যুদ্ধের খরচ নিয়ে সিনেট ডেমোক্রেটদের প্রশ্ন, সার্বজনীন শুনানির দাবি

যুদ্ধের খরচ নিয়ে সিনেট ডেমোক্রেটদের প্রশ্ন, সার্বজনীন শুনানির দাবি

ফন্ট সাইজ:

যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটে ডেমোক্রেটদের একটি দল ইরানের বিরুদ্ধে চলমান যুদ্ধ নিয়ে সার্বজনীন শুনানির দাবি তুলেছে। প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের কর্মকর্তাদের কাছ থেকে একাধিক গোপন ব্রিফিং পাওয়ার পর তারা এই দাবি জানিয়েছেন।

আইনপ্রণেতাদের অভিযোগ, কেন যুক্তরাষ্ট্র এই সংঘাতে প্রবেশ করেছে, এর লক্ষ্য কী এবং যুদ্ধ কতদিন চলতে পারে- এসব বিষয়ে হোয়াইট হাউস স্পষ্ট ব্যাখ্যা দেয়নি। কোনো কোনো সিনেটর এই যুদ্ধের খরচ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।

ম্যাসাচুসেটসের সিনেটর এলিজাবেথ ওয়ারেন বলেছেন, ১৫ মিলিয়ন আমেরিকান তাদের স্বাস্থ্যসেবা হারিয়েছে। তাদের জন্য অর্থ নেই। অথচ ইরানে বোমা হামলার জন্য প্রতিদিন এক বিলিয়ন ডলার খরচ করা হচ্ছে। এ খবর দিয়েছে অনলাইন আল জাজিরা। বর্তমানে রিপাবলিকানদের সিনেটে ৫৩-৪৭ আসনের অল্প ব্যবধানের সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে। এর ফলে কোন আইন বা প্রস্তাব বিতর্কের জন্য সিনেটে তোলা হলে তা নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা তাদের হাতে রয়েছে।

সাম্প্রতিক একটি গোপন বৈঠকের পর কয়েকজন ডেমোক্রেট হতাশা প্রকাশ করেন। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এখনো ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের স্থল সেনা পাঠানোর সম্ভাবনা নাকচ করেননি। কানেকটিকাট অঙ্গরাজ্যের সিনেটর ক্রিস মারফি মঙ্গলবার বলেন, আমি দুই ঘণ্টার একটি গোপন ব্রিফিং থেকে বেরিয়ে এসেছি। এতে আমার কাছে স্পষ্ট হয়েছে যে কৌশল পুরোপুরি অসংগত। তিনি আরও বলেন, বিষয়টি খুবই সহজ। প্রেসিডেন্ট যদি সংবিধান অনুযায়ী এই যুদ্ধের অনুমোদন চাইতে কংগ্রেসে আসতেন, তিনি তা পেতেন না। কারণ আমেরিকান জনগণ তাদের কংগ্রেস সদস্যদের ‘না’ ভোট দিতে বলত।

এ পর্যন্ত কী ঘটেছে?
২৮শে ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল ইরানের ওপর হামলা শুরু করার পর থেকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এবং প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথসহ জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা কংগ্রেস সদস্যদের সঙ্গে একাধিক গোপন বৈঠক করেছেন। এসব বৈঠকে সামরিক অভিযান ও তার অগ্রগতি সম্পর্কে ব্রিফিং দেয়া হয়েছে। বৈঠকগুলো গোপন হওয়ায় আইনপ্রণেতারা সেখানে পাওয়া তথ্যের অনেক কিছুই প্রকাশ্যে বলতে পারেন না।

ডেমোক্রেটরা কী বলছেন?
কয়েকজন ডেমোক্রেট সিনেটর বলেছেন, তারা বৈঠক থেকে বেরিয়ে হতাশ হয়েছেন। তাদের অভিযোগ, প্রশাসন যুদ্ধের লক্ষ্য, সময়সীমা কিংবা দীর্ঘমেয়াদি কৌশল সম্পর্কে পরিষ্কার উত্তর দেয়নি। এ সপ্তাহের শুরুতে ছয়জন ডেমোক্রেট সিনেটর দক্ষিণ ইরানের মিনাব শহরের একটি মেয়েদের স্কুলে হামলার তদন্ত দাবি করেন। প্রতিবেদন অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের বাহিনী জড়িত ছিল বলে তদন্তকারীরা মনে করছেন এবং ওই হামলায় কমপক্ষে ১৭০ জন নিহত হয়েছে। যার অধিকাংশই শিশু। ডেমোক্রেট সিনেটর রিচার্ড ব্লুমেনথাল বলেন, যুদ্ধে কোনো শেষ লক্ষ্য দেখা যাচ্ছে না। তিনি আরও বলেন, প্রেসিডেন্ট প্রায় এক নিশ্বাসে বলেন যুদ্ধ প্রায় শেষ, আবার একই সময়ে বলেন এটি মাত্র শুরু হয়েছে। তাই বিষয়টি এক ধরনের বিরোধপূর্ণ।

ম্যাসাচুসেটসের সিনেটর এলিজাবেথ ওয়ারেন যুদ্ধের খরচ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি মঙ্গলবার বলেন, ১৫ মিলিয়ন আমেরিকান তাদের স্বাস্থ্যসেবা হারিয়েছে। তাদের জন্য অর্থ নেই। কিন্তু ইরানে বোমা হামলার জন্য প্রতিদিন এক বিলিয়ন ডলার খরচ করা হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, এ ধরনের পদক্ষেপ থামানোর জন্য কংগ্রেসের হাতে যে ক্ষমতা আছে, সেটি হলো অর্থ বরাদ্দের ক্ষমতা। আরও কিছু আইনপ্রণেতা আশঙ্কা করছেন যে যুক্তরাষ্ট্র স্থল সেনা মোতায়েনের পথে এগোচ্ছে।

ব্লুমেনথাল সাংবাদিকদের বলেন, মনে হচ্ছে আমরা এমন এক পথে এগোচ্ছি যেখানে সম্ভাব্য লক্ষ্য পূরণের জন্য ইরানে মার্কিন সেনা মাটিতে নামানো হতে পারে। আমেরিকান জনগণের অধিকার আছে জানার- এই যুদ্ধের খরচ কত, ইউনিফর্ম পরা আমাদের ছেলে-মেয়েদের জন্য ঝুঁকি কতটা এবং এই যুদ্ধ আরও বড় সংঘাতে রূপ নিতে পারে কি না।

রিপাবলিকানরা কী বলছেন?
কংগ্রেসের উভয় কক্ষেই অল্প ব্যবধানে সংখ্যাগরিষ্ঠ রিপাবলিকানরা প্রায় সর্বসম্মতভাবে ট্রাম্পের ইরানবিরোধী অভিযানের সমর্থন করেছেন। যদিও অল্প কয়েকজন এ যুদ্ধ নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। কিছু রিপাবলিকান নেতা বলছেন, ইরানের সামরিক সক্ষমতা, ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি এবং আঞ্চলিক প্রভাব কমাতে এই হামলা প্রয়োজনীয়।

তারা আরও দাবি করেন, এই অভিযান সীমিত পরিসরের এবং এর লক্ষ্য মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের বাহিনী ও মিত্রদের জন্য ইরানের হুমকি দুর্বল করা। ফ্লোরিডার রিপাবলিকান প্রতিনিধি ব্রায়ান মাস্ট হাউস ফরেন অ্যাফেয়ার্স কমিটির চেয়ারম্যান। তিনি গত সপ্তাহে প্রকাশ্যে ট্রাম্পকে ধন্যবাদ জানান। তিনি বলেন, প্রেসিডেন্ট সংবিধান সম্মত ক্ষমতা ব্যবহার করে তেহরানের তাৎক্ষণিক হুমকি থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে রক্ষা করছেন।

তবে কিছু রিপাবলিকান সদস্যও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। সাউথ ক্যারোলিনার প্রতিনিধি ন্যান্সি মেস সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লিখেছেন, আমি সাউথ ক্যারোলাইনার ছেলে-মেয়েদের ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে পাঠাতে চাই না। কেন্টাকির রিপাবলিকান সিনেটর র‌্যান্ড পল অভিযোগ করেন, ট্রাম্প প্রশাসন প্রতিদিন যুদ্ধের ব্যাখ্যা বদলাচ্ছে। তিনি এক্সে লিখেছেন, ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধের নতুন নতুন কারণ শুনছি। এর কোনোটিই বিশ্বাসযোগ্য নয়। ‘নিপীড়িতদের মুক্ত করা’ শুনতে মহৎ লাগে, কিন্তু এর শেষ কোথায়? কয়েক দশক ধরে বলা হচ্ছে ইরান কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই পারমাণবিক অস্ত্র বানাবে। যুদ্ধ হওয়া উচিত শেষ বিকল্প, প্রথম পদক্ষেপ নয়। পছন্দের যুদ্ধ আমার পছন্দ নয়।

এই বিতর্ক কেন গুরুত্বপূর্ণ?
এই বিরোধ ওয়াশিংটন ডিসিতে দীর্ঘদিনের একটি বিতর্ককে আবার সামনে নিয়ে এসেছে- প্রেসিডেন্টের যুদ্ধ ঘোষণার ক্ষমতার সীমা নিয়ে বিতর্ক। যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান অনুযায়ী যুদ্ধ ঘোষণা করার ক্ষমতা কংগ্রেসের হাতে। কিন্তু আধুনিক সময়ে অনেক প্রেসিডেন্ট কংগ্রেসের আনুষ্ঠানিক অনুমোদন ছাড়াই সামরিক অভিযান শুরু করেছেন, সাধারণত জাতীয় নিরাপত্তা বা জরুরি হুমকির যুক্তি দেখিয়ে। আইন অনুযায়ী প্রেসিডেন্ট কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়া ৬০ দিন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের বাহিনী মোতায়েন করতে পারেন। এরপর কংগ্রেস অনুমোদন না দিলে আরও ৩০ দিনের মধ্যে সেনা প্রত্যাহার করতে হয়। কিছু আইনপ্রণেতা ও আইনি বিশেষজ্ঞ বলছেন, ইরানের বিরুদ্ধে এই যুদ্ধ সামরিক পদক্ষেপের ওপর কংগ্রেসের আরও শক্তিশালী নজরদারির প্রয়োজনীয়তা দেখিয়ে দিয়েছে।

হ্যামলাইন ইউনিভার্সিটির রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও আইন বিভাগের অধ্যাপক ডেভিড শুল্টজ বলেন, ১৯৭০-এর দশকে আমরা ‘ওয়ার পাওয়ার্স রেজ্যুলুশন’ নামে একটি আইন গ্রহণ করি, যা প্রেসিডেন্টকে সীমিত ক্ষমতা দেয়। তিনি আরও বলেন, তাই বলা যেতে পারে প্রেসিডেন্ট যা করছেন তা সংবিধান লঙ্ঘন করছে। কারণ এটি আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষিত যুদ্ধ নয়; অথবা তিনি তার ক্ষমতার সীমা ছাড়িয়ে গেছেন, হয় প্রধান সেনাপতি হিসেবে অথবা ওয়ার পাওয়ার্স আইনের অধীনে। শুল্টজ বলেন, অতএব বলা যায়, দেশের ভেতরের আইন অনুযায়ী তার এই পদক্ষেপ অবৈধ এবং অসাংবিধানিক। ট্রাম্প প্রশাসন বলেছে, ২৮শে ফেব্রুয়ারির হামলা তাৎক্ষণিক হুমকির জবাবে চালানো হয়েছে- যে যুক্তি দেখিয়ে প্রেসিডেন্টরা প্রায়ই কংগ্রেসের আগাম অনুমোদন ছাড়া সামরিক অভিযানকে বৈধতা দেন। তবে যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো নিজেরাই বলেছিল, মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র বা তার স্থাপনাগুলোর বিরুদ্ধে ইরানের কোনো তাৎক্ষণিক হুমকির প্রমাণ তাদের কাছে নেই।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন