মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে জ্বালানি তেলের বাজারে অস্থিরতা কমছে না। পাম্পগুলোতে প্রতিদিনই লেগে আছে মোটরসাইকেল, ব্যক্তিগত গাড়ি ও গণপরিবহনের দীর্ঘ লাইন। সরকারের পক্ষ থেকে জ্বালানি তেলের পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে জানিয়ে যার যতটুকু প্রয়োজন ততটুকু নেয়ার আহ্বান জানানো হলেও তা কর্ণপাত করছেন না অনেকে।
মঙ্গলবার সরজমিন দেখা যায়, রাজধানীর শাহবাগ, মতিঝিল, পরীবাগ, তেজগাঁও ও নীলক্ষেত এলাকার ফিলিং স্টেশনগুলোতে সেহরির পর থেকেই ছিল দীর্ঘ লাইন। কোনো কোনো পাম্পে সেই লাইন এক কিলোমিটার ছাড়িয়ে গিয়েছে। বেশ কয়েকটি পাম্প বন্ধ থাকায় যেগুলোতে তেল বিক্রি চলছিল সেগুলোতে পড়েছে বাড়তি চাপ। অনেক পাম্পে গিয়ে ফেরত আসতে হয়েছে চালকদের। দৈনিক বাংলা মোড়ের নাভানা সিএনজি ও ফিলিং স্টেশন, মতিঝিলের মেঘনা পেট্রোল পাম্প, কল্যাণপুর, শেওড়াপাড়াসহ বেশ কয়েকটি জায়গায় ফিলিং স্টেশনে তেল দেয়ার মেশিনে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছিল অকটেন ও ডিজেল বিক্রির সাময়িক বন্ধের নোটিশ। এতে ভোগান্তি পোহাতে হয়েছে মোটরসাইকেলচালকদের।
স্টেশনগুলোর তরফে বলা হচ্ছে, ডিপো থেকে স্টেশনগুলোতে ঠিকমতো তেল সরবরাহ করা হচ্ছে না। চাহিদা অনুযায়ী মিলছে না তেল। ফলে বাধ্য হয়েই তাদের পাম্প বন্ধ রাখতে হচ্ছে। তাছাড়া পাম্পে তেল মজুত করে রেখে সংকট দেখানোর অভিযোগ অস্বীকার করেন স্টেশন কর্তৃপক্ষ। ডিপো থেকে যতটুকু তেল দেয়া হয়, ততটুকুই তারা বিক্রি করতে পারেন। কিছু পাম্পে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য তেল বিক্রি করা হলেও দীর্ঘ লাইন ধরে আর ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করে নিতে হচ্ছে তেল। তবে তেল সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান জানিয়েছে, সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী তারা জ্বালানি সরবরাহ করছেন।
ওদিকে মঙ্গলবার থেকে রাইড শেয়ারিং চালকদের সর্বোচ্চ ৫ লিটার তেল দেয়ার নির্দেশনা দেয়ায় স্বস্তি প্রকাশ করেছেন চালকরা। তারা বলছেন এতে তাদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হবে না। এ ঘোষণা দেয়ার পর থেকে পাম্পগুলোতে দুপুরের পর থেকে ভিড় কিছুটা কম লক্ষ্য করা গিয়েছে।
রমনা পেট্রোল পাম্পে তেল সংগ্রহে আসা জাকির হোসেন বলেন, আমি ৩০ মিনিট ধরে লাইনে দাঁড়িয়ে আছি। আমার গাড়িতে তেল ছিল কিন্তু আজ শেষ হয়ে যাওয়ায় এসেছি। সবাই ভয়ে তেল নিয়ে রেখেছে। যার যেই পরিমাণ তেল নেয়া উচিত সেই পরিমাণ তেল নিলে এই সমস্যা হতো না। সবাই একধরনের প্যানিক থেকে হুমড়ি খেয়ে তেল কেনার জন্যে ভিড় করায় এই পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। প্রতিদিনের মতো সমপরিমাণ তেল নিলে এই পরিস্থিতি সৃষ্টি হতো না। সরকারের পক্ষ থেকে তেল বিক্রির সীমা ২ লিটার ঘোষণা করায় মানুষ আরও বেশি প্যানিক হয়ে গিয়েছে। তবে ৫ লিটার করে তেল দেয়ায় মানুষের মধ্যে আতঙ্ক কমে যাবে। এই পরিমাণ তেল দিয়ে আমার দু-তিনদিন চলে যাবে।
মতিঝিল রহমান ফিলিং স্টেশনে কথা হয় পাঠাও রাইডার জহির আলমের সঙ্গে। তিনি বলেন, আজ সকালে সরকার নতুন নিয়ম করেছে ৫ লিটার করে রাইডারদের দিবে এইটা ভালো সিদ্ধান্ত। এর ফলে সামনে থেকে পাম্পগুলোতে ভিড় কমে যাবে এবং আমাদের দুর্ভোগ লাঘব হবে। আমি কয়েকটি জায়গায় ঘুরে এখানে তেল পেয়েছি। এখানে ৫০০ টাকার তেল দেয়া হচ্ছে। এর ফলে ভিড় কমে যাবে আশা করি, কারণ যারা রাইডার তাদের একটু বেশি তেল প্রয়োজন হয়। আগে সীমা কম হওয়ায় অনেকে দিনে তিনবার করে পাম্পগুলোতে অপেক্ষা করতেন, এতে ভিড় বেশি হতো। গত দু’দিন ধরে তেলের জন্য ঠিকমতো রাইড করতে পারিনি। তেল সংগ্রহের পেছনে অনেক সময় ব্যয় হয়েছে এখন সামনে আর এই সমস্যা হবে না।
তেল না পাওয়ায় মতিঝিল মেঘনা ফিলিং স্টেশনের নিরাপত্তাকর্মীর সঙ্গে বাকবিতণ্ডা করছিলেন শাহীন। তিনি বলেন, এখানে আধা ঘণ্টা ধরে দাঁড়িয়ে আছি তেল নাই। এখন ম্যানেজার বললো সিরিয়াল ধরতে তেল দিবে। সিরিয়ালে দাঁড়াচ্ছিলাম নিরাপত্তাকর্মী ভেতরে প্রবেশ করতে দিচ্ছে না। তেল না থাকা প্রসঙ্গে দৈনিক বাংলা মোড়ের নাভানা ফিলিং স্টেশনের কর্মকর্তা সোবহান বলেন, ডিপো থেকে তেল পাওয়া যাচ্ছে না। এখানে ডিজেল আছে কিছু সেগুলো বিক্রি করছি। অকটেন পেট্রোল অর্ডার দিয়েও আজ দু’দিন ধরে পাচ্ছি না। ডিপো থেকে তেল আসলে আমরা বিক্রি শুরু করবো। পরিবাগ পূর্বাচল ট্রেডার্সের ক্যাশিয়ার জাফর আহমেদ বলেন, সরকার নতুন নির্দেশনা দেয়ায় মোটরসাইকেলে ৬০০ টাকার তেল দিচ্ছি। যেই তেল ৪-৫ দিন যেতো সেই তেল এখন দু’দিনও যাচ্ছে না। আমাদের তেল ধারণক্ষমতা ৩১ থেকে ৩৪ হাজার লিটার।
সকাল বেলায় পাম্প বন্ধ থাকার অভিযোগ নিয়ে তিনি মতিঝিল রহমান ফিলিং স্টেশনের কর্মী সুজন বলেন, টানা কয়েকদিন ধরে ডিউটি করায় কর্মচারীরা ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। তাই তাদের বিশ্রামের জন্য রাত থেকে সকাল ৯টা পর্যন্ত পাম্প সাময়িক সময়ের জন্য বন্ধ ছিল। যার যতটুকু তেল প্রয়োজন সেটুকু নিলে এ সমস্যা হতো না।
রাইড শেয়ারিং চালকরা ৫ লিটার তেল নিতে পারবেন
দেশে জ্বালানি তেলের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে এবং বাজারে আতঙ্ক কমাতে রাইড শেয়ারিং সেবায় ব্যবহৃত মোটরসাইকেলের জন্য দৈনিক সর্বোচ্চ ৫ লিটার অকটেন বা পেট্রোল সরবরাহের নির্দেশনা দিয়েছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)। এই সিদ্ধান্ত আপাতত মহানগর এলাকাগুলোর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে। মঙ্গলবার বিপিসি’র সচিব শাহিনা সুলতানা স্বাক্ষরিত এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়।
বিজ্ঞপ্তিতে কিছু শর্তও জুড়ে দেয়া হয়েছে- ফিলিং স্টেশন হতে জ্বালানি তেল গ্রহণের সময় মোটরসাইকেল রাইড শেয়ার ভোক্তাকে আবশ্যিকভাবে তেলের ধরন, পরিমাণ ও মূল্য উল্লেখ করে ক্রয় রসিদ প্রদান করতে হবে। ফিলিং স্টেশন হতে প্রতিবার জ্বালানি তেল গ্রহণের সময় পূর্ববর্তী ক্রয় রসিদ বা বিলের মূল কপি জমা প্রদান করতে হবে এবং সর্বশেষ মোটরসাইকেলের রেজিস্ট্রেশন নম্বর ও চালকের তথ্যাদি রাইড শেয়ারিং অ্যাপসের সঙ্গে যাচাইপূর্বক জ্বালানি তেল সরবরাহ করতে হবে।
বিজ্ঞপ্তিতে আরও উল্লেখ করা হয়, দেশে সরকার নির্ধারিত মূল্যে জ্বালানি তেল ক্রয়-বিক্রয়ের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। এক্ষেত্রে অতিরিক্ত মূল্য আদায় আইনত অপরাধ। দেশে জ্বালানি তেলের মূল্যের স্থিতিতে সরকার কর্তৃক নির্ধারিত দাম বজায় রাখা হয়। বর্তমান সংকটময় পরিস্থিতিতে দেশে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির বিষয়ে সরকার এখনো কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেনি। এ অবস্থায় দেশের সব ভোক্তা বা ফিল্ডারদের অর্পিত নির্দেশনা অনুসরণ করে দেশের জ্বালানি তেল সরবরাহ স্বাভাবিক রাখার লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট সবার সহযোগিতা কামনা করে বিপিসি।
