রেকর্ড প্রথম সেঞ্চুরি তানজিদের

রেকর্ড প্রথম সেঞ্চুরি তানজিদের

ফন্ট সাইজ:

মিরপুরের শেরেবাংলা স্টেডিয়ামে আজ যা দেখা গেল, তা কেবল একটি সাধারণ সেঞ্চুরি ছিল না, বরং ছিল দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান আর এক নতুন দিনের সূচনা। পাকিস্তানের বিপক্ষে সিরিজ নির্ধারণী ম্যাচে বাংলাদেশের ড্যাশিং ওপেনার তানজিদ হাসান তামিম যে ইনিংসটি খেললেন, তা দেশের ক্রিকেট ইতিহাসে দীর্ঘ ২৭ মাসের ওপেনিং খরা ঘুচিয়ে দিয়েছে। তানজিদের এই অনবদ্য সেঞ্চুরিতে ভর করে বাংলাদেশ নির্ধারিত ৫০ ওভারে ৫ উইকেট হারিয়ে ২৯০ রানের পাহাড়সম পুঁজি পায়। শেষবার ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে নিউজিল্যান্ডের মাটিতে সৌম্য সরকারের কাছ থেকে পাওয়া গিয়েছিল তিন অঙ্কের দেখা, আর এরপর দীর্ঘ ২৩ ম্যাচ পেরিয়ে অবশেষে বাংলাদেশের কোনো ওপেনার সেঞ্চুরির স্বাদ পেলেন। ক্যারিয়ারের আড়াই বছর পার করে তানজিদ এর আগে ১৬ বার (ওডিআই ৫, টি-টোয়েন্টি ১১) পঞ্চাশের ঘর ছুঁলেও সেটিকে পূর্ণতা দিতে পারেননি। গতকাল মিরপুরের হোম অব ক্রিকেটে পাকিস্তানের শক্তিশালী বোলিং আক্রমণকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিয়ে ১০৭ বলে ১০৭ রানের মহাকাব্য লিখলেন তিনি। এই ইনিংসটি কেবল বাংলাদেশ ক্রিকেটের জন্য স্বস্তির নিঃশ্বাস নয়, বরং এটি ছিল তানজিদের নিজের সামর্থ্যের প্রমাণ দেয়ার এক মোক্ষম সুযোগ যা তিনি দারুণভাবে কাজে লাগিয়ে রেকর্ডের খাতায় নাম লিখিয়েছেন। এই ইনিংস তাকে অনন্য এক শিখরে পৌঁছে দিয়েছে।
তানজিদের এই ধ্বংসাত্মক ইনিংসে ছিল ৬টি চার ও ৭টি ছক্কার মার। পাকিস্তানের বিপক্ষে ওয়ানডেতে বাংলাদেশের কোনো ব্যাটারের এক ইনিংসে সর্বোচ্চ ছক্কার রেকর্ড এখন তানজিদ হাসানের দখলে। মিরপুরের মাঠে এর আগে কোনো বাংলাদেশি ব্যাটার এক ওয়ানডে ইনিংসে এতগুলো ছক্কা হাঁকাতে পারেননি। তিনি শাহীন শাহ আফ্রিদি ও হারিস রউফের মতো গতি তারকাদের অবলীলায় সীমানাছাড়া করেন। বিশেষ করে রউফকে মারা তার পিক-আপ ফ্লিক এবং আপার কাটগুলো ছিল দেখার মতো। হারিস রউফের গতিকে কাজে লাগিয়ে তিনি যেমন থার্ড ম্যান অঞ্চলে বাউন্ডারি আদায় করেছেন, তেমনি স্পিনারদের বিপক্ষেও ছিলেন সমান আগ্রাসী। ৯২ রান থেকে ৯৯ তে পৌঁছানোর সময়ও তিনি ছিলেন অবিচল। মারমুখী মেজাজে থেকে বাউন্ডারি খুঁজছিলেন। তার উইলোর প্রতিটি ঝটকায় ছিল আত্মবিশ্বাসের বিচ্ছুরণ, যা কোণঠাসা করে ফেলেছিল পাকিস্তানের বোলিং আক্রমণকে।
ইনিংসের ৩৩তম ওভারে সালমান আলী আগার ফুলটস বলটিকে লং অফের ওপর দিয়ে উড়িয়ে ছক্কা মেরে যখন ক্যারিয়ারের প্রথম সেঞ্চুরি পূর্ণ করলেন, তখন পুরো গ্যালারি দাঁড়িয়ে তাকে অভিবাদন জানায়। ব্যক্তিগত ৯৪ রান থেকে সরাসরি ছক্কায় ১০০ স্পর্শ করা তানজিদ মেতে ওঠেন আকাশছোঁয়া উচ্ছ্বাসে। সেঞ্চুরি করার পর তিনি মাঠেই সিজদাহ করেন এবং সতীর্থকে জড়িয়ে ধরে আনন্দ ভাগ করে নেন। সাইফ হাসানের সঙ্গে ওপেনিং জুটিতে ১০০ রান এবং পরবর্তীতে নাজমুল হোসেন শান্তর সঙ্গে দারুণ পার্টনারশিপ ইনিংসটিকে বড় ভিত গড়ে দেয়। তার ব্যাটিংয়ে ছিল নিখুঁত টাইমিং আর বলের লাইন বুঝে আক্রমণাত্মক শট খেলার মুন্সিয়ানা। তানজিদ যেন আজ পণ করেছিলেন বড় ইনিংস খেলার মাধ্যমে দেশের জয় নিশ্চিত করবেন। তার এই আগ্রাসী ব্যাটিংয়ের কারণেই বাংলাদেশ ২৯০ রানের চ্যালেঞ্জিং স্কোর গড়তে সক্ষম হয়।
তবে সেঞ্চুরির পর ইনিংসটি আরও বড় করতে পারতেন তানজিদ। কিন্তু আবরার আহমেদের একটি আলগা বলে কাট করতে গিয়ে কভারে ক্যাচ দিয়ে ১০৭ রানে থামতে হয় তাকে। আউট হওয়ার পর তার চোখেমুখে ছিল হতাশা, তবে মিরপুরের দর্শকরা তাকে করতালির মাধ্যমে ড্রেসিংরুমে ফিরিয়ে দেন। বাংলাদেশ ক্রিকেটের জন্য এই সেঞ্চুরিটি ছিল অত্যন্ত সময়োপযোগী, কারণ ওপেনিং পজিশনে দীর্ঘ সময় ধরে চলা আস্থার সংকটের সমাধান দিলেন এই তরুণ। তার এই রেকর্ডময় সেঞ্চুরির সুবাদে বাংলাদেশ পাকিস্তান সিরিজে চালকের আসনে বসে পড়ে। অবশেষে একজন টপ অর্ডার ব্যাটসম্যান হিসেবে নিজেকে বড় মঞ্চের কারিগর হিসেবে প্রমাণ করলেন তানজিদ হাসান তামিম।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন