ঢাকা-১০ আসনের ধানমণ্ডি বয়েজ স্কুলের চিত্র। সহকারী প্রিজাইডিং অফিসারের হাত থেকে ব্যালট পেপার নিয়ে বুথের মধ্যে সবার সামনেই ওরা সিল মারছে নৌকা প্রতীকে। ভোটগ্রহণের নির্ধারিত সময় শেষ হওয়ার আগে দল বেঁধে ব্যালট পেপারে সিল মারার উৎসবে মেতে ওঠেন তারা। এসময় কর্তব্যরত সহকারী প্রিজাইডিং অফিসার উপস্থিত সাংবাদিকদের বলেন, আমার করার কিছু নেই। বিকাল চারটা বাজতে তখন ১৫ মিনিট বাকি। একাধিক পুলিশ কর্মকর্তা কেন্দ্রটির দায়িত্বরত প্রিজাইডিং অফিসারকে ডেকে বলেন, সময় অনেক কম। ভোট কাস্ট অনেক কম হয়েছে। একপর্যায়ে প্রিজাইডিং অফিসার দ্রুত কেন্দ্র ছেড়ে দিতে বাধ্য হন। এরপরই পুলিশের উপস্থিতেই ভোট কেন্দ্রের দ্বিতীয় ও তৃতীয় তলার প্রতিটি কক্ষেই শুরু হয় নৌকা প্রতীকে সিলা মারার উৎসব। সরজমিন দেখা যায়, ভোট গ্রহণের শুরু থেকেই ছোট ছোট দলে বিভক্ত হয়ে নৌকা প্রতীকের সমর্থকরা ধাপে ধাপে ভোট কারচুপি করেছে এ কেন্দ্রে। এই আসনটি ঢাকা-১০। এর নৌকা প্রতীকের প্রার্থী হলেন ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপস।
ঢাকা-১০ আসনের এক নম্বর ভোটকেন্দ্র লেদার ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজি ইনস্টিটিউট। বিকাল তিনটার কিছু সময় পরে গিয়ে দেখা যায়, কেন্দ্রটির বেশির ভাগ বুথই ভোটারশূন্য। দলে দলে বারান্দায় পাঁয়চারী করছেন নৌকা সমর্থিত নেতা-কর্মীরা। এসময় কেন্দ্রটির প্রিজাইডিং অফিসারের সঙ্গে তার রুমে এই প্রতিবেদক কথা বলার সময়ে দ্রুত ছুটে আসেন দুজন সহকারী প্রিজাইডিং অফিসার। তারা বলেন, ওরা আবার আসছে ভোট মারতে। তখন প্রিজাইডিং অফিসার তাদের বলেন, সকাল থেকে তো অনেক হলো। আর কত! এখন একটু চাকরির চিন্তা করেন।
ঢাকা-১০ আসনের আরেক কেন্দ্র রায়ের বাজার উচ্চবিদ্যালয়। বেলা আড়াইটা। সরজমিন দেখা যায়, বাঘ আর নৌকা প্রতীকের পোলিং এজেন্টে একাকার।
যদিও এই আসনে ছয়জন প্রার্থী। বুথের ভেতর থেকে সহকারী প্রিজাইডিং অফিসার একজনকে দেখিয়ে বলেন, উনি নৌকা প্রতীকের পোলিং এজেন্ট। কিন্তু ওই ব্যক্তি নিজেকে বাঘ প্রতীকের এজেন্ট বলে দাবি করেন। প্রতিবেদক তাকে বাঘ প্রতীকের প্রার্থীর নাম জিজ্ঞাসা করলে প্রার্থীর নাম বলতে পারেননি তিনি। এসময়ে কেন্দ্রটির বারান্দায় নৌকা প্রতীকের নেতা-কর্মীরা দল বেঁধে ঘোরাঘুরি করছেন। বারান্দায় সাদা পাঞ্জাবি পরা সরকারদলীয় এক নেতা আরেকজনকে নির্দেশ দিয়ে বলছেন, সময় বেশি নেই। এখনই মহিলাদের দিয়ে সিল মারা শুরু করে দাও। এর পরপরই নেতাকর্মীরা প্রতিটি কক্ষে ঢুকে সিলা মারার উৎসবে মেতে ওঠেন। এর পাশেই প্রগতি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে অবস্থিত আরেক ভোটকেন্দ্র। এলাকাটির ওয়ার্ড কমিশনার সমর্থিত নেতাকর্মীরা পালাক্রমে দল বেঁধে ভোট কেন্দ্রে প্রবেশ করছেন এবং ভোট দিচ্ছেন। এসময় দায়িত্বরত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য ও প্রিজাইডিং অফিসারকে নীরব দর্শকের ভূমিকায় দেখা যায়।
একই গণ্ডির মধ্যে ধানমণ্ডির সরকারি বালিকা বিদ্যালয় ও ধানমন্ডি কামরুন্নেসা বালিকা বিদ্যালয়ে অবস্থিত দুটি ভোটকেন্দ্র। সকাল থেকেই দেখা যায় উৎসবমুখর পরিবেশে ভোট উৎসব চলছে। কেন্দ্র দুটি ঘুরে দেখা যায়, এখানে নৌকা ও বাঘের পোলিং এজেন্ট ছাড়া অন্য কোনো প্রার্থীর এজেন্ট নেই। নৌকার সমর্থক দল বেঁধে ভোট কেন্দ্রের মধ্যে ঘুরছেন এবং পুলিশ নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করছে।
এদিকে স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে এই এখানে ভোট দিতে আসেন বিখ্যাত ফটো জার্নালিস্ট শহিদুল আলম। নিজের ভোট প্রদানের পর ক্যামেরাপ্রেমী এই মানুষ কেন্দ্রের মূল গেটে দাঁড়িয়ে ছবি তুলছিলেন। এসময় কিছু আওয়ামী লীগ নেতাকর্মী তেড়ে যান তার দিকে। তখন শহিদুল আলম ও তার স্ত্রী উপস্থিত আশপাশের মানুষকে এগিয়ে আসার জন্য বললেন, নৌকা প্রতীকের কর্মীরা আরো ক্ষিপ্ত হয়ে উঠেন। জোটবদ্ধ হয়ে তাকে ভোটকেন্দ্র এলাকা ছড়াতে হুমকি দেন। এসময় পুলিশের ভূমিকা নীরব দেখে শহিদুল আলম কেন্দ্রের পাশ থেকে সরে দাঁড়ান।
