হকিতে উন্নতির গ্রাফটা নিম্নমুখী। গতবছর ভারতে হওয়া এশিয়া কাপে ৬ষ্ঠ হয় বাংলাদেশ। স্থান নির্ধারণীতে জাপানকে হারাতে পারলে ২০২৬ হকি বিশ্বকাপ বাছাইয়ে সরাসরি খেলতে পারতো লাল-সবুজ প্রতিনিধিদের দল। প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। জাপানের কাছে হেরে পাকিস্তানের সঙ্গে প্লে অফ সিরিজ খেলতে হয় বাংলাদেশকে। ঘরের মাঠে হওয়া সেই সিরিজে পাকিস্তানের কাছে পাত্তা পায়নি বাংলাদেশ। তিন ম্যাচে ২৬ গোল হজমের বিপরীতে ৫ গোল করে। এবার নতুন করে যোগ হলো এশিয়ান গেমস হকি বাছাইপর্বের ব্যর্থতা। আগের তিন আসরের ফাইনালিস্ট বাংলাদেশের যাত্রা শেষ হলো পঞ্চম হয়ে । এই ব্যর্থতার পেছনে বাংলাদেশের কোচ ও খেলোয়াড়দের যেমন দায় আছে, তেমনি দায়ী ফেডারেশনও। দুই দশক ধরে এশিয়ান গেমস হকি বাছাইপর্বে দাপট দেখায় বাংলাদেশ। ২০০৬ সালে প্রথমবার ঘরের মাঠে হওয়া বাছাইপর্বে চ্যাম্পিয়ন হয় লাল-সবুজ প্রতিনিধিরা।
২০১৪ সালে এই টুর্নামেন্টে দ্বিতীয়বার শিরোপা জেতে বাংলাদেশ। এরপর ২০১৮ ও ২০২২ সালে ওমানের কাছে হেরে রানার্সআপ হয় লাল-সবুজের দল। এবার ফিরলো ১৬ বছর আগের স্মৃতি। ২০১০ সালে ঘরের মাঠে এশিয়ান গেমস বাছাইয়ে পঞ্চম হয় বাংলাদেশ। দলের এমন পারফরম্যান্সকে লজ্জাজনক বলছেন জাতীয় দলের সাবেক অধিনায়ক রফিকুল ইসলাম কামাল। তিনি বলেন, ‘আগে আমরা চীন-জাপানের মতো দলের সঙ্গে ফাইট করতাম। এখন র?্যাঙ্কিংয়ে পিছিয়ে থাকা দলের সঙ্গেও নাকানিচুবানি খেতে হচ্ছে। এবারের পারফরম্যান্স লজ্জাজনক ও ইতিহাসের সবচেয়ে বাজে পারফরম্যান্স।’ ব্যাংককে টুর্নামেন্ট খেলতে যাওয়ার একমাস আগে অনুশীলন ক্যাম্প করে বাংলাদেশ। প্রস্তুতিতে ছিল চরম অব্যবস্থাপনা। বিদেশি দলের সঙ্গে কোনো সিরিজ কিংবা প্রস্তুতি ম্যাচ খেলার ব্যবস্থা করতে পারেনি ফেডারেশন। থাইল্যান্ডে গিয়ে হংকং এর সঙ্গে দুই কোয়ার্টারের একটি গা গরমের ম্যাচ খেলেই আশরাফুল-রাব্বিদের সন্তুষ্ট থাকতে হয়েছে। পরে এই প্রস্তুতিতে টুর্নামেন্ট খেলে র?্যাঙ্কিংয়ে ২৮ ধাপ থেকে দুই ধাপ পিছিয়ে ৩০তম স্থানে পৌঁছেছে বাংলাদেশ। এমন পারফরম্যান্সের পেছনে দীর্ঘ মেয়াদি পরিকল্পনার অভাবকে দুষছেন রফিকুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘বিশ্বের সেরা হকি দলগুলো যেখানে প্রযুক্তিতে এগিয়ে গেছে আমরা পেছনেই পড়ে আছি। দীর্ঘমেয়াদি প্ল্যান নেই। ঘরোয়া লীগ নেই। কোনো টুর্নামেন্ট এলে দায়সারা এক মাসের ক্যাম্প করা হয়। প্লেয়ারদের আয়ের উৎসও নেই। কোচিংয়ে উন্নতির তাড়না নেই। এত নেই এর মাঝে গ্রাফ নিম্নমুখী হওয়াটা অস্বাভাবিক না।’ টুর্নামেন্ট আয়োজনের অভাবই দেশের হকি অঙ্গনে বড় সংকট। ২০১৫ সালের নভেম্বরে হকির অ্যাডহক কমিটি দায়িত্ব নেয়ার ১৫ মাসে মাত্র তিনটি ঘরোয়া টুর্নামেন্ট করেছে। সবশেষ ঘরোয়া লীগ মাঠে গড়ায় তিনবছর আগে। গত ২৬ বছরে মাত্র ১৩ বার মাঠে গড়িয়েছে প্রথম বিভাগ লীগ। দ্বিতীয় বিভাগ হকি লীগেও নেই সুখবর, শেষ ১২ বছরে মাত্র ৫ বার মাঠে গড়িয়েছে। স্কুল হকি,স্বাধীনতা দিবস হকি টুর্নামেন্ট পর্যন্ত আলোর মুখ দেখেনি। এ কারণে তৃণমূল থেকে নতুন প্রতিভা উঠে আসছে না। হকির এই দুঃসময়ে আক্ষেপ করছেন সাবেক অধিনায়ক মামুনুর রহমান চয়ন। ফরিদপুর থেকে উঠে আসা এ হকি তারকা বলেন, ‘বাছাইয়ে শ্রীলঙ্কা ফাইনাল খেলেছে। তাদের আমরা বলে কয়ে হারাতাম। ওরা (শ্রীলঙ্কা) এই টুর্নামেন্টে আসার আগে ফ্র্যাঞ্চাইজি হকি টুর্নামেন্ট খেলে প্রস্তুত হয়েছে। পাইপলাইন তৈরি হবে কিভাবে? বিকেএসপি ছাড়া আর তেমন কোথাও হকি বেঁচে নেই। সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনীতে প্লেয়াররা চাকরি না পেলে তো খেলাই ছেড়ে দিতে হতো।’ লীগ আয়োজনের তাগিদ এশিয়ান গেমস হকি বাছাইয়ে বাংলাদেশ দলের সহঅধিনায়কের ভূমিকায় থাকা বিপ্লব কুজুরের। তিনি বলেন, ‘লীগ না হলে কিভাবে নিয়মিত খেলার মধ্যে থাকা যায়? ফেডারেশনের কাছে একটাই চাওয়া যেন দ্রুত লীগ আয়োজন করে।’ অন্যদিকে লীগ আয়োজন করতে না পারার পেছনে ক্লাবগুলোর ওপর দায় চাপাচ্ছে ফেডারেশন। বাংলাদেশ হকি ফেডারেশনের (বাহফে) সাধারণ সম্পাদক লে. কর্নেল (অব.) রিয়াজুল হাসান বলেন, ‘ফেডারেশনগুলোকে চিঠি দিয়েও আমরা লীগে খেলানোর ব্যাপারে সম্মত করাতে পারিনি। আর্থিক ব্যাপারও রয়েছে। আবারো তাদের চিঠি দেবো।’ দেশের হকির নিম্নমুখী গ্রাফ থেকে উত্তরণের জন্য পাইপলাইন শক্তিশালী করা ও টুর্নামেন্ট আয়োজনের তাগিদ দিয়েছেন সাবেক অধিনায়ক রফিকুল ইসলাম কামাল। তিনি বলেন, ‘জাপান ও ইন্দোনেশিয়া হকিতে বেশ উন্নতি করেছে। তারা ইভেন্ট আয়োজন করছে। হকির সুনাম পুনরুদ্ধারে আন্তর্জাতিক ও ঘরোয়া টুর্নামেন্ট আয়োজনের বিকল্প নেই। সরকারকেও হকির প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে।’
