একটি রক্তস্নাত গণঅভ্যুত্থানের পর গঠিত অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত বহুল জনআকাঙ্খিত জাতীয় নির্বাচনে বিএনপি দুই তৃতীয়াংশ আসন নিয়ে দেশ পরিচালনার দায়িত্ব পেয়েছে। বাংলাদেশের জনগণ গত সতরো বছর ভোটাধিকার বঞ্চিত ছিল। স্বাভাবিকভাবেই ১২ই ফেব্রুয়ারি,২০২৬ এর নির্বাচন ছিল বহুদিন পর নাগরিক অধিকার প্রয়োগ করার একটি সুযোগ। এই নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত সরকারের প্রতি বাংলাদেশের মানুষের প্রত্যাশা তাই পাহাড়সম।
১৭ ফেব্রুয়ারি সংসদ সদস্যগণ সকালে এবং বিকালে মন্ত্রিসভা শপথ নেয়। মূলত মন্ত্রিসভার শপথ অনুষ্ঠান হয় বঙ্গভবনে। কিন্তু বিএনপি ২৪ এর গণঅভ্যুত্থানের স্পিরিটকে ধারণ করে এই অনুষ্ঠান জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় করার অনুরোধ জানায়, এটাও বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথম। বিএনপির মন্ত্িওসভা বা উপদেষ্টা পরিষদ কেমন হয়েছে সেটা অন্য আলোচনা। সেটা নিয়ে হয়ত একটা কলাম লেখা যাবে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান প্রথম দিন থেকেই নিজের দৈনন্দিন জীবনে এবং সরকার পরিচালনায় কিছু গুণগত পরিবর্তনের আভাস দিচ্ছেন। সচরাচর আমরা যা দেখে বড় হয়েছি, ফুটপাতে বা রাস্তায় ১৫ থেকে ২০ মিনিট দাঁড়িয়ে থাকতে হয়; প্রধানমন্ত্রীর প্রটোকলের গাড়িবহর যায়, তারপর জনসাধারণকে রাস্তা পার হতে হয়। এই ছিল প্রথা। এটাকে তিনি ভেঙে দিয়েছেন, প্রটোকলের গাড়ি কমিয়েছেন এবং নিজে সাধারণ নাগরিকের মতো ট্র্যাফিক জ্যাম পার হয়ে অফিস করছেন। এতে তার নিরাপত্তা কতটুকু বিঘ্নিত হচ্ছে সেটা অবশ্যই বিবেচ্য। আশা করি তার নিরাপত্তার বিষরটা মাথায় রেখেই তিনি এই পদক্ষেপটি জোরালো করবেন। প্রধানমন্ত্রী শনিবার অফিস করছেন। সকাল ৯ টা থেকে ৯টা ৩০ এর মধ্যে অফিসে হাজির হচ্ছেন। মন্ত্রিসভার সদস্য এবং সচিবালয়ে বা পিএমও অফিসের সবাইকে সঠিক সময়ে অফিসে আসার দিক নির্দেশনা দিচ্ছেন।
দেশের আর্থসামাজিক এবং জনমানুষের জীবনমানের উন্নয়নে যে প্রতিশ্রুতিগুলি বিএনপি নির্বাচনের পূর্বে দিয়েছিল তা বাস্তবায়নের জন্য প্রথম দিন থেকেই উদ্যোগী হয়েছেন। সংসদ সদস্যদের প্রথম বৈঠকেই স্বিদ্ধান্ত হয়েছে এবার শুল্কমুক্ত কোনো গাড়ির সুবিধা এমপিরা নেবেন না। তারা সবাই এই বিষয়ে ঐকমত্যে পৌঁছেছেন।
ফ্যামিলি কার্ডের কনসেপ্ট এবারের নির্বাচনে ব্যাপক ভূমিকা রেখেছে। সম্প্রতি জামায়াত আয়োজিত একটি ইফতার মাহফিলে এনসিপি নেতা নাসিরুদ্দিন পাটোয়ারী প্রধানমন্ত্রীকে বলছিলেন “ আমার বুয়া ফ্যামিলি কার্ড চায়, এটা নির্বাচনে জেতার ভালো কৌশল ছিল”। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী ফ্যামিলি কার্ডকে শুধুমাত্র নির্বাচনি কৌশল হিসেবেই নেননি বরং সত্যিকার অর্থেই নারীদেরকে স্বাবলম্বী করে তোলার জন্য এটাকে সময়োপযোগী মনে করেছেন এবং তাই ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ দ্রুত বাস্তবায়নের পদক্ষেপ নিয়েছেন। প্রাথমিকভাবে ১৪ টি উপজেলায় এই কার্ডটি বিতরণ করা হয়েছে।
কৃষক কার্ডের জন্যও তিনি একই পদক্ষেপ নিয়েছেন। তাছাড়াও নির্বাচনি জনসভায় দেয়া ওয়াদা অনুযায়ী ১০০০০ টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ সুদসহ মওকুফ করার ব্যবস্থা করেছেন। এই পদক্ষেপ ছিল খুবই প্রশংসনীয়। কারণ বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গণে প্রতিশ্রুতি প্রচুর শোনা যায়, কিন্তু বাস্তবায়নের সময় দেখা যায় উল্টোটা, বিভিন্ন আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় সামাজিক কর্মসূচিগুলো বাধাগ্রস্ত হয়। এক্ষেত্র প্রধানমন্ত্রীর বলিষ্ঠ পদক্ষেপ প্রশংসনীয়।
পরিবেশ ও জলবায়ু নিয়ে বিএনপির ইশতেহারে এবং দেশ গড়ার কর্মসূচীতে যে অঙ্গীকার ছিল তা নিয়েও প্রধানমন্ত্রী ইতিমধ্যে বৈঠক করেছেন, কমিটি করেছেন। ৫ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ এবং নদী ও খাল খননের উদ্যোগগুলো প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে ইতিমধ্যেই দৃশ্যমান হতে শুরু করেছে। ইমাম মুয়াজ্জিনদেরকে উৎসবভাতা দেয়ার একটি প্রতিশ্রুতি ছিল বিএনপির। সেটিও এই ঈদুল ফিতর থেকেই শুরু করবে সরকার।
এই পদক্ষেপ গুলো থেকে বোঝা যায় বিএনপি নির্বাচনি প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়নে কতটা আন্তরিক বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী নিজে। একটি রাজনৈতিক সরকার একক ব্যক্তি দ্বারা সফল হয় না বা হতে পারে না। এটা সম্পূর্ণ ঠিক ভিশনারি লিডার জরুরি, কিন্তু ভিশনারি লিডারকে অ্যাসিস্ট করার জন্য ক্যাপেবল টিমও জরুরি, যারা লিডারের ঐকান্তিক প্রয়াসকে কানেক্ট করতে পারবে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ইতিমধ্যেই যোগাযোগ বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে বসেছেন। ঘনবসতিপূর্ণ ঢাকার যোগাযোগ ব্যবস্থা কীভাবে জনবান্ধব করা যায় এবং ঢাকাকে কীভাবে বিকেন্দ্রীকরণ করা যায়। এ ব্যাপারে আমি একটু বিশেষভাবে আশাবাদি আমার শিক্ষক প্রফেসর শামসুল হককে দেখতে পেয়ে। তিনি দীর্ঘদিন ধরেই যোগাযোগখাতের ত্রুটি বিচ্যুতি এবং করণীয় নিয়ে কাজ করছেন। প্রত্যাশা করি প্রধানমন্ত্রীকে তিনি সঠিক পরামর্শের মাধ্যমে ঢাকাকে একটি বসবাসযোগ্য নগরী হিসেবে গড়ে তোলার ব্যাপারে সর্বাত্মক সহযোগিতা করবেন। নারীদের জন্য বিশেষায়িত ইলেকট্রিক বাস ১৮০ দিনের মধ্যে চালু করার সর্বাত্মক উদ্যোগ গ্রহণ করার কথা বলেছেন প্রধানমন্ত্রী।
প্রধানমন্ত্রী বিরোধী দলীয় নেতার আমন্ত্রণে ইফতার মাহফিলে যোগ দিয়েছেন। কুশলাদি বিনিময়, একসাথে নামাজ পড়া,খুনসুটি করা সবই করেছেন অনুষ্ঠানে গিয়ে। এর আগেও শপথ নেওয়ার পূর্বে তিনি বিরোধীদলীয় নেতা ও এনসিপির প্রধান নেতার বাসায় সৌজন্য সাক্ষাৎ করতে গিয়েছেন। এই সবগুলো পদক্ষেপই বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গণে নতুন এবং ইতিবাচক রাজনৈতিক পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়।
দুর্বৃত্তদের হামলায় চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার ভবন পরিদর্শন করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, তথ্যমন্ত্রী। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আশ্বাস দিয়েছেন, দুই মাসের মধ্যে তদন্ত শেষ করে বিচারিক প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়ার জন্য। একই সাথে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা নিশ্চিতে ইশতেহারে দেওয়া প্রতিশ্রুতি পূনর্ব্যক্ত করেছেন।
বিএনপি জুলাই সনদ স্বাক্ষর করেছিল নোট অব ডিসেন্ট সহ। এটা তারা প্রকাশ্যে করেছে, যুক্তি উপস্থাপন করেছে। কেন বর্তমান সামাজিক বাস্তবতায় তারা কিছু কিছু বিষয়ে নোট অব ডিসেন্ট দিয়েছে তাও ব্যাখ্যা করেছে। জুলাই সনদ বাস্তবায়নের পদক্ষেপ হিসেবে সরকারবিরোধী দলকে ডেপুটি স্পিকার নির্বাচনের কথা বলেছে। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে সরকার জুলাই সনদের ব্যাপারে তাদের আন্তরিক বার্তা বিরোধীদের কাছে পৌঁছে দিল।
বিশ্বের ১০২ টি দেশের মধ্যে বই পড়ার মানে বাংলাদেশের অবস্থান ৯৭ তম। এটাও জানতে পারলাম বাংলা একাডেমি আয়োজিত বইমেলায় দেওয়া প্রধানমন্ত্রীর ভাষণ থেকে। ঐ অনুষ্ঠানে অবশ্য তিনি আশ্বাস দিয়েছেন জেলায় জেলায় বইমেলা আয়োজন করতে সরকার সব ধরনের সহযোগিতা করবে। এবং বইমেলাকে আন্তর্জাতিক বইমেলায় রূপান্তর করা যায় কি না সে ব্যাপারটাও মেলা কর্তৃপক্ষকে ভেবে দেখতে বলেছেন।
বাংলাদেশের মানুষের একটা প্রবণতা পরিলক্ষিত হয়, কোনো একটা ঘটনা ঘটার সাথে সাথেই নিজেরাই বিচার করে ফেলে। ধর্ষণকাণ্ড হোক, হত্যাকাণ্ড হোক বা বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্ণর নিয়োগ, সবকিছুতেই খুব দ্রুত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রতিক্রিয়া জানায়। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্ণর কেমন হয়েছে, তিনি কোয়ালিটি কাজ করতে পারবেন কি না তা আমরা মুহূর্তের মধ্যেই বলে দিচ্ছি, তাকে হেয় প্রতিপন্ন করছি। ধর্ষণ হওয়ার পর অপরাধী গ্রেফতার হলো কি না, একটা অপরাধ সংগঠিত হওয়ার পর ন্যূনতম সময় দেওয়া হচ্ছে কি না সে ব্যাপারটাও ভেবে দেখা দরকার।
বহু মত ও পথের মানুষের দেশ আমাদের। সবাইকে সন্তুষ্ট করে সরকার চালানো যে কোনো রাজনৈতিক দলের পক্ষেই কঠিন। কিন্তু বাংলাদেশের মানুষের চাওয়া খুব ক্ষুদ্র। তারা চায় সুশাসন। জীবনমানের সুষম উন্নয়ন। বর্তমান নির্বাচিত সরকারের প্রধান তারেক রহমান একাধিক বক্তৃতায় বলেছেন তার সরকারের লক্ষ্য বড় বড় অবকাঠামো নয় বরং মানুষের আর্থ সামাজিক উন্নয়ন। এটি খুবই জরুরি বলে মনে করি। মানুষ যখন তার দৈনন্দিন জীবনে সাচ্ছন্দ্য বোধ করে, তখন সে সমাজেও কন্ট্রিবিউট করতে পারে, এবং একইভাবে দেশও আলোকিত হয়।
কথা হচ্ছে তারেক রহমানের সরকার কি সেই আলো দেখাতে পারছেন? আমি মনে করি তার প্রয়াসগুলো জনবান্ধব। তার মনের দৃঢ়তা ইস্পাতকঠিন। তিনি অনুভব করছেন এ দেশকে পরিবর্তন করতে হবে। তাই তারেক রহমানের সঙ্গে যারা কাজ করছেন তাদেরকেও তার মতোই স্পিরিট ধারণ করতে হবে। তবেই সম্মিলিত প্রয়াসে ভালো ফল আসবে। সরকার জনগণকে আশ্বস্ত করার জন্য আরেকটি উদ্যোগ নিতে পারে, প্রতি দুই বা তিন মাস অন্তর অন্তর ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, হেলথ ইস্যু, বৃক্ষ রোপণ ইত্যাদি প্রতিশ্রুতিগুলো কতটুকু বাস্তবায়ন হলো তার অফিসিয়াল আপডেট দিতে পারে। তাতে জনমনে কোনো বিভ্রান্তি থাকলে তা দূর হবে। অথবা কোনো একটা প্রফেশনাল ওয়েবসাইটেও তথ্যগুলোর আপডেট রাখতে পারে।
নতুন রাজনৈতিক সরকার জনগণের ন্যায্য ইচ্ছাগুলোকে সম্মান করবে, জনগণকে সবকিছুতে প্রাধান্য দেবে, ব্যক্তি ইচ্ছাকে নয় এটাই প্রত্যাশা।
লেখক: প্রকৌশলী, কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক
[email protected]
সরকারের বডিল্যাঙ্গুয়েজ কী বার্তা দেয়
সালাহউদ্দিন আহমেদ রায়হান
মত-মতান্তর
২ মাস আগে
১৩ মার্চ (শুক্রবার), ২০২৬, ১০ঃ০৫ (পূর্বাহ্ণ)
লিংক কপি হয়েছে!
ফন্ট সাইজ:
100%
