মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন ঘটায় দফায় দফায় দাম বাড়ছে। এতে নতুন রপ্তানি আদেশ কমে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন দেশের রপ্তানিকারকরা। এ ছাড়া যুদ্ধ দীর্ঘ হলে একদিকে রপ্তানি আদেশ কমবে, অন্যদিকে উৎপাদন ব্যয় বাড়বে। ফলে সামগ্রিক রপ্তানি পারফরম্যান্স দুর্বল হতে পারে। এই উদ্বেগ অন্যান্য শিল্পের রপ্তানিকারকরাও একই ধরনের আশঙ্কা প্রকাশ করছেন।
সংশ্লিষ্টরা জানান, জ্বালানির দাম বাড়ার প্রভাব ইতিমধ্যে ইউরোপ, যুক্তরাষ্ট্র ও অস্ট্রেলিয়ার মতো প্রধান রপ্তানি গন্তব্যে পড়তে শুরু করেছে। বিশেষ করে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারে প্রভাব পড়ছে। রপ্তানিকারকদের আশঙ্কা, এসব দেশে জ্বালানি, খাদ্যপণ্য ও পরিবহন ব্যয় বাড়লে ভোক্তারা তৈরি পোশাকের মতো নিত্যপণ্য নয়- এমন পণ্যের পেছনে কম ব্যয় করবেন। এতে ক্রয়াদেশ কমে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
রপ্তানিকারকদের মতে, ইউরোপের কিছু ক্রেতা ইতিমধ্যে তাদের ক্রয়াদেশের পরিকল্পনা স্থগিত রেখেছেন, আবার কেউ কেউ অর্ডার বাতিলও করেছেন। শিল্পমালিকরা বলছেন, স্থানীয় বাজারে জ্বালানি সরবরাহে কিছু ঘাটতির লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। পাশাপাশি জ্বালানির দাম বাড়ার আশঙ্কাও রয়েছে, যা উৎপাদন ব্যয় বাড়াতে পারে।
বাংলাদেশের নিট পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিকেএমইএ)’র সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, জাতীয় নির্বাচনের পর রপ্তানি আদেশ বাড়বে বলে আশা করেছিলেন উদ্যোক্তারা। কিন্তু তা হয়নি, মূলত যুদ্ধ শুরু হওয়ায় পরিস্থিতি বদলে গেছে। তিনি আরও জানান, সমপ্রতি কিছু ক্রেতা প্রি-অর্ডার নিয়ে আলোচনাও স্থগিত রেখেছেন।
দেশের শীর্ষস্থানীয় পাটজাত পণ্য ও লাইফস্টাইল পণ্যের রপ্তানিকারক ক্রিয়েশন্স প্রাইভেট লিমিটেড-এর কর্মকর্তারা জানান, দুই সপ্তাহ আগে এমবিয়েন্ট ভোক্তাপণ্য মেলায় অংশ নিতে তারা জার্মানির ফ্রাঙ্কফুর্টে গিয়েছিলেন। মেলা শেষে নতুন অর্ডার নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা ছিল।
প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. রাশেদুল করিম মুন্না বলেন, ওই ফেয়ারের পর কিছু বায়ার নতুন করে কিছু অর্ডারের বিষয়ে আলোচনা করেছিলেন এবং চলতি সপ্তাহে তা নিয়ে নেগোশিয়েট করার কথা ছিল। কিন্তু যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর তারা ওই আলোচনা স্থগিত করেছেন। তিনি বলেন, কেবল অর্ডারের পরিকল্পনা স্থগিত নয়, ক্রয়াদেশ দেয়ার পরও কিছু ক্ষেত্রে বাতিল করা হয়েছে। ইউরোপজুড়ে জ্বালানির দাম বেড়েছে। ফলে তারা এখন ট্রান্সপোর্টেশন, গ্রোসারি আইটেমের দাম বাড়ায় ভোক্তারা তাদের বাজেট ওইসব খাতে বেশি দিচ্ছে। যার কারণে আমাদের রপ্তানি হওয়া পণ্যের চাহিদা আগামীতে কমে যেতে পারে- উল্লেখ করে তিনি বলেন, যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে আমাদের রপ্তানিতে ব্যাপক নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। অথচ আমরা আশা করেছিলাম এই বছরটি ভালো যাবে।
এদিকে দেশের আরেক বড় রপ্তানি খাত চামড়াজাত ও সিনথেটিক জুতাপণ্য রপ্তানিকারকরা একই কথা বলেছেন। ইইউ ও যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে শীর্ষস্থানীয় রপ্তানিকারক বেঙ্গল লেদার কমপ্লেক্স-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও বাংলাদেশ ট্যানার্স এসোসিয়েশনের সভাপতি টিপু সুলতান বলেন, আগামী এপ্রিল থেকে ক্রয়াদেশ নিয়ে নেগোসিয়েশন হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর তারা আপাতত আলোচনা স্থগিত করেছে। যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে রপ্তানির আদেশ হয়তো আমরা ধরতে পারবো না।
রপ্তানিকারকরা আশা করেছিলেন, ২০২৫ সাল কঠিন গেলেও জাতীয় নির্বাচনের পর নতুন সরকার গঠনের ফলে বিনিয়োগ ও রপ্তানির জন্য ইতিবাচক পরিবেশ তৈরি হবে। বাংলাদেশের মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় ৮৫ শতাংশই আসে তৈরি পোশাক খাত থেকে। তাই যুদ্ধ চলতে থাকলে অর্ডার আরও কমে যেতে পারে বলে উদ্বিগ্ন এ খাতের উদ্যোক্তারা।
ডিবিএল গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান এমএ রহিম ফিরোজ উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, ইউরোপে খাদ্যপণ্যের দাম বেড়েছে বলে তারা ইতিমধ্যে রিপোর্ট পেয়েছেন। জ্বালানির দাম বাড়লে পরিবহন ব্যয়ও বাড়বে। আর চাইলেই সহজে বাড়ানো যায় না। ফলে ভোক্তারা আগে খাদ্য ও পরিবহন খাতে ব্যয় করবেন, আর পোশাক কেনা তাদের অগ্রাধিকার তালিকার নিচে চলে যাবে। এতে আমাদের রপ্তানি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তবে তিনি বলেন, ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের ক্রেতাদের কাছ থেকে এখনো কোনো নেতিবাচক সংকেত পাওয়া যায়নি।
মোহাম্মদ হাতেম জানান, এখন পণ্য পরিবহনে সময় বেশি লাগছে এবং ফ্রেইট চার্জও বেড়েছে। যদিও বাংলাদেশের রপ্তানিকারকরা যে পদ্ধতিতে ক্রয়াদেশ নেন, তাতে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই ফ্রেইট চার্জ ক্রেতার বহন করার কথা। তবে এসব বাড়তি খরচের একটি অংশ ভবিষ্যতে রপ্তানিকারকের ওপর পরোক্ষভাবে পড়বে বলে মনে করেন এই নিট পোশাক রপ্তানিকারক।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী, টানা সাত মাস ধরে বাংলাদেশের রপ্তানি কমছে। রপ্তানিকারক ও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এর একটি কারণ হলো গত বছরের মাঝামাঝি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের আরোপিত পাল্টা শুল্ক। ইপিবি’র তথ্য বলছে, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম আট মাস- জুলাই থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বাংলাদেশের রপ্তানি আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ৩.১৫ শতাংশ কমেছে। শুধু ফেব্রুয়ারিতেই রপ্তানি কমেছে ১২ শতাংশের বেশি।
এদিকে শিল্পমালিকরা বলছেন, হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল সরবরাহে ব্যাঘাত এবং জ্বালানি বিতরণে সরকারি বিধিনিষেধের কারণে কিছু কারখানায় ডিজেলের ঘাটতি দেখা দিয়েছে।
বিকেএমইএ’র পরিচালক মিনহাজুল হক বলেন, আমাদের সংগঠনের তিনজন সদস্য ইতিমধ্যে ডিজেল সংগ্রহে সমস্যার কথা জানিয়েছেন। ডিজেল না পেলে কারখানা চালানো কঠিন হবে, তাতে রপ্তানির শিপমেন্ট বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
বাংলাদেশের শিল্পখাত মূলত গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সরকারি বিদ্যুৎ সরবরাহের ওপর নির্ভরশীল। তবে সামপ্রতিক বছরগুলোতে গ্যাসের চাপ কমে যাওয়া এবং ঘন ঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে অনেক কারখানাকে ডিজেলচালিত জেনারেটর ব্যবহার করতে হচ্ছে। শিল্প নেতাদের মতে, ডিজেল না পাওয়া গেলে বা দাম বাড়লে তাদের উৎপাদন ব্যয় বাড়বে এবং বৈশ্বিক বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানিকারকদের প্রতিযোগিতার সক্ষমতা দুর্বল হবে। পোশাক খাতের ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ শিল্প হিসেবে স্পিনিং মিলগুলোতে জ্বালানির চাহিদা বিশেষভাবে বেশি।
বিজিএমইএ’র পরিচালক নাফিস-উদ-দৌলা রোববার বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রীর সঙ্গে এ বিষয়ে আলোচনা করেছেন। তিনি বলেন, আমরা ডিজেল বিতরণে শিল্পকারখানার জন্য একটি নির্দিষ্ট কোটা বরাদ্দের অনুরোধ করেছি।
প্রায় ৩০ কোটি ডলার বার্ষিক রপ্তানিকারক স্নোটেক্স গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এসএম খালেদ বলেন, বন্দরে শিপিং শিডিউল ইতিমধ্যে জটিল হয়ে পড়েছে। ফলে কিছু ক্রেতা সরবরাহকারীদের নির্ধারিত সময়ের আগেই পণ্য বন্দরে পাঠাতে বলছেন। তিনি বলেন, যুদ্ধ দীর্ঘ হলে রপ্তানি কমবে। অন্যদিকে তেলের দাম বাড়লে জ্বালানিনির্ভর সুতা ও কাপড়ের দামও বাড়বে, ফলে উৎপাদন ব্যয় বাড়বে।
ইউরোপভিত্তিক ব্র্যান্ড লিনডেক্স এইচকে লিমিটেডের সাউথ এশিয়া সাসটেইনেবিলিটি ম্যানেজার কাজী মোহাম্মদ ইকবাল হোসেন বলেন, এখন পর্যন্ত বাংলাদেশের সঙ্গে সরবরাহ শৃঙ্খল বা ব্যবসায় বড় কোনো প্রভাব দেখা যায়নি। তবে যুদ্ধ যদি দুই থেকে তিন সপ্তাহ ধরে চলে, তাহলে এর উল্লেখযোগ্য প্রভাব পড়বে। তিনি জাহাজ চলাচলের সময়সূচিতে বিঘ্ন ঘটার আশঙ্কাও প্রকাশ করেন।
আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বিশেষজ্ঞ এবং রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি ইন্টেগ্রেশন ফর ডেভেলপমেন্ট-এর চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ আবদুর রাজ্জাক বলেন, যুদ্ধ চলতে থাকলে বাংলাদেশের রপ্তানি গন্তব্য দেশগুলোতে মূল্যস্ফীতি বাড়তেই থাকবে। ফলে ওই বাজারগুলোতে বাংলাদেশ যেসব পণ্য রপ্তানি করে তার চাহিদা কমে যাবে এবং রপ্তানিও হ্রাস পাবে বলে মনে করেন তিনি। তিনি বলেন, অন্যদিকে সরবরাহ শৃঙ্খলে বিঘ্ন এবং তেলের দাম বাড়লে ব্যবসা পরিচালনার ব্যয়ও বেড়ে যাবে।
