মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতি বহু দশক ধরে বিশ্ব রাজনীতির অন্যতম জটিল ও স্পর্শকাতর ক্ষেত্র। এই অঞ্চলের প্রতিটি রাজনৈতিক পরিবর্তন কেবল একটি দেশের অভ্যন্তরীণ ঘটনায় সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং তা বৈশ্বিক শক্তির ভারসাম্য, জ্বালানি নিরাপত্তা, সামরিক জোট ও কূটনৈতিক সমীকরণকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। সাম্প্রতিক সময়ে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির মৃত্যুর পর তাঁর উত্তরসূরি হিসেবে মোজতবা হোসেইনি খামেনির নির্বাচিত হওয়ার ঘটনা সেই বাস্তবতারই আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
৫৬ বছর বয়সী মোজতবা খামেনি দীর্ঘদিন ধরেই ইরানের ক্ষমতার অন্দরমহলে একটি পরিচিত নাম হলেও তিনি কখনো আনুষ্ঠানিকভাবে বড় কোনো সরকারি পদে ছিলেন না। তবু রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের কাছে তিনি ছিলেন প্রভাবশালী এক ছায়া-নেতা—যিনি নীরবে ক্ষমতার গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে প্রভাব বিস্তার করে গেছেন। তাঁর বাবা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি প্রায় ৩৬ বছর ধরে ইরানের ইসলামি প্রজাতন্ত্রের সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে দেশটির রাজনৈতিক, ধর্মীয় ও সামরিক কাঠামোকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। তাঁর মৃত্যুর পর মোজতবার নেতৃত্বে নতুন অধ্যায় শুরু হওয়ায় স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে—এই পরিবর্তন ইরানের ভবিষ্যৎকে কোন পথে নিয়ে যাবে?
ইরানের ইসলামি প্রজাতন্ত্রের রাজনৈতিক কাঠামো এমন যে, সর্বোচ্চ নেতা কেবল রাষ্ট্রপ্রধান নন; তিনি দেশটির ধর্মীয় ও সামরিক শক্তিরও সর্বোচ্চ কর্তৃত্ব। ফলে এই পদে যে-ই আসীন হন, তাঁর সিদ্ধান্ত পুরো রাষ্ট্রব্যবস্থাকে প্রভাবিত করে। সেই বিবেচনায় মোজতবা খামেনির ক্ষমতায় আসা কেবল পারিবারিক উত্তরাধিকারের বিষয় নয়; এটি ইরানের রাজনৈতিক ধারাবাহিকতা ও প্রতিরোধনীতির ভবিষ্যৎ নির্ধারণের প্রশ্নও বটে।
ইসলামি প্রজাতন্ত্রের প্রতিষ্ঠাতা নেতা আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির মৃত্যুর পর ১৯৮৯ সালে আলী খামেনি সর্বোচ্চ নেতা হন। গত তিন দশকের বেশি সময় ধরে তিনি ইরানের রাজনৈতিক কাঠামোকে একটি শক্তিশালী প্রতিরোধভিত্তিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় রূপ দিয়েছেন। পশ্চিমা শক্তির চাপ, নিষেধাজ্ঞা এবং আঞ্চলিক সংঘাতের মধ্যেও তাঁর নেতৃত্বে ইরান নিজস্ব কৌশলগত অবস্থান ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে। সেই দীর্ঘ নেতৃত্বের উত্তরাধিকার এখন তাঁর ছেলে মোজতবার হাতে এসে পড়েছে।
তবে মোজতবা খামেনির ক্ষমতায় আসার প্রেক্ষাপট ছিল অত্যন্ত নাটকীয় ও সংকটপূর্ণ। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ সামরিক হামলায় তাঁর বাবা নিহত হন, এবং একই হামলায় মোজতবা ব্যক্তিগতভাবেও বড় ক্ষতির মুখোমুখি হন—তাঁর স্ত্রী এবং ধারণা করা হয় তাঁর এক সন্তানও নিহত হন। এই ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি তাঁর রাজনৈতিক মনোভাব ও সিদ্ধান্তকে কীভাবে প্রভাবিত করবে, তা এখন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের অন্যতম আলোচ্য বিষয়।
অনেক পর্যবেক্ষকের মতে, মোজতবা খামেনির রাজনৈতিক উত্থান আকস্মিক নয়। বহু বছর ধরেই তিনি ইরানের ক্ষমতার কাঠামোর ভেতরে ধীরে ধীরে নিজের অবস্থান শক্ত করেছেন। বিশেষ করে ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী বা আইআরজিসির সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা রয়েছে। ইরানের এই শক্তিশালী সামরিক ও রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান দেশটির নিরাপত্তা, অর্থনীতি এবং আঞ্চলিক কৌশলের গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি। ফলে আইআরজিসির সমর্থন পাওয়া যেকোনো নেতার জন্যই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
২০০৫ সালে মাহমুদ আহমাদিনেজাদের আকস্মিক উত্থানের সময়ও মোজতবা খামেনির নাম আলোচনায় আসে। অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, বিপ্লবী গার্ড বাহিনী ও বাসিজ প্যারামিলিটারি বাহিনীর সমর্থন নিশ্চিত করতে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন। যদিও এসব অভিযোগ কখনো আনুষ্ঠানিকভাবে প্রমাণিত হয়নি, তবু ইরানের ক্ষমতার অন্দরমহলে তাঁর প্রভাব নিয়ে সন্দেহ খুব কমই রয়েছে।
মোজতবা খামেনিকে সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচনের বিষয়টি ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির পাশাপাশি আন্তর্জাতিক রাজনীতিতেও গভীর প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প প্রকাশ্যে তাঁকে অগ্রহণযোগ্য বলে মন্তব্য করেন এবং বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের অনুমোদন ছাড়া তাঁর ক্ষমতায় টিকে থাকা কঠিন হবে। এই মন্তব্য ইরানের রাজনীতিতে উল্টো প্রভাব ফেলতে পারে বলেই অনেকে মনে করেন। কারণ, ইরানের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে বিদেশি চাপ প্রায়ই জাতীয় প্রতিরোধের অনুভূতিকে আরও শক্তিশালী করে।
আসলে ইরানের রাজনৈতিক বাস্তবতা এমন যে, বাইরের চাপ অনেক সময় অভ্যন্তরীণ ঐক্যকে জোরদার করে। যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েলের সরাসরি সমালোচনা বা হুমকি প্রায়ই দেশটির শাসনব্যবস্থার প্রতি জনসমর্থন বাড়িয়ে দেয়। ফলে ট্রাম্পের প্রকাশ্য বিরোধিতা মোজতবার নেতৃত্বকে আরও বৈধতা দিয়েছে—এমন বিশ্লেষণও রয়েছে।
এদিকে ইরানের ‘অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টস’, যা সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচনের সাংবিধানিক কর্তৃপক্ষ, সেই পরিষদের বৈঠক হওয়ার আগেই হামলার ঘটনা ঘটেছে। এতে স্পষ্ট হয়েছে যে ইরানের নেতৃত্ব পরিবর্তন কেবল একটি অভ্যন্তরীণ বিষয় নয়; এটি আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতিরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
মোজতবা খামেনির সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে—ইরানের অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা বজায় রাখা এবং একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক চাপ মোকাবিলা করা। সাম্প্রতিক হামলার পর ইরান যে ড্রোন ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে পাল্টা প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে, তা দেশটির সামরিক সক্ষমতার একটি স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে। তবে এই প্রতিরোধনীতির দীর্ঘমেয়াদি কৌশল কী হবে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিও সহজ নয়। দেশটিতে সংস্কারপন্থী, রক্ষণশীল এবং বিপ্লবী শক্তির মধ্যে দীর্ঘদিন ধরেই মতপার্থক্য রয়েছে। অনেকেই মনে করেন, নতুন নেতৃত্বের সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হবে—ইরান কি বর্তমান প্রতিরোধনীতির ধারাবাহিকতা বজায় রাখবে, নাকি নতুন কোনো কূটনৈতিক পথ অনুসন্ধান করবে।
কিছু বিশ্লেষক একসময় মনে করেছিলেন, মোজতবা খামেনি হয়তো সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের মতো অর্থনৈতিক ও সামাজিক সংস্কারের পথে যেতে পারেন। কিন্তু সাম্প্রতিক সংঘাত সেই সম্ভাবনাকে অনেকটাই ক্ষীণ করে দিয়েছে। ব্যক্তিগত ক্ষতি এবং জাতীয় নিরাপত্তা সংকট তাঁর নেতৃত্বকে আরও কঠোর প্রতিরোধনীতির দিকে ঠেলে দিতে পারে।
তবে ইরানের ভবিষ্যৎ কেবল নেতৃত্বের ওপর নির্ভর করে না; এটি দেশের জনগণের রাজনৈতিক সচেতনতা ও সামাজিক শক্তির সঙ্গেও গভীরভাবে সম্পর্কিত। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইরানে বিভিন্ন সামাজিক আন্দোলন ও রাজনৈতিক মতপ্রকাশের ঘটনা দেখা গেছে। এসব ঘটনা দেখায় যে ইরানি সমাজের ভেতরেও পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা রয়েছে।
তারপরও বাইরের চাপের মুখে ইরানের জনগণ প্রায়ই জাতীয় ঐক্যের অবস্থান গ্রহণ করে। ইতিহাসে বহুবার দেখা গেছে—বিদেশি হুমকি বা সামরিক চাপ ইরানের রাজনৈতিক কাঠামোকে দুর্বল করার বদলে অনেক সময় আরও শক্তিশালী করে তুলেছে।
এই বাস্তবতায় মোজতবা খামেনির নেতৃত্ব ইরানের জন্য এক নতুন পরীক্ষার সময়। তিনি কি তাঁর বাবার মতো দীর্ঘস্থায়ী ও প্রভাবশালী নেতৃত্ব দিতে পারবেন? নাকি তাঁর শাসনামলে ইরানের রাজনৈতিক কাঠামো নতুন রূপ নেবে—এই প্রশ্নগুলোর উত্তর এখনো অনিশ্চিত।
তবে একটি বিষয় নিশ্চিত—ইরান মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হিসেবে থেকেই যাবে। জ্বালানি সম্পদ, সামরিক সক্ষমতা, আঞ্চলিক জোট এবং দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা—সব মিলিয়ে দেশটি সহজে আন্তর্জাতিক সমীকরণ থেকে বাদ পড়ার নয়।
মোজতবা খামেনির নেতৃত্ব তাই কেবল একটি পারিবারিক উত্তরাধিকার নয়; এটি একটি রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা নির্ধারণের অধ্যায়। তাঁর সামনে রয়েছে কঠিন বাস্তবতা, জটিল কূটনীতি এবং গভীর অভ্যন্তরীণ প্রত্যাশা।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে স্পষ্ট হবে—এই নতুন নেতৃত্ব ইরানকে আরও কঠোর প্রতিরোধের পথে নিয়ে যাবে, নাকি ধীরে ধীরে নতুন কোনো রাজনৈতিক ভারসাম্যের দিকে অগ্রসর করবে।
কিন্তু যে পথই বেছে নেওয়া হোক, একটি বিষয় স্পষ্ট—ইরানের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে এখন মোজতবা খামেনির ভূমিকা হবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর নেতৃত্বই ঠিক করে দেবে, মধ্যপ্রাচ্যের এই প্রভাবশালী রাষ্ট্র আগামী দশকগুলোতে বিশ্ব রাজনীতিতে কোন অবস্থানে দাঁড়াবে।
লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক
ঢাকা। ই–মেইল: [email protected]
