যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধের প্রভাব নিয়ে পরস্পরবিরোধী বার্তার কারণে তেলের বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা দেখা যাচ্ছে। পরিস্থিতি বুঝতে না পেরে ব্যবসায়ীরা দামের ব্যাপক ওঠানামার মুখোমুখি হচ্ছেন। আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন ব্রেন্ট ক্রুড মঙ্গলবার ১৭ শতাংশ পর্যন্ত কমে ব্যারেলপ্রতি ৮০ ডলারের নিচে নেমে যায়।
এক পর্যায়ে মার্কিন জ্বালানি মন্ত্রী ক্রিস রাইট এক্সে দাবি করেন, মার্কিন নৌবাহিনী হরমুজ প্রণালী দিয়ে একটি তেলবাহী জাহাজকে নিরাপত্তা দিয়ে পার করেছে। পরে আবার প্রায় ৯০ ডলারের কাছাকাছি উঠে যায় ওই তেলের দাম। তবে জ্বালানিমন্ত্রী পরে সেই পোস্টটি দ্রুত মুছে ফেলেন। এ খবর দিয়েছে অনলাইন আল জাজিরা।
এরপর হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি কারোলিন লেভিট সাংবাদিকদের জানান, ওই প্রণালী দিয়ে কোনো সশস্ত্র নিরাপত্তা দিয়ে জাহাজ পার করানো হয়নি। ইরানের হুমকির কারণে ওই অঞ্চলে কার্যত জাহাজ চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে।
বুধবার ভোরে তেলের দাম আবারও কমে যায়, যখন দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল জানায় যে আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা (আইইএ) বিশ্ববাজারে সরবরাহ স্থিতিশীল রাখতে তাদের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় তেল মজুদ ছাড়ার কথা বিবেচনা করছে। এই খবর প্রকাশের পর গ্রিনিচ মান সময় রাত ২টার দিকে ব্রেন্ট ক্রুড ফিউচারসের দাম ব্যারেলপ্রতি ৮৫ ডলারের নিচে ঘোরাফেরা করছিল।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল ২৮ শে ফেব্রুয়ারি ইরানের ওপর যৌথ হামলা চালানোর আগে তেলের দাম প্রায় ৫০ শতাংশ বেড়ে একসময় ব্যারেলপ্রতি প্রায় ১২০ ডলারে পৌঁছে। পরে কিছুটা কমলেও দাম যুদ্ধ শুরুর আগের তুলনায় প্রায় ১৭ শতাংশ বেশি।
বিশ্ব জ্বালানি বাজারে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণে। বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই পথ দিয়ে যায়। একই সঙ্গে মধ্যপ্রাচজুড়ে জ্বালানি স্থাপনায় হামলার ঘটনাও পরিস্থিতিকে আরও উত্তেজনাপূর্ণ করে তুলেছে। এই জলপথ কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত এবং ইরাক তেল উৎপাদন কমাতে বাধ্য হয়েছে। কারণ বিপুল পরিমাণ তেল জমে থাকলেও তা পাঠানোর মতো নিরাপদ পথ নেই এবং সংরক্ষণাগারের জায়গাও দ্রুত কমে যাচ্ছে।
ইরানের সমুদ্রে মাইন বসানোর আশঙ্কা
তেলের দাম দীর্ঘ সময় ধরে বাড়তে থাকলে তা বৈশ্বিক অর্থনীতিতে বড় প্রভাব ফেলতে পারে। এতে দৈনন্দিন পণ্যের দাম বেড়ে যাবে এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কমে যেতে পারে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফওগঋ) এক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তেলের দাম প্রতি ১০ শতাংশ বাড়লে বিশ্বে গড় মূল্যস্ফীতি প্রায় ০.৪ শতাংশ বাড়ে এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি প্রায় ০.১৫ শতাংশ কমে যায়। যুদ্ধ শুরুর পর থেকে যুক্তরাষ্ট্রে পেট্রোলিয়াম পণ্যের দাম প্রায় ১৭ শতাংশ বেড়েছে। অন্যদিকে দক্ষিণ কোরিয়া, থাইল্যান্ড, বাংলাদেশ এবং পাকিস্তান খরচ নিয়ন্ত্রণে রাখতে মূল্যসীমা নির্ধারণ ও রেশনিংয়ের মতো ব্যবস্থা নিয়েছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বারবার বলেছেন, প্রয়োজনে হরমুজ প্রণালী খোলা রাখতে মার্কিন নৌবাহিনী মোতায়েন করা হতে পারে। তবে কিছু বিশ্লেষক এই পরিকল্পনার বাস্তবতা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। কারণ ওই অঞ্চলে ইতিমধ্যে বিপুল সংখ্যক জাহাজ আটকে আছে এবং কাছাকাছি ইরানি উপকূল থেকে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ঝুঁকিও রয়েছে।
মঙ্গলবার মার্কিন সামরিক বাহিনী জানায়, ট্রাম্প আগে তেহরানকে ওই জলপথে মাইন বসানোর বিরুদ্ধে সতর্ক করার পর হরমুজ প্রণালীর কাছে ইরানের ১৬টি মাইন পাতা জাহাজে হামলা চালানো হয়েছে। ট্রাম্প এবং তার প্রশাসনের কর্মকর্তারা যুদ্ধ কতদিন চলতে পারে সে বিষয়েও ভিন্ন ভিন্ন বক্তব্য দিয়েছেন, যা জ্বালানি বাজারে উদ্বেগ আরও বাড়িয়েছে।
মঙ্গলবার ট্রাম্প বলেন, তিনি আশা করছেন যুদ্ধ খুব শিগগিরই শেষ হবে। তবে একই সঙ্গে তিনি বলেন, শত্রুকে সম্পূর্ণ ও সুনির্দিষ্টভাবে পরাজিত না করা পর্যন্ত ইরানের ওপর মার্কিন হামলা বন্ধ হবে না এবং যুক্তরাষ্ট্র এখনও যথেষ্ট জয় অর্জন করেনি।
শিল্পবিষয়ক প্রকাশনা রিগজোনের প্রেসিডেন্ট চ্যাড নরভিল আল জাজিরাকে বলেন, বিশ্লেষকরা প্রায়ই ভূরাজনৈতিক ঝুঁকির কথা বলেন। কিন্তু বেশিরভাগ সময় তা কেবল সম্ভাবনা হিসেবেই থাকে। এই সপ্তাহে আমরা দেখেছি বাজার সেই ঝুঁকিকে বাস্তব হিসেবে বিবেচনা করে সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কায় দাম নতুন করে নির্ধারণ করেছে। তিনি আরও বলেন, একটি মাত্র তেলবাহী জাহাজকে নিরাপত্তা দিয়ে পার করানো সরবরাহ পরিস্থিতি খুব বেশি বদলে দেয় না। কারণ সাধারণত প্রতিদিন শতাধিক জাহাজ এই প্রণালী দিয়ে যাতায়াত করে। বাজার আসলে বুঝতে চাইছে- মোট তেল সরবরাহ স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে পারবে কি না।
