চা ও আমের সমন্বিত বাগান করে সাফল্যের নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন পঞ্চগড় সদর উপজেলার দেওয়ানহাট মাহানপাড়া গ্রামের বসিরুল আলম প্রধান। সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান হিসেবে সবাই তাকে আলম চেয়ারম্যান হিসেবেই চেনেন। ইতিমধ্যে তার বয়স সত্তর পেরিয়েছে। এই বয়সেও থেমে যাননি তিনি। বাড়ির পাশের এক সময়ের প্রায় পতিত পড়ে থাকা উঁচু ২২ একর জমিতে গড়ে তুলেছেন চা বাগান। চা চাষে স্বীকৃতিস্বরূপ ক্ষুদ্র চা চাষি হিসেবে তিনি ২০২৪ সালে জাতীয় পুরস্কার পান। এখানেই শেষ নয়, তিনি তার বাগানের পুরোটাই সাজিয়েছেন চা ও আমের সমন্বিত বাগানে। বিগত দুই বছরে শুধু আম বিক্রয় করে তিনি আয় করেছেন প্রায় ৭৫ লাখ টাকা। এবার এই বাগান থেকে শুধু আম বিক্রি করে কোটি টাকা আয়ের স্বপ্ন দেখছেন। সাধারণ কৃষকের মতোই পথচলা শুরু করেছিলেন বসিরুল আলম প্রধান। কিন্তু স্বপ্ন ছিল অনেক বড়। পরিশ্রম, দূরদর্শী চিন্তা ও কৃষির প্রতি গভীর ভালোবাসা দিয়ে দেওয়ানহাট এলাকার মাহানপাড়া গ্রামে তালমা নদীর তীর ঘেঁষে গড়ে তুলেছেন এক অনন্য চা ও আমের বাগান। চা বাগানের পাশাপাশি সাথী ফসল হিসেবে আম গাছ লাগিয়ে তিনি এলাকায় এক নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। অত্যন্ত সৌখিন এই কৃষক নিজের ২২ একর জমিতে চা চাষের সঙ্গে বিভিন্ন জাতের আম গাছ লাগিয়ে একটি সমন্বিত কৃষি মডেল গড়ে তুলেছেন। বর্তমানে তার বাগানে রয়েছে প্রায় ৫ হাজার ব্যানানা ম্যাংগো গাছ। এ ছাড়া ৫০টি আম্রপালিসহ আরও প্রায় শতাধিক বিদেশি জাতের আমের ভ্যারাইটি রয়েছে তার বাগানে। চলতি মৌসুমে আমের প্রচুর মুকুল এসেছে। মুকুল আসার পরই শুরু হয়েছে নতুন করে যত্ন নেয়ার পালা। আমের পরিচর্যায় শ্রমিকরা প্রখর রোদে দিনভর কাজ করে যাচ্ছেন। যত্ন আর পরিকল্পনায় সাজানো এই বাগান এখন স্থানীয় কৃষকদের কাছে অনুপ্রেরণার কেন্দ্র হয়ে উঠেছে। ২০২৪ সালে তার বাগান থেকে আম বিক্রি করে প্রায় ৪০ লাখ টাকা আয় হয়। পরের বছর ২০২৫ সালে আম বিক্রি করে প্রায় ২৫ লাখ টাকা আয় করেছেন। চলতি বছরেও গত বছরের তুলনায় আরও বেশি আম উৎপাদনের ব্যাপারে তিনি আশাবাদী। চা বাগানে আম বা অন্য কোনো ফলের গাছ লাগালে চায়ে বিভিন্ন ধরনের পোকা-মাকড় ও রোগ বালাই হতে পারে- চা বোর্ডের এমন আশঙ্কা উড়িয়ে দিয়ে চা উৎপাদনেও রয়েছে তার ধারাবাহিক উন্নতি। ২০২৪ সালে তার বাগানে চা উৎপাদন হয়েছিল ১ লাখ ৬৭ হাজার ৬৭১ কেজি। আর ২০২৫ সালে সেই উৎপাদন বেড়ে দাঁড়ায় ২ লাখ ৫ হাজার ৪৮৯ কেজিতে। চলতি মৌসুমের সবুজ চা পাতা তোলা শুরু হয়েছে। মৌসুমের শুরুতে দামও বেড়েছে। তিনি প্রতি কেজি চা পাতা ৩৬ টাকা দরে বিক্রি করছেন। যা তার আয়ের বড় একটি উৎস। বসিরুল আলম প্রধান বলেন, কৃষিকে আমি শুধু পেশা হিসেবে নয়, ভালোবাসা থেকে করি। শুরুতে চা বাগানে শেড ট্রি হিসেবে আম গাছের চারা লাগাই। শুরুতেই ভালো ফলন পাই। ধীরে ধীরে গোটা বাগানের মাঝের খালি অংশ সঠিক ব্যবহার করে বিভিন্ন ভ্যারাইটির আম গাছ রোপণ করি। সাফল্যও খুব সহজে ধরা দেয়। চায়ের সঙ্গে বিক্রয় করে আমি মোটা অঙ্কের টাকা পাচ্ছি। কোনো কারণে চায়ের দাম কমে গেলেও আমার বাগানে কোনো লোকসান হবে না। অনেকেই আমার বাগান দেখতে আসছেন। উৎসাহ পাচ্ছেন। আমি চাই তরুণ কৃষকরা আধুনিক পদ্ধতিতে কৃষিতে এগিয়ে আসুক। ব্র্যাক নার্সারি ম্যানেজার আশিকুর রহমান চৌধুরী জানান, আলম সাহেব অত্যন্ত আগ্রহী ও উদ্ভাবনী চিন্তার একজন কৃষক। চা বাগানের সঙ্গে আম চাষের এই সমন্বিত পদ্ধতি কৃষকদের জন্য লাভজনক মডেল হতে পারে। ব্র্যাক নার্সারির পক্ষ থেকে আমরা নিয়মিত তাকে কৃষি বিষয়ক বিভিন্ন পরামর্শ দিয়ে আসছি। পঞ্চগড় কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক আব্দুল মতিন বলেন, চা বাগান পরিচর্যার জন্য বাগানের মাঝখানে অনেকটা ফাঁকা রাখা হয়। এই ফাঁকা জায়গায় অনেক চা চাষি শেড ট্রি হিসেবে স্বল্প মেয়াদি গাছ লাগান। সেখানে যদি আম-লিচুর মতো ফলজ গাছ লাগানো যায় সেখান থেকে বাড়তি আয় করা সম্ভব। সবুজ চা পাতার দাম কখনো কমে গেলে ফলের আয় দিয়ে সেই লোকসান লাঘব করা সম্ভব হবে। আমি আলম সাহেবের সমন্বিত চা ও আম বাগান দেখেছি। তিনি খুব যত্ন সহকারে বাগানটি করেছেন। এবার আম গাছে প্রচুর মুকুল এসেছে। সঠিকভাবে পরিচর্যা করলে এবার তার বাগানে প্রচুর ফলন পাওয়া যাবে। আমরা কৃষি বিভাগ থেকে তাকে সব ধরনের পরামর্শ ও সেবা প্রদান করে আসছি।
চা ও আমের সমন্বিত বাগান
দুই বছরে ৭৫ লাখ টাকার আম বিক্রি
পঞ্চগড় প্রতিনিধি
১৪ মার্চ (শনিবার), ২০২৬
লিংক কপি হয়েছে!
ফন্ট সাইজ:
100%
