আনোয়ার হোসেন। বয়স পঞ্চাশ ছুঁই ছুঁই । মিরপুরের মণিপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের বালক শাখা কেন্দ্রের গেটের লাইনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছিলেন ভোট দেয়ার। ঘড়ির কাঁটা সোয়া ৮টা ছাড়িয়ে গেছে তখন। এরপরেও কেন্দ্রের প্রধান গেট ভোটারদের জন্য উন্মুক্ত করা হয়নি। আনোয়ারের বক্তব্য, ভোটগ্রহণের শুরুতেই আমি ভোট দিতে চেয়েছিলাম। কিন্তু ভোট শুরুর ১৫ মিনিট পেরিয়ে গেলেও ঢুকতে দেয়া হচ্ছে না। ৬০ ফিট সড়ক থেকে সামান্য সামনে এ কেন্দ্রের ভেতরে যখন প্রবেশ করা হয় তখন ঘড়ির কাঁটায় সময় সাড়ে ৮টা। তখনই ভোটারদের জন্য প্রধান গেট উন্মুক্ত করা হয়। ভোটকেন্দ্র এবং বুথে তখনও ভোটগ্রহণ শুরু হয়নি। দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রিজাইডিং অফিসার ফরিদুল ইসলাম বলেন, ভোটারদের উপস্থিতি কম, এ কারণে তাদের একটু দেরি হয়েছে। এ কেন্দ্রের ১০টির উপরে বুথ ঘুরে দেখা যায় কয়েকটিতে দুই চারটি ভোট পড়েছে। আর কোনো বুথে একটি ভোটও পড়েনি তখন। পোলিং অফিসারদের দাবি শীতের সকাল বলে ভোটারদের উপস্থিতি কম। এ কেন্দ্রের প্রত্যেকটি বুথে নৌকা প্রতীকের পোলিং এজেন্টের উপস্থিতি থাকলেও ধানের শীষ প্রতীকের একজন ছাড়া অন্য কোনো এজেন্ট পাওয়া যায়নি। মিরপুর পীরেরবাগ এলাকার এ কেন্দ্রটি ঢাকা-১৫ আসনের অন্তর্ভুক্ত। এ আসনে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী নৌকা এবং ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থী। নৌকা সমর্থকদের কেন্দ্র এবং আশেপাশে উপস্থিতি দেখা গেলেও ধানের শীষ কিংবা অন্য কোনো প্রতীকের লোকজনের উপস্থিতি দেখা যায়নি। মিরপুরের মধ্য পীরেরবাগ এলাকার আলীম উদ্দীন উচ্চ বিদ্যালয়, লিটল ফ্লওয়ারস স্কুল, ফুলকলি স্কুল ও পীরেরবাগ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্র। এ চারটি কেন্দ্রের মধ্যে শুধুমাত্র লিটল ফ্লাওয়ারস স্কুলে ভোটাররা নির্বিঘ্নে প্রবেশ করতে পেরেছেন। অন্য তিন কেন্দ্রের চিত্র ছিল হ-য-ব-র-ল অবস্থা। এখানে নারী ভোটকেন্দ্রের একটির ভোটার তালিকা অন্যটিতে টাঙানো, সাধারণ মানুষের ভোটকেন্দ্রে অবাধে প্রবেশসহ নানা অনিয়ম দেখা গেছে। অনিয়মের কারণ হিসেবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং প্রিজাইডিং অফিসাররা তা অস্বীকার করেন। প্রিজাইডিং অফিসার কামরুজ্জামান কাঁপতে কাঁপতে বলেন, আমার কেন্দ্রে ভোট ঠিকভাবে হচ্ছে। কোনো রকম অনিয়ম হয়নি। তার কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিলো, তাহলে নারী ভোটাররা কেনো ভোটকেন্দ্র খুঁজে পাচ্ছেন না। তিনি জানান, নারীরা তাদের ভোটের সিরিয়াল নম্বর ঠিকভাবে বলতে পারছেন না বলে, এমন জটলা বেঁধে রয়েছে। জাহিদ হাসান। মিরপুর-১৩ আসনের হারম্যান মেইনার উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রের ধানের শীষ প্রতীকের প্রধান এজেন্ট। সকালে পোলিং এজেন্টদের নিয়ে মিটিং করে কেন্দ্রে প্রবেশ করেন। ভোটগ্রহণের শুরুতেই নৌকা প্রতীকের ব্যাচ পরা ৫০-৬০ জনের একটি দল এসে তাদের সকলকে মেরে কেন্দ্র থেকে বের করে দেয়। কয়েকজন পালিয়ে গেলেও তিনি কিছুদূর যেয়ে তাদের দেখতে থাকেন কি করেন তারা। এরপরে ওই গ্রুপটি আবার তার ওপর হামলা চালায়। উপর্যুপরি কিল-ঘুষি দিয়ে মারতে মারতে ন্যাম ভবন পর্যন্ত নিয়ে যান। পরবর্তীতে জাহিদকে ধরে কয়েকজন মিরপুরের একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা দিতে নিয়ে যান। জাহিদ বলেন, তিনি এলাকার পরিচিত মুখ এবং ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী। এখন এলাকায় বসবাস করা তার জন্য কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। হারম্যান মেইনারের পাশেই সরকারি ইউনানী আয়ুবের্দিক কলেজ কেন্দ্র। এ কেন্দ্রে ভোট শুরুর আগেই ধানের শীষের এজেন্টদের মেরে বের করে দেয়া হয়। এরপরে আশেপাশে এ প্রতীকের সমর্থকদের ওপরও হামলা শুরু হয়। কয়েকজনকে আটকে রেখে মারধর করে ছেড়ে দেয়া হয়। মতিউর রহমান, এজেন্ট ফাহিম, নূর হোসেন ও মাহমুদকে ছাত্রলীগ মেরে রক্তাক্ত করে ছেড়ে দেয়। তারাও একটি হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়ে চলে যান।
এ ছাড়া রাকিব হাসান নামের এক তরুণ ভোটার সকাল ১১টায় মিরপুর-১৩ নম্বরে সাংবাদিকদের কাছে অভিযোগ করেন তার ভোট পূর্বেই দেয়া হয়ে গেছে। বিআরপি স্কুলে তার ভোটার সিরিয়াল নম্বর ৩৩৮৫। এ ভোটার বলেন, তিনি ভোট দিতে গিয়ে দেখেন তার ভোট অন্য কেউ দিয়ে গেছে। পরে প্রিজাইডিং অফিসারের সঙ্গে চ্যালেঞ্জ করলে পুনরায় তার ভোটগ্রহণ করা হয়। এ ছাড়া ঢাকা-১৬ আসনের মিরপুর বাঙলা স্কুল কেন্দ্রে দুপুরের পরেও ভোটারদের দীর্ঘ লাইন থাকলে দুর্বৃত্তরা ককটেল বিস্ফোরণ চালিয়ে ছত্রভঙ্গ করার পরে এক পক্ষ ভোট দিতে ঢুকে। এসময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নীরবতা পালন করে। এ ছাড়া আবু তালেব উচ্চ বিদ্যালয়, ভাষানটেকের বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী মিরপুর আদর্শ বাঙলা উচ্চ বিদ্যালয়, সাংবাদিক কলোনি উচ্চ বিদ্যালয়ে বিভিন্ন অনিয়মের চিত্র দেখা যায়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং নির্বাচনী কর্মকর্তারা চেয়ে চেয়ে দেখেন। মিরপুর বাঙলা উচ্চবিদ্যালয় কেন্দ্রে কথা হয় ঢাকা-১৬ আসনের ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থী আহসান উল্লাহ হাসানের সঙ্গে। তিনি বলেন, আমি কার বিরুদ্ধে কার কাছে অভিযোগ করবো। পায়ের পাতা থেকে মাথা পর্যন্ত রোগ। পুলিশ, বিজিবি, নির্বাচনী কর্মকর্তা সকলেরই এক অবস্থা। আমার জীবনে এমন ভোট আর দেখিনি।
