ইনকিলাব মঞ্চের সাবেক আহ্বায়ক ও মুখপাত্র শরীফ ওসমান বিন হাদি হত্যাকাণ্ডের মূল আসামি শুটার ফয়সাল করিম মাসুদ ও ফয়সালের সহযোগী আলমগীরকে আটক করেছে পশ্চিমবঙ্গ পুলিশ। শনিবার দিবাগত রাতে বনগাঁও থেকে আটকের পর বর্তমানে তারা দু’জনেই ১৪ দিনের রিমান্ডে রয়েছে। আর এই খবর জানার পর আলোচিত এই খুনিদের দেশে ফিরিয়ে আনতে উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। ইতিমধ্যেই হাদি হত্যার প্রধান অভিযুক্তের সঙ্গে দেখা করতে কনস্যুলার এক্সেস চেয়েছে বাংলাদেশ। কূটনৈতিকসহ বিভিন্ন চ্যানেলে চিঠি চালাচালি চলছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে- খুব শিগগিরই হাদির হত্যাকারীদের দেশে ফিরিয়ে আনা হবে।
এর আগে সম্প্রতি বাংলাদেশের গোয়েন্দা সংস্থার একজন শীর্ষ কর্মকর্তা ভারত সফরে যান। তিনি ওই সময় ভারতীয় কর্তৃপক্ষকে হাদি হত্যা মামলার আসামিসহ সকল সন্ত্রাসীদের আটক করে বাংলাদেশের ফেরত পাঠানোর জন্য অনুরোধ করেন। ওসমান হাদির হত্যাকারীদের বিষয়ে কিছু তথ্যও উপস্থাপন করেন। এরপরই শনিবার রাতে পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের স্পেশাল টাস্ক ফোর্স (এসটিএফ) বনগাঁ সীমান্ত এলাকায় অভিযান চালিয়ে হাদি হত্যার মূল হত্যাকারী ফয়সাল ও আলমগীরকে আটক করে। আটকের সময় তারা প্রথমে মিথ্যা নাম ব্যবহার করে। ফয়সাল পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের কাছে নিজেকে রাহুল বলে। পরে প্রকাশ পায় তারাই হাদিকে হত্যার পর মেঘালয় সীমান্ত দিয়ে ভারতে পালিয়ে এসেছে। এরপর অবৈধ অনুপ্রবেশের অভিযোগে তাদের বিরুদ্ধে সেখানকার থানায় মামলা দায়ের করে এসটিএফ। ওই মামলায় দু’জনকে রোববার বিধাননগর মহকুমা আদালতে হাজির করে রিমান্ডের আবেদন করে পুলিশ। শুনানি শেষে আদালত ১৪ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন। রিমান্ডে থাকা বাংলাদেশের এই মোস্ট ওয়ানটেড আসামিদের আটকের খবর ইতিমধ্যেই পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের পক্ষ থেকে কলকাতায় বাংলাদেশ হাইকমিশনে জানানো হয়েছে। এরই প্রেক্ষিতে বাংলাদেশের পক্ষে উপ-হাইকমিশনের কর্মকর্তারা ধৃত ফয়সাল করিম মাসুদ এবং আলমগীর হোসেনের সঙ্গে দেখা করতে কনস্যুলার এক্সেস চেয়ে কলকাতায় ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রকের স্থানীয় কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করেছে। কলকাতায় বাংলাদেশ উপ-হাইকমিশন এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, তারা কলকাতায় ভারতীয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করেছে এবং কনস্যুলার অ্যাক্সেসের জন্য অনুরোধ করেছে।
পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের তদন্তকারী গোয়েন্দারা আটক ফয়সাল ও আলমগীরকে নিয়ে উত্তর ২৪ পরগনার জেলার বিভিন্ন জায়গায় গিয়ে তথ্য সংগ্রহ করছেন। হাদিকে হত্যা করে পশ্চিমবঙ্গে পালিয়ে আসার পর তারা কাদের কাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিল তাও জানার চেষ্টা চলছে। সীমান্ত এলাকায় কাদের মাধ্যমে আশ্রয় নিয়েছিল তাদেরও খোঁজ করছে পশ্চিমবঙ্গ পুলিশ।
এদিকে বাংলাদেশ পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) আলী হোসেন ফকির বলেছেন, ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শহীদ শরীফ ওসমান বিন হাদি হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিদের দেশে ফিরিয়ে আনতে কূটনৈতিক চ্যানেলে কাজ শুরু হয়েছে। এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেছেন, ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শহীদ শরীফ ওসমান বিন হাদি হত্যা মামলায় ভারতে গ্রেপ্তার হওয়া দুই আসামিকে দেশে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। ইতিমধ্যে পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে অনুরোধ করা হয়েছে। দুই দেশের মধ্যে থাকা প্রত্যর্পণ চুক্তির আওতায় তাদের ফিরিয়ে আনার জন্য আমরা চেষ্টা চালাচ্ছি।
বিষয়টি নিয়ে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ বলেছেন, বাংলাদেশের কলকাতা মিশন থেকে এরই মধ্যে রোববার ভারতের কাছে কনস্যুলার অ্যাক্সেস চাওয়া হয়েছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আশা করছে, দ্রুতই অ্যাক্সেস পাবে। তারপরই মন্ত্রণালয় পরবর্তী ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, শুধু হাদি হত্যার আসামি নয় শেখ হাসিনাকে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া চলমান আছে। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে যারা মানবতাবিরোধী অপরাধ করেছে, তাদের বিচারে সরকার সচেষ্ট রয়েছে।
উল্লেখ্য, গত বছর ১২ই ডিসেম্বর জুমার নামাজের কিছুক্ষণ পর রাজধানীর পুরানা পল্টনের কালভার্ট রোডে রিকশাযোগে যাওয়ার সময় খুব কাছ থেকে ওসমান হাদিকে গুলি করা হয়। পেছন থেকে আসা মোটরসাইকেল থেকে মাথায় গুলি করে পালিয়ে যায় ঘাতকরা। পরে হাদিকে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেয়া হয়। সেখান থেকে তাকে আবার এভারকেয়ার হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য ওসমান হাদিকে সিঙ্গাপুরে পাঠায় অন্তর্বর্তী সরকার। গত ১৮ই ডিসেম্বর সেখানেই মারা যান তিনি। আলোচিত এই হত্যাকাণ্ডের তদন্ত শেষে সাবেক ওয়ার্ড কাউন্সিলর তাইজুল ইসলাম চৌধুরী বাপ্পি, সাবেক ছাত্রলীগ কর্মী ফয়সাল করিম মাসুদসহ ১৭ জনকে আসামি করে গত ৬ই জানুয়ারি হাদি হত্যা মামলার অভিযোগপত্র দেয় গোয়েন্দা পুলিশ। গত ১২ই জানুয়ারি মামলাটি শুনানির জন্য ছিল। মামলার বাদী আবদুল্লাহ আল জাবের সেদিন অভিযোগপত্র পর্যালোচনার জন্য দুইদিন সময় চান। আদালত তা মঞ্জুর করে ১৫ই জানুয়ারি অভিযোগপত্র গ্রহণের দিন ঠিক করেন। সেদিন ডিবি পুলিশের দেয়া অভিযোগপত্র নিয়ে অসন্তোষ জানিয়ে নারাজি দাখিল করেন ইনকিলাব মঞ্চের সদস্য সচিব আবদুল্লাহ আল জাবের। পরে আদালত মামলাটি সিআইডিকে তদন্তের নির্দেশ দেয়।
