ছাত্রলীগ নেতারা কে কোথায়?

বেলায়েত হোসাইন | ২০১৬-০২-০৯ ১০:৩০

অবিভক্ত পাকিস্তানের সর্বপ্রথম ছাত্র সংগঠন বাংলাদেশ ছাত্রলীগ। ঐতিহ্যবাহী এই ছাত্র সংগঠনটির জন্ম আওয়ামী লীগের এক বছর আগে। জন্মের পর যে কোনো আন্দোলন-সংগ্রামে সামনের কাতারে ছিল সংগঠনটি। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ১৯৬২ শিক্ষা আন্দোলন, ১৯৬৬ এর ৬ দফা, ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান, ১৯৭১ এর মহান মুক্তিযুদ্ধের সংগ্রাম ও ১৯৯০-এর স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনসহ প্রতিটি গণতান্ত্রিক আন্দোলনে সক্রিয় ছিল ছাত্রলীগ। দেশের প্রাচীন এই সংগঠনটি ঐতিহ্য হারাতে বসেছে গত দুই যুগেরও বেশি সময় ছাত্র সংসদ নির্বাচন না থাকায়। স্বাধীনতার ৬ মাসের মাথায় ছাত্রলীগে ভাঙন দেখা দেয়। তবে ১৯৭১ সাল থেকে বর্তমান কমিটি পর্যন্ত ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পদে এসেছেন ১৫ জন। কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক ছিলেন ১জন। সাবেক এই ছাত্র নেতাদের মধ্যে বর্তমানে আওয়ামী লীগের নীতি-নির্ধারণী ফোরাম প্রেসিডিয়ামে আসতে পেরেছেন মাত্র ১ জন, বিএনপিতে গেছেন ২ জন, অন্য দলে ২জন। বাকিদের মধ্যে অনেকে বেঁচে নেই। কেউ আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পদে। পদহীনও রয়েছেন বেশ কয়েকজন। দশম জাতীয় সংসদে এমপি হয়েছেন ৫ জন। এ ছাড়া বর্তমান সরকারের মন্ত্রিসভায় আছেন একজন।
১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি ছিলেন নুরে আলম সিদ্দিকী। বর্তমানে তিনি প্রাক্তন ছাত্রলীগ ফাউন্ডেশনের আহ্বায়ক। তার সময়ে সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্বে ছিলেন শাজাহান সিরাজ। দেশ স্বাধীন হওয়ার মাত্র ৬ মাসের মাথায় এই দুজনের নেতৃত্বে ছাত্রলীগে ভাঙন দেখা দেয়। এর মধ্যে মুজিববাদী হিসেবে পরচিতি অর্থাৎ মূল অংশের নেতৃত্বে থেকে যান  নুরে আলম সিদ্দিকী। আর শাজাহান সিরাজের অংশটি বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রীপন্থী হিসেবে পরিচিত হয়। এই অংশটি পরবর্তী সময়ে জাসদ ছাত্রলীগ নামে আত্মপ্রকাশ করে। শাজাহান সিরাজ ছাত্র রাজনীতি শেষ করে যোগ দেন জাসদের রাজনীতিতে। তিনি জাসদের টিকিটে ৩ বার এমপি নির্বাচিত হন। এরপর যোগ দেন বিএনপিতে। ছিলেন বিএনপির ভাইস-চেয়ারম্যান পদে। ৮ম সংসদে বিএনপির এমপি ছিলেন। দায়িত্ব পালন করেন বন ও পরিবেশ মন্ত্রণালয়ে। বর্তমানে শারীরিক অসুস্থতার কারণে দল ও রাজনীতি থেকে দূরে রয়েছেন।
এরপর ১৯৭৪ সাল পর্যন্ত ছাত্রলীগের সভাপতির পদে ছিলেন শেখ শহীদুল ইসলাম। তিনি সম্পর্কে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভাগ্নে। শেখ শহীদ পরে জাতীয় পার্টিতে যোগ দিয়ে তিনি এরশাদ সরকারের শিক্ষামন্ত্রী ও গণপূর্তমন্ত্রীর দায়িত্ব পান। বর্তমানের আনোয়ার হোসেন মঞ্জুর নেতৃত্বাধীন জাতীয় পার্টির মহাসচিবের পদে আছেন। তার সময় সাধারণ সম্পাদক ছিলেন এম এ রশিদ। তার পৈতৃক নিবাস পটুয়াখালী। তিনি বর্তমানে প্রাক্তন ছাত্রলীগ ফাউন্ডেশন এর সঙ্গে জড়িত।
১৯৭৪ সাল থেকে ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত ছাত্রলীগের সভাপতি ছিলেন মনিরুল হক চৌধুরী। তিনি পরবর্তী সময়ে বিএনপিতে যোগ দেন। এমপিও নির্বাচিত হন। তার নিজ জেলা কুমিল্লা। মনিরুল হক চৌধুরীর সভাপতির সময় সাধারণ সম্পাদক ছিলেন শফিউল আলম প্রধান। সাধারণ সম্পাদক থাকা অবস্থাতেই তিনি দল থেকে বহিষ্কৃত হন। বর্তমানে তিনি জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি-জাগপার সভাপতি।  
১৯৭৫ সালে বাকশাল গঠনের পর জাতীয় ছাত্রলীগ ছাড়া সকল ছাত্র সংগঠন বিলুপ্ত হয়ে যায়। জাতীয় ছাত্রলীগের সভাপতির কোনও পদ না থাকায় সাধারণ সম্পাদক হয়ে পুনরায় আসেন শেখ শহিদুল ইসলাম। এরপর ১৯৭৭ সালে জাতীয় ছাত্রলীগ থেকে আবার বাংলাদেশ ছাত্রলীগে রূপান্তরিত হয়। যার আহ্বায়ক পদে ছিলেন এম এ আউয়াল। তার পৈতৃক নিবাস নারায়ণগঞ্জে। বেশ কয়েক বছর আগে তিনি মারা গেছেন। এরপর ১৯৭৮ সাল থেকে ১৯৮১ সাল পর্যন্ত ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সভাপতির পদে ছিলেন ওবায়দুল কাদের। ছাত্রলীগ নেতাদের মধ্যে তিনিই সম্ভবত দলের সর্বোচ্চ পদে আসীন আছেন। বর্তমানে আওয়ামী লীগের সর্বোচ্চ নীতি-নির্ধারণী ফোরাম প্রেসিডিয়ামের সদস্য ছাড়াও দুই মেয়াদের পালন করছেন যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব। এর আগে ১৯৯৬ সালে তিনি প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। ২০০৮ সালের নবম ও দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তার পৈতৃক নিবাস নোয়াখালীর কোম্পানিগঞ্জ থেকে এমপি নির্বাচিত হন।
ওবায়দুল কাদের ছাত্রলীগের সভাপতি থাকাকালীন সাধারণ সম্পাদক ছিলেন বাহালুল মজনুন চুন্নু। বর্তমানে আওয়ামী লীগের গুরুত্বপূর্ণ কোনো পদে না থাকলেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট নির্বাচনে আওয়ামী প্যানেলের নির্বাচনী দেখভালের পাশাপাশি বঙ্গবন্ধু সমাজ কল্যাণ পরিষদের চেয়ারম্যান তিনি।
১৯৮১ সাল থেকে ১৯৮৩ সাল পর্যন্ত ছাত্রলীগের সভাপতি হন ডা. মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিন। ঢাকা মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস করা মোস্তফা জামাল চিকৎসকদের সংগঠন বিএমএ’র ৩ বারের নির্বাচিত সেক্রেটারি। ছিলেন আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্য বিষয়ক সম্পাদক। ২০০৮ সালের নবম সংসদ নির্বাচনে লালবাগ থেকে এমপি নির্বাচিত হলে দশম নির্বাচনে সাবেক সংসদ সদস্য হাজি সেলিমের কাছে হেরে যান। তার সময় সাধারণ সম্পাদক ছিলেন আ খ ম জাহাঙ্গীর। তিনি দলের কোনো গুরুত্বপূর্ণ পদে নেই। বর্তমানে ব্যবসায়ী। দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পটুয়াখালী থেকে এমপি হওয়ার আগেও একাধিকবার এমপি হয়েছেন।
১৯৮৩ সাল থেকে ১৯৮৫ সাল পর্যন্ত সভাপতি ছিলেন আবদুল মান্নান। ময়মনসিংহের বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশোনা করা এই ছাত্র নেতা দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বগুরায় সারিয়াকান্দি থেকে এমপি  হয়েছেন। বর্তমানে একজন কৃষিবিদ হিসাবে পরিচিত। মান্নানের সভাপতির সময় সাধারণ সম্পাদকের পদে ছিলেন জাহাঙ্গীর কবির নানক। ডাকসু নির্বাচনে জিএস পদে নির্বাচন করে হেরে যান তিনি। বর্তমানে আওয়ামী লীগের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক। নবম সংসদে ঢাকার মোহাম্মদপুর থেকে এমপি হওয়ার পর দায়ত্বি পান স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী হিসেবে। দশম সংসদ এমপি হলেও কেবিনেটে স্থান পাননি তিনি।
১৯৮৫ সাল থেকে ১৯৮৮ সাল পর্যন্ত ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সভাপতির পদে ছিলেন সুলতান মুহাম্মদ মনসুর আহমেদ। স্বাধীনতা যুদ্ধের পর ডাকসু নির্বাচনে ছাত্রলীগের প্যানেল থেকে তিনিই প্রথম ভিপি নির্বাচিত হন। ১৯৯৬ সালের সংসদ নির্বাচনে তিনি নিজ এলাকা মৌলভীবাজার-২ আসন থেকে এমপি নির্বাচিত হন। সর্বশেষ আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ছিলেন। তার সময়ে সাধারণ সম্পাদক ছিলেন আব্দুর রহমান। নবম ও দশম সংসদ নির্বাচনে তিনি এমপি হয়েছেন। বর্তমানে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য তিনি। রাজনীতির বাইরে তিনি শেয়ার মার্কেটের ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। ১৯৮৮ সাল থেকে ১৯৯২ সাল পর্যন্ত ছাত্রলীগের সভাপতি হন হাবিবুর রহমান। পরে ছাত্রলীগের রাজনীতি ছেড়ে যোগ দেন বিএনপিতে। বর্তমানে বিএনপির সহ তথ্য ও গবেষণা বিষয়ক সম্পাদক। তার সময় সাধারণ সম্পাদক হিসেবে ছিলেন অসীম কুমার উকিল। বর্তমানে আওয়ামী লীগে কেন্দ্রীয় উপ-প্রচার সম্পাদক। দশম সংসদে মনোনয়ন চেয়েও পাননি তিনি। তার স্ত্রী অপু উকিল যুব আওয়ামী মহিলা লীগের সেক্রেটারি। ১৯৯২ থেকে ১৯৯৪ পর্যন্ত এই সংগঠনের সভাপতির ছিলেন মাঈনুদ্দিন হাসান চৌধুরী। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশুনা করা নেতার পৈতৃক নিবাস চট্টগ্রামের সাতকানিয়া। রাজনীতিতে থাকলেও তেমন সরব নন। নেই কোনও গুরুত্বপূর্ণ পদেও। তার সময় সাধারণ সম্পাদক ছিলেন ইকবালুর রহিম। দশম সংসদ নির্বাচনে দিনাজপুর সদর থেকে এমপি হয়ে বর্তমান সংসদের একজন হুইপ। দলের কোনো গুরুত্বপূর্ণ পদে নেই তিনি।
আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য একেএম এনামুল হক শামীম। ১৯৯৪ থেকে ১৯৯৮ পর্যন্ত ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সভাপতির পদে ছিলেন তিনি। সক্রিয় রাজনীতির পাশাপাশি তিনি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটির পরিচালনার সঙ্গে জড়িত আছেন। তিনি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদের ভিপি ছিলেন। শামীমের সভাপতি থাকাকালীন সাধারণ সম্পাদকের পদে ছিলেন ইসহাক আলী পান্না। বর্তমানে আওয়ামী লীগের উপকমিটির সহ-সম্পাদক তিনি। এ ছাড়া একটি ইন্স্যুরেন্স কোম্পানির চেয়ারম্যানের পদে রয়েছেন তিনি। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশোনা করেছেন। এরপর ১৯৯৮ থেকে ২০০২ পর্যন্ত ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সভাপতির পদে ছিলেন বাহাদুর বেপারি। বর্তমানে আওয়ামী লীগের উপ-কমিটির সহ-সম্পাদক। তিনি পাওয়ার প্ল্যান্ট ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। এ ছাড়া একজন টক-শো ব্যক্তিত্ব হিসাবে রয়েছে তার পরিচিতি। তার পৈতৃক নিবাস শরিয়তপুর। বাহাদুর বেপারির সময় সাধারণ সম্পাদক ছিলেন অজয় কর খোকন। বর্তমানে আওয়ামী লীগের উপ কমিটির সহ-সম্পাদক। দশম সংসদ নির্বাচনে দলের মনোনয়ন চেয়েও পাননি তিনি। পরে স্বতন্ত্র হয়ে নির্বাচনে দাঁড়ালে নির্বাচন কমিশন তার মনোনয়ন পত্র বাতিল করে দেয়। ২০০২ সাল থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সভাপতির পদে ছিলেন লিয়াকত শিকদার। বর্তমানে আওয়ামী লীগের উপকমিটির সহ-সম্পাদক। রাজনীতির পাশাপাশি তিনি একজন ব্যবসায়ী। লিয়াকত শিকদারের সময় সাধারণ সম্পাদক ছিলেন নজরুল ইসলাম বাবু। নবম ও দশম সংসদের নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজার থেকে এমপি হয়েছেন। বর্তমানে আওয়ামী লীগের উপকমিটির সহ-সম্পাদক। রাজনীতি ছাড়াও জড়িত আছেন ব্যবসায়। ২০০৬ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি ছিলেন মাহমুদ হাসান রিপন। একই সময়ে সাধারণ সম্পাদক ছিলেন মাহফুজুল হায়দার চৌধুরী রোটন। তারা দুজনই আওয়ামী লীগের উপকমিটির সহ-সম্পাদক।  ২০১১ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি ছিলেন বদিউজ্জামান সোহাগ। সোহাগের সভাপতি থাকাকালীন সাধারণ সম্পাদকের পদে ছিলেন সিদ্দিকী নাজমুল আলম। তারা দুজন এখনও দলের ভাল পদে আসতে পারেননি। বর্তমানে ছাত্রলীগের সভাপতির পদে রয়েছেন মো. সাইফুর রহমান সোহাগ। তার পৈতৃক নিবাস মাদারীপুর। এ ছাড়া সাধারণ সম্পাদক হিসেবে আছেন এস.এম. জাকির হোসেন। তার পৈতৃক নিবাস মৌলভীবাজার। এরা দুজনই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী।