দেশের বৃহত্তম সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানায় এ মুহূর্তে চাকা ও কাঁচামালের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। কারখানায় দীর্ঘদিন ধরে অচল অবস্থায় পড়ে আছে প্রায় শতাধিক রেল কোচ (বগি)। শুধুমাত্র চাকা ও প্রয়োজনীয় ছোট যন্ত্রাংশের অভাবে এসবও কোচ মেরামত করা যাচ্ছে না। ফলে আসন্ন ঈদযাত্রায় ট্রেন সেবায় বিঘ্ন ঘটার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। কারখানা সূত্রে জানা যায়, সারা বছর দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বিশেষ করে ঢাকামুখী আন্তঃনগর ট্রেনের সমস্যাগ্রস্ত কোচগুলো মেরামতের জন্য এখানে আনা হয়। বর্তমানে জমে থাকা কোচগুলোর মধ্যে শতাধিক কোচের প্রধান সমস্যা চাকা সংক্রান্ত। নতুন চাকা সংযোজন করা গেলে সেগুলো দ্রুত সচল করা সম্ভব।
কিন্তু কয়েক মাস ধরে চাকার সরবরাহ না থাকায় কোচগুলো অচল অবস্থায় পড়ে আছে। এ ছাড়া আরও প্রায় একশ’ কোচ বিভিন্ন ক্ষুদ্র যন্ত্রাংশের অভাবে মেরামতের অপেক্ষায় রয়েছে। স্প্রিং, বিয়ারিং, পিক আয়রন, হার্ড ক্লকসহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশ বিদেশ থেকে আমদানিনির্ভর। গত এক বছরে এসব যন্ত্রাংশ আমদানির কার্যক্রম স্থবির থাকায় সংকট প্রকট আকার ধারণ করেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ব্রডগেজ লাইনের কোচগুলোতেই সংকট সবচেয়ে বেশি। এসব কোচের বড় একটি অংশ ভারত, ইন্দোনেশিয়া ও চীন থেকে আমদানিকৃত। একই সময়ে আমদানি ও সংযোজনের ফলে প্রায় একই সময়েই যান্ত্রিক সমস্যা দেখা দিয়েছে। এদিকে আমদানি সংক্রান্ত চুক্তির মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ায় সংশ্লিষ্ট বিদেশি কোম্পানির কাছ থেকেও আর সরাসরি কারিগরি সহায়তা মিলছে না। ফলে আলাদাভাবে যন্ত্রাংশ আমদানি করে মেরামত করতে হচ্ছে, যা সময়সাপেক্ষ ও জটিল প্রক্রিয়া। রেলওয়ে কারখানার বগি শপের ঊর্ধ্বতন উপ-সহকারী প্রকৌশলী শাহিনুর আলম শাহ জানান, ট্রেনের বগিগুলো স্থাপন করা থাকে ট্রলির উপর।
এই ট্রলি স্থাপন করা হয় চাকার ফ্রেমে। প্রতিটি কোচে চার জোড়া চাকা থাকে, এর মধ্যে থাকে স্প্রিং এবং সূক্ষ্ম কিছু যন্ত্রাংশ। রেলওয়ের কোচের এসব চাকা আমদানিনির্ভর। কিন্তু দরপত্রে জটিলতা ও দীর্ঘসূত্রতায় রেল কারখানায় চাকাসহ কিছু যন্ত্রাংশের অভাব দেখা দিয়েছে। এ কারণে কোচগুলো মেরামত করা যাচ্ছে না।
কারখানার বিভাগীয় তত্ত্বাবধায়ক (ডিএস) শাহ সুফী নুর মোহাম্মদ বলেন, উৎপাদন সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও প্রয়োজনীয় কাঁচামালের অভাবে কাঙ্ক্ষিত আউটটার্ন দেয়া যাচ্ছে না। তিনি জানান, লোকবল সংকটের মধ্যেও কারখানাটি প্রতি দুইদিনে তিনটি যাত্রীবাহী ও তিনটি মালবাহী কোচ মেরামতের সক্ষমতা রাখে। তবে অপরিহার্য যন্ত্রাংশের ঘাটতির কারণে সেই সক্ষমতাকে পুরোপুরি কাজে লাগানো যাচ্ছে না। এতে একদিকে রেলওয়ের আর্থিক ক্ষতি বাড়ছে, অন্যদিকে যাত্রীসেবায়ও প্রভাব পড়ছে। রেল সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ঈদকে সামনে রেখে যাত্রীচাপ কয়েকগুণ বেড়ে যায়। এ সময় অতিরিক্ত কোচ সংযোজনের মাধ্যমে চাপ সামাল দেয়া হয়। কিন্তু বিপুলসংখ্যক কোচ অচল থাকায় অতিরিক্ত সার্ভিস চালু করা কঠিন হয়ে পড়বে। এতে ঘরমুখো মানুষের স্বাচ্ছন্দ্যময় যাত্রা ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি সার্বিক যোগাযোগ ব্যবস্থায়ও চাপ তৈরি হতে পারে।
সংশ্লিষ্ট মহলের দাবি, আমদানিনির্ভর যন্ত্রাংশের আগাম মজুত নিশ্চিত করা এবং ক্রয় প্রক্রিয়া সহজ করা জরুরি। একইসঙ্গে রেলওয়ে ভবন ও মন্ত্রণালয় পর্যায়ে দ্রুত সিদ্ধান্তে না এলে সংকট দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। সবমিলিয়ে যন্ত্রাংশ সংকটের কারণে অচল পড়ে থাকা কোচগুলো সচল না হলে আসন্ন ঈদযাত্রায় রেলসেবায় বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এমন আশঙ্কাই এখন ঘুরপাক খাচ্ছে যাত্রী ও রেল সংশ্লিষ্টদের মাঝে।
