ভোটের প্রথম প্রতিদান ফ্যামিলি কার্ড

ভোটের প্রথম প্রতিদান ফ্যামিলি কার্ড

ফন্ট সাইজ:

বাংলাদেশের রাজনীতিতে নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি একটি পরিচিত শব্দ। কিন্তু বাস্তবে সেই প্রতিশ্রুতির কতটুকু পূরণ হয়—সেটি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই জনগণের মধ্যে সংশয় রয়েছে। নির্বাচন এলেই নানা প্রতিশ্রুতি শোনা যায়, আর নির্বাচন শেষ হলে অনেক ক্ষেত্রেই সেগুলো হারিয়ে যায় রাজনৈতিক ব্যস্ততা কিংবা প্রশাসনিক জটিলতার ভিড়ে। এই প্রেক্ষাপটে এবারের নির্বাচনের পর নতুন সরকারের একটি উদ্যোগ রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে নতুন একটি উদাহরণ হিসেবে সামনে এসেছে—‘ফ্যামিলি কার্ড’ কর্মসূচি।
ভোটের কালি এখনো শুকায়নি, ক্ষমতা গ্রহণের মাত্র ২১ দিনের মাথায় নির্বাচনী ইশতেহারের অন্যতম প্রধান প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের সূচনা—এটি নিঃসন্দেহে একটি তাৎপর্যপূর্ণ রাজনৈতিক বার্তা। রাজধানীর বনানীর টিঅ্যান্ডটি খেলার মাঠে আনুষ্ঠানিকভাবে এই কর্মসূচির উদ্বোধনের মাধ্যমে সরকার দেখাতে চেয়েছে যে নির্বাচনী অঙ্গীকার কেবল রাজনৈতিক বক্তব্য নয়, বরং বাস্তবায়নের একটি প্রতিশ্রুতি।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ল্যাপটপের একটি বাটন চাপার মাধ্যমে একযোগে দেশের ১৪টি জেলায় এই কর্মসূচির উদ্বোধন করেন। এর সঙ্গে সঙ্গে ৩৭ হাজার ৫৬৭ জন নারীপ্রধান পরিবারের বিকাশ অ্যাকাউন্টে ২৫০০ টাকা করে জমা হয়। ডিজিটাল পদ্ধতিতে সরাসরি উপকারভোগীদের হাতে অর্থ পৌঁছে যাওয়া সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত বলেই বিবেচিত হতে পারে।

বাংলাদেশে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি নতুন কোনো বিষয় নয়। কিন্তু এই উদ্যোগের বিশেষত্ব হলো—এটি সরাসরি নারীপ্রধান পরিবারকে লক্ষ্য করে নেওয়া হয়েছে। দেশের জনসংখ্যার অর্ধেক নারী। উন্নয়নের আলোকে নারীদের অন্তর্ভুক্ত না করলে সামগ্রিক অগ্রগতি কখনোই পূর্ণতা পায় না। সরকারও তাদের বক্তব্যে স্পষ্ট করেছে যে নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নকে উন্নয়নের কেন্দ্রে রাখার একটি প্রচেষ্টা হিসেবেই ফ্যামিলি কার্ড চালু করা হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উল্লেখ করেছেন—দেশ পরিচালনার ক্ষেত্রে বাস্তবতা ও প্রত্যাশার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা জরুরি। বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতি, বিশেষ করে আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক চাপ কিংবা মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতার মতো বিষয়গুলো একটি দেশের অর্থনীতিকে প্রভাবিত করে। তবুও তিনি আশ্বাস দিয়েছেন যে নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি থেকে সরকার সরে যাবে না; প্রয়োজনে সময় লাগলেও ধাপে ধাপে সেগুলো বাস্তবায়নের চেষ্টা চলবে।

এই বার্তাটি রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ জনগণ এখন শুধু প্রতিশ্রুতি নয়, প্রতিশ্রুতির বাস্তব প্রয়োগ দেখতে চায়। গত কয়েক দশকে বাংলাদেশের ভোটারদের রাজনৈতিক সচেতনতা অনেক বেড়েছে। তারা উন্নয়নের দৃশ্যমান ফলাফল দেখতে আগ্রহী। ফলে নির্বাচনের পরপরই কোনো প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া জনগণের কাছে সরকারের বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়াতে সহায়ক হতে পারে।

ফ্যামিলি কার্ড প্রকল্পের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এর দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। সরকারের লক্ষ্য আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে দেশের চার কোটি পরিবারের নারীপ্রধান সদস্যদের কাছে এই কার্ড পৌঁছে দেওয়া। যদি পরিকল্পনাটি বাস্তবায়িত হয়, তাহলে এটি দেশের বৃহত্তম সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিগুলোর একটি হয়ে উঠতে পারে।

একই সঙ্গে সরকার এটিকে ভবিষ্যতে একটি সর্বজনীন সামাজিক পরিচয়পত্র হিসেবে রূপান্তর করার পরিকল্পনাও জানিয়েছে। ২০৩০ সালের মধ্যে ফ্যামিলি কার্ডকে একটি ‘সর্বজনীন সোশ্যাল আইডি কার্ড’ হিসেবে গড়ে তোলার কথা বলা হয়েছে। এর অর্থ দাঁড়ায়—একটি কার্ডের মাধ্যমে বিভিন্ন সামাজিক সেবা, ভাতা কিংবা সরকারি সুবিধা পাওয়ার একটি সমন্বিত কাঠামো তৈরি হতে পারে।

তবে এই উদ্যোগের ক্ষেত্রে কিছু বাস্তব দিকও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা দরকার। সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে যেসব নারীপ্রধান পরিবার এই কার্ড পাবেন, তারা অন্য কোনো সরকারি ভাতা গ্রহণ করতে পারবেন না। অর্থাৎ সামাজিক সহায়তার বিভিন্ন খাতকে একত্রিত করে একটি লক্ষ্যভিত্তিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার চেষ্টা করা হচ্ছে। এটি প্রশাসনিক দক্ষতা বাড়াতে সহায়ক হতে পারে, তবে বাস্তবায়নের সময় স্বচ্ছতা ও সঠিক যাচাই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

কারণ সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির ক্ষেত্রে একটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো প্রকৃত উপকারভোগী নির্বাচন। যদি সঠিকভাবে যাচাই করা যায় যে কারা সত্যিই দরিদ্র ও সহায়তার প্রয়োজন রয়েছে, তাহলে এই কর্মসূচি সমাজে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। অন্যদিকে যদি নির্বাচন প্রক্রিয়ায় ত্রুটি থাকে, তাহলে কাঙ্ক্ষিত সুফল পাওয়া কঠিন হবে।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো প্রযুক্তির ব্যবহার। বিকাশ অ্যাকাউন্টে সরাসরি অর্থ পাঠানোর ব্যবস্থা দুর্নীতি বা মধ্যস্বত্বভোগীর সুযোগ কমিয়ে দেয়। ডিজিটাল পদ্ধতির মাধ্যমে আর্থিক সহায়তা প্রদান সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে আরও স্বচ্ছ ও কার্যকর করে তুলতে পারে।

ফ্যামিলি কার্ডের পাশাপাশি সরকার কৃষকদের জন্য ‘কৃষক কার্ড’ চালুর ঘোষণাও দিয়েছে। কৃষিঋণ মওকুফের মতো উদ্যোগ ইতোমধ্যে নেওয়া হয়েছে বলেও জানানো হয়েছে। কৃষি ও সামাজিক সুরক্ষা—এই দুই ক্ষেত্র বাংলাদেশের অর্থনীতির ভিত্তির সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। ফলে এই দুটি খাতে সমন্বিত উদ্যোগ দেশের গ্রামীণ অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে পারে।

সব মিলিয়ে ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচি কেবল একটি ভাতা কর্মসূচি নয়; এটি রাজনৈতিক বার্তারও একটি অংশ। নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে দ্রুত প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের মাধ্যমে সরকার একটি নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তোলার চেষ্টা করছে—যেখানে প্রতিশ্রুতি মানেই বাস্তবায়নের অঙ্গীকার।

বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় এটি একটি ইতিবাচক প্রবণতা হিসেবে দেখা যেতে পারে। কারণ রাজনীতিতে বিশ্বাসযোগ্যতা তখনই তৈরি হয় যখন কথার সঙ্গে কাজের মিল থাকে। জনগণ যদি দেখতে পায় যে নির্বাচনের আগে দেওয়া প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের জন্য সরকার আন্তরিকভাবে কাজ করছে, তাহলে রাজনীতির প্রতি আস্থা বাড়বে।

অবশ্য যেকোনো কর্মসূচির প্রকৃত মূল্যায়ন সময়ের সঙ্গে সঙ্গে হয়। ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচিও তার ব্যতিক্রম নয়। পরিকল্পনা অনুযায়ী যদি এটি সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হয় এবং প্রকৃত উপকারভোগীদের কাছে পৌঁছায়, তাহলে এটি বাংলাদেশের সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থায় একটি নতুন অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

ভোটের কালি শুকানোর আগেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের এই উদ্যোগ তাই নিঃসন্দেহে একটি শক্তিশালী বার্তা বহন করে—রাজনীতিতে প্রতিশ্রুতি শুধু শ্লোগান নয়, তা বাস্তবায়নেরও বিষয়।

লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক ও কলামিস্ট
email: [email protected]

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন