রিসেট

মণি ভাই বেঁচে থাকলে দেখতেন....

প্রকাশিত: ৯ মার্চ (বুধবার), ২০১৬ Archive 2016
Warning: Undefined property: stdClass::$news_source in /var/www/vhosts/mzamin.com/httpdocs/old-archive.php on line 257

Deprecated: htmlspecialchars(): Passing null to parameter #1 ($string) of type string is deprecated in /var/www/vhosts/mzamin.com/httpdocs/old-archive.php on line 257
Source:
কলেজ ছাত্র সংসদের ভিপি নির্বাচিত হলাম। ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কার্যকরী সংসদের গ্রন্থনা ও প্রকাশনা সম্পাদকের দায়িত্বও পেলাম। বন্ধুরা বলতে লাগলো এবার বোধকরি সাংবাদিকতার প্রতি আমার মোহ কমে যাবে। আমি হয়ে যাবো পুরোদস্তুর রাজনীতিক। কিন্তু আমি আমার সিদ্ধান্তে অনড়। রাজনীতি করবো না। ভাগ্যে যাই থাকুক সাংবাদিক হতেই হবে আমাকে। রাজনীতি করলে কি হতো? ছাত্রলীগের যে কমিটিতে গ্রন্থনা ও প্রকাশনা সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেছি সে কমিটির নেতারা মানে আমার বন্ধুরা এখন রাষ্ট্র ক্ষমতায়। সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক। জনপ্রশাসন মন্ত্রী। ওবায়দুল কাদের সেতুমন্ত্রী এবং আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য। খ ম জাহাঙ্গীর পটুয়াখালী থেকে এমপি। আগে প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্বও পালন করেছেন। উবায়দুল মোকতাদির চৌধুরী ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে এমপি নির্বাচিত হয়েছেন। ডা. মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিন পুরনো ঢাকা থেকে একাধিকবার এমপি নির্বাচিত হয়েছেন। আমি রাজনীতিতে থাকলে কিছু একটা হলেও হতে পারতাম। কিন্তু কেন জানি রাজনীতি আমাকে কখনও টানেনি। রাজনীতি অপছন্দ করি তা কিন্তু নয়। ওবায়দুল কাদের একদিন বলেই ফেললেন আমার বন্ধুটি খুবই ঈর্ষাকাতর। আমাদের সমালোচনা করেই যাচ্ছে। ভোরের কাগজের সম্পাদক শ্যামল দত্ত ছিলেন পাশে। এটিএন বাংলার জন্মদিনের অনুষ্ঠানের দেখা হতেই কাদের বুকে বুক রেখে এ কথা বলেছিলেন। বিনীতভাবে তাকে বলেছিলাম, ভাল কাজের প্রশংসা করি। খারাপ কাজের সমালোচনা করা আমার নৈতিক দায়িত্ব। যুক্তিহীন ভক্তি আর অন্ধ মোহ থাকলে তো রাজনীতিই করতাম। তবে বন্ধু এ কথা বলতে পারি, রাজনীতি আমার জন্য নয়। আমি সাংবাদিকতা বেছে নিয়েছি নিজের ইচ্ছায়। পুরনো বন্ধুদের সঙ্গে দেখা হয়। কথা হয়। রাজনীতি নিয়ে কথা বলি না। জানি তারাও সব কিছুর সঙ্গে একমত নয়। আগের কিস্তিগুলোতে সাংবাদিক হওয়ার গল্প বলেছি। আসল কথা বলা হয়নি। প্রয়াত শেখ ফজলুল হক মণির নির্দেশেই সাংবাদিকতাকে পেশা হিসেবে নিয়েছিলাম। মুক্তিযুদ্ধ শেষ। যে যার মতো নিজেদের তৈরি করছে। মণি ভাই দৈনিক বাংলার বাণী প্রকাশ করলেন। তার ইচ্ছে সাংবাদিকতাকে পিকিংপন্থীদের হাত থেকে মুক্ত করা। এটা ঠিক পাক আমল থেকে বাংলাদেশ হওয়া পর্যন্ত সাংবাদিকতা ছিল পিকিংপন্থীদের কব্জায়। মণি ভাই বেঁচে থাকলে দেখতেন পিকিংপন্থীরা কিভাবে ইতিহাসের অংশ হয়ে গিয়েছে। সাপ্তাহিক বাংলার বাণীতে কাজ করার সুবাদে চাকরি হয়ে গেল বাংলার বাণীতে। মণি ভাই একদিন ডেকে পাঠালেন। বললেন, তোর যেহেতু ছাত্রলীগের ব্যাকগ্রাউন্ড রয়েছে তাই রাজনীতির রিপোর্ট করা ভালো। মণি ভাইয়ের অনেক বিখ্যাত লেখার ডিকটেশন নিয়েছি। ‘মোনায়েমের আমলা দিয়ে মুজিবের শাসন চলতে পারে না’ এই লেখাটি আমলাদের উত্তেজিত করেছিল। প্রশাসনে প্রতিক্রিয়া থেকে বঙ্গবন্ধু কিছুটা রাগও করেছিলেন। কারণ আমলাদের বেশির ভাগই ছিলেন হয় পাকিস্তান ফেরত, নতুবা মোনায়েম সরকারের অধীনে কর্মরত। মণি ভাই কি ভেবে এই লেখাটি লিখেছিলেন জানিনা। এই লেখার মধ্যে তখন অনেকেই ষড়যন্ত্রের ভূত দেখেছিলেন। অনেকে বঙ্গবন্ধুর কান ভারি করেছিলেন। আখেরে প্রমাণিত হয়েছে মণি ভাই ঠিকই মূল্যায়ন করেছিলেন। ঘাতকের গুলিতে তার প্রাণ কেড়ে নেয়া না হলে বাংলাদেশের রাজনীতি তিনিই একদিন নিয়ন্ত্রণ করতেন এতে কোনো সন্দেহ নেই। মণি ভাই একদিন দুপুরে ডেকে পাঠালেন। সিটি এডিটর তখন রকীব সিদ্দিকী। প্রেস ক্লাবে নাস্তার টেবিলে ফোন করে এই খবরটি দিলেন। একটার দিকে অফিসে পৌঁছে দেখি মণি ভাই নেই। ডেইলি কাগজগুলোর পাতা ওল্টাচ্ছি, এমন সময় খবর এলো মণি ভাই অফিসে ঢুকেছেন। মতিঝিলে বাংলার বাণীর অফিস। দোতলায় বসতেন তিনি। রুমের ভেতর তখন যুবলীগের নেতারা। আমাকে দেখে বললেন, একটু বস। ওদের বিদায় দিয়ে নিই। তোকে ডেকেছি দুটো কারণে। পরে বলছি। প্রায় ১ ঘণ্টা পর নেতারা চলে গেলেন। এর মধ্যে ঢুকে পড়লেন আনোয়ারুল ইসলাম ববি। ম্যানেজিং এডিটর। পরে তিনি মর্নিং সানের সম্পাদক হয়েছিলেন। তিনি ঢুকলে মেলা দেরি হবে। না, বেশি সময় নিলেন না তিনি। এরপর অফিস সহকারী এসে বলল, স্যার আপনাকে ডেকেছেন। মণি ভাই তখন চুরুট টানছেন। বেশি চিন্তামগ্ন থাকলে চুরুটই তার একমাত্র সঙ্গী হতো। বললেন, আজ একটা লেখার ডিকটেশন দেবো। তবে আগে বলে নিই ক’দিন বিশ্ববিদ্যালয় রিপোর্টারের দায়িত্ব পালন কর। ঠিক আছে। কি করতে হবে বলেন। তুই তো জানিস রোকেয়া হলের সামনে রিকশাওয়ালারা ঠ্যাং এর ওপর ঠ্যাং দিয়ে কিভাবে বসে থাকে। এটার ওপর রিপোর্ট করতে হবে। এখানেই শেষ নয় কিন্তু। কান্দুপট্টিতে (পতিতাপল্লী) গিয়েছিস কখনও? চোখমুখ লাল হয়ে গেছে আমার। ওরে রিপোর্টার হতে হলে লজ্জাশরম থাকলে চলে না। কান্দুপট্টির সামনেও একই দৃশ্য। রিকশাওয়ালারা একইভাবে বসে থাকে। দু’টোর মিল খুঁজতে হবে। রিপোর্টে দেখাতে হবে সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠের হাল হচ্ছে এটা। বয়স কম। ভাবিনি এর প্রতিক্রিয়া কি হতে পারে। সম্পাদকের নির্দেশ তো মানতেই হবে। রফিকুর রহমান তখন ফটো সাংবাদিক। বর্তমানে রয়টার্সে কর্মরত। অ্যাসাইনমেন্ট খাতায় নাম উঠলো বিশেষ রিপোর্টার হিসেবে। রফিককে নিয়ে কাজ করলাম তিনদিন। ও চমৎকার কিছু ছবি তুললো। ভাল ফটোগ্রাফার হিসেবে ওর সুখ্যাতি রয়েছে দেশ-বিদেশে। তিনদিন পর রিপোর্টটি লিখে জমা দিলাম। বার্তা সম্পাদক শহীদুল হক জানেন এটা মণি ভাইয়ের অ্যাসাইনমেন্ট। তাই তিন কলাম জায়গা হলো প্রথম পাতায়। রিপোর্ট লিখে বিদায় নিয়েছি অনেক রাতে। সে সময় অনেক রাত পর্যন্ত অফিসে থাকতে হতো। এখন রিপোর্টাররা আটটা বাজলেই ঘড়ি দেখতে থাকেন। পরদিন সকালে জাতীয় প্রেস ক্লাবে আড্ডায় মশগুল রয়েছি। এমন সময় অফিস থেকে ফোন। এখনই অফিসে যেতে হবে। বুঝতে পারিনি কেন এই জরুরি তলব। অফিসে গিয়ে দেখি রকিব সিদ্দিকী চুপচাপ বসে রয়েছেন। কি হলো। রকিব ভাই বললেন, সর্বনাশ হয়ে গেছে। পত্রিকা পোড়ানো হচ্ছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে। তোমাকে অনির্দিষ্টকালের জন্য ক্যাম্পাসে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করা হয়েছে। ক্যাম্পাসের আশেপাশে যাওয়ার চেষ্টা করো না। বিপদ হতে পারে। ফোনে যোগাযোগ করা তখন সহজ ছিল না। বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করতে হলে ক্যাম্পাসে যেতে হবে। এর মধ্যে ববি ভাই ঢুকলেন নিউজ রুমে। কি মিয়া! একি করেছো। তোমাকে এবার কে রক্ষা করবে? বললাম, মণি ভাইয়ের অ্যাসাইনমেন্ট। দেখিনা কি হয়। বিকেলের দিকে মণি ভাই অফিসে এলেন। সবকিছু খুলে বল্লাম। তিনি অবশ্য আগেই শুনেছেন। কথা বলতে চাইলেন উপাচার্য অধ্যাপক আবদুল মতিন চৌধুরীর সঙ্গে। পাওয়া গেল না। ঘণ্টাখানেক পরে মণি ভাইয়ের সঙ্গে যোগাযোগ হলো। মণি ভাইয়ের প্রশ্ন কি হয়েছে? কেন ওরা পত্রিকা পোড়াচ্ছে। উপাচার্য বললেন, কান্দুপট্টির সঙ্গে রোকেয়া হলের সামনের দৃশ্যের মিল-অমিল খোঁজার কি উদ্দেশ্য। মণি ভাই দৃঢ়চিত্তে বললেন, আমি তো অন্তত কোন অমিল দেখি না। কেন এভাবে রিকশাওয়ালারা বসে থাকবে। মতিন চৌধুরী তখন বলছেন সব নিয়ে কি লেখা যায়? মণি ভাই বললেন, শতভাগ সঠিক আমার রিপোর্ট। ওরা পত্রিকা পোড়াক। মতিকে মারবে? মেরে দেখুক না। ভয় পেয়ে গেলাম। মণি ভাই কার সঙ্গে যেন কথা বললেন। এরপর আমাকে বললেন, কয়েকদিন ক্যাম্পাসের দিকে যাবি না। হোটেলে বা কোন বন্ধুর বাসায় ওঠে যা। তবে আমি এর শেষ দেখে ছাড়বো। আমার অফিসে আসাও বন্ধ। পালিয়ে বেড়ালাম সপ্তাহখানেক। উপাচার্য মতিন চৌধুরী পরিস্থিতি অন্যদিকে যেতে পারে ভেবে মণি ভাইকে ফোনে বললেন, ঠিক আছে ওদের সঙ্গে কথা বলেছি। আর কিছু হবে না। পত্রিকাও ক্যাম্পাসে ঢুকবে। রিপোর্টারকে (মতি) বলবেন আমার সঙ্গে যেন পরিস্থিতি শান্ত হলে একবার দেখা করে।
চলবে