মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের নির্মমতায় নিভে গেছে চার প্রবাসীর জীবন প্রদীপ। তাদের মৃত্যুতে পরিবারে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। পরিবারের অভাব ঘুচাতে প্রবাসে পাড়ি দিয়েছিলেন তারা। তাদের ঘিরেই ছিল পরিবারের স্বপ্ন, সুখ। সেই মানুষরা হয়েছেন যুদ্ধের নির্মম বলি।
বাকরুদ্ধ মোশারফের পরিবার: সৌদি আরবে একটি আবাসিক ভবনে রোববার রাতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় এক বাংলাদেশি নিহত হয়েছেন। নিহত ওই বাংলাদেশির নাম মোশারফ হোসেন (৩৮)। তিনি টাঙ্গাইলের সখীপুর উপজেলার কীর্তনখোলা গ্রামের মধ্যপাড়া এলাকার মো. সুজাত আলীর ছেলে। মোশারফ হোসেনের সঙ্গে কাজ করা কীর্তনখোলা গ্রামের লোকজন পরিবারকে মৃত্যুর তথ্য নিশ্চিত করেছে। পরিবার এবং প্রতিবেশীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রায় আট বছর আগে সৌদি আরব যান মোশারফ হোসেন। মৃত্যুর আধা ঘণ্টা আগে তিনি বড় ছেলে মাহিমের সঙ্গে ভিডিও কলে কথা বলেছিলেন। এ সময় তিনি স্থানীয় একটি স্কুলে নবম শ্রেণিতে পড়ুয়া ছেলে মাহিম (১৪)কে বলেন, তোমার ছোট ভাই মিহানসহ পরিবারের সকলের জন্য ঈদের কেনাকাটা করে নাও। আমি পরে টাকা পাঠিয়ে দেবো। নিহত মোশারফ রোববার রাত সাড়ে আটটার দিকে ভিডিও কলে সর্বশেষ কথা বলেন মাহিমের সঙ্গে। মৃত্যুর খবর শোনার পর থেকে মোশারফের স্ত্রী কবরী আক্তার বিলাপ করতে করতে বারবার মূর্ছা যাচ্ছেন। মোশারফের বাবা সুজাত আলী বলেন, ছেলেকে হারিয়ে আমার পুরো পরিবার বাকরুদ্ধ। শেষবারের মতো তাকে যেন আমরা দেখতে পারি, তাই তার লাশটা দেশে ফেরত চাই।
‘আর বেশিদিন না, শিগগিরই দেশে ফিরবো’: ঘটনার আগের দিন বিকালেও মেয়ের সঙ্গে ভিডিও কলে কথা বলেছিলেন বাবা। হাসিমুখে বলেছিলেন, “আর বেশিদিন না, শিগগিরই দেশে ফিরবো।” কিন্তু রাত না পেরোতেই সেই কণ্ঠ চিরতরে স্তব্ধ হয়ে গেল। বাহরাইনে ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় প্রাণ হারালেন সন্দ্বীপ প্রবাসী মোহাম্মদ তারেক (৪৮)। ২রা ফেব্রুয়ারি ভোরে বাহরাইনের রাজধানী মানামায় একটি ড্রাইডক শিপইয়ার্ডে ডিউটিরত অবস্থায় হামলার শিকার হয়ে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। ধ্বংসাবশেষ এসে জাহাজে পড়লে গুরুতর আহত হন তারেক। পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। নিহতের একমাত্র মেয়ে তামান্না কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘আব্বুর আসার কথা ছিল জানুয়ারিতে। এতদিনে বাবা দেশে থাকতো। কিন্তু গত বছর ওমরাহ হজ করেছেন বলে বলতেন রোজার শেষে এলে ঈদ ও কোরবানির ঈদ একসঙ্গে পালন করবো, না হলে ঈদের পর এসে বাড়িতে কোরবানির ঈদ পালন করবো। বাবা ১৮ মাস বা দুই বছর পরপর দেশে আসতেন। সর্বশেষ ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে এসেছিলেন। এবার ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে থাকার কথা ছিল।’ কথা বলতে বলতে ভেঙে পড়েন তিনি। “রোববার বিকালেও আমার সঙ্গে ভিডিও কলে কথা হয়েছে। পারিবারিক সূত্র জানায়, প্রায় ২৭ বছর ধরে বাহরাইনে কর্মরত ছিলেন তারেক। তিনিই ছিলেন পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। তার একমাত্র মেয়ে কলেজে অধ্যয়নরত।
সালেহকে হারিয়ে দিশাহারা পরিবার: ইরানের ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে সংযুক্ত আরব আমিরাতে নিহত সালেহ উদ্দিন ওরফে আহমদ আলী (৫৫)কে হারিয়ে পরিবারের লোকজন প্রায় দিশাহারা হয়ে পড়েছেন। সালেহের এমন মৃত্যু মেনে নিতে পারছেন না তার স্ত্রী-সন্তানসহ স্বজনরা। ২৮শে ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় সংযুক্ত আরব আমিরাতের আজমান শহরে ইরানের ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় সালেহ আহমদ ওরফে আহমদ আলী নিহত হন। পরদিন রোববার (১লা মার্চ) দুপুরে দেশে থাকা স্বজনরা তার মৃত্যুর খবর পান। এরপর থেকে সালেহের পরিবারে শোকের ছায়া নেমে আসে। নিহত সালেহ বড়লেখা পৌরসভার গাজিটেক গ্রামের মৃত সবর আলীর ছেলে।
পরিবার সূত্রে জানা গেছে, সালেহ উদ্দিন ওরফে আহমদ আলী জীবিকার তাগিদে প্রায় ২৭ বছর আগে সংযুক্ত আরব আমিরাতে পাড়ি জমান। সেখানে তিনি আজমান শহরে বসবাস করতেন এবং পানি সরবরাহের গাড়ি চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করতেন। গত শনিবার ইফতারের পর পানি সরবরাহ করতে গিয়ে ইরানের ছোড়া একটি ক্ষেপণাস্ত্র তার গাড়িতে এসে পড়ে। এতে সালেহসহ আরও কয়েকজন গুরুতর আহত হন। পরে তাদের উদ্ধার করে স্থানীয় একটি হাসপাতালে নেয়া হলে চিকিৎসকেরা সালেহকে মৃত ঘোষণা করেন। সালেহের বড় ছেলে আব্দুল হক কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ইফতারের পর আমার বাবার কাছে পানি সরবরাহের একটি অর্ডার আসে। অর্ডার পেয়ে তিনি গাড়ি নিয়ে গন্তব্যে রওনা দেন। কিন্তু হঠাৎ ইরানের ছোড়া একটি ক্ষেপণাস্ত্র আমার বাবার গাড়িতে এসে আঘাত হানে। এতে তিনিসহ আরও কয়েকজন গুরুতর আহত হন। পরে তাদের দ্রুত স্থানীয় হাসপাতালে নেয়া হলে সেখানে আমার বাবা মারা যান।
অনিশ্চয়তায় সন্তানদের ভবিষ্যৎ: সৌদি আরবে মিসাইল হামলায় নিহত কিশোরগঞ্জের কটিয়াদী উপজেলার বাচ্চু মিয়া। রোববার ইফতারের আগে দেশটির আল-খারজ শহরের ‘আল তুইক বলদিয়া কোম্পানির’ একটি শ্রমিক ক্যাম্পে হামলায় তিনি মারা যান। নিহত ৩৫ বছর বয়সী বাচ্চু মিয়া কটিয়াদী উপজেলার জালালপুর ইউনিয়নের পশ্চিম ফেকামারা গ্রামের রইস উদ্দিনের ছেলে। তিনি দুই মেয়ের বাবা। বাবাকে হারিয়ে দিশাহারা হয়ে পড়েছে তারা। নেমে এসেছে অন্ধকার। তাদের কান্না যেন থামছে না।
আহত ১৪: প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মো. নুরুল হক নুর জানিয়েছেন, ইরান-ইসরাইল যুদ্ধ শুরুর পর থেকে সোমবার পর্যন্ত ৪ জন বাংলাদেশি নিহত হয়েছেন। তাদের মধ্যে সৌদি আরবে ২ জন, বাহরাইনে ১ জন ও দুবাইয়ে ১ জন মারা গেছেন। এ ছাড়া এখন পর্যন্ত ১৪ জনের মতো আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। সোমবার দুবাইয়ে নিহত আহমেদ আলীর লাশ হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে গ্রহণকালে এ তথ্য জানান তিনি। প্রতিমন্ত্রী বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের এই সংকট শুরু হওয়ার পর যখন ফ্লাইট বন্ধ ছিল, তখন থেকেই যাত্রীদের থাকার ব্যবস্থা করাসহ সংকট নিরসনে সমন্বয় করে কাজ করার জন্য প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় সহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে নির্দেশনা দিয়েছিলেন। তিনি বলেন, আজকেও আমরা সৌদিতে নিহতদের পরিবারের সঙ্গে কথা বলেছি।
