ইসরাইলের প্রথম দফা হামলায় আহত হওয়ার পরও মোজতবা খামেনিকে ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে নিশ্চিত করা হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এতে বোঝা যায় ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) কতটা মরিয়া ছিল নিজেদের পছন্দের প্রার্থীকে ক্ষমতায় বসাতে এবং একই সঙ্গে তারা কতটা আত্মবিশ্বাসী যে যুদ্ধকালীন রাষ্ট্রযন্ত্র তার সরাসরি উপস্থিতি ছাড়াই কার্যত ‘অটোপাইলট’ মোডে চালাতে সক্ষম।
মোজতবা খামেনির আঘাত কতটা গুরুতর এবং তিনি কত দ্রুত সুস্থ হচ্ছেন- তা এখনও স্পষ্ট নয়। তবে অন্তত তার একটি পা ভেঙেছে এবং মুখমণ্ডলেও আঘাত রয়েছে বলে জানা গেছে।
ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা মন্ত্রী আলি লারিজানি সতর্ক ভাষায় বলেছেন, তার অবস্থা সংকটজনক বলে রিপোর্ট করা হয়নি। তবে এই মন্তব্যে এমন ইঙ্গিতও রয়েছে যে তিনি হয়তো ব্যক্তিগতভাবে তাকে দেখেননি।
সরকারি কার্যক্রম সংবিধান অনুযায়ী চলছে- এমন বার্তা দিতে লারিজানি বলেন, এই ঘটনার পরও তিনি পূর্ণ কর্তৃত্ব নিয়ে নির্দেশনা ও তদারকি দিচ্ছেন এবং সব পদক্ষেপ ও হামলা তার সরাসরি অনুমতি ও নির্দেশে পরিচালিত হচ্ছে।
নির্বাচন বিলম্বের পেছনে স্বাস্থ্য নিয়ে সংশয়?
প্রথমদিকে ধারণা করা হচ্ছিল, যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে ৮৮ সদস্যের ধর্মীয় পরিষদ ‘অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টস’কে একত্র করা কঠিন হওয়ায় নতুন নেতা নির্বাচনে বিলম্ব হয়েছে। তবে এখন মনে করা হচ্ছে, মোজতবা খামেনির শারীরিক সক্ষমতা ও এই দায়িত্ব নিতে তার আগ্রহ নিয়েও প্রশ্ন ছিল।
ইসরাইলের হামলায় তার পরিবারের বড় অংশ নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে ছিলেন তার বাবা সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি, মা, স্ত্রী জাহরা হাদ্দাদ-আদেল এবং তার এক ছেলে। এছাড়া বোন, ভগ্নিপতি ও এক ভাতিজিও নিহত হন। আহত হওয়ার তিন দিন পর তার মা মারা যান। হামলায় সর্বোচ্চ নেতার কার্যালয় সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যায়।
এত বড় ব্যক্তিগত ক্ষয়ক্ষতির পর তিনি পুরোপুরি অক্ষত ছিলেন- এমন ধারণা অনেকের কাছেই অবিশ্বাস্য মনে হয়েছে।
কোমায় থাকার গুঞ্জন: প্রবাসে থাকা বিরোধী গোষ্ঠীগুলোর দাবি, মোজতবা খামেনি কোমায় রয়েছেন এবং গোপনে হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন। তাদের মতে, তিনি হয়তো নিজের সর্বোচ্চ নেতা হওয়ার বিষয়টিও জানেন না। তার নির্বাচনের তিন দিন পরও সরকার তার কোনো ছবি, ভিডিও বা বক্তব্য প্রকাশ না করায় নানা জল্পনা ছড়ায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কেউ কেউ দাবি করেন, হয়তো অজান্তেই একটি মৃত মানুষ বা প্রতীকী চরিত্রকে দেশের নেতা বানানো হয়েছে।
সরকার পরিচালনা কি নেতার উপস্থিতি ছাড়া সম্ভব?
ইরানের এক সাংবাদিক দাবি করেন, ইরানের নেতা প্রকাশ্যে না এলেও দেশ পরিচালনা সম্ভব। তাকে রাস্তায় বা ধর্মীয় কেন্দ্রে থাকতে হবে- এমন নয়। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো রাষ্ট্র পরিচালনা।
খামেনির সমর্থকেরা একটি ছবি প্রকাশ করে দাবি করেছেন তিনি আইআরজিসির শীর্ষ কমান্ডারদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন, যদিও ছবিটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় তৈরি কি না- সে প্রশ্ন উঠেছে।
এদিকে ইরানের গণমাধ্যমেও নতুন নেতার নীরবতা নিয়ে জল্পনা শুরু হয়েছে। মঙ্গলবার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘায়ির কাছে সাংবাদিকরা জানতে চান খামেনি কি সত্যিই দেশের সর্বোচ্চ ধর্মীয় ও রাজনৈতিক নেতা হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছেন। জবাবে তিনি সরাসরি কিছু না বলে বলেন, যাদের বার্তা পাওয়ার দরকার ছিল, তারা বার্তা পেয়েছে।
আইআরজিসি’র প্রভাব: ইরানের প্রেসিডেন্টের ছেলে ইউসুফ পেজেশকিয়ান টেলিগ্রামে এক পোস্টে প্রথমবারের মতো উল্লেখ করেন যে মোজতবা খামেনি আহত হয়েছেন, তবে তিনি সুস্থ আছেন এবং বড় কোনো সমস্যা নেই।
তবে সমালোচকদের মতে, এই নিয়োগ প্রমাণ করে আইআরজিসি যেভাবেই হোক নিজেদের পছন্দের ব্যক্তিকে ক্ষমতায় বসাতে চেয়েছে। ইরানের ক্ষমতাকাঠামোয় আইআরজিসি শুধু সামরিক বাহিনী নয়, এটি বিশাল ব্যবসায়িক সাম্রাজ্য, যার বিনিয়োগ পুরো অর্থনীতিতে ছড়িয়ে আছে।
অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্ট অ্যান্টনিস কলেজের অধ্যাপক মেরিয়াম আলেমজাদেহ বলেন, ইরানের রাজনৈতিক ব্যবস্থা এমনভাবে গড়ে তোলা হয়েছে যাতে নেতৃত্ব সহজেই বদলানো যায়।
তার মতে, আইআরজিসি, বাসিজ এবং অন্যান্য রাষ্ট্রীয় সংস্থার একটি আধা-আনুষ্ঠানিক নেটওয়ার্ক রয়েছে, যারা সেবা প্রদান, নজরদারি ও দমন-পীড়নের মতো নানা ভূমিকা পালন করে। নেতৃত্বে পরিবর্তন হলেও এই নেটওয়ার্কে খুব বেশি প্রভাব পড়ে না।
মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউটের জ্যেষ্ঠ গবেষক অ্যালেক্স ভাতাঙ্কা বলেন, ৫৬ বছর বয়সী মোজতবা খামেনির নিজের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে চার বছর পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। তার বাবার ক্ষেত্রেও শুরুতে একই সমস্যা হয়েছিল।
তিনি বলেন, শুধু পদই ক্ষমতা দেয় না, ক্ষমতা নির্ভর করে সেই পদে থাকা ব্যক্তির ব্যক্তিত্বের ওপর। আর সেটা তৈরি হতে সময় লাগে।
