লেবানন দখলের হুমকি

আগ্রাসীদের রক্তে রঞ্জিত করবে ইরান

ফন্ট সাইজ:

তেহরান জুড়ে হামলা আরও জোরালো করেছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল। এর ওপর লেবানন দখল করে নেয়ার হুমকি দিয়েছে ইসরাইলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরাইল কাটজ। ইরানের হরমুজ প্রণালির কাছে কৌশলগত খারগ দ্বীপে সেনা পাঠানোর হুমকি দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প। তবে তার জবাবে ইরানি পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাকের গালিবাফ সতর্ক করেছেন। বলেছেন, এমন হলে আমরা সব সংযম ত্যাগ করবো এবং পারস্য উপসাগরকে আগ্রাসীদের রক্তে রঞ্জিত করবো। বৃহস্পতিবার সকালে ইরাকের বসরার কাছে মার্কিন মালিকানাধীন জাহাজে হামলা করেছে ইরান।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প যুদ্ধে নিজের জয় দাবি করলেও বলেছেন, যুদ্ধ অব্যাহত আছে। ইরানি স্পিকার মোহাম্মদ বাকের গালিবাফ বলেছেন, ইরানের দ্বীপগুলোতে হামলা বা দখলের যেকোনো চেষ্টা হলে তার জবাব হবে সম্পূর্ণ সংযমহীন ও কঠোর। এক্সে দেয়া এক পোস্টে গালিবাফ লিখেছেন, ইরানি দ্বীপপুঞ্জের ভূখণ্ডের বিরুদ্ধে যেকোনো আগ্রাসন হলে (আমাদের) সব সংযম ভেঙে যাবে। তিনি আরও বলেন, আমরা সব সংযম ত্যাগ করবো এবং পারস্য উপসাগরকে আগ্রাসীদের রক্তে রঞ্জিত করবো। যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের হামলার পর পুরো মধ্যপ্রাচ্য এখনো যুদ্ধে জড়ানোর চেয়ে কূটনীতিকে প্রাধান্য দেয়ার কথা বলছে। যুদ্ধ বন্ধ করতে হলে তিনটি শর্ত তুলে ধরেছেন ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান। শর্ত তিনটি হলো- তেহরানের বৈধ অধিকারে স্বীকৃতি, ক্ষতিপূরণ প্রদান এবং ভবিষ্যতে আর কোনো আগ্রাসন না হওয়ার বিষয়ে দৃঢ় আন্তর্জাতিক গ্যারান্টি। তার এমন শর্তকে অনেকেই কিছুটা নমনীয় হওয়ার ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন।

তবে একই সময়ে সাইবার হামলা, হরমুজ প্রণালিতে সামুদ্রিক হামলা এবং তেলের দাম বৃদ্ধি- সব মিলিয়ে এই যুদ্ধের বৈশ্বিক প্রভাব আরও বাড়ছে। ইসলামিক রেভ্যুলুশনারি গার্ড করস (আইআরজিসি) দাবি করেছে তারা ইরাকের বসরা উপকূলের কাছে মার্শাল আইল্যান্ডের পতাকাবাহী সেফসি বিষ্ণু’তে আঘাত করেছে। এটি মার্কিন মালিকানাধীন। ওই জাহাজে থাকা একজন ভারতীয় নাবিক নিহত ও ১৫ জন আহত হয়েছে বলে জানিয়েছে বাগদাদে ভারতীয় দূতাবাস। জার্মান শিপিং কোম্পানি প্যাপাগ-লয়েডের তথ্য অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালির কাছে ওই কোম্পানির একটি জাহাজে ক্ষেপণাস্ত্রের ধ্বংসাবশেষ পড়েছে। ওই জাহাজটির নাম সোর্স ব্লেসিং। ধ্বংসাবশেষ জাহাজে পড়ার পর এতে আগুন ধরে যায়। ওদিকে লেবানন সরকারকে হিজবুল্লাহকে থামানোর আল্টিমেটাম দিয়েছে ইসরাইলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরাইল কাটজ। বলেছেন, যদি হিজবুল্লাহ ইসরাইলের উত্তরাঞ্চলে হামলা অব্যাহত রাখে তাহলে ইসরাইলি সেনারা লেবানন দখল করে নেবে এবং তা হবে ইসরাইলের। ইরান যুদ্ধে নিজেদের জয় দাবি করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প।

তবে কখন যুদ্ধ শেষ হবে সে বিষয়ে কিছু বলেননি তিনি। এই অনিশ্চয়তা উদ্বেগ বাড়িয়েছে যে, সুস্পষ্ট অথবা সুপরিকল্পিত কৌশল নির্ধারণ করেনি তার প্রশাসন। কংগ্রেসের কিছু মহল মনে করছে, ট্রাম্প হয়তো ইচ্ছাকৃতভাবেই ইরানি কর্তৃপক্ষকে অনিশ্চয়তার মধ্যে রাখতে চাইছেন এবং যুদ্ধ চলার সময় প্রশাসনের পরবর্তী পদক্ষেপ কী হবে, তা আগেভাগে প্রকাশ করতে চাইছেন না। আরেকটি মত হলো, ইসরাইল ইরানের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতেও হামলা চালাচ্ছে। তারা এই সংঘাতের দ্রুত সমাপ্তি চায় না এবং ওয়াশিংটন ইসরাইলের সেই যুক্তিতে প্রভাবিত হয়েছে। ফলাফল হলো, ট্রাম্প এখন পর্যন্ত পরিস্থিতির ফলাফলে সন্তুষ্ট বললেও, যুদ্ধ কবে শেষ হবে-তা কেউই নিশ্চিতভাবে জানে না।

জাতিসংঘে ইরানের প্রতিনিধি আমির সাঈদ ইরাভানির মতে, বৃহস্পতিবার যুদ্ধ ১৩তম দিনে প্রবেশ করার সঙ্গে সঙ্গে কমপক্ষে ১৩৪৮ জন বেসামরিক মানুষ নিহত হয়েছেন। ইউনিসেফ জানিয়েছে, সংঘাতের তীব্রতা এমন এক বিপর্যয়কর পরিস্থিতি তৈরি করেছে যেখানে ১১০০-এর বেশি শিশু আহত বা নিহত হয়েছে বলে খবর পাওয়া গেছে।
ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠী হান্ডালা দাবি করেছে, তারা মেডিকেল ডিভাইস জায়ান্ট স্ট্রাইকারের নেটওয়ার্ক অচল করে দিয়েছে এবং মিনাব স্কুলে হামলার প্রতিশোধ হিসেবে ৫০ টেরাবাইট ডাটা চুরি করেছে। মিনাব স্কুলে হামলায় ১৭০ জনের বেশি মানুষ নিহত হয়। তাদের বেশির ভাগই স্কুলশিক্ষার্থী। হামলা বন্ধে আহ্বান জানিয়েছে জাতিসংঘ। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ একটি প্রস্তাব পাস করেছে, যাতে উপসাগরীয় দেশগুলোর ওপর হামলা বন্ধ করতে ইরানকে আহ্বান জানানো হয়েছে। তবে এতে ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরাইলের হামলার কথা উল্লেখ করা হয়নি।

ওদিকে ইরানের সর্বোচ্চ নেতার জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা ইয়াহইয়া রহিম সাফাভি রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পকে আক্রমণ করে বলেন, তিনি ‘সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত ও বোকা মার্কিন প্রেসিডেন্ট’ এবং ‘স্বয়ং শয়তান’। ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাক্রোন বলেছেন, হরমুজ প্রণালিতে ইরান সমুদ্রমাইন পুঁতেছে- এ বিষয়ে তার কাছে ‘কোনো নিশ্চিত তথ্য’ নেই।

সৌদি আরবের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় বৃহস্পতিবার জানিয়েছে, শাইবা তেলক্ষেত্রের দিকে আসা দুইটি ড্রোন এম্পটি কোয়ার্টার মরুভূমির আকাশে ভূপাতিত করা হয়েছে। এর আগে একই তেলক্ষেত্রের দিকে যাওয়া আরেকটি ড্রোনও ধ্বংস করা হয়েছে বলে জানানো হয়। বৃহস্পতিবারের শুরুতে মন্ত্রণালয় আরও জানায়, বিদেশি দূতাবাস সংবলিত একটি অঞ্চলের দিকে আসা একটি ড্রোন এবং পূর্বাঞ্চলে আরেকটি ড্রোন গুলি করে নামানো হয়েছে। ওমানের সালালাহ বন্দরে ড্রোন হামলায় কয়েকটি জ্বালানি ট্যাংক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কাতার এ ঘটনাকে বিপজ্জনক উত্তেজনা বৃদ্ধি বলে তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। ইরান হামলার দায় অস্বীকার করেছে। বাহরাইন মুহাররাকে জ্বালানি ট্যাংকে ইরানি হামলার পর দেশটি বাসিন্দাদের ধোঁয়া এড়াতে ঘরের ভেতরে থাকার আহ্বান জানিয়েছে। সংযুক্ত আরব আমিরাত ১১ই মার্চ ইরানের ছোড়া বিপুলসংখ্যক ক্ষেপণাস্ত্র আটকে দেয়। এর মধ্যে ছিল ৬টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, ৭টি ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র এবং ৩৯টি ড্রোন। ভূপাতিত করা ড্রোনের ধ্বংসাবশেষ পড়ে যাওয়ায় কুয়েতের ৬টি বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন বন্ধ হয়ে যায় বলে দেশটির বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে। এর আগে দেশটি কয়েকটি ড্রোন ভূপাতিত করলেও একটি ড্রোন আবাসিক ভবনে আঘাত হানে। তাতে দুইজন আহত হন। কাতারের প্রধানমন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ বিন আবদুর রহমান বিন জসিম আল থানি বারবার ইরানি হামলার মধ্যেও নাগরিক ও বাসিন্দাদের ঐক্যের প্রশংসা করেছেন এবং দৈনন্দিন জীবন স্বাভাবিক রাখার অঙ্গীকার করেছেন।

হোয়াইট হাউস জানিয়েছে, যুদ্ধ চললেও আসন্ন বিশ্বকাপে ইরানের অংশগ্রহণকে স্বাগত জানাবেন ট্রাম্প।

ইসরাইলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরাইল কাটজ বলেছেন, সব লক্ষ্য অর্জন এবং অভিযান জয়ী হওয়া পর্যন্ত যতদিন প্রয়োজন, ততদিন কোনো সময়সীমা ছাড়াই অভিযান চলবে। ইসরাইলি সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, তারা দাহিয়েহ এলাকায় হিজবুল্লাহর অবকাঠামোর ওপর বৃহৎ পরিসরের হামলার ঢেউ শুরু করেছে। ইসরাইলি সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, ইরান থেকে ইসরাইলের দিকে ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্র শনাক্ত করা হয়েছে।
যুদ্ধের কারণে বৈশ্বিক বাণিজ্যে বিঘ্ন ঘটছে। আর তেলের দাম বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারে পৌঁছেছে। বাজার স্থিতিশীল করতে আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা রেকর্ড ৪০০ মিলিয়ন ব্যারেল অপরিশোধিত তেল ছাড়ছে, যার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র দিচ্ছে ১৭২ মিলিয়ন ব্যারেল।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন