ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিসহ দেশটির শীর্ষ নেতৃত্ব নিহত হওয়ার পরও কেন ইরান লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে। এই প্রশ্ন এখন বিশ্বজুড়ে আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভাইরাল ভিডিও দাবি করছে, এর উত্তর লুকিয়ে থাকতে পারে প্রায় ৪০ বছর আগে তৈরি করা একটি ‘অ্যাসিমেট্রিক ওয়ারফেয়ার’ বা অসম যুদ্ধ কৌশলে, যা তেহরান নীরবে তৈরি করেছিল ইরান-ইরাক যুদ্ধের পর। ‘দ্য টেরিফাইং রিয়ালাইজেশন ইরান হ্যাড ৪০ ইয়ার্স অ্যাগো’ শিরোনামের ওই ভিডিওটি দ্রুতই সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। জনপ্রিয় এক্স অ্যাকাউন্ট ওয়ার্ল্ড ওয়ার ৩-এ শেয়ার করা ভিডিওটি একদিনের মধ্যেই ৭ লাখের বেশি ভিউ পেয়েছে। এ খবর দিয়েছে অনলাইন ইকোনমিক টাইমসে।
ভিডিওটিতে দেখানোর চেষ্টা করা হয়েছে কীভাবে ইরান এমন একটি সামরিক মতবাদ তৈরি করেছে, যা প্রচলিত সামরিক শক্তিতে শক্তিশালী দেশগুলোর সঙ্গে সরাসরি সমানে লড়াই না করেও তাদের চ্যালেঞ্জ জানাতে পারে। এই কৌশলের মূল ধারণা হলো- শক্তিশালী প্রতিপক্ষকে সরাসরি যুদ্ধক্ষেত্রে পরাজিত করার চেষ্টা না করে যুদ্ধকে এত ব্যয়বহুল ও জটিল করে তোলা, যাতে তারা দীর্ঘ সময় তা চালিয়ে যেতে না পারে। ভিডিওটিতে বলা হয়েছে, এই কৌশলের সূত্রপাত ১৯৮০ থেকে ১৯৮৮ সালের ইরান-ইরাক যুদ্ধ থেকে। এটি ছিল আধুনিক মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম দীর্ঘ ও রক্তক্ষয়ী সংঘাত, যেখানে ইরানে প্রায় ১০ লাখ মানুষ প্রাণ হারায়। সে সময় ইরাকের কাছে আধুনিক সামরিক সরঞ্জাম ছিল এবং বড় বড় বিশ্বশক্তির সমর্থনও ছিল তাদের পক্ষে। অন্যদিকে ইরানকে তখন আধুনিক অস্ত্রের সীমিত সরবরাহ এবং আর্থিক সংকট নিয়ে যুদ্ধ চালাতে হয়েছিল। ভিডিওটির মতে, তখনই ইরানের নেতারা বুঝতে পারেন যে, প্রচলিত সামরিক শক্তিতে বড় শক্তিগুলোর সঙ্গে প্রতিযোগিতা করা অত্যন্ত কঠিন হবে। ফলে তারা গুরুত্ব দিতে শুরু করেন একটি ভিন্ন ধরনের সামরিক কৌশলে, যাকে সামরিক বিশ্লেষকরা বলেন ‘অ্যাসিমেট্রিক ওয়ারফেয়ার’ বা অসম যুদ্ধনীতি। এই কৌশলে ব্যবহৃত হয় অপ্রচলিত পদ্ধতি, তুলনামূলক কম খরচের অস্ত্র এবং কৌশলগত চাপের জায়গাগুলো, যাতে শক্তিশালী প্রতিপক্ষের সুবিধাকে আংশিকভাবে নিরসন করা যায়। ভিডিওটিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে তা হলো আক্রমণ ও প্রতিরক্ষার ব্যয়ের বিশাল পার্থক্য। একটি উদাহরণ দিয়ে বলা হয়, মাত্র ২ হাজার ডলার মূল্যের একটি ড্রোন শত্রুকে বাধ্য করতে পারে প্রায় ২০ লাখ ডলার মূল্যের একটি প্রতিরোধী ক্ষেপণাস্ত্র (ইন্টারসেপ্টর মিসাইল) নিক্ষেপ করতে। এই ধরনের প্রতিক্রিয়া বারবার ঘটতে থাকলে ধীরে ধীরে অর্থনৈতিক ও সামরিক সম্পদের ওপর বিশাল চাপ পড়ে শক্তিশালী দেশগুলোর। ফলে ব্যয়বহুল যুদ্ধবিমান বা বিমানবাহী রণতরীতে বিপুল বিনিয়োগ করার বদলে ইরান গুরুত্ব দিয়েছে- ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন, তুলনামূলক কম খরচের আঘাত হানার প্রযুক্তির ওপর। এগুলো যুদ্ধের সময় উল্লেখযোগ্য চাপ তৈরি করতে পারে।
ভিডিওটিতে বলা হয়েছে, এই কৌশল শুধু অস্ত্রের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে ইরানের মিত্র সংগঠনগুলোর নেটওয়ার্ক। উদাহরণ হিসেবে এসব সংগঠনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে- হিজবুল্লাহ (লেবানন), হুতি আন্দোলন (ইয়েমেন)। ভিডিওটির মতে, এই জোটগুলো ইরানকে একসঙ্গে বিভিন্ন দিক থেকে চাপ সৃষ্টি করার সুযোগ দেয়, ফলে প্রতিপক্ষকে তাদের সামরিক শক্তি বিভিন্ন ফ্রন্টে ভাগ করতে হয়। এই কৌশলের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো হরমুজ প্রণালি। এই সরু সামুদ্রিক পথ দিয়ে প্রতিদিন বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল সরবরাহ হয়। এই রুটে কোনো ধরনের হুমকি সৃষ্টি হলে তা দ্রুত বিশ্ব জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি করতে পারে এবং তেলের দাম বাড়িয়ে দিতে পারে।
ভিডিওটির শেষাংশে বলা হয়েছে, ইরান সম্ভবত প্রচলিত সামরিক আধিপত্যের মাধ্যমে যুদ্ধ জেতার চেষ্টা করছে না। বরং তাদের লক্ষ্য হতে পারে যুদ্ধকে দীর্ঘায়িত করা, যাতে তা শক্তিশালী প্রতিপক্ষের জন্য অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিকভাবে ব্যয়বহুল হয়ে ওঠে। মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা যখন ক্রমশ বাড়ছে এবং বিশ্ব তেলবাজারও অস্থির হয়ে উঠছে, তখন ভাইরাল ভিডিওতে আলোচিত এই দশক পুরোনো কৌশলটি আবারও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে এসেছে। এই তত্ত্ব বাস্তবে পুরোপুরি সঠিক কি না, তা এখনও নিশ্চিত নয়।
তবে এই আলোচনা দেখিয়ে দেয়- অনেক সময় ছোট বা তুলনামূলক দুর্বল দেশগুলো সরাসরি সামরিক শক্তির বদলে ব্যয়, ধৈর্য এবং কৌশলগত চাপের ওপর ভর করে বড় শক্তিগুলোকে চ্যালেঞ্জ করার চেষ্টা করে।
