ওয়েবসাইট খুলে চিকিৎসার ফাঁদ জিম্মি করে অর্থ আদায় করতো চক্রটি

ফন্ট সাইজ:

তুরস্কে কিডনি প্রতিস্থাপনের নামে প্রতারণার মাধ্যমে বড় অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নেয়া একটি চক্রের পাঁচ সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে র‌্যাব। বুধবার দিবাগত রাতে রাজধানীর আগারগাঁও ও গুলশান এলাকা থেকে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তারকৃতরা হলেন- নুরুজ্জামান রাজু, মাসুম বিল্লাহ, মোহাম্মদ তরিকুল, সালমান ফারসি ও ওয়ালিদ মিয়া। চক্রটি দীর্ঘদিন ধরে তুরস্কের একটি প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইট নকল করে ‘টার্কিশডকবিডি’ নামে ভুয়া ওয়েবসাইট তৈরি করে প্রতারণা করে আসছিল। তারা কিডনি প্রতিস্থাপনসহ বিভিন্ন চিকিৎসার কথা বলে রোগীদের তুরস্কে পাঠিয়ে সেখানে জিম্মি করে বড় অঙ্কের অর্থ আদায় করতো। বৃহস্পতিবার মিরপুরে র‌্যাব-৪ এর কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানানো হয়।
সংস্থাটির কোম্পানি কমান্ডার ও অতিরিক্ত পুলিশ সুপার কে এন রায় নিয়তি বলেন, কয়েকদিন আগে নীরব নজরুল লিখন নামের এক ব্যবসায়ী অভিযোগ করেন। তার মায়ের কিডনি প্রতিস্থাপনের জন্য এই চক্রের মাধ্যমে তুরস্কে গিয়ে তিনি প্রতারণার শিকার হয়েছেন। এ ঘটনায় তিনি রাজধানীর শ্যামপুর থানায় একটি মামলা করেন। মামলার পরিপ্রেক্ষিতে র‌্যাব-৪ অভিযান চালিয়ে চক্রের মূলহোতাসহ পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করে। তিনি বলেন, ভুক্তভোগীর মা কিডনি রোগে আক্রান্ত।


কিডনি প্রতিস্থাপনের চিকিৎসার জন্য দেলোয়ার নামের এক ব্যক্তির মাধ্যমে এই চক্রের সঙ্গে তার পরিচয় হয়। তারা নিজেদের তুরস্কের একটি প্রতিষ্ঠানের বাংলাদেশি এজেন্ট পরিচয় দিয়ে হাসপাতালে ২৩ হাজার ডলারের বিনিময়ে কিডনি প্রতিস্থাপনের ব্যবস্থা করার আশ্বাস দেন। তাদের কথায় বিশ্বাস করে ভুক্তভোগী প্রথমে দেশে পাঁচ লাখ টাকা এবং বিভিন্ন কাগজপত্র সত্যায়নের জন্য আরও দুই লাখ টাকা দেন। পরে গত ফেব্রুয়ারিতে তিনি তার মাকে নিয়ে তুরস্কে যান। সেখানে পৌঁছানোর পর এক তুর্কি নাগরিক নিজেকে প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি পরিচয় দিয়ে তাদের রিসিভ করে হাসপাতালে ভর্তি করান। ভর্তি হওয়ার পর নানা অজুহাতে নির্ধারিত ২৩ হাজার ডলার ছাড়া আরও প্রায় ১৫ হাজার ডলারসহ ৫০ লাখ টাকার উপরে আদায় করেন। পরে চিকিৎসা দেয়া সম্ভব নয় বলে জানিয়ে তাদের দেশে ফিরে যেতে বলা হয়। অন্যথায়, পুলিশে ধরিয়ে দেয়ার হুমকিও দেয়া হয় বলে অভিযোগ করেন ভুক্তভোগী। তিনি আরও অভিযোগ করেছেন যে, তার মায়ের অবস্থা আশঙ্কাজনক হওয়ায় তাৎক্ষণিক ডায়ালাইসিসের জন্য অতিরিক্ত পাঁচ হাজার ডলার এবং বিভিন্ন কাগজপত্র অনুবাদের জন্য আরও ছয় হাজার ডলার এবং বিভিন্ন কাগজপত্র অনুবাদের জন্য আরও ছয় হাজার ডলার নেয়া হয়।
কে এন রায় নিয়তি বলেন, চক্রের সদস্যরা বিশ্বস্ততা অর্জনের জন্য তুরস্কের একটি প্রতিষ্ঠান টার্কিশডক এর ওয়েবসাইট অবিকল নকল করে টার্কিশডকবিডি নামক ওয়েবসাইট খোলেন। তারা কিডনি প্রতিস্থাপন, আইভিএফসহ বিভিন্ন রোগীদের তুরস্কে পাঠিয়ে সে দেশে জিম্মি করে বিশাল অঙ্কের অর্থ আদায় করে আসছিলেন। আমরা খোঁজ নিয়ে জানতে পেরেছি, উক্ত চক্রের মাধ্যমে সে দেশে গিয়ে প্রতারণার শিকার হয়ে কয়েকজন কারাবাস করছেন। তারা ভুয়া ওয়েবসাইট তৈরি করে বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জন করতো। এরপর রোগীদের বিদেশ পাঠিয়ে সেখানে জিম্মি করে অর্থ আদায় করতো। এভাবে প্রতারণার শিকার হয়ে কয়েকজন ভুক্তভোগী তুরস্কে কারাবাসও করেছেন।

নুরুজ্জামান রাজু আগে একটি ওষুধ কোম্পানির প্রতিনিধি ছিলেন। ঢাকায় তুরস্কের একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ‘টার্কিশডকবিডি’ নামে একটি ওয়েবসাইট খুলে কিডনি প্রতিস্থাপনসহ বিভিন্ন রোগের চিকিৎসার জন্য তুরস্কে পাঠানো হতো। কাঙ্ক্ষিত রোগী না পেয়ে কয়েকমাস আগে প্রতিষ্ঠানটি বন্ধ করে চলে যান সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। নুরুজ্জামান ওই প্রতিষ্ঠানে চাকরি করতেন। প্রতিষ্ঠানটি বন্ধ হয়ে গেলে নুরুজ্জামান টার্কিশডকবিডি নামে ভুয়া ওয়েবসাইট খুলে কিডনি প্রতিস্থাপনসহ বিভিন্ন রোগীকে তুরস্কে পাঠিয়ে চিকিৎসার নামে টাকা হাতিয়ে নিয়ে প্রতারণা করে আসছিলেন। তিনি গুলশানের একটি অফিস ভাড়া নিয়ে চক্রের সদস্যদের নিয়ে রোগী সংগ্রহ করে চিকিৎসার নামে প্রতারণা করতেন। ঢাকা থেকে পাঠানো রোগী তুরস্কে গ্রহণ করতেন তারই চক্রের অপর সদস্যরা।

তারা পদে পদে টাকা হাতিয়ে নিলেও রোগীদের আর চিকিৎসা দিতেন না। র‌্যাবের এই কর্মকর্তা বলেন, প্রতারণা শুরুর পর গত তিন বছরে ভুয়া প্রতিষ্ঠান খুলে তিনি শতাধিক রোগীকে দেশটিতে পাঠিয়েছে। আমাদের সঙ্গে এখন পর্যন্ত প্রায় ১৫ জন যোগাযোগ করেছে। প্রতারণার অর্থ দিয়ে তিনি ঢাকা শহরে গাড়ি-বাড়ি করেছে। এই প্রতিষ্ঠানে টাকা দিয়ে প্রতারিত হয়েছে এ রকম আরও কিছু অভিযোগ আমরা পেয়েছি। পরবর্তী তদন্তে বিষয়গুলো সামনে আসবে।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন