মঙ্গলবার ভোর হওয়ার কিছু আগের কথা। ওই রাতে রাজধানী তেহরানে অন্যদিনের চেয়ে ভয়াবহ ও তীব্র বোমাবর্ষণ করেছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল। রাতভর তেহরানের আকাশে যুদ্ধবিমানগুলো খুব নিচু দিয়ে উড়ে গেছে। শহরের বিভিন্ন এলাকায় ডজনখানেক ভারী বোমা নিক্ষেপ করে। এতে এক কোটির বেশি মানুষের এই শহরের অনেক এলাকায় প্রচণ্ড কম্পন সৃষ্টি হয়। এই বিপদের মধ্যেও যারা ঘরে ছিলেন, তাদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। পুরো আতঙ্কের রাতে পরিণত হয় সেদিন। দিনের বেলাতেও হামলা চলতে থাকে। স্থানীয় গণমাধ্যম জানায়, ইসফাহান ও কারাজ শহরেও হামলা হয়েছে। এর আগে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ বলেন, মঙ্গলবার হবে ‘ইরানের ভেতরে আমাদের হামলার সবচেয়ে তীব্র দিন’। তেহরানের পশ্চিম অংশে পরিবারের সঙ্গে বসবাসকারী ৩৮ বছর বয়সী সিমা বলেন, প্রথমে মনে হচ্ছিল প্রায় ১৫ মিনিট ধরে ডজনখানেক যুদ্ধবিমান আমাদের মাথার ঠিক ওপরে উড়ছে। তারপর কয়েক মিনিট বিরতি দিয়ে আবার নতুন করে হামলা শুরু হয়। নিরাপত্তার কারণে নিজের আসল নাম প্রকাশ না করার অনুরোধ জানিয়ে তিনি বলেন- মাটি, জানালা আর আমাদের বুক- সবই কাঁপছিল। কিন্তু আমরা বাথরুমে আশ্রয় নিয়ে কোনোমতে রাতটা পার করেছি।
তেহরানের কয়েকজন বাসিন্দা আল জাজিরাকে জানান, মঙ্গলবার ভোরে তীব্র বিমান হামলার সময় আকাশে উজ্জ্বল আলোর ঝলকানি দেখা যায়। কিছু সময়ের জন্য রাতকে দিনের মতো করে তুলেছিল। কেউ কেউ ছাদ বা বারান্দায় উঠে সেই দৃশ্য দেখেছেন এবং ভিডিও ধারণ করেছেন। অনলাইনে ছড়িয়ে পড়া কিছু ভিডিওতে কিছু এলাকায় নীল রঙের অদ্ভুত আলোর ঝলকানি দেখা গেছে। ধারণা করা হচ্ছে, বোমা হামলায় বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় এই আলো তৈরি হয়েছে। তেহরানের কিছু এলাকায় বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। তবে সরকার জানায় কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই বিদ্যুৎ সরবরাহ পুনরুদ্ধার করা হয়েছে।
শহরের কেন্দ্রীয় এলাকায় একা বসবাসকারী ২৫ বছর বয়সী আলি রেজা বলেন, প্রয়োজনে দ্রুত নিচে নেমে যায়ার জন্য তিনি নিজের অ্যাপার্টমেন্টের দরজা খোলা রেখেছিলেন, যাতে প্রয়োজনে ভবনের ভূগর্ভস্থ পার্কিংয়ে আশ্রয় নিতে পারেন। তেহরানে কোনো সরকারি বোমা আশ্রয়কেন্দ্র বা আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা নেই। গত বছরের ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ১২ দিনের যুদ্ধের সময়ও একই রকম ছিল। তিনি বলেন, তেহরান ও অন্য শহরে কোথায় কী আঘাত হানছে তা জানতে বন্ধু-স্বজনদের সঙ্গে অসংখ্য ফোন কল আর বার্তা আদান-প্রদান করতে করতে আমি প্রায় পাগল হয়ে যাচ্ছি। এই অভিশপ্ত ইন্টারনেট বন্ধের কারণে প্রায় কোনো তথ্যই পাওয়া যাচ্ছে না।
ইরানের শাসনব্যবস্থা টানা ১১ দিন ধরে প্রায় পুরো দেশে ইন্টারনেট বন্ধ করে রেখেছে। এখন কেবল স্থানীয় কিছু সেবাভিত্তিক একটি অভ্যন্তরীণ নেটওয়ার্ক চালু আছে এবং তথ্য প্রবাহ পুরোপুরি রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে। ভিপিএন ও প্রক্সি সংযোগ কালোবাজারে বিক্রি হচ্ছে। তবে সরকার দ্রুত সেগুলো শনাক্ত করে বন্ধ করে দেয়। এগুলোর দামও অনেক বেশি, গতি ধীর এবং ডাটা সীমিত- এমনটাই জানিয়েছেন এগুলো ব্যবহার করা কয়েকজন।
বিশ্বব্যাপী ইন্টারনেট পর্যবেক্ষণ সংস্থা নেটব্লকস মঙ্গলবার জানায়, এই ইন্টারনেট বন্ধ বিশ্বে সরকার আরোপিত সবচেয়ে কঠোর ইন্টারনেট বন্ধ হওয়া বিষয়গুলোর একটি। যা কেবল জানুয়ারির বিক্ষোভের সময় ইরান সরকারের ২০ দিনের ইন্টারনেট বন্ধের পর দ্বিতীয় স্থানে। সরকার ইঙ্গিত দিয়েছে যে পরবর্তী নির্দেশ না দেয়া পর্যন্ত এই অবস্থা চলবে। সরকারের মুখপাত্র ফাতেমেহ মোহাজেরানি মঙ্গলবার সাংবাদিকদের বলেন, যারা দেশের কণ্ঠস্বর বাইরে পৌঁছে দিতে সাহায্য করতে পারে তাদের জন্য সীমিত ইন্টারনেট প্রবেশাধিকার দেয়া হয়েছে। তবে তিনি বিস্তারিত কিছু জানাননি।
যুদ্ধের মধ্যেও টিকে থাকার চেষ্টা
যুদ্ধ চললেও তেহরানের কিছু অংশে স্বাভাবিক জীবনের আভাস দেখা যাচ্ছে। শহরের কেন্দ্রস্থলে কিছু দোকানপাট সীমিতভাবে খোলা আছে এবং কিছু ট্যাক্সিচালক ও মোটরসাইকেল কুরিয়ার কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন জীবিকা নির্বাহের জন্য। অনেক পেট্রোল পাম্পে এখনো লম্বা লাইন। রবিবার রাতে ইসরাইল তেহরানের বড় জ্বালানি মজুত ও তেল স্থাপনাগুলোতে হামলা করার পর সোমবার আকাশ অন্ধকার হয়ে যায় এবং তেল মিশ্রিত বৃষ্টির কারণে ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশ তৈরি হয়। এরপর অনেক মানুষ গাড়ি ধোয়ার জন্য কার ওয়াশে ভিড় করেন। তেহরানের গ্র্যান্ড বাজারে কাজ করা এক তরুণ বলেন, এ সপ্তাহে আমরা সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত দোকান খুলি। কিন্তু গ্রাহক খুব বেশি নেই। তিনি জানান, তার আত্মীয়রা পূর্ব তেহরানে কাজ বা বাজার করতে গেলে খুব অল্প দূরত্বে যাতায়াত করেন। কারণ ওই এলাকায় নিরাপত্তা বাহিনী ও পুলিশের ভবনগুলোতে বারবার বোমা হামলা হয়েছে। ইরানি কর্তৃপক্ষ বলেছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলায় বহু আবাসিক এলাকা, হাসপাতাল, স্কুল এবং ঐতিহাসিক স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তারা বেসামরিক ক্ষয়ক্ষতির বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে ব্যবস্থা নেয়ার আহ্বান জানিয়েছে।
