রিসেট

পরিকল্পনা ছিল ৩২ নম্বরে শোক মিছিলে হামলার

প্রকাশিত: ১৬ আগস্ট (বুধবার), ২০১৭ Archive 2016
Warning: Undefined property: stdClass::$news_source in /var/www/vhosts/mzamin.com/httpdocs/old-archive.php on line 257

Deprecated: htmlspecialchars(): Passing null to parameter #1 ($string) of type string is deprecated in /var/www/vhosts/mzamin.com/httpdocs/old-archive.php on line 257
Source:
ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে বড় ধরনের নাশকতা সৃষ্টি করার পরিকল্পনা ছিল নব্য জেএমবি’র। জাতীয় শোক দিবসে এই জায়গাটিতে হামলা করে নিজেদের সক্রিয়তার কথা জানাতে চেয়েছিল এ জঙ্গি সংগঠনটি। কিন্তু বড় ধরনের কোনো ক্ষতি হওয়ার আগেই কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিটের একটি টিমের নজরে আসে তাদের গতিবিধি। গতকাল শোক দিবসের সকালে রাজধানীর পান্থপথে হোটেল ওলিওতে ঘটে যাওয়া ‘অপারেশন আগস্ট বাইট’ অভিযানে সফলভাবে জেএমবি সদস্য সাইফুল ইসলামকে সনাক্ত করে অভিযান চালানো হয়। এতে আত্মঘাতী হয়ে মারা যায় সাইফুল। পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিটের পক্ষ থেকে এসব তথ্য জানানো হয়। কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিটের কর্মকর্তারা বলছেন, নব্য জেএমবি’র নতুন এই পরিকল্পনা নস্যাৎ করে দেয়া নিঃসন্দেহে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অনেক বড় সাফল্য। জঙ্গিরা তাদের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে পারলে অনেক বেশি ক্ষয়ক্ষতি হতে পারতো। অভিযান শেষে এক সংবাদ সম্মেলনে সিটিটিসি’র প্রধান মনিরুল ইসলাম বলেন, নব্য জেএমবি’র একটি সেল বড় নাশকতার পরিকল্পনা করেছিল। তাদের সেই পরিকল্পনার বিষয়ে আমরা আগাম কিছু গোয়েন্দা তথ্য পাচ্ছিলাম। ধারাবাহিক অভিযানে কোণঠাসা নব্য জেএমবি কিছুটা মরিয়া হয়ে ওঠে। তাদের লক্ষ্য ছিল, একটি বড় হামলা করা। যাতে নিজেদের অস্তিত্ব জানান দেয়া যায়। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিকভাবে তাদের সক্ষমতার বিষয়টি প্রচার পায়। মনিরুল ইসলাম আরো বলেন, কোণঠাসা হয়ে যাওয়ায় নব্য জেএমবি নতুন করে সদস্য রিক্রুট করতে পারছিল না। এই হামলার মাধ্যমে তাদের সদস্যরা যাতে আরও বেশি চাঙ্গা হয়, সেই পরিকল্পনাও ছিল তাদের। ১৫ই আগস্ট শোক দিবসের মিছিলে সাধারণ মানুষ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর জঙ্গিদের হামলার পরিকল্পনার কথা কয়েক দিন আগেই জানতে পারে কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিট। মনিরুল ইসলাম বলেন, বিশেষ প্রযুক্তি ও গোয়েন্দা তথ্যের মাধ্যমে আমরা জানতে পারি নব্য জেএমবি’র একটি দল নতুন করে হামলার পরিকল্পনা করছে। এজন্য চলতি মাসের শুরুতেই বিদায়ী সদস্য হিসেবে সাইফুল ইসলামকে প্রস্তুত থাকতে বলা হয়। চলতি মাসের ৭ই আগস্ট খুলনা থেকে ঢাকায় আসে সাইফুল। এরপর বিভিন্ন জায়গায় অবস্থানের পর শোক দিবস উপলক্ষে ৩২ নম্বরে হামলার জন্য বলা হয় সাইফুলকে। এজন্য তাকে দেয়া হয় প্রয়োজনীয় এক্সপ্লোসিভ। কালো ট্রাভেল ব্যাগে করে এক্সপ্লোসিভ ও সুইসাইডাল ভেস্ট নিয়ে হোটেল ওলিও ইন্টারন্যাশনালের ৩০১ নম্বর কক্ষটি ভাড়া নেয় সাইফুল। সিটিটিসির প্রধান আরো বলেন, আগস্ট মাস হচ্ছে নাশকতার মাস, চক্রান্তের মাস। আর তারই অংশ হিসেবে আজকের শোক দিবসকে কাজে লাগিয়েছে তারা। আর এই দিনে যেহেতু ধানমন্ডির ৩২ নম্বর এলাকায় প্রচুর জনসমাগম হয়ে থাকে, বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ এখানে আসে, বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করে- সে হিসেবে নব্য জেএমবির একটা সেল পরিকল্পনা করছিল এখানে একটা বড় ধরনের ঘটনা তারা সংগঠিত করবে। আমরা তিনটি সম্ভাব্য স্পটের মধ্যে পান্থপথকে আমরা গুরুত্ব দিয়ে চিহ্নিত করি। তাই পান্থপথে আমাদের গুপ্তচর বা টেকনোলজি সমৃদ্ধ ইনটেলিজেন্সের মাধ্যমে নিশ্চিত হই যে এক বা একাধিক কোনো ব্যক্তি এই অঞ্চলে অবস্থান নিয়েছে। সে সূত্র ধরেই রোববার থেকেই আমরা ব্লক রেট শুরু করি। পরবর্তীকালে আবার ব্লক রেড দিয়ে নিশ্চিত হই যে মিরপুর রোড কিংবা পান্থপথের কোনো আবাসিক হোটেল অথবা মেসে কেউ অবস্থান করেছে। দ্বিতীয়বার রেড দেয়ার পর আমরা হোটেল ওলিও ইন্টারন্যাশনালের বিভিন্ন কক্ষে নক দিই। প্রতিটি কক্ষের দরজা খুলে দেয় সবাই। কিন্তু এই একটা কক্ষ যেটি তিনতলার ৩০১ নম্বর কক্ষ দরজা খোলেনি। দরজা না খুলে বলে যে, সকালের আগে দরজা খোলা যাবে না। তখনই আমাদের সন্দেহ হয়। আর এই করিডোরের পাশে একটি জানালা ছিল।  সেটি দিয়ে তার ব্যাগ ও জামাকাপড় দেখা যায়। তখনই আমাদের যারা ব্লক রেড করছিল তারা খুব বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে বাহির থেকে তালা লাগিয়ে দেয়। যাতে সে ভেতর থেকে পালিয়ে যেতে না পারে। আমরা যেহেতু প্রস্তুত ছিলাম সে কারণে তারপরই সোয়াত এবং বোমা নিষ্ক্রিয়কারী দল উপস্থিত হয়। সকাল থেকে আমরা বারবার তাকে আত্মসমর্পণ করার জন্য বলি এবং ভেতরে যা আছে সেটা রেখে এসে যেন সে নিজ থেকে ধরা দেয়, সেজন্য অনুরোধ করি। শুধু তাই নয়, তার সঙ্গে যোগাযোগের স্থাপনের চেষ্টাও করি। কিন্তু সে আমাদের আহ্বানে সাড়া না দেয়ার কারণে আমরা অভিযানের সিদ্ধান্ত নিই।  পুরো ঘটনার বিবরণ জানিয়ে মনিরুল ইসলাম বলেন, সোয়াতের সদস্যরা গুলি করতে করতে রুমের সামনে চলে যায়। কাছাকাছি গিয়ে রুমের সামনে গ্যাস ছাড়ে। একপর্যায়ে সে রুমের ভেতর থেকেই বিস্ফোরণ ঘটায়। বিস্ফোরণের পরেই রুমের দরজা ভেঙে যায় এবং সে বেরিয়ে আসে। সোয়াদের সদস্যরাও গুলি ছোড়ে। একই সঙ্গে তার নিজের হাতে থাকা বোমাটিও বিস্ফোরিত হয়। পাশাপাশি সে যে রুমে ছিল, তার দেয়াল ভেঙে পড়ে। আমরা যেটা দেখেছি সেটা হলো- এটি একটা শক্তিশালী বোমা, যা বিস্ফোরিত হয়। এই বোমা সে ট্রাভেল ব্যাগে করে এনেছিল। পরবর্তীকালে আমরা আরো একটি বোমা অবিস্ফোরিত অবস্থায় উদ্ধার করেছি। মোট তিনটি বোমা তার কাছে ছিল। একটা প্রথমেই ফুটিয়ে ছিল। যার ফলে রুমের দরজা ভেঙে পড়ে। অন্যটি নিজের হাতেই ফোটায়। আর তৃতীয়টি বোম ডিসপোজাল ইউনিট উদ্ধার করে। মনিরুল ইসলাম আরো জানান, আত্মঘাতী সাইফুলের বাবার নাম আবুল খায়ের। তার বাড়ি খুলনার ডুবুরিয়া থানায়। খুলনার বিএন কলেজের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী। চলতি মাসের ৭ তারিখে বাড়িতে মাকে চাকরির কথা বলে ঢাকায় আসে। এখানে এসে বিভিন্ন জায়গায় অবস্থান করার পর তাকে এই আত্মঘাতী হামলার দায়িত্ব দিয়ে পাঠানো হয়েছে। গোয়েন্দাদের তথ্য মতে, সে এই হোটেলে একাই ছিল। জানা গেছে, সাইফুল ইসলাম সদ্য নব্য জেএমবির সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। এর আগে সে ছাত্র শিবিরের কর্মী ছিল। তার বাবাও জামায়াতের সঙ্গে জড়িত। এদিকে পুলিশের মহাপরিদর্শক একেএম শহীদুল ইসলাম  গতকাল এর আগে আরেক সংবাদ সম্মেলনে জানান, জাতীয় শোক দিবসে ৩২ নম্বরে ব্যাপক জনসমাগমে নাশকতা সৃষ্টির লক্ষ্যে পরিকল্পনা করে নব্য জেএমবি। তিনি বলেন, ১৫ই আগস্টে ৩২ নম্বরে আসা মিছিলে আত্মঘাতী হামলার পরিকল্পনা ছিল ওই জঙ্গির। গোয়েন্দা টিম দীর্ঘদিন থেকে ১৫ই আগস্ট উপলক্ষে হামলা পরিকল্পনাকারীদের অনুসন্ধান চালাচ্ছিল। আমাদের গোয়েন্দা পুলিশের তৎপরতায় পান্থপথে হোটেল ওলিও ইন্টারন্যাশনালে ওই জঙ্গির অবস্থান নিশ্চিত করে।
যেভাবে অভিযান:
পুলিশ সূত্র জানায়, একের পর এক জঙ্গিবিরোধী অভিযানে বহু জঙ্গি নেতাকর্মী নিহত ও নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন নব্য জেএমবি কোণঠাসা হয়ে পড়ায় বাকি সদস্যরা সংগঠনের অস্তিত্ব জানান দিতে মরিয়া হয়ে ওঠে। এজন্য ধানমন্ডি ৩২ কাছে শোক দিবসের মিছিলে আত্মঘাতী বিস্ফোরণ ঘটিয়ে নিজেদের অস্তিত্ব জানান দিতে সাইফুল স্থানীয় লায়ন ফিরোজ এ রহমানের মালিনাকাধীন ওই হোটেলে ওঠে। সঙ্গে নেয় ৩টি শক্তিশালী বোমা, সুইসাইডাল ভেস্ট ও সরঞ্জামাদি। পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজমের গোয়েন্দা টিম বেশ কয়েক দিন আগেই নাশকতার পরিকল্পনার আগাম তথ্য জানতে পারে। তারপর গত কয়েক দিন ধরেই ধানমন্ডির সঙ্গে সংযুক্ত তিনটি রাস্তায় ব্লক রেইড দিতে থাকে। একপর্যায়ে গত সোমবার দিবাগত শেষ রাতের দিকে পুলিশ পান্থপথের ওই হোটেলে প্রতিটি রুমে গিয়ে টোকা দেয়। এরপর প্রত্যেক কক্ষ খুলে দেয়া হয়। কিন্তু তৃতীয় তলার কোণের ৩০১ নম্বর কক্ষের দরজায় কড়া নাড়া হলে ভেতর থেকে বলা হয় এখন নয়, সকালে দরজা খোলা হবে। একাধিকবার নক করা হলে সকালের আগে দরজা খোলা হবে না বলে কঠোরভাবে জানিয়ে দেয়া হয়। এরপর জানালা দিয়ে উঁকি দিয়ে তারা ভেতরে ব্যাগ ও কাপড় দেখতে পান। এরপর পুলিশ সদস্যরা কৌশলে দরজার বাইরে তালা দেয়। ঘিরে রাখে ভবনটি। পুলিশের আত্মসমর্পণের প্রস্তাবেও ওই জঙ্গি তাতে কান দেয়নি। ভোরে ওই হোটেল থেকে সবাইকে বের করে আনা হয়। সকালে ঘটনাস্থলে আসে সোয়াত টিম। একে একে আসতে থাকে কলাবাগান থানা পুলিশ, র‌্যাব, ফায়ার সার্ভিস সদস্যরা। এসে উপস্থিত হন পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। এদিকে তার কাছেই দিনের প্রথম প্রহর থেকে ধানমন্ডি ৩২-এ জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিকৃতিতে পুষ্পস্তবক অর্পণের মধ্য দিয়ে সম্মান জানানোর আনুষ্ঠানিকতা চলছিল। এজন্য অভিযান পরিচালনা বিলম্ব করে তাকে বারবার আত্মসমপর্ণের প্রস্তাব দেয়া হচ্ছিল। সকাল পৌনে ১০টার দিকে সোয়াত টিম অভিযান আগস্ট বাইট শুরু করে। সোয়াতের অভিযানের পর বোমা নিষ্ক্রিয়কারী দল পৌনে ১২টায় অবিস্ফোরিত অবস্থায় উদ্ধার হওয়া তৃতীয় বোমাটি নিষ্ক্রিয় করার পর অভিযানের সমাপ্তি ঘোষণা করেন আইজিপি।
সরজমিন দেখা যায়, গতকাল সকাল থেকে রাসেল স্কয়ার থেকে পান্থপথ মোড় পর্যন্ত সড়ক বন্ধ করে দেয়া হয়। দুপাশে বসে পুলিশের বেরিকেড। প্রায় সারাদিন বন্ধ ছিল যানবাহন চলাচল। স্কয়ার হাসপাতালের ফুটওভার ব্রিজে বসে আরও একটি বেরিকেড। সংবাদকর্মীদেরকেও এর ভেতরে যেতে দেয়া হয়নি। সকাল পৌনে ১০টার দিকে সোয়াত অভিযান শুরু করার পর মুহুর্মুহু গুলি হতে থাকে। ঘটে পর পর দুটি বিস্ফোরণ। থেমে থেমে ১৫ মিনিট ধরে গুলি। এ সময় ভেঙে পড়া কাচ এসে লাগে এক দর্শনার্থীর। তিনি মুহূর্তেই রক্তাক্ত হয়ে যান। তাকে স্কয়ার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। গতকাল সন্ধ্যায় নিহত জঙ্গি সাইফুলের লাশ উদ্ধার করে অ্যাম্বুলেন্সে করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ মর্গে নেয়া হয়েছে। সেখানে লাশের ময়নাতদন্ত হওয়ার কথা রয়েছে।