প্রথম আলো
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের মামলা: দখল, দ্বন্দ্ব ও চাঁদাবাজির জন্য ‘ইচ্ছেমতো’ আসামি-এটি দৈনিক প্রথম আলোর প্রথম পাতার প্রতিবেদন। খবরে বলা হয়, কন্যাশিশুর জন্মের পর স্ত্রীকে নিয়ে ঢাকার সিদ্ধেশ্বরীর মনোয়ারা হাসপাতালে ছিলেন ব্যবসায়ী ইসমাইল হোসেন প্রধানীয়া (৪৮)। সেখান থেকেই গত বছরের ৫ মে তাঁকে গ্রেপ্তার করে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। অভিযোগ, ভাটারা থানার মো. রিয়াজ হত্যা মামলায় তিনি জড়িত।
গ্রেপ্তারের পর ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) এক বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, প্রধানীয়ার বিরুদ্ধে রাজধানীর বিভিন্ন থানায় জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময়কার হত্যা মামলা আছে। সেখানে তাঁর পরিচয় দেওয়া হয় রমনা থানা স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে।
ঢাকার আদালতে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, গত বছরের ১৮ জুন রিয়াজ হত্যা মামলায় জামিন পান প্রধানীয়া। সেদিনই ভাটারা থানার আরেকটি মামলায় তাঁকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়। নতুন মামলায় তাঁর পরিচয় লেখা হয়, কেন্দ্রীয় স্বেচ্ছাসেবক লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক। যদিও স্বেচ্ছাসেবক লীগের কেন্দ্রীয় বা থানা—কোনো কমিটিতেই ইসমাইল প্রধানীয়ার নাম নেই।
রিয়াজ জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে যাত্রাবাড়ীতে গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান। এ ঘটনায় গত বছর যাত্রাবাড়ী ও ফতুল্লায় দুটি মামলা হয়েছিল। একই ঘটনায় তৃতীয় মামলা হয় ভাটারা থানায়, যে মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে ইসমাইল প্রধানীয়া ১০৯ দিন জেল খাটেন। যদিও একটি ঘটনায় তিনটি মামলা হওয়ার সুযোগ নেই।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, অ্যাপার্টমেন্ট ও বিপণিবিতানের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিরোধের জেরে ইসমাইল প্রধানীয়াকে স্বেচ্ছাসেবক লীগের নেতা সাজিয়ে জুলাই হত্যা মামলায় আসামি করা হয়েছে। গত বছরের ২২ আগস্ট জামিনে মুক্তি পান ইসমাইল প্রধানীয়া। তিনি সম্প্রতি প্রথম আলোকে বলেন, ‘মিথ্যা মামলায় পড়ে আমার জীবন, পরিবার তছনছ হওয়ার মতো অবস্থা। এখনো মামলার ঘানি টানতে হচ্ছে।’
প্রথম আলোর অনুসন্ধানে ১০০টি মামলার পর্যালোচনায় দেখা গেছে, মামলাগুলোতে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের নেতা–কর্মী, সাবেক মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যের পাশাপাশি অনেক সাধারণ বা বিভিন্ন শ্রেণি–পেশার মানুষকে ঢালাও বা হয়রানিমূলকভাবে আসামি করা হয়েছে। এমন ব্যক্তিদের আসামি করার পেছনে ব্যক্তিগত, ব্যবসায়িক বা পেশাগত দ্বন্দ্ব, সম্পদ দখল, চাঁদাবাজি, মামলা-বাণিজ্য বা প্রতিহিংসাজনিত কারণও পাওয়া গেছে। কোথাও অর্থ লেনদেনের অভিযোগও রয়েছে। দুটি মামলায় তিন মৃত ব্যক্তিকে আসামি করার তথ্যও পাওয়া গেছে।
৩২ জন বাদী স্বীকার করেছেন, তাঁরা চেনেন না এমন ব্যক্তিদেরও আসামি করেছেন। অনেক বাদী পরে আদালতে হলফনামা দিয়ে বলেছেন, ভুলবশত আসামি করা হয়েছে। অন্তত ৪৭টি মামলায় ছয় শতাধিক আসামির নাম বাদ দিতে আদালতে আবেদন করা হয়েছে। এসব ক্ষেত্রে ২০ হাজার থেকে ৪ লাখ টাকা পর্যন্ত লেনদেনের তথ্য রয়েছে। চট্টগ্রামের একটি মামলায় দুই আসামির জামিনে আপত্তি নেই বলে আদালতে বক্তব্য দেওয়ার পর বাদীকে হাজতেও পাঠানো হয়েছিল। পরে মুচলেকা দিয়ে তিনি মুক্তি পান।
এ ধরনের হয়রানিমূলক ব্যক্তিদের আসামি করার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মী, একশ্রেণির অসাধু আইনজীবী, পুলিশ সদস্য এবং মামলাকেন্দ্রিক বিভিন্ন চক্র জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। আবার জামিনের পর অন্য মামলায় (এজাহারে নাম না থাকা সত্ত্বেও) গ্রেপ্তার দেখানো নিয়ে বাণিজ্য রয়েছে। এ ক্ষেত্রেও একশ্রেণির পুলিশ সদস্যের সহায়তা নিয়েছেন মামলাবাজ চক্র বা ব্যক্তিরা। প্রথম আলোর কাছে অন্তত ১৫ জন ভুক্তভোগী বলেছেন, মামলা থেকে নিষ্কৃতি পেতে তাঁদের ঘুষ দিতে হয়েছে। এ রকম একটি ঘটনায় একজন মামলার বাদীকে শাস্তি দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে আদালতে।
নিরপরাধ ব্যক্তিদের আসামি করে হয়রানির ঘটনায় ক্ষুব্ধ শহীদদের স্বজনেরাও। ঢাকা রেসিডেনসিয়াল মডেল কলেজের ছাত্র শহীদ ফারহান ফাইয়াজের বাবা শহিদুল ইসলাম ভূঁইয়া প্রথম আলোকে বলেন, ‘বিচারের যে গতি দেখছি, তাতে সন্তান হত্যার ন্যায়বিচার পাব কি না, তা নিয়ে সংশয় তৈরি হয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘যখন সত্যিকারের অপরাধীদের পরিবর্তে নিরীহ মানুষকে মামলায় আসামি বা গ্রেপ্তারের কথা শুনি, খারাপ লাগে। আমরা চাই প্রকৃত অপরাধীরা ছাড়া না পাক এবং নিরীহ কেউ হয়রানির শিকার না হোক।’
অনুসন্ধানে প্রাপ্ত তথ্য নিয়ে গত ১৮ ফেব্রুয়ারি কথা হয় পুলিশের তৎকালীন মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বাহারুল আলমের সঙ্গে। তিনি প্রথম আলোকে বলেছিলেন, মামলার তদন্তকালে অপরাধে কারও সম্পৃক্ততা না মিললে পুলিশ সুপারদের স্বপ্রণোদিত হয়ে আদালতে অন্তর্বর্তী তদন্ত প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে।
মামলার চিত্র
মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে এখন পর্যন্ত শহীদের তালিকায় ৮৩২ জনের নাম এসেছে। আরও ১২ জনের নাম যুক্ত হওয়ার বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন। আহত ব্যক্তির তালিকায় রয়েছে ১৪ হাজার ৩৬৯ জনের নাম (গত ৮ মার্চ পর্যন্ত)।
গত বছরের ৫ আগস্ট গণ–অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকে স্বজন হারানো পরিবারগুলো মামলা করা শুরু করে। এর বাইরে আত্মীয় বা ‘সচেতন নাগরিক’ পরিচয়েও অনেকে মামলা করেছেন। এসব মামলায় শত শত মানুষকে আসামি করা হয়েছে। হয়রানিমূলকভাবে যাঁদের আসামি করা হয়েছে, তাঁদের নামের সঙ্গে আওয়ামী লীগ বা দলটির অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের বিভিন্ন পদ জুড়ে দেওয়ার ঘটনাও রয়েছে।
যার কারণে বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সময় একাধিক দফায় বলা হয়েছিল, মামলা হলেই যাচাই ছাড়া আসামি গ্রেপ্তার করা যাবে না। পাশাপাশি গত বছরের ১০ জুলাই ফৌজদারি কার্যবিধি সংশোধন করে তদন্ত চলাকালে অন্তর্বর্তী প্রতিবেদন দেওয়ার সুযোগ তৈরি করা হয়, যেখানে নিরপরাধ ব্যক্তিকে অব্যাহতি দেওয়া যায়। কিন্তু নিরীহ ব্যক্তিদের গ্রেপ্তার ও হয়রানি বন্ধ হয়নি।
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, জুলাই-সংশ্লিষ্ট মোট মামলা হয়েছে ১ হাজার ৮৪১টি। এর মধ্যে হত্যা মামলা ৭৯১টি। ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ৪৬টি হত্যা মামলায় অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে। অন্য মামলাগুলোর মধ্যে ৯৪টিতে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে। ৬৩৮টি মামলায় ৪ হাজার ২৮৫ জনের সম্পৃক্ততা না পাওয়ায় অন্তর্বর্তী প্রতিবেদন দেওয়া হয়েছে।
পুলিশের অতিরিক্ত আইজিপি (অপরাধ ও পরিচালন) খন্দকার রফিকুল ইসলাম ৮ মার্চ প্রথম আলোকে বলেন, জুলাইয়ের ঘটনাকেন্দ্রিক কিছু মামলায় উদ্দেশ্যমূলকভাবে বা ভুলভাবে আসামি করার ঘটনা পাওয়া গেছে। কিছু ক্ষেত্রে ঘটনাস্থল মিথ্যা দেখানো হয়েছে। পর্যালোচনা করে যেগুলোর সত্যতা পাওয়া যাচ্ছে না, সেগুলোতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দিয়ে নতুন মামলাও নেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, ‘ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে গঠিত ১০টি তদারকি দল সারা দেশের মামলাগুলো পর্যবেক্ষণ করছে। তদন্ত কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যাচাই ছাড়া কাউকে গ্রেপ্তার করা যাবে না।’
এক ঘটনায় তিন মামলা, নেপথ্যে কী
স্বজনেরা বলছেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট যাত্রাবাড়ীতে পুলিশের গুলিতে রিয়াজের মৃত্যু হয়েছিল। রাস্তায় তাঁর মরদেহ পড়ে ছিল। একটি ছবি দেখে রিয়াজের স্ত্রী ফারজানা বেগম তাঁর স্বামীকে শনাক্ত করেন। তিনি স্বামীকে হত্যার ঘটনায় সে বছরের ১৪ নভেম্বর যাত্রাবাড়ী থানায় মামলা করেন।
অবশ্য রিয়াজের স্ত্রীর মামলার আগেই ২৩ অক্টোবর একই ঘটনায় নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা থানায় আরেকটি মামলা হয়। ওই ঘটনায় পরের বছর, ২০২৫ সালের ২৫ এপ্রিল ঢাকার ভাটারা থানায় আরেকটি মামলা করেন জনৈক জাহিদুল ইসলাম। এতে ২৮১ জনের নাম উল্লেখ করে আরও ৩০০ জনকে অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়। তাতে ইসমাইল প্রধানীয়াসহ অনেককে হয়রানিমূলক আসামি করা হয়। মামলায় বাদী জাহিদুল ইসলামের যে ঠিকানা দেওয়া হয়েছে, সেখানে গিয়ে এ নামের কাউকে খুঁজে পাওয়া যায়নি। যে মুঠোফোন নম্বর উল্লেখ করা হয়েছে, সেটাও বন্ধ।
জুলাই শহীদ রিয়াজের স্ত্রী ফারজানা বেগম প্রথম আলোকে বলেন, ভাটারা ও ফতুল্লা থানায় যাঁরা মামলা করেছেন, তাঁদের তিনি চেনেন না। মানুষকে হয়রানি করে, ভয় দেখিয়ে টাকা আদায়ের জন্য এই মামলাগুলো করা হয়েছে।
ভাটারা থানার উপপরিদর্শক মো. আনোয়ার হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, রিয়াজ হত্যা মামলার বাদী জাহিদুলের কোনো হদিস পাওয়া যায়নি। প্রাথমিক তদন্তে অভিযোগেরও সত্যতা পাওয়া যায়নি। তিনি বলেন, তাঁরা পরে জানতে পেরেছেন, প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় গ্রেপ্তার হওয়া সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) সাবেক গাড়িচালক আবেদ আলীর সঙ্গে একটি মামলাসহ অনেক মামলা আছে তাঁর বিরুদ্ধে।
পুলিশের অপর একটি সূত্র জানিয়েছে, এই জাহিদুলের বিরুদ্ধে প্রতারণাসহ বিভিন্ন থানায় সাতটি মামলা রয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে, এ রকম একজন ব্যক্তির করা মামলায় একজন ব্যবসায়ীকে গ্রেপ্তারে গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) কেন এত উদ্যোগী হলো। যেখানে বারবার অন্তর্বর্তী সরকার ও পুলিশের উচ্চপর্যায় থেকে বলেছিল, যাচাই–বাছাই ছাড়া কাউকে গ্রেপ্তার না করতে।
ইসমাইল প্রধানীয়া বলেন, কেবল ভাটারা থানা নয়, যাত্রাবাড়ী, পল্টন, কোতোয়ালি ও আশুলিয়া থানায় গণ-অভ্যুত্থানের ঘটনাসংক্রান্ত আরও পাঁচটি মামলায় তাঁকে আসামি করা হয়েছে। এর পেছনে রয়েছেন নাসির উদ্দিন ওরফে দুলাল নামের এক ব্যক্তি। তাঁর সঙ্গে মৌচাকের ফরচুন শপিং মল ও অ্যাপার্টমেন্টকে কেন্দ্র করে পুরোনো দ্বন্দ্ব রয়েছে। প্রধানীয়া এই শপিং মল দোকান মালিক সমিতি এবং অ্যাপার্টমেন্ট ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক। এই মালিক সমিতির ১১ সদস্যের বিরুদ্ধে বিভিন্ন থানায় অন্তত ২৮টি মামলা দেওয়া হয়েছে।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে নাসির উদ্দিন দুলালের তিনটি মুঠোফোন নম্বরে যোগাযোগের চেষ্টা করেন এই প্রতিবেদক। দুটি নম্বরই বন্ধ পাওয়া যায়। আরেকটি নম্বরে কল করলে ধরেন এক ব্যক্তি। অভিযোগের কথা বলার সঙ্গে সঙ্গে তিনি ‘রং নম্বর’ বলে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন। আর ফোন ধরেননি।
এদিকে ভুক্তভোগীদের দাবি, নাসির উদ্দিন এই ক্ষেত্রে যে মামলাবাজ চক্রকে ব্যবহার করেছেন, তাঁর নেতৃত্বে রয়েছেন সাইফুল ইসলাম বাহার নামের এক ব্যক্তি। এ বিষয়ে জানতে চাইলে সাইফুল ইসলাম বাহার মুঠোফোনে প্রথম আলোকে বলেন, এগুলো মিথ্যা। নাসির উদ্দিনকে তিনি ব্যক্তিগতভাবে চেনেন। তবে তাঁর কার্যক্রমের সঙ্গে সম্পৃক্ততা নেই।
জমি নিয়ে দ্বন্দ্ব, আসামি পাঁচ মালিক
জুলাই শহীদ তালিকায় নাম রয়েছে কাজী আশরাফ আহমেদ রিয়াজের। তাঁকে হত্যার ঘটনায় ঢাকার মোহাম্মদপুর থানায় মামলা হয় গত বছরের ২ জুলাই। মামলায় ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ আওয়ামী লীগের শীর্ষ পর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে আসামি করা হয়েছে আরও ৯৪ জনকে। তাঁদের মধ্যে পাঁচটি নাম কৌতূহলোদ্দীপক। এই ব্যক্তিরা কালশী সড়কের পার্শ্ববর্তী জোয়ারসাহারার একটি জমির যৌথ মালিক। তাঁরা হলেন মিরপুর ডিওএইচএসের ফারুক হোসেন, পল্লবীর আশিকুর রহমান, ক্যান্টনমেন্ট এলাকার নুরুল আমিন প্রামাণিক, মনোয়ারুল ইসলাম ও আহসান হাবীব। এঁদের কারোরই রাজনৈতিক পরিচয় নেই।
মামলার বিষয়ে পুলিশের কাছে দেওয়া এক আবেদনে এই পাঁচ ব্যক্তি জানান, তাঁদের জমিটি সড়কসংলগ্ন। পাশের আরেকটি জমির মালিক মাসুদ আলী গং। জমিটিতে বহুতল আবাসন ভবন (কনডোমিনিয়াম) নির্মাণের জন্য মাসুদ আলীরা একটি আবাসন কোম্পানির সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হন। তবে কনডোমিনিয়াম নির্মাণের জন্য সড়কসংলগ্ন পাঁচ ব্যক্তির জমিটিও প্রয়োজন। তাঁদের অভিযোগ, মাসুদ আলীরা কয়েক দফা তাঁদের জমি দখলের চেষ্টা করেছেন। তাতে ব্যর্থ হয়ে জুলাই হত্যা মামলায় ফাঁসিয়েছেন।
অবশ্য জমি দখলের চেষ্টার অভিযোগ অস্বীকার করে মাসুদ আলী প্রথম আলোকে বলেন, মামলার বিষয়েও তিনি কিছু জানেন না।
এ বিষয়ে কথা হয় মামলার বাদী নিহত আশরাফের বাবা কাজী বাবুলের সঙ্গে। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, আওয়ামী লীগের চার-পাঁচজন ছাড়া বাকি আসামিদের তিনি চেনেন না। উল্লিখিত পাঁচ ব্যক্তির নাম কীভাবে মামলায় এল, জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এত কথা তো বলতে পারছি না।’
মামলায় পাঁচ ব্যক্তির জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বরও দেওয়া আছে। এই নম্বর কোথায় পেলেন, জিজ্ঞেস করলে কাজী বাবুল আবারও বলেন, ‘এত কিছু তো বলতে পারছি না, কিছু না কিছু সহযোগিতা তো অবশ্যই আছে।’
জমির মালিকদের একজন ফারুক হোসেন ৯ মার্চ প্রথম আলোকে বলেন, জমির দলিলে থাকা জাতীয় পরিচয়পত্রের নম্বর সংগ্রহ করে মামলার এজাহারে বসানো হয়েছে। পরে জানা গেছে, এই পাঁচজনকে ভাটারা থানায় করা গণ–অভ্যুত্থানের আরেকটি মামলায়ও আসামি করা হয়েছে।
এক মামলায় আসামি ৯ ব্যবসায়ী
দেশের প্রক্রিয়াজাত খাদ্যপণ্যের বাজারে সুপরিচিত প্রতিষ্ঠান আহমেদ ফুড প্রোডাক্টস। এই প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মিনহাজ আহমেদ বাংলাদেশ অ্যাগ্রো প্রসেসরস অ্যাসোসিয়েশনের (বাপা) কোষাধ্যক্ষ। গত বছরের ১৬ জুন বাপার ইফতার মাহফিল ও বার্ষিক সাধারণ সভা থেকে তাঁকে হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার করে ডিবি পুলিশ।
মিনহাজের সঙ্গে সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক এবং মেসার্স আহমেদ অ্যান্ড কোম্পানির মালিক মো. ইকতাদুল হককেও গ্রেপ্তার করা হয়। এই দুজনসহ তাঁদের সংগঠনের সদস্য মোট ৯ জন ব্যবসায়ীকে যাত্রাবাড়ী থানার মো. মাহাদী হাসান (পান্থ) হত্যা মামলায় আসামি করা হয়েছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, মাহাদী হাসানকে হত্যার ঘটনায় যাত্রাবাড়ী ও কদমতলী থানায় দুটি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে ২০২৪ সালের ৬ অক্টোবর যাত্রাবাড়ী থানার মামলাটি করেন নিহত ব্যক্তির চাচা পরিচয় দেওয়া মো. নাদিম। এ মামলাতেই ৯ ব্যবসায়ীকে আসামি করা হয়েছে। পরে একই ঘটনায় ২০২৪ সালের ৮ নভেম্বর কদমতলী থানায় আরেকটি মামলা করেন শহীদ মাহাদী হাসানের বাবা মো. জাহাঙ্গীর হোসেন।
প্রথম মামলার বাদী মো. নাদিম প্রথম আলোর কাছে নিজেকে কৃষক দলের ডেমরা থানা শাখার সদস্য হিসেবে পরিচয় দেন। তাঁর দাবি, এ মামলার বিষয়ে কথা বলতে দলীয়ভাবে নিষেধ আছে।
তবে মাহাদী হাসানের বাবা মো. জাহাঙ্গীর হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, ‘চাচা পরিচয় দেওয়া নাদিমকে কখনো দেখিনি, নামও শুনিনি। অনেকেই অভিযোগ করেছেন তিনি (নাদিম) মামলা দিয়ে বাণিজ্য করছেন।’
মিনহাজের মা এবং আহমেদ ফুডস প্রোডাক্টসের চেয়ারম্যান সুরাইয়া আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, ৮৫ দিন পর কারাগার থেকে জামিনে মুক্তি পেলেও মিনহাজের স্বাভাবিক হতে অনেক সময় লাগছে। তিনি বলেন, ‘অ্যাসোসিয়েশনের নির্বাচনে পরাজিতরা শত্রুতাবশত পুরো প্যানেলকে জুলাই হত্যা মামলায় আসামি করিয়েছে।’
মোহাম্মদপুরের দুটি হাউজিং প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সরোয়ার খালেদের বিরুদ্ধে রাজধানীর মোহাম্মদপুরসহ বিভিন্ন থানায় অন্তত ১৪টি মামলা হয়। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, গণ–অভ্যুত্থানের পর স্থানীয় শীর্ষ সন্ত্রাসী ও তাঁদের সহযোগীরা চাঁদা চেয়েছিল। তিনি দেননি। এরপর তাঁকে একের পর এক মামলায় জড়ানো হয়।
‘মামলাগুলো যথাযথ প্রক্রিয়ায় হয়নি’
গণ-অভ্যুত্থান হয়েছে প্রায় দেড় বছর আগে। মামলা–বাণিজ্যের প্রতিকারে সরকার ও পুলিশ কিছু কিছু উদ্যোগ নিয়েছে। তারপরও দেখা যাচ্ছে হয়রানি চলছে।
জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সদস্য মো. নূর খান প্রথম আলোকে বলেন, অপদস্থ ও বাণিজ্য করতে অনেক মানুষকে আসামি করা হয়েছে। একই ব্যক্তিকে একই তারিখের একাধিক জায়গায় সংঘটিত অপরাধে অভিযুক্ত করা হয়েছে। এতে পরিষ্কার, মামলাগুলো যথাযথ প্রক্রিয়ায় হয়নি।
নূর খানের মতে, সরকারের উচিত জরুরি ভিত্তিতে এসব মামলার পর্যালোচনা করা। কারণ, সারা দেশের হাজার হাজার মানুষ মামলার শিকার। অনেকে এখনো ঘরে থাকতে পারছেন না, কর্মস্থলে যেতে পারছেন না। তাই দ্রুত যাচাই–বাছাই করে নির্দোষ ব্যক্তিদের হয়রানি থেকে মুক্তির ব্যবস্থা করতে হবে।
যুগান্তর
দৈনিক যুগান্তরের প্রধান শিরোনাম ‘জুলাই সনদের গন্তব্য কতদূর’। খবরে বলা হয়, জুলাই জাতীয় সনদের বাস্তবায়ন কোন পথে-এ নিয়ে মুখোমুখি এখন সরকার ও বিরোধী দল। ক্ষমতাসীন বিএনপি বলেছে, রাষ্ট্র আবেগ নিয়ে চলে না, চলে সংবিধান ও আইন দিয়ে। দলটি বলেছে, সংবিধান সংস্কার পরিষদ নিয়ে জাতীয় সংসদে আলোচনা হতে পারে। জুলাই সনদ বাস্তবায়নে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ বলেও জানিয়েছে বিএনপি। অপরদিকে, প্রধান বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীসহ তাদের জোটের শরিকরা জুলাই সনদের প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়নে সংবিধান সংস্কার পরিষদের অধিবেশন ডাকার জোর দাবি জানিয়েছে। তা না হলে রাজপথে আন্দোলনে যাওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তারা। এ অবস্থায় জুলাই সনদ বাস্তবায়ন প্রশ্নে রাজনৈতিক অঙ্গনে এরই মধ্যে উত্তাপ ছড়াতে শুরু করেছে। কেউ কেউ বলছেন, রাজনীতির মারপ্যাঁচে কার্যত অনেকটাই হাবুডুবু খাচ্ছে জুলাই সনদ। শুধু তাই নয়, সরকার এবং বিরোধী দলের অনড় অবস্থানের কারণে জুলাই সনদ কী এখন অনিশ্চিত গন্তব্যের পথে হাঁটছে-এমন প্রশ্নও উঠছে। এ অবস্থায় গণভোটের ফলাফল হিসাবে এই সনদের ভবিষ্যৎ আসলে কি হবে-সেটি নিয়ে জনমনে নানা সংশয় যেমন দানা বাঁধছে, তেমনি বাড়ছে কৌতূহলও।
ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের শাসনামলের প্রায় ১৮ মাসের মাথায় ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। একই দিন জুলাই সনদ বাস্তবায়ন নিয়ে অনুষ্ঠিত হয় গণভোট। ১৪ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনের ফলাফলের গেজেট প্রকাশ করে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হওয়ার ফলে জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন আদেশ অনুসারে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়ী ব্যক্তিরা একই দিন দুটি শপথ নেওয়ার কথা। একটি সংসদ-সদস্য হিসাবে, অন্যটি সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য। ১৭ ফেব্রুয়ারি জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টিসহ (এনসিপি) বিরোধী দলের সদস্যরা দুটি শপথই নেন। কিন্তু বিএনপি থেকে নির্বাচিতরা সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসাবে শপথ নেননি। তারা বলেন, সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্যদের শপথের বিষয়ে সংবিধানে কিছু নেই। ভবিষ্যতে এটি যুক্ত হলে তখন শপথের বিষয়টি আসবে। এরপর থেকে জুলাই সনদ কিভাবে বাস্তবায়ন হবে তা নিয়ে রাজনীতিতে আলোচনা শুরু হয়।
এ প্রসঙ্গে সংবিধান বিশেষজ্ঞ ও জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ড. শাহদীন মালিক রোববার যুগান্তরকে বলেন, যে গণভোটের কথা বলে সংবিধানে পরিবর্তনের বা সংবিধান সংস্কারের কথা বলা হচ্ছে, এই গণভোট নিয়েই প্রশ্ন আছে। তিনি বলেন, জুলাই সনদের অনেক ধারা বা বিধান করা হয়েছে, যেগুলো আমাদের সংবিধানের সম্পূর্ণ পরিপন্থি। এখন সংবিধান পরিপন্থি কোনো সংশোধন তো সংসদ পাশ করতে পারে না। পাশ করলে এটা আদালতে চ্যালেঞ্জ হলে বাতিল হয়ে যাবে। শাহদীন আরও বলেন, সংবিধান সংস্কার করার জন্য সংসদই যথেষ্ট। দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকলেই সংবিধান সংশোধন করা সম্ভব। এর জন্য আলাদা সংবিধান সংস্কার পরিষদের প্রয়োজন নেই।
স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ ও সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার এ প্রসঙ্গে যুগান্তরকে বলেন, রাজনৈতিক দলগুলো জুলাই সনদে স্বাক্ষর করেছে। এর আলোকে একই সঙ্গে নির্বাচন এবং গণভোট অনুষ্ঠিত হয়েছে। গণভোটে হ্যাঁ জয়ী হওয়ায় রাজনৈতিক দলগুলো জুলাই সনদ বাস্তবায়নে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। কিন্তু এখন যদি কেউ বিষয়টিকে নানা অজুহাতে পাশ কাটিয়ে যেতে চায়, তাহলে তা হবে এক ধরনের বিশ্বাসঘাতকতা।
সূত্র জানায়, গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হওয়ায় জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ অনুযায়ী, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে একটি সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠিত হওয়ার কথা। এই আদেশ ও জুলাই সনদের সংবিধান সম্পর্কিত ৪৮টি সংস্কার প্রস্তাব বাস্তবায়নের পক্ষে গণভোটে রায় এসেছিল। সংবিধান সম্পর্কিত প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়ন করার কথা সংবিধান সংস্কার পরিষদের। এছাড়া বাস্তবায়ন আদেশে সংবিধান সংস্কার পরিষদের প্রথম অধিবেশন আহ্বান সম্পর্কে বলা আছে, সংসদ নির্বাচনের ফল ঘোষিত হওয়ার ৩০ পঞ্জিকা দিবসের মধ্যে যে পদ্ধতিতে জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন আহ্বান করা হবে, একই ভাবে পরিষদের প্রথম অধিবেশন আহ্বান করা হবে। সংবিধান সংস্কার পরিষদ প্রথম অধিবেশন শুরুর তারিখ থেকে ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে জুলাই জাতীয় সনদ এবং গণভোটের ফলাফল অনুসারে সংবিধান সংস্কার সম্পন্ন করবে।
কালের কণ্ঠ
‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ নিয়ে সংসদে উত্তেজনা’-এটি দৈনিক কালের কণ্ঠের প্রথম পাতার খবর। প্রতিবেদনে বলা হয়, জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নে গণভোটের রায়ের আলোকে ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’ গঠন এবং নির্বাচনের ৩০ দিনের মধ্যে সংস্কার পরিষদের অধিবেশন আহ্বানের কথা থাকলেও তা নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। এ নিয়ে সংসদ সদস্যদের শপথ গ্রহণের দিন থেকে সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে টানাপোড়েন শুরু হয়েছে। সর্বশেষ এ নিয়ে সংসদ অধিবেশনে উত্তেজনা দেখা দিয়েছে। সরকারি দলের সদস্যরা শপথ না নেওয়ায় এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সংস্কার পরিষদের অধিবেশন আহবান না করায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন বিরোধীদলীয় নেতা ডা. মো. শফিকুর রহমান।
জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জানিয়েছেন, সংবিধানে ‘সংস্কার পরিষদ’ বলে কিছু নেই। জুলাই সনদে সংস্কার পরিষদের কথা বলা হয়েছে, তা বাস্তবায়নের আগে সংবিধানে সংশোধনী আনতে হবে।
গত ১৭ ফেব্রুয়ারি সংসদ সদস্যের পাশাপাশি সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন বিরোধীদলীয় জোটের সদস্যরা। তবে বিএনপির নেতৃত্বাধীন সরকারি দল ও স্বতন্ত্র সদস্যরা সংস্কার পরিষদের শপথ গ্রহণ করেননি।
গত ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সঙ্গে জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন আদেশের ওপর গণভোট হয়। ৬৮ শতাংশের বেশি ‘হ্যাঁ’ ভোটে আদেশটি অনুমোদিত হয়। আদেশ অনুযায়ী, ‘হ্যাঁ’ জয়ী হলে জুলাই সনদের ৪৮ সাংবিধানিক সংস্কার প্রস্তাবের ৩৮টি বাস্তবায়ন করতে হবে। বাকি ১০টি বাস্তবায়ন বাধ্যতামূলক নয়।
দলগুলো নোট অব ডিসেন্ট (ভিন্নমত) অনুযায়ী, এসব সংস্কার প্রস্তাব বাস্তবায়ন করতে পারবে। গণভোটের প্রশ্নে ছিল, সনদে বর্ণিত পদ্ধতির আলোকে তত্ত্বাবধায়ক সরকার, নির্বাচন কমিশন, সরকারি কর্ম কমিশন, মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক, ন্যায়পাল এবং দুর্নীতি দমন কমিশন গঠন করতে হবে। নির্বাচন কমিশন বাদে বাকি সংস্কারগুলোতে বিএনপির ‘নোট অব ডিসেন্ট’ রয়েছে। বিএনপি জুলাই সনদ বাস্তবায়নের বিষয়ে স্বোচ্চার থাকলেও সংস্কার পরিষদের বিষয়ে অনীহা প্রকাশ করেছে।
গণ-অভ্যুত্থানের অভিপ্রায়ের ক্ষমতাবলে রাষ্ট্রপতির জারি করা জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশে বলা হয়েছে, গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হলে নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের নিয়ে ১৮০ কার্যদিবস মেয়াদি সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন করতে হবে।
এই পরিষদ অনুযায়ী, সনদে বর্ণিত উপায়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার; নির্বাচন কমিশনসহ অন্যান্য কমিশন এবং চলতি সংসদেই উচ্চকক্ষ গঠনের বিধান সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করবে। যে ৩০ সংস্কার প্রস্তাবে সব দলের ঐকমত্য হয়েছিল, সেগুলো বাস্তবায়ন করতে হবে পরিষদকে। আদেশের ১০ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, সংসদ নির্বাচনের ৩০ দিনের মধ্যে সংসদ অধিবেশন আহ্বানের অনুরূপ পদ্ধতিতে পরিষদ আহবান করতে হবে। অর্থাৎ রাষ্ট্রপতি পরিষদের অধিবেশন আহবান করবেন। কিন্তু এই সময় শেষ হলেও অধিবেশন আহবান করা হয়নি। এ নিয়ে সংসদের ভেতরে-বাইরে ক্ষোভ প্রকাশ করেছে বিরোধী দল।
সমকাল
দৈনিক সমকালের প্রধান শিরোনাম ‘তত্ত্বাবধায়ক সরকার ফেরাতে সংবিধান, সংসদ অথবা আদালত লাগবে’। খবরে বলা হয়, নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার-সংক্রান্ত সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী পুনর্বহাল করে আপিল বিভাগের দেওয়া পূর্ণাঙ্গ রায়ে বলা হয়েছে, সংবিধানে স্বয়ংক্রিয়ভাবে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা চালু হবে। তবে তা কার্যকর হবে আগামী চতুর্দশ সংসদ নির্বাচন থেকে।
সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করা হয়। রায়ে স্বয়ংক্রিয়ভাবে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা চালু হওয়ার কথা বলা হলেও এর জন্য সংবিধান সংশোধন করতে হবে। অথবা, পঞ্চদশ সংশোধনীর বিরুদ্ধে আপিল বিভাগে যে মামলা চলছে, তার রায়ের জন্য অপেক্ষা করতে হবে। রায়ে পঞ্চদশ সংশোধনী পুরোপুরি বাতিল হলে সংবিধান সংশোধনের প্রয়োজন নাও হতে পারে।
এদিকে পুরোনো তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা ফেরত এলে সর্বশেষ অবসরে যাওয়া প্রধান বিচারপতি প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্ব পালন করবেন। কিন্তু জুলাই সনদে বিচার বিভাগ এবং রাষ্ট্রপতিকে বাইরে রেখে রাজনৈতিক ঐকমত্যের ভিত্তিতে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনে একমত হয়েছিল দলগুলো। ফলে জুলাই সনদ অনুসরণ করতে হলে এ বিষয়ে সংসদে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
গত বছরের ২০ নভেম্বর সংক্ষিপ্ত রায় ঘোষণার প্রায় চার মাস পর ৭৪ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ রায়টি ১২ মার্চ সমকসুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়। প্রধান বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদের নেতৃত্বে সাত সদস্যের বেঞ্চ আপিল বিভাগের ওই রায়ের বিরুদ্ধে করা দুটি পৃথক সিভিল আপিল মঞ্জুর ও চারটি রিভিউ আবেদন নিষ্পত্তি করে সর্বসম্মতভাবে এ রায় দেন। পূর্ণাঙ্গ রায়ে এতে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থাকে বৈধ ও সাংবিধানিক বলা হয়েছে।
রিভিউকারীদের একজনের আইনজীবী ড. শরীফ ভূঁইয়া এ ক্ষেত্রে অন্তত তিনটি পরিবর্তনের প্রয়োজন আছে বলে মনে করেন। তিনি গতকাল সমকালকে বলেন, ত্রয়োদশ সংশোধনীতে বলা হয়েছে, সংসদ বিলুপ্তির ১৫ দিনের মধ্যে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠিত হবে। কিন্তু পঞ্চদশ সংশোধনীতে সংবিধানে ১২৩ অনুচ্ছেদ সংশোধন করে বিধান করা হয়েছে, সংসদ বিলুপ্তির পূর্ববর্তী ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন করতে হবে। ত্রয়োদশ সংশোধনী অনুযায়ী, সংসদ বহাল থাকা অবস্থায় তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন করা সম্ভব নয়। তাই আগে সংবিধানের ১২৩ অনুচ্ছেদ সংশোধন করতে হবে।
ইত্তেফাক
‘নতুন-পুরোনো পাঠের চাপে পাঁচ লক্ষাধিক শিক্ষার্থী’-এটি দৈনিক ইত্তেফাকের প্রথম পাতার খবর। প্রতিবেদনে বলা হয়, আইনি জটিলতা কাটিয়ে ২০২৫ সালের স্থগিত প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষা আগামী এপ্রিল মাসের প্রথম সপ্তাহে আয়োজনের সিদ্ধান্তে নতুন-পুরোনো পাঠের চাপে পড়েছে প্রায় পাঁচ লক্ষাধিক শিক্ষার্থী। একদিকে প্রথম সাময়িক পরীক্ষার পাশাপাশি এক মাস পরের অর্ধবার্ষিক পরীক্ষার প্রস্তুতি, অন্যদিকে পঞ্চম শ্রেণির পুরোনো সিলেবাস পুনরায় ঝালিয়ে নিয়ে বৃত্তি পরীক্ষার প্রস্তুতি—এই দুইয়ের যাঁতাকলে পিষ্ট হচ্ছে কোমলমতি শিশুরা। অনেক শিক্ষার্থী গত বছরের পাঠ্যবই-গাইড বই ইতিমধ্যে বিক্রি করে দিয়েছে। নতুন করে ঐ বই সংগ্রহ করাও অনেক পরিবারের জন্য কষ্টসাধ্য। উপরন্তু নতুন শিক্ষাবর্ষের বইয়ের সঙ্গে পুরোনো বইয়ের অনেকখানি অমিল রয়েছে, যা প্রস্তুতিকে আরো জটিল করে তুলেছে। বছরের মাঝামাঝি সময়ে এসে হঠাত্ বৃত্তি পরীক্ষা নেওয়ার সিদ্ধান্ত শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর কতটা নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে, তা নিয়ে শিক্ষাবিদ ও অভিভাবক মহলে তীব্র উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
গত ফেব্রুয়ারির শেষ সপ্তাহে সংবাদ সম্মেলন করে শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন জানিয়েছেন, গত বছরের স্থগিত প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষা আগামী এপ্রিল মাসে ঈদুল আজহার আগে অনুষ্ঠিত হবে। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পরিকল্পনা অনুযায়ী, এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে এই পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। এ বছর প্রথমবারের মতো কিন্ডারগার্টেনের শিক্ষার্থীরাও এতে অংশ নেওয়ার সুযোগ পাচ্ছে। বৃত্তি বণ্টনের ক্ষেত্রে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ৮০ শতাংশ এবং কিন্ডারগার্টেনসহ বেসরকারি বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ২০ শতাংশ কোটা পাবে। পাঁচটি বিষয়ে মোট ৪০০ নম্বরের এ পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে। বাংলা, ইংরেজি ও গণিতে ১০০ নম্বর করে এবং প্রাথমিক বিজ্ঞান ও বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয়ে ৫০ নম্বর করে বরাদ্দ থাকবে। অর্থাত্ এটি কোনো সাধারণ বার্ষিক পরীক্ষা নয়, বরং প্রতিযোগিতামূলক বৃত্তি পরীক্ষা। আর এই প্রতিযোগিতায় এখন অংশ নিতে হবে ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থীদের, পঞ্চম শ্রেণির সিলেবাসে।
জানা গেছে, এবার প্রাথমিক বৃত্তির দেওয়া হবে মোট ৮২ হাজার ৫০০ জন শিক্ষার্থীকে। মেধাবৃত্তির সংখ্যা ৩৩ হাজার। এরমধ্যে সরকারি বিদ্যালয়ের জন্য হবে ২৭ হাজার ৫০০ ও বেসরকারি বিদ্যালয়ের জন্য ৫ হাজার ৫০০। সাধারণ বৃত্তির সংখ্যা ৪৯ হাজার ৫০০। এর মধ্যে সরকারি বিদ্যালয়ের জন্য ৪১ হাজার ২৫০ ও বেসরকারি বিদ্যালয়ের জন্য ৮ হাজার ২৫০ বৃত্তি। মেধাবৃত্তি পাওয়া শিক্ষার্থীরা এককালীন ২২৫ টাকা ও মাসে ৩০০ টাকা পাবে। আর সাধারণ বৃত্তি পাওয়া শিক্ষার্থীদের এককালীন ২২৫ টাকা ও মাসে ২২৫ টাকা করে দেওয়া হবে। শিক্ষামন্ত্রী বলেন, আগামী বছর থেকে (২০২৭ সালে) প্রাথমিক বৃত্তির পরিমাণ বাড়ানোর চিন্তা করা হবে।
এদিকে মাধ্যমিক স্তরের বই পড়তে পড়তে হঠাত্ প্রাথমিকের বৃত্তির প্রস্তুতি নিতে বসে মানসিক চাপে পড়ছে শিক্ষার্থীরা। হঠাত্ বৃত্তি পরীক্ষা নেওয়ার সিদ্ধান্তে অভিভাবকদের সমালোচনার ঝড় উঠেছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। তাদের মতে, নিয়মিত ষষ্ঠ শ্রেণির ক্লাস ও প্রথম সাময়িক পরীক্ষার প্রস্তুতির পাশাপাশি আগের বছরের পাঠ্যবই পড়ে নতুন করে প্রস্তুতি নেওয়া শিক্ষার্থীদের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করছে। পঞ্চম ও ষষ্ঠ শ্রেণির পাঠ্যসূচি, শিখন ও মূল্যায়ন পদ্ধতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। নতুন শিক্ষাক্রমে ষষ্ঠ শ্রেণির পাঠ্যবই ও শিখনপদ্ধতি পুরোপুরি বদলে গেছে। সেখানে অভ্যস্ত হতে না হতেই আবার পুরোনো পদ্ধতির পরীক্ষার জন্য পড়তে হবে, এটা শিশুদের জন্য কতটা কঠিন হয়ে উঠতে পারে, তা সহজেই অনুমান করা যায়।
সাতক্ষীরা জেলার একটি স্কুলের একজন শিক্ষার্থীর অভিভাবক জানান, তার সন্তানকে ক্যাডেট কলেজে ভর্তির জন্য প্রস্তুত করাচ্ছেন। ইতিমধ্যে পড়াশোনার ব্যাপক চাপ রয়েছে। এর ওপর আবার বৃত্তি পরীক্ষার প্রস্তুতি নিতে গিয়ে তার সন্তান হিমশিম খাচ্ছে। শুধু এই এক পরিবার নয়, দেশের অসংখ্য পরিবার এখন একই সমস্যায় পড়েছে। বিশেষ করে যে শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে, তাদের জন্য এই অতিরিক্ত চাপ মারাত্মক মানসিক চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
নয়া দিগন্ত
দৈনিক নয়া দিগন্তের প্রধান শিরোনাম ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ ঘিরে সংসদে বিতর্ক’। প্রতিবেদনে বলা হয়, জুলাই গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় ঘোষিত ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ বাস্তবায়ন নিয়ে জাতীয় সংসদে তীব্র বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। সনদের আওতায় সংবিধান সংস্কার পরিষদের অধিবেশন নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আহ্বান না হওয়ায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা: শফিকুর রহমান। তবে সরকারের পক্ষ থেকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, সংবিধানে এমন কোনো পরিষদের অস্তিত্ব না থাকায় প্রধানমন্ত্রী রাষ্ট্রপতিকে অধিবেশন আহ্বানের পরামর্শ দিতে পারেন না। ফলে সাংবিধানিক ভিত্তি ছাড়া ওই পরিষদের অধিবেশন ডাকা সম্ভব নয়। এ ইস্যুতে গতকাল রোববার সংসদের অনির্ধারিত আলোচনায় পাল্টাপাল্টি বক্তব্যে রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক বিতর্ক আরো ঘনীভূত হয়েছে।
সংবিধান সংস্কার পরিষদ না হওয়ায় উদ্বেগ বিরোধী দলের: গতকাল রোববার বেলা ১১টায় জাতীয় সংসদের অধিবেশন শুরু হলে প্রশ্নোত্তর পর্ব শেষে অনির্ধারিত আলোচনায় অংশ নেন বিরোধীদলীয় নেতা ডা: শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে গঠিত এই সংসদ স্বাভাবিক নির্বাচনী প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আসেনি; বরং রাষ্ট্রপতির জারি করা আদেশের মাধ্যমে এর জন্ম হয়েছে।
তিনি সংসদে জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশের বিভিন্ন ধারা পড়ে শোনান এবং বলেন, এই আদেশ অনুযায়ী নির্বাচনের ফল ঘোষণার ৩০ দিনের মধ্যে সংবিধান সংস্কার পরিষদের অধিবেশন আহ্বান করার কথা ছিল। কিন্তু নির্ধারিত সময় পার হয়ে গেলেও তা হয়নি।
বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, ‘এই বিষয়টি আমার গভীর উদ্বেগের কারণ। আদেশে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হলে জাতীয় সংসদের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের নিয়ে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন করা হবে। কিন্তু এখনো সেই পরিষদের অধিবেশন ডাকা হয়নি।’
তিনি আরো বলেন, যেভাবে জাতীয় সংসদের অধিবেশন আহ্বান করা হয়, একই পদ্ধতিতে সংবিধান সংস্কার পরিষদের অধিবেশন আহ্বান করা সম্ভব। প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শেই রাষ্ট্রপতি সংসদের অধিবেশন ডেকেছেন- তাই একইভাবে সংস্কার পরিষদের অধিবেশন আহ্বানও করা উচিত।
২টি ভূমিকায় নির্বাচিত হয়েছেন সংসদ সদস্যরা: ডা: শফিকুর রহমান দাবি বলেন, এবারের সংসদ সদস্যরা দু’টি ভিন্ন প্রক্রিয়ায় নির্বাচিত হয়েছেন- একটি সংসদ সদস্য হিসেবে, আরেকটি সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে। তিনি বলেন, জুলাই আদেশ অনুযায়ী বিরোধী দলের ৭৭ জন সদস্য সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নিয়েছেন। ফলে তারা সংসদ সদস্যের পাশাপাশি সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবেও দায়িত্ব পালন করতে চান। তার ভাষায়, ‘আমরা চাই আদেশ অনুযায়ী আমাদের সেই দায়িত্ব পালনের সুযোগ দেয়া হোক।’
বণিক বার্তা
‘আগামী অর্থবছর সরকারের ঋণ গ্রহণ ৩ লাখ কোটি টাকা ছাড়াতে পারে’-এটি দৈনিক বণিক বার্তার প্রধান শিরোনাম। খবরে বলা হয়, বিএনপি সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের মাত্র ১১ দিনের মাথায় ইরানে হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। পুরো মধ্যপ্রাচ্যে এখন এ যুদ্ধের ছায়া।
এর প্রভাবে বিশ্ববাজারে জ্বালানির সরবরাহ সংকট সৃষ্টি হওয়ার পাশাপাশি মূল্যও বেড়ে গেছে। বাংলাদেশকেও বাড়তি দাম দিয়ে জ্বালানি কিনতে হচ্ছে। সরকারের বিভিন্ন রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি পূরণেও অর্থের প্রয়োজন। সামনে সরকারি কর্মচারীদের পে-স্কেল দেয়ার ক্ষেত্রেও বাড়তি অর্থ লাগবে। সব মিলিয়ে সামনের দিনে সরকারের ওপর বড় ধরনের আর্থিক চাপ আসতে যাচ্ছে। এক্ষেত্রে আগামী অর্থবছর সরকারের নেয়া ঋণের পরিমাণ ৩ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।
অর্থ বিভাগের তথ্যানুসারে, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেট ঘাটতি মেটাতে ২ লাখ ২১ হাজার কোটি টাকার ঋণ গ্রহণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারিত রয়েছে। এর মধ্যে স্থানীয় উৎস থেকে ১ লাখ ২৫ হাজার কোটি ও বিদেশী উৎস থেকে ৯৬ হাজার কোটি টাকার ঋণ নেয়ার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। তাছাড়া চলতি অর্থবছরে দেশী-বিদেশী মিলিয়ে ১ লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকার ঋণ পরিশোধের কথা রয়েছে। সরকারের ব্যয়ের তুলনায় রাজস্ব আহরণ কম হওয়ার কারণে বর্তমানে ঋণ করে পরিচালন ব্যয়ের কিছু অংশ মেটাতে হচ্ছে। তাছাড়া ঋণ শোধ করতেও ঋণ নিতে হচ্ছে।
সরকারের বছরভিত্তিক ঋণ পরিশোধ পরিকল্পনা অনুসারে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ১ লাখ ৭৫ হাজার কোটি, ২০২৭-২৮ অর্থবছরে ১ লাখ ২৫ হাজার কোটি এবং ২০২৮-২৯ অর্থবছরে দেড় লাখ কোটি টাকারও বেশি ঋণ শোধ করতে হবে। এর সঙ্গে পরিশোধ করতে হবে ঋণের সুদও। সর্বশেষ ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ১ লাখ ৩৪ হাজার ৪৩০ কোটি টাকার সুদ পরিশোধ করেছে সরকার। জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি বর্তমান সরকারকে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জে ফেলে দিয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে আগামী দিনে ঋণের পরিমাণ বাড়লে সুদের পরিমাণও বাড়বে। সব মিলিয়ে ঋণের কিস্তি ও সুদ পরিশোধের পাশাপাশি পরিচালন ও উন্নয়ন ব্যয় মেটাতে আগামী অর্থবছরে সরকারের নেয়া ঋণের পরিমাণ ৩ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরুর আগে যেখানে প্রতি এমএমবিটিইউ এলএনজি ১০-১১ ডলারে কেনা হয়েছিল সেখানে বর্তমানে স্পট মার্কেট থেকে প্রতি এমএমবিটিইউ এলএনজি কিনতে হচ্ছে ২৪-২৮ ডলারে। সম্প্রতি সিঙ্গাপুরের ভিটল এশিয়ার কাছ থেকে প্রতি এমএমবিটিইউ সাড়ে ২৪ ডলার এবং গানভরের কাছ থেকে প্রতি এমএমবিটিইউ ২৮ ডলার করে দুই কার্গো এলএনজি কিনেছে বাংলাদেশ। যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে এলএনজির দাম আরো বাড়বে এবং এতে এ খাতে সরকারের ব্যয়ও বেড়ে যাবে। এরই মধ্যে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের পক্ষ থেকে অর্থ বিভাগের কাছে জ্বালানি কেনার জন্য বাড়তি অর্থ চাওয়া হয়েছে।
নির্বাচনের প্রচারণায় ভোটারদের বেশকিছু প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল বিএনপি। এর মধ্যে পর্যায়ক্রমে ফ্যামিলি কার্ড প্রদান; কৃষক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, মৎস্যচাষী ও প্রাণিসম্পদ খামারিদের কৃষক কার্ড প্রদান; হতদরিদ্র এতিম শিশুদের জন্য বিশেষ তহবিল গঠন; মূল্যস্ফীতির নিরিখে সামাজিক সুরক্ষা ভাতার পরিমাণ বৃদ্ধি, ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত সুদসহ কৃষি ঋণ মওকুফ অন্যতম। এরই মধ্যে ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ড বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। পাশাপাশি ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষি ঋণ মওকুফের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। এসব কর্মসূচির আওতা সম্প্রসারণের জন্য আগামী অর্থবছরের বাজেটে বাড়তি অর্থ বরাদ্দ দেয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। এতেও সরকারের ব্যয় বাড়বে।
আজকের পত্রিকা
দৈনিক আজকের পত্রিকার প্রধান শিরোনাম ‘সংস্কার পরিষদ নিয়ে সংসদে ঠেলাঠেলি’। প্রতিবেদনে বলা হয়, সময় শেষ হলেও সংবিধান সংস্কার পরিষদের অধিবেশন আহ্বান না করায় জাতীয় সংসদে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান। এ নিয়ে সরকারি দলের পক্ষ থেকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, যে জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশের অধীনে এই পরিষদের কথা বলা হচ্ছে, তা আরোপিত এবং জবরদস্তিমূলক।
যদিও জুলাই সনদ বাস্তবায়নে নিজ দলের অঙ্গীকারের কথা তুলে ধরেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। এ জন্য আগে সংবিধান সংশোধন প্রয়োজন জানিয়ে তিনি বিরোধীদলীয় নেতাকে সংবিধান সংস্কারের বিষয়ে সংসদের কার্য উপদেষ্টা কমিটিতে আলোচনার প্রস্তাব দেন।
পরে বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমানের উদ্দেশে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমেদ বলেছেন, ‘আপনি অত্যন্ত জনগুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় উপস্থাপন করেছেন। এ ধরনের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে জায়গায় বসে সমাধান দেওয়া যায় না। এটার জন্য আপনি নোটিশ দেবেন। নোটিশ পাওয়ার পর আমি সিদ্ধান্ত দেব।’
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের দ্বিতীয় কার্যদিবস ছিল গতকাল রোববার। বেলা ১১টায় অধিবেশন শুরু হয়। শুরুতেই অনির্ধারিত আলোচনার জন্য দাঁড়ান জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান। তখন স্পিকার বলেন, প্রশ্নোত্তর পর্ব শেষ হলে বিরোধীদলীয় নেতাকে সুযোগ দেওয়া হবে।
প্রশ্নোত্তর পর্ব শেষে বিরোধীদলীয় নেতাকে মাইক দেন স্পিকার। শফিকুর রহমান তখন বলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থাপনের প্রেক্ষাপটে গঠিত এই সংসদ স্বাভাবিকভাবে নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় আসেনি। রাষ্ট্রপতির একটি আদেশের মাধ্যমে এসেছে। এটি জারি করা হয় ২০২৫ সালের ১৩ নভেম্বর।
এরপর জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ পুরোটা পড়ে শোনান বিরোধদলীয় নেতা। তিনি বলেন, ‘আদেশ অনুযায়ী গণভোটে ‘হ্যাঁ’ বিজয়ী হলে ফল প্রকাশের ৩০ দিনের মধ্যে সংবিধান সংস্কার পরিষদের সভা হওয়ার কথা। কিন্তু সে সময় শেষ হয়ে যাচ্ছে আজ। অধিবেশন ডাকা হয়নি। আমার উদ্বেগের বিষয়টি এখানে।’
বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, যে পদ্ধতিতে সংসদের অধিবেশন আহ্বান করা হবে, সেই একই পদ্ধতিতে সংবিধান সংস্কার পরিষদের অধিবেশন আহ্বান করার কথা। প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শে রাষ্ট্রপতি সংসদের অধিবেশন আহ্বান করেছেন।
বিরোধীদলীয় জোটের এমপিরা জাতীয় নির্বাচন ও গণভোট অনুসারে এমপি ও সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নিয়েছেন উল্লেখ করেন শফিকুর রহমান বলেন, এই আদেশ অনুসারে তাঁরা একই সঙ্গে সংসদ সদস্য ও সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালনের সুযোগ পেতে চান।
দেশ রূপান্তর
‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ নিয়ে উত্তপ্ত সংসদ’-এটি দৈনিক দেশ রূপান্তরের প্রধান শিরোনাম। খবরে বলা হয়, জুলাই জাতীয় সনদের প্রস্তাব বাস্তবায়নে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন নিয়ে জাতীয় সংসদে উত্তপ্ত বিতর্ক হয়েছে। জুলাই সনদবিষয়ক আদেশ অনুসারে নির্ধারিত সময়ে সংবিধান সংস্কার পরিষদের অধিবেশন আহ্বান না করায় সংসদে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান। তিনি বলেছেন, বিষয়টি সংসদে সমাধান না হলে তারা রাজপথেও নামবেন।
এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, সংবিধানে সংবিধান সংস্কার পরিষদের অস্তিত্ব না থাকায় প্রধানমন্ত্রী রাষ্ট্রপতিকে পরামর্শ দিতে পারেন না। রাষ্ট্রপতিও অধিবেশন ডাকতে পারেন না বলেই তা করেননি। বিরোধীদলীয় নেতাকে সংবিধান সংস্কারের বিষয়ে সংসদের কার্য উপদেষ্টা কমিটিতে আলোচনার প্রস্তাব দেন তিনি। গতকাল রবিবার বেলা ১১টায় ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের দ্বিতীয় দিনের কার্যক্রম শুরু হয়। বিকেলে সংসদ অধিবেশন ২৯ মার্চ বেলা ৩টা পর্যন্ত মুলতবি ঘোষণা করেন স্পিকার মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ (বীরবিক্রম)। সবাইকে সহযোগিতা করার জন্য ধন্যবাদ জানানোর পাশপাশি ঈদের আগাম শুভেচ্ছা জানান তিনি।
সংসদে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, “জুলাই গণঅভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে গঠিত এ সংসদ নির্বাচনী প্রক্রিয়া অনুসরণ করে গঠিত হয়নি। এটি প্রসিডেনশিয়াল অর্ডারের মাধ্যমে হয়েছে, যা ১৩ নভেম্বর ২০২৫ তারিখে জারি করা হয়েছিল। এ অর্ডারের ১৫টি নির্দেশিকার ৩ থেকে ১৫ নম্বর বিষয়গুলো ‘জুলাই সনদ’ এবং গণভোটের সঙ্গে সম্পর্কিত।”
বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, ‘অর্ডারের ১০ নম্বর নির্দেশিকায় বলা হয়েছে, সংসদ নির্বাচনের ফল ঘোষিত হওয়ার ৩০ পঞ্জিকা দিবসের মধ্যে যে পদ্ধতিতে জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন আহ্বান করা হবে, অনুরূপ পদ্ধতিতে পরিষদের প্রথম অধিবেশনও আহ্বান করা হবে। আমার বিবেচ্য বিষয়টি এখানেই। আজ ৩০তম পঞ্জিকা দিবস, কিন্তু এর মধ্যে এ অধিবেশন আহ্বান করা হয়নি।’
সহযোগীদের খবর
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের মামলা: দখল, দ্বন্দ্ব ও চাঁদাবাজির জন্য ‘ইচ্ছেমতো’ আসামি
অনলাইন ডেস্ক
অনলাইন
২ মাস আগে
১৬ মার্চ (সোমবার), ২০২৬, ৯ঃ১৭ (পূর্বাহ্ণ)
লিংক কপি হয়েছে!
ফন্ট সাইজ:
100%
