ব্রেন্ট ক্রুড আবারও সংকটময় অবস্থায় ফিরে গেছে। মাত্র কয়েক দিনের মধ্যে দাম লাফিয়ে প্রতি ব্যারেল ১২০ ডলারের দিকে চলে গেছে। ফলে ১৯৭০-এর দশকের তেল-সংকটের সঙ্গে নতুন করে তুলনা শুরু হয়েছে। কারণ ব্যবসায়ীরা হিসাব কষতে ব্যস্ত যে, হরমুজ প্রণালিতে দীর্ঘস্থায়ী বিঘ্ন এমন এক বাজারে কী প্রভাব ফেলতে পারে। যেখানে এখন প্রতিদিন প্রায় ১০ কোটি ব্যারেল তেল ব্যবহৃত হয়।
এই আতঙ্কের কেন্দ্রে আছে একটি মাত্র সংকীর্ণ পথ।
মার্কিন এনার্জি ইনফরমেশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের তথ্য অনুযায়ী, প্রতিদিন প্রায় ২ কোটি ব্যারেল তেল ও পেট্রোলিয়ামজাত তরল সেই হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়। এটি বৈশ্বিক ব্যবহারের প্রায় ২০ শতাংশ এবং সমুদ্রপথে পরিবাহিত বিশ্বের মোট তেল বাণিজ্যের এক-চতুর্থাংশেরও বেশি। এই তেলের বেশিরভাগই যায় এশিয়ায়। চীন, ভারত, জাপান এবং দক্ষিণ কোরিয়া- এই চার দেশ মিলে প্রণালিটি দিয়ে যাওয়া মোট অপরিশোধিত তেলের অর্ধেকেরও বেশি গ্রহণ করে। ফলে এখানে দীর্ঘস্থায়ী কোনো বিঘ্ন ঘটলে তার প্রথম ও সবচেয়ে বড় ধাক্কা লাগবে এশিয়ার অর্থনীতিগুলোতে।
এই ঝুঁকি আরও বেড়েছে দ্য কোবেইসি লেটারের একটি ভাইরাল চার্টের কারণে। বাজারবিষয়ক এই নিউজলেটারটি সতর্ক করে বলেছে, হরমুজ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেলে তা ‘ইতিহাসের সবচেয়ে বড় তেল সরবরাহ-ধাক্কা’ সৃষ্টি করতে পারে।
এই সম্ভাব্য পরিস্থিতি সত্যিই বিস্ময়কর।
তাত্ত্বিকভাবে প্রতিদিন প্রায় ২ কোটি ব্যারেল তেলের সরবরাহ ঝুঁকির মধ্যে পড়তে পারে। তুলনামূলকভাবে, ১৯৭৩ সালে ইয়োম কিপুর যুদ্ধ চলাকালে তেল অবরোধের ফলে বৈশ্বিক বাজার থেকে প্রতিদিন প্রায় ৪ থেকে ৫.৫ মিলিয়ন ব্যারেল তেল কমে গিয়েছিল। ১৯৭৮-৭৯ সালের ইরানি বিপ্লবে বিঘ্নিত হয়েছিল প্রায় ৫ থেকে ৬ মিলিয়ন ব্যারেল। আর ১৯৮০ সালে শুরু হওয়া ইরান-ইরাক যুদ্ধে দৈনিক প্রায় ৪ মিলিয়ন ব্যারেল তেল সরবরাহ বাজার থেকে হারিয়ে যায়। কাঁচা পরিমাণের হিসাবে দেখলে, হরমুজ পুরোপুরি অবরুদ্ধ হলে তা আগের প্রতিটি ধাক্কাকেই ছাড়িয়ে যাবে।
তবে এখানে একটি বড় শর্ত আছে।
২ কোটি ব্যারেলের এই হিসাবটি সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতির সর্বোচ্চ অনুমান, যেখানে ধরা হচ্ছে প্রণালি পার হওয়া প্রতিটি ট্যাঙ্কার হঠাৎ করেই আটকে যাবে। বাস্তবে কিছু চালান সম্ভবত চলতেই থাকবে, আর সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো আঞ্চলিক উৎপাদকরা প্রণালিকে এড়িয়ে যাওয়া পাইপলাইনের মাধ্যমে সীমিত পরিমাণ তেল ঘুরিয়ে পাঠাতে পারবে। কৌশলগত মজুতও আঘাত কিছুটা সামাল দিতে পারে। তবু আংশিক বিঘ্নও দামকে ঊর্ধ্বমুখী করে তুলতে পারে। আর ভারতের মতো তেল আমদানিনির্ভর দেশের ক্ষেত্রে ক্ষতির প্রধান উৎস হবে শারীরিক ঘাটতির চেয়ে মূল্যবৃদ্ধি।
ভারত যে পরিমাণ তেল ব্যবহার করে, তার প্রায় ৮৫ শতাংশই আমদানি করতে হয়। ফলে বৈশ্বিক দামের ওঠানামার প্রতি দেশটির অর্থনীতি খুবই সংবেদনশীল। ভারতের রিজার্ভ ব্যাংকের গবেষণা বলছে, অপরিশোধিত তেলের দামে ১০ শতাংশ বৃদ্ধি স্বল্পমেয়াদে মূল্যস্ফীতি বাড়াতে পারে এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কমিয়ে দিতে পারে। ব্রেন্টের দাম যদি ১২০ ডলারের দিকে ওঠার পর দ্রুত আবার নেমে আসে, তাহলে ধাক্কাটি হয়তো সামাল দেয়া সম্ভব হবে। কিন্তু যদি এই উল্লম্ফন স্থায়ী হয় এবং ২০ থেকে ৩০ শতাংশের দীর্ঘমেয়াদি মূল্যবৃদ্ধিতে রূপ নেয়, তাহলে অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করছেন- এর প্রভাব মূল্যস্ফীতি, সরকারি আর্থিক ভারসাম্য এবং আর্থিক বাজারজুড়ে ছড়িয়ে পড়তে পারে।
আরও গভীর দুর্বলতাটি হলো কাঠামোগত।
বিশ্বের তেলব্যবস্থা কার্যত তার মোট সরবরাহের পাঁচভাগের একভাগকে একটি সরু নৌপথের ওপর কেন্দ্রীভূত করে ফেলেছে, যেখানে বিকল্প পথ খুবই সীমিত। এটাকে মানবশরীরের ধমনি হিসেবে দেখা যেতে পারে। এই ধমনী যদি কখনো দীর্ঘ সময়ের জন্য পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়, তাহলে সরবরাহে এমন ধাক্কা লাগতে পারে, যা আধুনিক জ্বালানি বাজারে আগে কখনো দেখা যায়নি।
এখন বাজারে যারা লেনদেন করছেন, তাদের তাড়িয়ে বেড়ানো আসল প্রশ্নটি হলো- ঝুঁকি আছে কি না, তা নয়; বরং হরমুজ প্রণালি কতদিন অরক্ষিত থাকবে, আর বিশ্ব এই ধাক্কার প্রকৃত সর্বোচ্চ সীমা কোথায়, তা বুঝতে দামের কতটা ওপরে যেতে হবে।
