উচ্চ সুদহার, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও নীতি দুর্বলতার কারণে চাপের মুখে রয়েছে অর্থনীতি। বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি কমে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমেছে। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক চুক্তি রপ্তানি খাতের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করেছে। বিদ্যমান চুক্তির পুনর্বিবেচনা করার দাবি জানিয়েছে ব্যবসায়ীদের সংগঠন ডিসিসিআই।
এ ছাড়া ইরান-যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যকার সাম্প্রতিক সংঘাত, বৈশ্বিক বাণিজ্যে অচলাবস্থা এবং জ্বালানি সরবরাহের অনিশ্চয়তার কারণে দেশের বেসরকারি খাতের অগ্রগতি বাধাগ্রস্ত হবে বলে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ঢাকা চেম্বার।
সোমবার রাজধানীর মতিঝিলে ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই) আয়োজিত সেমিনারের শুরুতে লিখিত বক্তব্য দেন সংগঠনের সভাপতি তাসকীন আহমেদ। ‘বেসরকারিখাতের দৃষ্টিতে অর্থনীতির বিদ্যমান অবস্থা ও ভবিষ্যৎ পর্যালোচনা’Ñ শীর্ষক এ সেমিনারে প্রধান অতিথি ছিলেন- পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ সাকি। জোনায়েদ সাকি বলেন, অর্থনীতি খাদের কিনারে গেছিলো। এর মধ্যে একটা বৈরী অবস্থা তৈরি হয়েছে। অর্থনীতিকে একটা শক্তিশালী অবস্থায় নেয়ার চেষ্টা করছে সরকার। কর-জিডিপি বাড়াতে লিকেজ বন্ধ করার চেষ্টা করা হচ্ছে।
অর্থনীতির গণতান্ত্রিকীকরণ এ সরকারের অন্যতম লক্ষ্য উল্লেখ করে জোনায়েদ সাকি বলেন, দেশের উন্নয়নের সুফল যেন প্রতিটি মানুষ পেতে পারে সেটার উপর সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। তিনি জানান, কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি, পরিবেশ সুরক্ষার পাশাপাশি দক্ষ জনবল তৈরিতে সরকার প্রাধান্য দেবে। তিনি আরও বলেন, করজাল সম্প্রসারণের যথেষ্ট সুযোগ থাকলেও আমরা ততটা মনোযোগী নই, ফলে আমাদের স্থানীয় ও বৈশ্বিক ঋণের উপর নির্ভর করতে হচ্ছে, এ অবস্থা নিরসনে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে।
ডিসিসিআই সভাপতি বলেন, রপ্তানি বৈচিত্র্য ও নতুন বাজার সম্প্রসারণের পাশাপাশি নীতি সংস্কার ছাড়া অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়। বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতির আলোকে নীতিমালা হালনাগাদ করা জরুরি। এলডিসি উত্তরণের পর আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে নতুন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বাজারে প্রবেশাধিকার ধরে রাখা, বাণিজ্য প্রক্রিয়া সহজ করতে হবে। তাসকীন আহমেদ বলেন, ২০২৫ অর্থবছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) যে দুই লাখ ৩১ হাজার ২০৫ কোটি টাকার রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছিল, তা অর্জন সম্ভব হয়নি। ২০২৪২৫ অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে ঘাটতি ধরা হয়েছে ২.২৬ ট্রিলিয়ন টাকা, যা জিডিপি’র ৪.১ শতাংশ। যদিও প্রাথমিকভাবে ঘাটতি ধরা হয়েছিল ২.৫৬ ট্রিলিয়ন টাকা। তিনি আরও বলেন, ট্যাক্স-জিডিপি অনুপাত ২০২৪২৫ অর্থবছরে কমে ৬.৫৬ শতাংশে নেমে এসেছে, যা আগের বছর ছিল ৭.২ শতাংশ। এটি রাজস্ব আহরণ সক্ষমতার জন্য উদ্বেগজনক।
কর ব্যবস্থার দুর্বলতার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, সম্পূর্ণ অটোমেশন ও স্বয়ংক্রিয় ট্যাক্স ব্যবস্থাপনা না থাকায় কর আদায়ে বিলম্ব এবং স্বচ্ছতার ঘাটতি রয়েছে। তাই, প্রত্যক্ষ করের ওপর গুরুত্ব বাড়িয়ে অনানুষ্ঠানিক ও আন্ডার-রিপোর্টেড খাতগুলোকে করের আওতায় এনে করভিত্তি সম্প্রসারণ করতে হবে। পাশাপাশি ই-নিবন্ধন, ই-রিটার্ন, ই-পেমেন্ট, ই-অডিট ও ই-রিফান্ডসহ পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল সেবা চালুর পাশাপাশি ভ্যাট, আয়কর ও কাস্টমস সংযুক্ত একটি সমন্বিত কেন্দ্রীয় ডেটাবেস গড়ে তোলার পরামর্শ দেন তিনি। তিনি বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি অনুসরণ করছে। নীতি সুদহার ১০ শতাংশে স্থির রাখার ফলে ঋণের সুদ বেড়ে ১৬ শতাংশ বা তারও বেশি উঠেছে। বেসরকারি খাতের ঋণ গ্রহণ ও বিনিয়োগ কার্যক্রম মন্থর হয়ে গেছে।
তাসকীন আহমেদ বলেন, মূল্যস্ফীতি কোনো সাময়িক সংকট নয়, বরং দীর্ঘদিনের কাঠামোগত ভারসাম্যহীনতা ও নীতিগত দুর্বলতার প্রতিফলন। বাজারে অব্যবস্থাপনা, অবৈধ সিন্ডিকেট এবং অতিরিক্ত সরকারি ঋণ গ্রহণের অন্যতম কারণ। তাসকীন আহমেদ বলেন, বাজার নজরদারি জোরদার করতে হবে এবং মজুতবিরোধী আইনের কঠোর প্রয়োগের মাধ্যমে সিন্ডিকেট ভাঙতে হবে। পাশাপাশি সাপ্লাই চেইন শক্তিশালী করা, দক্ষ জনশক্তি তৈরি এবং বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার স্থিতিশীল রাখা জরুরি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. মোহাম্মদ আকতার হোসেন বলেন, মুদ্রাস্ফীতি বর্তমানে ৯-এ রয়েছে, তবে সম্প্রতি শুরু হওয়া মধ্যপ্রাচ্যের সংকটের কারণে অর্থনীতিতে অস্থিতিশীলতা আসার সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে, এক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের সংকোচনমুখী মুদ্রানীতি নিতে হবে, তা না হলে মুদ্রাস্ফীতি আরও বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
উচ্চ সুদ ও নীতি দুর্বলতায় চাপের মুখে অর্থনীতি: ডিসিসিআই
অর্থনৈতিক রিপোর্টার
১০ মার্চ (মঙ্গলবার), ২০২৬
লিংক কপি হয়েছে!
ফন্ট সাইজ:
100%
