প্রেসিডেন্টকে অসম্মান ইস্যুতে মোদি-মমতা রাজনৈতিক সংঘাত চরমে

প্রেসিডেন্টকে অসম্মান ইস্যুতে মোদি-মমতা রাজনৈতিক সংঘাত চরমে

ফন্ট সাইজ:

ভারতের প্রেসিডেন্ট দ্রৌপদী মুর্মুর ‘অসম্মান’ নিয়ে তৃণমূল কংগ্রেসের সঙ্গে বিজেপির রাজনৈতিক সংঘাত ‌চরমে উঠেছে। বিজেপির হয়ে ময়দানে নেমেছেন খোদ প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। পাল্টা তৃণমূলও প্রেসিডেন্টকে ‘রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার’ করার অভিযোগ তুলে আক্রমণ করেছে। ফলে রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হয়ে গিয়েছেন দেশের সাংবিধানিক প্রধান তথা প্রেসিডেন্ট।


গত শনিবার পশ্চিমবঙ্গের শিলিগুড়িতে একটি সাঁওতাল সম্মেলনে যোগ দিতে গিয়েছিলেন প্রেসিডেন্ট মুর্মু। কিন্তু এই সফরের সময় প্রটোকল অনুযায়ী মুখ্যমন্ত্রী বা রাজ্যের কোনও মন্ত্রী স্বাগত জানাতে বিমানবন্দরে বা অনুষ্ঠানস্থলে উপস্থিত ছিলেন না। প্রেসিডেন্ট আন্তর্জাতিক সাঁওতাল সম্মেলনে ভাষণ দেয়ার সময় উল্লেখ করেন যে, মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বা বাংলার অন্য কোনও মন্ত্রী তাকে আগমনের সময় স্বাগত জানাননি। তিনি প্রোটোকল লঙ্ঘন এবং অনুষ্ঠানে উপস্থিতি কম রাখার চেষ্টার প্রতিও ইঙ্গিত দিয়েছিলেন।


এরপরই মুর্মু সফর বিতর্ক আরও তীব্রতর হয়েছে মোদি পশ্চিমবঙ্গ সরকারকে প্রেসিডেন্টকে অপমান করার অভিযোগ করার পর। মোদি মুর্মুর পশ্চিমবঙ্গ সফরের সময় প্রোটোকল লঙ্ঘনের অভিযোগকে ‘লজ্জাজনক এবং অভূতপূর্ব’ বলে বর্ণনা করেছেন এবং বলেছেন যে রাজ্য সরকার ‘সমস্ত সীমা অতিক্রম করেছে’।


তবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় অভিযোগ করেছেন, বিজেপি বিষয়টি নিয়ে রাজনীতি করছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি পশ্চিমবঙ্গের প্রেসিডেন্ট দ্রৌপদী মুর্মুকে বয়কট করার অভিযোগ করেছেন এবং বলেছেন, ‘রাজ্যের মানুষ একজন নারী, একজন আদিবাসী এবং দেশের প্রেসিডেন্টকে ‘গুরুতর অপমান’ ক্ষমা করবেন না।


মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় পাল্টা আক্রমণ করে বলেন যে, মুর্মুর সফরের জন্য প্রোটোকল তার বা কোনও মন্ত্রীর উপস্থিতি দাবি করেনা। সেইসঙ্গে তিনি প্রেসিডেন্টকে ‘বিজেপির নির্দেশে নির্বাচনের আগে রাজনীতি না করার’ পরামর্শ দিয়েছেন।


আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনের দিকে ইঙ্গিত করে মোদি বলেন, ‘‘তৃণমূলের ‘ক্ষমতার অহংকার’ শিগগিরই ‘চূর্ণবিচূর্ণ’ হবে। তিনি সংস্কৃতে একটি পঙক্তি উদ্ধৃত করে বলেন, ‘যত শক্তিশালী ব্যক্তিই হোন না কেন, একজন অহংকারী ব্যক্তির শেষ পর্যন্ত দর্পের অবসান হয়’।’


মোদি বলেন, ‘দেশের রাজধানী থেকে আমি বলতে চাই যে একজন আদিবাসী প্রেসিডেন্টকে অপমান করার তৃণমূল কংগ্রেসের নোংরা রাজনীতি এবং ক্ষমতার এই অহংকার শিগগিরই ভেঙে যাবে।’


বিজেপি সদর দপ্তরে সংবাদমাধ্যমকে ব্রিফ করার সময় সাবেক কেন্দ্রীয় আইনমন্ত্রী রবি শঙ্কর প্রসাদ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নাম উল্লেখ করতে কোনও দ্বিধা করেননি।


দ্রৌপদীর সঙ্গে যে আচরণ রাজ্য সরকার করেছে, তা গোটা আদিবাসী সমাজের অপমান বলে দাবি করতে শুরু করেছে বিজেপি। দলের জনজাতি মোর্চাকেও রাস্তায় নামিয়ে দিয়েছে বিজেপি নেতৃত্ব। পশ্চিমবঙ্গের একাধিক জেলায় আদিবাসী প্রধান এলাকাগুলোতে রাস্তায় টায়ার জ্বালিয়ে এবং অবরোধ করে বিক্ষোভ চলছে।


বিজেপির দাবি, ‘স্বতঃস্ফূর্তভাবে’ জনজাতি সমাজ ওই বিক্ষোভ শুরু করেছে। তবে বিজেপি সূত্রে জানা গেছে , জনজাতি মোর্চার রাজ্য সভাপতি তথা সাংসদ খগেন মুর্মু প্রত্যেকটি আদিবাসী প্রধান এলাকায় যোগাযোগ করেছেন। অবিলম্বে বিক্ষোভ দেখাতে পথে নামতে নির্দেশও দিয়েছেন।


রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, বিজেপি আদিবাসী অধ্যুষিত আসন জয়ের লক্ষ্যে মাঠে নেমেছে। ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে জনজাতি অধ্যুষিত জঙ্গলমহলের সবক’টি আসন জিতেছিল বিজেপি। কিন্তু ২০২১ সালের বিধানসভা ভোটে সেই ক্ষত অনেকটা মেরামত করে তৃণমূল কংগ্রেস। ২০২৪ সালের লোকসভা ভোটে পশ্চিমাঞ্চলের তিনটি লোকসভা বাঁকুড়া, ঝাড়গ্রাম এবং মেদিনীপুর আসন দখল করে নেয় তৃণমূল কংগ্রেস। অনেকের অভিমত, প্রেসিডেন্টকে কেন্দ্র করে এই বিতর্ক সেই জনজাতি অধ্যুষিত অঞ্চলে সবচেয়ে বেশি প্রভাব তৈরি করতে পারে। আবার অনেকের বক্তব্য, আদিবাসী সমাজ ছাড়িয়ে বৃহত্তর রাজনৈতিক পরিসরেও এই বিতর্ক ছাপ ফেলতে পারে।


পরিসংখ্যান অনুযায়ী, রাজ্যের মোট ২৯৪টি আসনের মধ্যে ১৬টি আসন জনজাতিদের জন্য সংরক্ষিত। কিন্তু রাজ্যের অন্তত ৫২টি আসনে উল্লেখযোগ্য হারে আদিবাসী ভোট রয়েছে। যেমন বীরভূম, হুগলি, পূর্ব বর্ধমান, পশ্চিম বর্ধমানের অনেক আসনে জনজাতি অংশের ভোট বিপুল। কিন্তু সেই আসনগুলো সংরক্ষিত নয়। ফলে এই বিতর্কের ব্যাপ্তি শুধু সংরক্ষিত আসনেই সীমাবদ্ধ থাকবে না।


কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন