দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ নগরী সিলেট থেকে প্রায় ৩৫ কিলোমিটার দূরের সীমান্তবর্তী উপজেলা কোম্পানীগঞ্জ। এই কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার সীমানা ভারতের মেঘালয় রাজ্যের সীমানা-সংলগ্ন পাদদেশে। সাদা পাথরখ্যাত ভোলাগঞ্জের যে ধলাই নদ আমরা দেখছি সে নদের উৎপত্তি কিন্তু ভারতের মেঘালয়ের পাহাড়ি ঝরনা থেকেই। পাহাড়ি ঝরনার পানির স্রোতেই ভেসে এসেছে এই সাদা সাদা পাথর। পাহাড়ের কোলঘেঁষে শুয়ে থাকা পাথরগুলো ছিল আকাশের ছেঁড়া মেঘের মতো, শীতল, শান্ত আর নীরব। দেশ-বিদেশ থেকে ছুটে আসা পর্যটকরা স্বচ্ছ পানির ধারায় গা এলিয়ে দিয়ে পরম শান্তি উপভোগ করতো। পাথরের ভাঁজে ভাঁজে নির্মল ঝলমলে পানি, চারপাশের নীল আকাশ আর সবুজে ঘেরা পাহাড়-সব মিলিয়ে এটি ছিল পর্যটকদের জন্য এক মোহময় গন্তব্য। পর্যটন খাতে তাই অর্থনীতির নতুন ভিত রচিত হচ্ছিল এখানে।
কিন্তু প্রকৃতির অবারিত দান সেই শুভ্র লীলাভূমির ওপর আঘাত পড়লো মানুষের লোভ-লালসার হাতুড়ি। দিনের আলোয় আর রাতের অন্ধকারে নৌকার পেটে চেপে পাথরগুলো উধাও করা হলো। গণমাধ্যম এ মর্মে সংবাদ প্রকাশ করলো। পরিবেশকর্মী ও স্থানীয় বাসিন্দাদের বরাতে বছরে আনুমানিক দুইশত কোটি টাকার অধিক মূল্যের পাথর লুট হওয়ার ঘটনা ওঠে আসলো এতে। সাদাপাথরের এই পর্যটন কেন্দ্রের চারদিকে বিজিবি’র চারটি ক্যাম্প ও পোস্ট রয়েছে বলে জানা যায়। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে-চারদিক থেকে ঘেরা বিজিবি’র চারটি ক্যাম্প থাকা সত্ত্বেও এত এত পাথর লুট হয় কীভাবে? হাতের নাগালে দিনের আলোয় এই যে পুকুরচুরি হলো তার দায় এখন কে নেবে? ঘটনাটি এমন নয় যে, দুইশত কোটি টাকার কোনো একটি চেক বইয়ের পাতা কেউ একজন পকেটে পুরে দশ মিনিটে চম্পট দিয়েছে। গত একটি বছর ধরে দিনের পর দিন বিরামহীনভাবে ঘটেছে এ ঘটনা। শুধু পাথর নয়, বালুও লুট করা হয়েছে। দৃষ্টিনন্দন এই পর্যটন কেন্দ্র আজ পরিণত হয়েছে বিরানভূমিতে। প্রকৃতির নান্দনিক অমূল্য দান কোটি কোটি টাকার পাথর যে গায়েব হয়ে গেল তা রক্ষণাবেক্ষণের বা দেখভালের দায়িত্ব ছিল সরকার ও তার সংশ্লিষ্ট সংস্থা বা বিভাগের ওপর।
সরকারি সম্পদ রক্ষণাবেক্ষণ ও তার সুষ্ঠু ব্যবহার সম্পর্কিত আইন ও বিধি রয়েছে দেশে। তাহলে বুঝাই যাচ্ছে কোনো না কোনো কারণে প্রশাসনের ভেতরে নমনীয়তা বা শৈথিল্য ছিল। সম্পদ রক্ষার্থে এর তদারকিতে অবহেলা বা নমনীয়তা দায়িত্বহীনতার মধ্যে পড়ে। এই দায়িত্বহীনতা ধীরে ধীরে উৎসাহ দেয় জোচ্চুরিপনাকে, দুর্নীতিকে।
জানা যায়, গত বছর ৫ই আগস্ট পট পরিবর্তনের পর এক শ্রেণির অসাধু চোরাকারবারিরা পাথর সরানো নিয়ে তৎপর হয়। পর্যটক ও এলাকাবাসীর চোখের সামনে দিয়েই নিমিষে শত শত নৌকা পাথর বোঝাই করে উধাও হতে থাকে। স্থানীয় লোকজন ও সেনাবাহিনীর হস্তক্ষেপের কারণে একসময় লুটপাট কমলেও মাঠ পর্যায়ের প্রশাসনের তৎপরতা ঢিলেঢালা হওয়ার সুবাদে লুটপাট ফের শুরু হয়। লুটপাট চলতে চলতে আজ ধু-ধু বালুচর। ধলাই নদের উৎসমুখের এ পর্যটন কেন্দ্রের পাথরের প্রতি দীর্ঘদিন ধরেই লোলুপ দৃষ্টি ছিল পাথরখেকোদের।

গতবছর সরকার পতনের পরদিনই যখন আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নিষ্ক্রিয় হয় তখন থেকেই পাথর চুরির মহোৎসব বড় করে শুরু হয়। গণমাধ্যমেও তখন খবর ছড়িয়ে পড়ে। নিরাপত্তাকর্মী কিংবা দায়িত্বশীলদের সঙ্গে আঁতাত করে পাথর আর বালু চুরি করার অভিযোগ ছিল তখন। স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের যোগসাজশ থাকার অভিযোগও সেই সময় থেকেই। সম্প্রতি সাদা পাথর পর্যটন কেন্দ্রের পাথর লুটপাটের ঘটনায় গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক সমালোচনার ঝড় বইলে কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার বিএনপি’র সভাপতি সাহাব উদ্দিনের পদ স্থগিত করা হয়। পদ স্থগিতের পেছনে পাথর লুটপাটের বিষয়টি উল্লেখ করা না হলেও এই নেতার বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি ও দখলবাজির কথা উল্লেখ থাকায় এই ধরনের নেতার ছত্রছায়ায় পাথর চুরির সম্ভাবনার বিষয় উড়িয়ে দেয়া যায় না।
এই যে আটঘাট বেঁধে এতবড় লুটতরাজের ঘটনা ঘটলো, দিনে দুপুরে পাথর-বালুর অবৈধ রমরমা ব্যবসা চললো, তার বিপরীতে প্রশাসন কার্যত কী ব্যবস্থা নিয়েছিল? মোবাইল কোর্ট পরিচালনা বা গুটিকয়েকদিন অভিযান করে যেহেতু লুটপাট বন্ধ করা যাচ্ছিল না তখন তারা আর কী ধরনের পদক্ষেপ নিয়েছিল? উপযুক্ত পদক্ষেপ যদি নেয়া হয়ে থাকে তাহলে আজ এ অবস্থা কেন? প্রশাসন সর্বাত্মক চেষ্টা করেও যদি চুরি ঠেকাতে না পারে তাহলে কি খোদ প্রশাসনই লুটেরাদের কাছে জিম্মি ছিল? রাজনৈতিক ক্ষমতার দাপটের কাছেই হোক, কিংবা হোক লুটপাটকারীদের কাছে, কোনো পক্ষের কাছেই প্রশাসন নির্লিপ্ত বা জিম্মি থাকতে পারে না।
বন ও জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক উপদেষ্টা খোদ সৈয়দা রিজওয়ানা হাসানও আক্ষেপ করে যদি বলেন যে, উপদেষ্টা হয়েও তিনি পাথর তোলা বন্ধ রাখতে পারেন নি, তাহলে প্রশাসনের অসহায়ত্ব ও দুর্বলতা আজ কী পর্যায়ে নেমেছে তার ধারণা নেয়া কঠিন নয়। অবস্থাদৃষ্টে মনে হয় এই পাথরখেকোরা আগে থেকেই প্রশাসনের দৌড় সম্বন্ধে ওয়াকিবহাল ছিল। প্রশাসনের অসহায়ত্ব ও দুর্বলতার ওপর ভর করে মতলববাজ পাথরখেকোরা যে সফল হবে তা তারা আগে থেকেই আঁচ করতে পেরেছিল। প্রশাসনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে শেষমেষ তারা সফলও হলো। এই লেখক যখন নিবন্ধ লিখতে বসেছে তখন দুদকের একটি বিশেষ টিম পর্যটন কেন্দ্রে অভিযান পরিচালনার জন্য গিয়েছে। দুঃখ হলো আমাদের দেশে কোনো দুর্ঘটনা ঘটার পর কেবল তখনই প্রশাসন নড়েচড়ে বসে। এবারো এর ব্যতিক্রম হয়নি। ওদিকে দেশের খনিজ সম্পদ উন্নয়ন ব্যুরো বিষয়টি নিয়ে কিছু ভাবছে নাকি তারা নাকে তেল দিয়ে ঘুমাচ্ছে তা জনগণের কানে এখনো আসেনি।
রাষ্ট্রযন্ত্রের শৃঙ্খলা ও জানমাল রক্ষার জন্য নির্মিত প্রশাসন ভুলে গেল যে, এর কাঠামো যত দুর্বল হয়, অপরাধীরা ততই মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। আর প্রশাসন দুর্বল হলে তা শুধু অপরাধ দমন করতে ব্যর্থ হয় না, পরোক্ষভাবে অপরাধ বৃদ্ধির পরিবেশও প্রশস্ত করে। আমরা বেমালুম ভুলে যাই যে, আইন প্রয়োগের শিথিলতা বা নমনীয়তা অপরাধী বা দুষ্কৃতকারীদের মনে দণ্ডহীনতার সংস্কৃতি গড়ে তোলে। এক বছর ধরে চোরাকারবারিরা নির্বিঘ্নে পর্যায়ক্রমে পাথর সরিয়েছে। প্রথমেই শক্ত হস্তে দমন করা হয়নি। বলা যায় এক প্রকার অলিখিত ঘোষণা দিয়েই তারা চুরির কর্মযজ্ঞে সফল হয়েছে। এই আশকারা আর কতোদিন? দু’দিন পর তারা নতুন কোনো চুরির খেলায় মেতে ওঠবে না তার নিশ্চয়তা কোথায়?
কয়েকদিন আগে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম সচিবালয়ে উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠক শেষে এক সংবাদ সম্মেলনে রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য এক স্বস্তিদায়ক তথ্য দেন। তিনি জানান, উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকের শুরুতে অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস বলেছেন যে, গত ৫ই আগস্ট অন্তর্বর্তী সরকারের প্রথম অধ্যায় শেষ হয়েছে। এরপর দ্বিতীয় অধ্যায় শুরু হয়েছে। নির্বাচন যেন সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও উৎসবমুখর পরিবেশে অনুষ্ঠিত হয়, তা নিশ্চিত করাই এখন সরকারের প্রধান দায়িত্ব। এমতাবস্থায় পাথর লুটপাটের এই ধূসর প্রান্তের দিকে তাকালে মনে একটি প্রশ্নই উদিত হয়-নির্বাচন আয়োজন যদি সরকারের প্রধান দায়িত্ব হয়, তাহলে জনগণের জান-মাল ও রাষ্ট্রীয় সম্পদের হেফাজতের বিষয় নিশ্চিত করা এখন সরকারের কোন পর্যায়ের দায়িত্ব?
লেখক: ঈশা খাঁ ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির শিক্ষক ও কলামিস্ট
Email: [email protected]
