা যায়। অর্থনীতির এই মুহূর্তে নীতিনির্ধারকদের জন্য সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো-জ্বালানি নিরাপত্তা এখন জাতীয় অর্থনৈতিক নিরাপত্তার অবিচ্ছেদ্য অংশ। মধ্যপ্রাচ্যের যেকোনো অস্থিরতা যে সরাসরি বাংলাদেশের বাজার, কৃষি, শিল্প ও মূল্যস্ফীতিকে প্রভাবিত করতে পারে, তা এখন আর তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ নয়; এটি দৃশ্যমান বাস্তবতা। অতএব, বাজেট হতে হবে বাস্তববাদী, সংকট-সচেতন এবং ব্যবসাবান্ধব।

সাকিফ শামীম বলেন, দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যকে টিকিয়ে রাখতে হলে শুধু বাজেট নয়, প্রয়োজন নীতিগত সমন্বয়, শক্তিশালী ব্যবসায়ী নেতৃত্ব এবং দ্রুত জ্বালানি কূটনীতি। অন্যথায় এই সংকট সাময়িক থাকবে না: এটি দীর্ঘমেয়াদে প্রবৃদ্ধি, বিনিয়োগ এবং কর্মসংস্থানের ওপর গভীর ক্ষত তৈরি করবে। তিনি বলেন, এখানে আরেকটি বড় উদ্বেগের জায়গা হলো রপ্তানি ও আমদানি বাণিজ্যের সরবরাহ শৃঙ্খল। বাংলাদেশের অর্থনীতি আমদানি-নির্ভর শিল্প কাঠামোর ওপর দাঁড়িয়ে আছে। তৈরি পোশাক খাত থেকে শুরু করে ওষুধ, প্লাস্টিক, সিরামিকস, ইস্পাত, সিমেন্ট-সব ক্ষেত্রেই কাঁচামাল, জ্বালানি এবং পরিবহন ব্যয়ের ওপর ব্যাপক নির্ভরতা রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা যদি দীর্ঘায়িত হয়, তাহলে শুধু জ্বালানির দাম নয়, আন্তর্জাতিক শিপিং খরচ, বীমা ব্যয় এবং আমদানি সময়ও বেড়ে যাবে। এর ফলে ব্যবসায়ীদের কার্যকরী মূলধনের ওপর চাপ আরও বাড়বে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এর সরাসরি প্রভাব পড়বে রপ্তানি প্রতিযোগিতা সক্ষমতার ওপর।

তিনি বলেন, বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্প আন্তর্জাতিক বাজারে মূলত মূল্য প্রতিযোগিতার ওপর নির্ভরশীল। যখন উৎপাদন ব্যয় বাড়ে-বিশেষ করে বিদ্যুৎ, গ্যাস, ডিজেল, পরিবহন ও ব্যাংক সুদের কারণে-তখন আন্তর্জাতিক ক্রেতারা সহজেই বিকল্প বাজার যেমন ভিয়েতনাম, ভারত বা কম্বোডিয়ার দিকে ঝুঁকতে পারে। এটি শুধু রপ্তানি আয়ে নয়, লক্ষ লক্ষ শ্রমিকের কর্মসংস্থানেও প্রভাব ফেলতে পারে।

এখানে এফবিসিসিআইয়ের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব ছিল সেক্টরভিত্তিক ব্যবসায়িক ঝুঁকি মূল্যায়ন ও সরকারের কাছে জরুরি নীতি সুপারিশ প্রদান। যদিও সাম্প্রতিক সময়ে তারা ইডিএফ (ঊউঋ) তহবিল বাড়ানো, সুদের হার কমানো এবং কর সংস্কারের প্রস্তাব দিয়েছে ব্যবসায়ী সমাজের অনেকের মতে মাঠপর্যায়ের চাপের তুলনায় এই পদক্ষেপ এখনো যথেষ্ট দৃশ্যমান নয়।একই সঙ্গে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা (ঝগঊং) সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মুখে। বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠান কিছুটা হলেও বাড়তি ব্যয় সামাল দিতে পারে, কিন্তু ক্ষুদ্র ব্যবসা, স্থানীয় উৎপাদক, পরিবহন উদ্যোক্তা, কৃষিনির্ভর ক্ষুদ্র শিল্প এবং খুচরা ব্যবসায়ীরা দ্রুত তারল্য সংকটে পড়ে যাচ্ছে। ব্যাংকঋণের উচ্চ সুদ, বিক্রয় হ্রাস এবং বিদ্যুৎ-জ্বালানি অনিশ্চয়তা তাদের ব্যবসার স্থায়িত্বকে প্রশ্নের মুখে ফেলছে।

এই সংকটের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তা। ডিজেল সংকটের কারণে সেচ ব্যবস্থা ব্যাহত হলে বোরো মৌসুমে ধানের উৎপাদন সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এর প্রভাব শুধু কৃষকের আয় কমায় না, বরং কয়েক মাস পর খাদ্যপণ্যের মূল্যস্ফীতি আরও তীব্র করে তোলে। বর্তমানে মাঠপর্যায়ে সেচ পাম্প চালাতে ডিজেল সংকটের কারণে কৃষকেরা চরম দুর্ভোগে পড়েছেন। এই বাস্তবতায় বাজেটের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হওয়া উচিত উৎপাদন ব্যয় কমানো, কর কাঠামোয় স্বস্তি, জ্বালানি নিরাপত্তা তহবিল।

সাকিফ শামীম আরও বলেন, শুধু রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধির লক্ষ্য নিয়ে বাজেট তৈরি করলে তা ব্যবসা-বাণিজ্যকে আরও চাপে ফেলবে। আরেকটি বিষয় বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর বাড়তি চাপ। বিকল্প উৎস থেকে ব্যয়বহুল জ্বালানি আমদানি করতে গিয়ে সরকারের আমদানি বিল উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ছে, যা রিজার্ভের ওপর সরাসরি চাপ তৈরি করছে। পরিস্থিতি স্থিতিশীল না হলে অতিরিক্ত কয়েক বিলিয়ন ডলার ব্যয় হতে পারে বলে বিশ্লেষকেরা আশঙ্কা করছেন। সবশেষে, এই সংকট আমাদের একটি মৌলিক প্রশ্নের সামনে দাঁড় করিয়েছে-বাংলাদেশের অর্থনীতি কি এখনো অতিমাত্রায় আমদানি-নির্ভর ও জ্বালানি-ঝুঁকিপূর্ণ রয়ে গেছে? যদি উত্তর হ্যাঁ হয়, তাহলে এবারের বাজেট শুধু বার্ষিক আর্থিক দলিল নয়: এটি হতে হবে অর্থনৈতিক পুনর্গঠনের রূপরেখা।