‘ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৫’ আইন হিসেবে পাসে বাধা প্রদান করতে নানামুখী তৎপরতা শুরু করেছে ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো (বিএটি) বাংলাদেশ। তরুণ প্রজন্ম ও জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় ই-সিগারেট এবং ভ্যাপের মতো ক্ষতিকর পণ্য নিষিদ্ধ করে আনা এই যুগান্তকারী অধ্যাদেশটি জাতীয় সংসদে পাস হওয়া ঠেকাতে অর্থ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীসহ আরও ৫টি মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়েছে বহুজাতিক এই তামাক কোম্পানি। গত ৯ই মার্চ ২০২৬ তারিখে বিএটি বাংলাদেশের কোম্পানি সেক্রেটারি স্বাক্ষরিত ওই চিঠিতে তারা সরকারের রাজস্ব আয় এবং বিদেশী বিনিয়োগের দোহাই দিয়ে অধ্যাদেশের গুরুত্বপূর্ণ ধারাগুলো বাতিলের অযৌক্তিক দাবি জানিয়েছে।
কোম্পানিটির সবচেয়ে বড় মাথাব্যথা অধ্যাদেশের ধারা ৭-এর উপধারা ৬(গ) নিয়ে, যেখানে ই-সিগারেট, ভ্যাপ, হিটেড টোব্যাকো প্রোডাক্টস এবং নিকোটিন পাউচের মতো উদীয়মান ক্ষতিকর পণ্যগুলো সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। চিঠিতে বিএটি এই ধারাটি “সম্পূর্ণরূপে অপসারণ” করার প্রস্তাব দিয়েছে। তাদের যুক্তি হলো, এসব পণ্য নিষিদ্ধ করলে অবৈধ বাজার তৈরি হবে; তাই নিষিদ্ধ না করে এগুলোকে “ঝুঁকিভিত্তিক নিয়ন্ত্রিত ক্যাটাগরিতে” বৈধতা দেয়া উচিত। মূলত তরুণ প্রজন্মকে নতুনভাবে নিকোটিনের নেশায় জড়ানোর জন্যই তারা এই কূটকৌশলের আশ্রয় নিয়েছে। উল্লেখ্য, পৃথিবীতে প্রায় ৪০টি দেশ এসব ক্ষতিকর পন্য নিষিদ্ধ করেছে।
বিএটি রাজস্বের যে খোঁড়া যুক্তি দেখাচ্ছে, তা জনস্বাস্থ্যের বিশাল ক্ষতির তুলনায় নিতান্তই নগণ্য। বর্তমানে দেশে ৩ কোটি ৭৮ লাখ মানুষ তামাক ব্যবহার করেন। তামাকজনিত নানা দুরারোগ্য ব্যাধিতে বছরে প্রায় ২ লাখ মানুষের অকাল মৃত্যু হচ্ছে এবং আর্থিক ক্ষতি ছাড়িয়ে যাচ্ছে ৮৭ হাজার কোটি টাকা, যা তামাক কোম্পানিগুলোর দেয়া রাজস্বের দ্বিগুণেরও বেশি। এই বিপুল ক্ষয়ক্ষতি রোধেই জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের দীর্ঘদিনের দাবির প্রেক্ষিতে নতুন অধ্যাদেশে যুগান্তকারী কিছু পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। এর মধ্যে পাবলিক প্লেস ও পরিবহনে ‘ধূমপানের জন্য নির্ধারিত স্থান’ বাতিল করে শতভাগ ধূমপানমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করা, সচিত্র স্বাস্থ্য সতর্কবার্তার আকার ৫০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৭৫ শতাংশ করা এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও হাসপাতালের ১০০ মিটারের মধ্যে তামাক বিক্রি নিষিদ্ধ করার মতো বিষয়গুলো উল্লেখযোগ্য।
সংবিধান অনুযায়ী, নতুন সংসদের প্রথম অধিবেশন বসার ৩০ দিনের মধ্যেই এই অধ্যাদেশটিকে সংসদে স্থায়ী আইন হিসেবে পাস করাতে হবে, অন্যথায় এটি বাতিল হয়ে যাবে। বাংলাদেশে তামাক নিয়ন্ত্রণের আইনি ভিত্তি তৈরি হয়েছিল ২০০৫ সালে বর্তমান ক্ষমতাসীন দলের হাত ধরেই এবং তাদের ২০২৬ সালের নির্বাচনী ইশতেহারেও তামাক নিয়ন্ত্রণে আইনি উদ্যোগের সুস্পষ্ট প্রতিশ্রুতি রয়েছে। জনস্বাস্থ্যের সুরক্ষার চেয়ে কোনো কোম্পানির ব্যবসায়িক স্বার্থ বড় হতে পারে না। তামাকমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে এবং এসডিজি লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে, তামাক কোম্পানির এই অনৈতিক হস্তক্ষেপ উপেক্ষা করে অধ্যাদেশটিকে কোনো প্রকার কাটাছেঁড়া বা কালক্ষেপণ ছাড়াই দ্রুত আইনে পরিণত করা এখন সময়ের দাবি।
প্রজ্ঞার নির্বাহী পরিচালক এবিএম জুবায়ের বলেন, তামাক প্রতিদিন গড়ে ৫৪৫টি প্রাণ কেড়ে নেয়। একটি শক্তিশালী আইনই পারে এই ব্যাপক জীবনহানী ঠেকাতে। আমরা চাই জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় তামাক নিয়ন্ত্রণ অধ্যাদেশটি কোন প্রকার হস্তক্ষেপ ছাড়া হুবহু আইন আকারে পাস হোক।
