তেলের তীব্র সংকটে বিপর্যস্ত কিউবা। ফলে তারা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সরাসরি আলোচনা শুরু করেছে। দুই দেশের মধ্যে থাকা ‘দ্বিপক্ষীয় মতপার্থক্য’ সমাধানের উদ্দেশ্যে এই আলোচনা চলছে বলে শুক্রবার জানিয়েছেন কিউবার প্রেসিডেন্ট মিগুয়েল ডিয়াজ-কানেল। এ খবর দিয়ে অনলাইন লস অ্যানজেলেস টাইমস বলছে, কিউবাজুড়ে সম্প্রচারিত এক ভাষণে প্রেসিডেন্ট কানেল ওই মন্তব্য করেন। এটি প্রথমবারের মতো নিশ্চিত করা হলো যে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন ও হাভানার মধ্যে আলোচনা চলছে। প্রায় ৭০ বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্র ও কিউবা পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী। ১৯৫৯ সালে ফিদেল ক্যাস্ত্রোর বিপ্লবের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র সমর্থিত শাসক ফুলগেনসিও বাতিস্তা ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর থেকেই দুই দেশের সম্পর্ক শীতল হয়ে ওঠে।
কয়েক মাস ধরে ট্রাম্প প্রশাসন কিউবার কমিউনিস্ট সরকারের ওপর চাপ বাড়িয়ে আসছে। দ্বীপটিতে তেলের সরবরাহ কমিয়ে দেয়া হয়েছে এবং কিউবার নেতৃত্বের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপেরও হুমকি দেয়া হয়েছে।
এ সপ্তাহেই ট্রাম্প বলেন, এটি হয়তো বন্ধুত্বপূর্ণভাবে ক্ষমতা গ্রহণ হতে পারে, আবার নাও হতে পারে। ওয়াশিংটনের আমেরিকান ইউনিভার্সিটির গবেষক অর্থনীতিবিদ রিকার্ডো টরেস বলেন, ট্রাম্পের হুমকি এবং কিউবার ক্রমবর্ধমান জ্বালানি সংকট হাভানাকে আলোচনার টেবিলে বসতে বাধ্য করেছে। তিনি বলেন, দেশটি এখন কেবল টিকে থাকার চেষ্টা করছে। তিনি উল্লেখ করেন, কিউবায় নিয়মিত বিদ্যুৎ বিভ্রাট, খাদ্য, ওষুধ ও জ্বালানির তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। ফলে কিউবার সামনে আর কোনো বিকল্প নেই। তাদের কথা বলতেই হবে।
তবে ট্রাম্প প্রশাসন এই আলোচনার মাধ্যমে ঠিক কী অর্জন করতে চায়, তা এখনও স্পষ্ট নয়। ট্রাম্প এবং মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বারবার বলেছেন, কিউবাকে পরিবর্তন হতে হবে। কিন্তু সেই পরিবর্তন অর্থনৈতিক সংস্কার হবে, নাকি রাজনৈতিক ব্যবস্থার বড় রকম রূপান্তর- তা স্পষ্ট করেননি। শুক্রবারের প্রায় ৯০ মিনিটের ভাষণে দিয়াজ-কানেল ইঙ্গিত দেন যে কিউবার দৃষ্টিকোণ থেকে তাদের রাজনৈতিক ব্যবস্থা পরিবর্তনের বিষয়টি আলোচনার অংশ নয়।
তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা হচ্ছে দুই দেশের রাজনৈতিক ব্যবস্থার প্রতি পারস্পরিক সম্মান, সার্বভৌমত্ব এবং আমাদের সরকারের আত্মনিয়ন্ত্রণের ভিত্তিতে।
অতীতে যুক্তরাষ্ট্রকে ‘সাম্রাজ্যবাদী শক্তি’ এবং ‘গণহত্যামূলক অবরোধের’ জন্য দায়ী বলে তীব্র সমালোচনা করলেও, এই ভাষণে দিয়াজ-কানেল তুলনামূলকভাবে নরম সুরে কথা বলেন। তিনি বলেন, এ আলোচনার প্রথম লক্ষ্য হলো কোন কোন দ্বিপক্ষীয় সমস্যা সমাধান করা দরকার তা চিহ্নিত করা। এরপর সেই সমস্যাগুলোর সমাধান খুঁজে বের করা।
ট্রাম্পের দৃষ্টিতে মূল সমস্যা হলো কিউবার দীর্ঘদিনের প্রতিষ্ঠিত কমিউনিস্ট আমলাতন্ত্র, যা আধুনিক যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে পরিবর্তিত হয়নি। অন্যদিকে কিউবার কর্মকর্তারা দ্বীপটির অর্থনৈতিক সংকটের জন্য ৬০ বছরেরও বেশি সময় ধরে চলা যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞাকে দায়ী করেন। দুই দেশের মধ্যে এই নতুন আলোচনা সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার সময়ের পর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে। ওবামা কিউবার সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার চেষ্টা করেছিলেন। তার প্রশাসন হাভানায় মার্কিন দূতাবাস পুনরায় চালু করে, ভ্রমণ ও বাণিজ্যের ওপর নানা বিধিনিষেধ শিথিল করে এবং ২০১৬ সালে তিনি কিউবা সফরও করেন। সে সময় তিনি কিউবার তৎকালীন প্রেসিডেন্ট রাউল ক্যাস্ত্রোর সঙ্গে করমর্দনও করেন। কিন্তু ট্রাম্প তার প্রথম মেয়াদে ওবামার এই উদ্যোগগুলোর বেশিরভাগই বাতিল করেন এবং যুক্তরাষ্ট্র-কিউবা সম্পর্ক আবারও শীতল যুদ্ধের মতো উত্তেজনাপূর্ণ অবস্থায় ফিরে যায়।
শুক্রবারের এ খবর এমন এক সময় এসেছে যখন কয়েকদিন আগে যুক্তরাষ্ট্র ইরানে হামলা চালিয়েছে এবং দুই মাস আগে ট্রাম্পের মোতায়েন করা মার্কিন বাহিনী ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে ক্ষমতাচ্যুত করেছে। মাদুরোকে নিউইয়র্কে নিয়ে গিয়ে মাদক পাচারের অভিযোগে বিচারের মুখোমুখি করা হয়েছে। তবে তার বামপন্থী ‘চাভিস্তা’ সরকারের বেশিরভাগ অংশ এখনও কারাকাসে ক্ষমতায় রয়েছে এবং এখন ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে তেল উৎপাদন ও রপ্তানিতে সহযোগিতা করছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ধারণা, কিউবার ক্ষেত্রেও ট্রাম্প একই ধরনের কৌশল নিতে পারেন- রাজনৈতিক ব্যবস্থা মোটামুটি অক্ষুণ্ণ রেখে অর্থনৈতিক উন্মুক্ততা বাড়ানোর চেষ্টা করবেন। পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও কিউবান অভিবাসী পরিবারের সন্তান। তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, ট্রাম্প প্রশাসন কিউবায় হঠাৎ বড় রাজনৈতিক পরিবর্তন চাপিয়ে দিতে চাইছে না। তিনি গত মাসে বলেন, কিউবায় পরিবর্তন দরকার। কিন্তু সেই পরিবর্তন একদিনে ঘটতে হবে এমন নয়।
বিশ্লেষকদের মতে, কিউবা তুলনামূলক ছোট কিছু ছাড় দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে সন্তুষ্ট করার চেষ্টা করতে পারে- যেমন রাজনৈতিক বন্দিদের মুক্তি। এই সপ্তাহে হাভানা ঘোষণা করেছে যে ‘সদিচ্ছার নিদর্শন হিসেবে’ শিগগিরই ৫১ জন বন্দিকে মুক্তি দেয়া হবে।
ফ্লোরিডাভিত্তিক এনজিও কিউবা প্রক্সিমার উপপরিচালক মিশেল ফার্নান্দেজ পেরেজ বলেন, অনেক কিউবান-আমেরিকান চান কিউবায় পূর্ণ গণতান্ত্রিক রূপান্তর হোক, যেখানে একাধিক রাজনৈতিক দল মুক্ত নির্বাচনে অংশ নেবে। তবে আপাতত কম বড় ধরনের পরিবর্তন হলেও, যদি তা মানুষের জীবনমান উন্নত করে, তাহলে সেটিকেও সমর্থন করা যেতে পারে। তিনি বলেন, যদি এর ফলে কিউবার মানুষ কম কষ্টে থাকে এবং তাদের জীবনে বেশি সুযোগ আসে, তাহলে আমরা সেটিকে সমর্থন করব।
কিউবার সাধারণ মানুষ বহুদিন ধরেই অর্থনৈতিক কষ্টে অভ্যস্ত। কিন্তু সাম্প্রতিক জ্বালানি সংকট পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তুলেছে। হাভানার ৫৬ বছর বয়সী ট্যাক্সিচালক ব্রুনো দিয়াজ বলেন, আমরা আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে খারাপ অবস্থায় আছি। আমি কাজ বন্ধ করে দিয়েছি। কারণ গাড়িতে তেল ভরার মতো আয় করতে পারি না। দাম আকাশছোঁয়া। কেউ আর জ্বালানি কিনতে পারছে না। সবাই হতাশ। ট্যাক্সি চালানোর পাশাপাশি তিনি একজন সংগীতশিল্পীও। পর্যটকদের জন্য বিভিন্ন ক্লাবে গান গেয়ে অতিরিক্ত আয় করতেন। কিন্তু এখন বিদেশি পর্যটকও প্রায় নেই। কারণ জেট ফুয়েলের সংকটে পর্যটন খাত মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
তিনি বলেন, কোনো পর্যটক নেই। আমাদের জীবিকা চালানোর পথও নেই। পরিস্থিতি খুবই ভয়াবহ। কিউবা ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সরাসরি আলোচনার গুজব কয়েক মাস ধরেই চলছিল। তবে এখন পর্যন্ত কোনো পক্ষই আনুষ্ঠানিকভাবে তা নিশ্চিত করেনি। মঙ্গলবার যুক্তরাষ্ট্রে কিউবার রাষ্ট্রদূত লিয়ানস টোরেস রিভেরা বলেন,
দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা করতে আমরা প্রস্তুত।
শুক্রবার ট্রাম্প এই খবরের প্রতিক্রিয়ায় নিজের সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম ট্রুথ সোশ্যালে একটি সংবাদ শেয়ার করেন, যার শিরোনাম- ‘কিউবা ট্রাম্প কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনার বিষয়টি নিশ্চিত করেছে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তির আশাবাদ বাড়ছে।’ ফার্নান্দেজ বলেন, আলোচনার বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া ইতিবাচক লক্ষণ। যদিও তিনি চান যে নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরাও এই আলোচনায় অংশ নিক। তবে শেষ পর্যন্ত এই আলোচনা থেকে কী ফল বের হবে, তা বলা কঠিন। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র কী চায় বা কী অর্জন করবে- তা অনুমান করা কঠিন। কারণ মার্কিন সরকারের সিদ্ধান্ত অনেক সময় নীতি বা আইনের ভিত্তিতে নয়, বরং প্রেসিডেন্টের ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করে।
