যাকাতের বৈশ্বিক শক্তি: দারিদ্র্য মোকাবিলায় নতুন ভাবনা

যাকাতের বৈশ্বিক শক্তি: দারিদ্র্য মোকাবিলায় নতুন ভাবনা

ফন্ট সাইজ:

যাকাত ব্যবস্থাপনা সুশৃঙ্খল এবং কার্যকর করতে ধর্মমন্ত্রীকে এক সময়োপযোগী নির্দেশনা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

ইসলামের পাঁচটি মৌলিক স্তম্ভের একটি যাকাত। এটি শুধু ধর্মীয় বিধান নয়; এটি একটি শক্তিশালী সামাজিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থাও। সঠিকভাবে ব্যবস্থাপনা করা গেলে যাকাত দারিদ্র্য বিমোচনে অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। আজকের বিশ্বে বহু মুসলিম দেশ বিপুল সম্পদের অধিকারী, আবার অনেক মুসলিম অধ্যুষিত দেশ ও অঞ্চলে মানুষ এখনও দারিদ্র্যের সঙ্গে সংগ্রাম করছে। তাই ধনী মুসলিম দেশগুলো থেকে যাকাত সংগ্রহ ও সুষ্ঠু বণ্টনের একটি কার্যকর বৈশ্বিক কাঠামো গড়ে তোলার বিষয়টি নতুন করে গুরুত্ব পাচ্ছে।

প্রথমত, যাকাত সংগ্রহকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়া জরুরি। অনেক দেশে ব্যক্তিগতভাবে যাকাত দেয়ার প্রচলন রয়েছে। কিন্তু রাষ্ট্রীয় বা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে একটি স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থা থাকলে ধনী মুসলিম দেশগুলো থেকে বিপুল পরিমাণ যাকাত সংগ্রহ করা সম্ভব। আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে একটি আন্তর্জাতিক যাকাত ফান্ড গঠন করা যেতে পারে, যেখানে সরকার, ইসলামি ব্যাংক, দাতব্য সংস্থা এবং আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো অংশ নিতে পারে। এতে যাকাতের অর্থ ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা বাড়বে এবং দাতাদের আস্থাও বৃদ্ধি পাবে।

দ্বিতীয়ত, যাকাতের অর্থ বণ্টনে কেবল ত্রাণনির্ভর পদ্ধতির পরিবর্তে উৎপাদনমুখী কর্মসূচির ওপর জোর দেয়া প্রয়োজন। অনেক সময় যাকাত শুধু খাদ্য বা নগদ সহায়তা হিসেবে দেয়া হয়, যা স্বল্পমেয়াদে উপকার দিলেও দীর্ঘমেয়াদে দারিদ্র্য দূর করতে পারে না। বরং ক্ষুদ্র ব্যবসা, কৃষি, কারিগরি প্রশিক্ষণ এবং উদ্যোক্তা তৈরিতে যাকাতের অর্থ বিনিয়োগ করলে দরিদ্র মানুষ স্বাবলম্বী হতে পারে। এতে তারা ভবিষ্যতে নিজেরাও যাকাতদাতা হয়ে উঠতে পারে যা ইসলামের সামাজিক ন্যায়বিচারের চক্রকে আরও শক্তিশালী করবে।

তৃতীয়ত, আন্তর্জাতিক সমন্বয় জরুরি। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ইতিমধ্যে যাকাতভিত্তিক দারিদ্র্য মোকাবিলার নানা উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে। কিছু দেশে সরকারি যাকাত বোর্ড রয়েছে, আবার কোথাও বেসরকারি ফাউন্ডেশন ও ইসলামি দাতব্য সংস্থা যাকাত সংগ্রহ করে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর উন্নয়নে কাজ করছে। উদাহরণ হিসেবে পাকিস্তানের সরকারি যাকাত ব্যবস্থার কথা বলা যায়। সেখানে রাষ্ট্রীয়ভাবে যাকাত সংগ্রহ করে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা এবং সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে ব্যয় করা হয়।

বাংলাদেশেও বিভিন্ন ইসলামি দাতব্য সংস্থা মধ্যপ্রাচ্যের ধনী দেশগুলো থেকে যাকাত সংগ্রহ করে নানা উন্নয়ন প্রকল্প পরিচালনা করছে। অনেক সংস্থা সৌদি আরব, কুয়েত, কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের দাতাদের কাছ থেকে যাকাত সংগ্রহ করে এতিমখানা, মাদ্রাসা, হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রকল্প পরিচালনা করছে। একইভাবে আফ্রিকার সোমালিয়া, সুদান কিংবা নাইজারের মতো দরিদ্র দেশগুলোতে আন্তর্জাতিক ইসলামি ত্রাণ সংস্থা ও ফাউন্ডেশন মধ্যপ্রাচ্যের ধনী মুসলিম সমাজ থেকে যাকাত সংগ্রহ করে খাদ্য সহায়তা, পানীয়জল প্রকল্প এবং ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে।

আরেকটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ হলো মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ার যাকাত ব্যবস্থাপনা। সেখানে সংগঠিত যাকাত প্রতিষ্ঠানগুলো শুধু দেশের অভ্যন্তরেই নয়, বরং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মাধ্যমে বিভিন্ন দরিদ্র অঞ্চলে সহায়তা পৌঁছে দিচ্ছে। ফলে যাকাত ধীরে ধীরে একটি বৈশ্বিক কল্যাণ ব্যবস্থায় রূপ নিচ্ছে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি। যাকাতের অর্থ কোথায় যাচ্ছে, কাদের কাছে পৌঁছাচ্ছে এবং তার কী ফলাফল হচ্ছে এসব বিষয়ে পরিষ্কার তথ্য থাকলে দাতা ও গ্রহীতা উভয়ের আস্থা বাড়বে। পাশাপাশি ধর্মীয় শিক্ষাবিদ, অর্থনীতিবিদ এবং উন্নয়ন বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে একটি নীতিমালা তৈরি করা প্রয়োজন, যাতে যাকাতের অর্থ ইসলামের নির্দেশনা মেনে সবচেয়ে কার্যকরভাবে ব্যবহার করা যায়।

বিশ্বজুড়ে মুসলমানদের সম্মিলিত শক্তি যদি সুশৃঙ্খলভাবে কাজে লাগানো যায়, তবে যাকাত শুধু ব্যক্তিগত ইবাদত নয় বরং একটি বৈশ্বিক সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থায় রূপ নিতে পারে। ধনী মুসলিম দেশগুলোর সম্পদ এবং দরিদ্র জনগোষ্ঠীর প্রয়োজনের মধ্যে সেতুবন্ধন গড়ে তুলতে পারলে যাকাত দারিদ্র্যমুক্ত একটি ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গঠনে বড় ভূমিকা রাখতে পারে। তখন যাকাত কেবল দান নয়, বরং মানবিক উন্নয়ন ও সামাজিক ন্যায়বিচারের শক্তিশালী মাধ্যম হয়ে উঠবে।


লেখক: সুইজারল্যান্ডভিত্তিক বেসরকারি ব্যাংকিং আর্থিক অপরাধ বিশেষজ্ঞ কলামিস্ট ও কবি

ইমেইল: [email protected]

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন