প্রযুক্তির নতুন যুগে শিল্প অর্থনীতির জাগরণ

প্রযুক্তির নতুন যুগে শিল্প অর্থনীতির জাগরণ

ফন্ট সাইজ:

উদীয়মান ও ডিসরাপটিভ প্রযুক্তির বৈশ্বিক রূপান্তরের এই যুগে সঠিক সময়ে উপলব্ধি ও অভিযোজনে ব্যর্থতা শিল্প ও অর্থনীতির ভবিষ্যৎ অগ্রযাত্রায় বাংলাদেশের জন্য ব্যয়বহুল পরিণতি ডেকে আনতে পারে। তবে যুগসন্ধিক্ষণে বাংলাদেশ এমন একটি সম্ভাবনাময় রাষ্ট্র, যে পুরাতন প্রযুক্তির ভারে ভারাক্রান্ত নয়, আবার নতুন প্রজন্মের প্রযুক্তি আয়ত্তে নেয়ার জন্য অনেকটাই প্রস্তুত।

পিছিয়ে পড়ার প্রধান সূচক হতে পারে বিশ্বের যেকোনো প্রান্তে উদ্ভাবিত ও অনুমোদিত প্রযুক্তি বাস্তবায়নে অযৌক্তিক বিলম্ব। দেশের শ্রম ও রপ্তানি অর্থনীতি একটি বা দুইটি খাতের ওপর নির্ভরশীলতা কাটিয়ে কীভাবে প্রযুক্তিনির্ভর বহুমুখী শিল্প অর্থনীতিতে রূপান্তরিত হতে পারে, সেটাই প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিৎ।

গত কয়েক দশকে উৎপাদনের ব্যাপক বিস্তার এবং আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে রপ্তানি সংযুক্তির ফলে অর্জিত প্রাথমিক শিল্প-পেশীকে কাজে লাগিয়ে প্রযুক্তির বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার মাঠে নামার সময় এখন। তবে সেই অভিযাত্রায় অবশ্যই নেতৃত্বে থাকতে হবে আধুনিক বিবর্তিত প্রযুক্তির জ্ঞান, কৌশল ও দূরদৃষ্টিতে সমৃদ্ধদের।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ডেটা-নির্ভর সভ্যতার উন্মেষে বিশ্ব এখন প্রবেশ করেছে চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের যুগে। এই সময়ে ডিজিটাল, ভৌত ও জীববৈজ্ঞানিক প্রযুক্তির অভূতপূর্ব সংমিশ্রণ থেকে যে শক্তিশালী পরিবর্তনের ঢেউ তৈরি হচ্ছে, তার প্রবল স্রোত শিগগিরই বাংলাদেশের অর্থনীতির বুকে আছড়ে পড়তে পারে। নাও থাকতে পারে পূর্বাভাস দেয়ার মতো অবশিষ্ট সময়।

সরকার ও জনগণ কত সঠিকভাবে এই ঢেউয়ের গতি, প্রকৃতি ও আকৃতি অনুভব করে, সেটাই হবে পিছিয়ে পড়ার ঝুঁকি এড়ানোর গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। সিদ্ধান্ত ও পদক্ষেপে ত্রুটি হলে রাষ্ট্রব্যবস্থা, কর্মসংস্থান, শিক্ষা এবং মানবজীবনে বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে। তবে সুখের কথা বাংলাদেশ সেই রূপান্তরকে স্বাগত জানাতে, ধারণ করতে এবং তাকে ব্যবহার করতে অনেকটাই প্রস্তুত।

এই অভূতপূর্ব দ্রুতগতির বিবর্তনে শ্রমবাজার সংকোচনের সতর্ক ধ্বনির তুলনায় ভিন্নতর কর্মসংস্থান সৃষ্টির বাদ্যঘণ্টাই বেশি তীব্র। কারণ আতশবাজির মতো এই দেশের শিরায় শিরায় প্রবাহিত হতে পারে আধুনিক শিল্পের স্রোত, যার নতুন রূপের সূচনা ও প্রসার বিশ্বব্যাপী আগেই শুরু হয়েছে। শ্রম আর দক্ষতার যে পালাবদল হবে, তার জন্য উপযুক্ত আগাম প্রস্তুতি একটি মুখ্য বিষয়।

যেসব বাধা অতীতে শিল্পের অগ্রযাত্রায় যুক্তিসঙ্গত অজুহাত হিসেবে দাঁড়িয়েছিল, তাদের পূর্বরূপে বা নবরূপে পুনরাবির্ভাব ঠেকানোর পাশাপাশি প্রকৃতি বা পরিবেশ যাতে শিল্পের অগ্রযাত্রায় ক্ষতবিক্ষত না হয়, তা নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

অর্থনীতি শুধুমাত্র শ্রমনির্ভর হওয়ার কারণে মানুষ যেখানে উৎপাদনের উপাদানে পরিণত হয়েছিল, তা থেকে মানবীয় উত্তরণের সুযোগ আছে এই প্রযুক্তি রূপান্তরে। তবে ডেটা সভ্যতায় মূল্যবোধের নতুন প্রজাতির যে বীজ বপন হবে, তার অঙ্কুরোদ্গমের পরিচর্যা করা অত্যন্ত জরুরি পূর্বশর্ত। শিল্প সম্প্রসারণের ভবিষ্যৎ ম্যাপিং সঠিক না হলে ভুল গন্তব্যের দিকে ভ্রমণের খেসারত হবে মারাত্মক।

টেকসই বাস্তবায়নের জন্য সবচেয়ে জরুরি হলো সরকার ও রাষ্ট্রের সঠিক নীতিমালা প্রণয়ন এবং আরও বেশি জরুরি নীতিমালা তৈরিতে মুখ্য বিবেচনার মৌলিক উপাদানগুলোকে সঠিকভাবে চিহ্নিত করা ও নির্বাচন করা। প্রয়োজন পলিসি ল্যাব অর্থাৎ নীতি প্রণয়ন গবেষণাগার প্রতিষ্ঠা করা।

জটিল ও উন্নততর পণ্যের উৎপাদনের সেই ব্যাপকতা এখনো দৃশ্যমান নয়, যদিও কারখানাজাত পণ্যে রপ্তানির পঞ্চাশ বছরের ইতিহাসের পিঠে দাঁড়িয়ে তার উৎপাদন ও দেশ-বিদেশে সফল বিপণনে বাংলাদেশের ন্যায্য দাবিদার হওয়ারই কথা। ফলে প্রশ্ন উঠতে পারে, বহুবিধ কর্মপ্রক্রিয়া ও বহু প্রযুক্তির সমন্বয় ঘটিয়ে জটিল পণ্য উৎপাদনের সক্ষমতা গড়ে তুলতে আরও বাড়তি সহায়তার প্রয়োজন ছিল কি না।

শিল্পায়নের প্রাথমিক পর্যায়ে রাষ্ট্রের নীতিগত সহায়তা প্রায় অপরিহার্য হয়ে ওঠে। নবীন শিল্প আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার কঠিন বাস্তবতায় প্রথম থেকেই সমান শক্তিতে দাঁড়াতে পারে না। নতুন প্রযুক্তির বেলায় ব্যক্তি উদ্যোগ বা প্রাইভেট সেক্টরে দীর্ঘমেয়াদি শিল্প সক্ষমতা গড়ে তুলতে হলে প্রাথমিক পর্যায়ে কিছু কৌশলগত সহায়তা, সুরক্ষা এবং প্রাতিষ্ঠানিক ও রাষ্ট্রীয় ভূমিকা বড় প্রভাব ফেলতে পারে।

তবে সরকারের সহায়তা বা প্রণোদনা, শুধুমাত্র ঋণদান ও ব্যাংক সুদ কমানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকার সুযোগ নেই। সেই সঙ্গে কর প্রণোদনার জন্য সূক্ষ্মভাবে পণ্য নির্বাচন করা এবং সেই সব নির্দিষ্ট পণ্যে করের মাত্রা অত্যন্ত গভীর চিন্তার উপর ভিত্তি করে হওয়া উচিত।

কারিগরি পণ্যে সঠিক স্ট্যান্ডার্ড, কোড ও টেস্টিং প্রক্রিয়া অনুসরণ করতেই হবে। সমস্যা হলো আমাদের স্ট্যান্ডার্ড ও কোডের বেলায় অপ্রতুল নির্দেশনা এখানে মানসম্পন্ন শিল্প উন্নয়নের একটি বড় বাধা। উৎপাদনের যন্ত্রপাতি বা মেশিনারি প্রস্তুতে গুণগত মানের ক্ষেত্রে দুটি বিকল্প; এক. আন্তর্জাতিক মানের পণ্য নির্মাণ। দুই. মান বজায় রাখতে না পারলে এই পণ্যের উৎপাদন থেকে বিরত থাকা।

সম্ভাবনার ক্ষেত্রভূমি বাংলাদেশ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিস্তৃত উদ্ভাবনকে কার্যকরভাবে কাজে লাগাতে পারলে উন্নত দেশের সঙ্গে বহু যুগের উন্নয়নগত আপেক্ষিক ব্যবধান কমিয়ে আনা যেমন সম্ভব তেমনই জ্ঞান আহরণ, প্রশিক্ষণ এবং সিদ্ধান্তগ্রহণের নতুন পদ্ধতিগুলো মানবসম্পদ উন্নয়নের গতি বহুগুণ বাড়িয়ে দিতে সক্ষম। অল্প সময়ের ব্যবধানে মধ্যবর্তী কয়েক ধাপ ডিঙিয়ে শিল্প বিবর্তনের শেষ ধাপের বাস্তবায়ন শুরু করার সুযোগ এটি।

একটি সম্ভাব্য দৃশ্যপট কল্পনা করা যেতে পারে। যদি আগামী পাঁচ বছরে প্রায় একশ বিলিয়ন ডলার পরিমাণ বিনিয়োগ শুধুমাত্র শিল্প উৎপাদনের ক্যাপিটাল যন্ত্রপাতিতে প্রবাহিত হয়, তবে বাংলাদেশের শিল্প অর্থনীতি সম্পূর্ণ নতুন মাত্রায় প্রবেশ করতে পারে। তবে সেটিকে অবাস্তব কল্পনা নয়, বরং যথেষ্ট বাস্তবসম্মত অনুমান বলেই বিবেচনা করা যায়। এখানে লক্ষণীয় বিষয় হলো, এই বিনিয়োগের জন্য সবকিছু নতুন করে শুরু করার প্রয়োজন নেই। গত কয়েক দশকে নির্মিত অবকাঠামো, বিদ্যুৎ সক্ষমতা (যদিও জ্বালানি দুর্বলতা আছে), বন্দর সম্প্রসারণ, অর্থনৈতিক অঞ্চল ও শিল্পাঞ্চলের ভিত্তি ব্যবহার করেই উৎপাদনের ব্যাপক সম্প্রসারণ সম্ভব।

নতুন প্রজন্মের প্রযুক্তি দ্বারা সমৃদ্ধি অর্জনের বেলায় একমাত্র ইচ্ছাশক্তি পোষণের ব্যর্থতা ছাড়া অন্য কোনো ব্যর্থতার যুক্তিসঙ্গত কারণ নেই। গাণিতিক বিশ্লেষণেও বড় মাপের বিনিয়োগের পূর্বাভাস দেওয়া যেতে পারে।

প্রশ্ন হলো, এই বিশাল সম্ভাবনা যার বাস্তবতা নিয়ে সন্দেহের অবকাশ খুবই সীমিত তার জন্য আমাদের সব প্রস্তুতি কি কেবল অর্থনৈতিক, প্রশাসনিক ও প্রযুক্তিগত পরিসরে সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি তা বিস্তৃত হবে উচ্চশিক্ষা, গবেষণা, সামাজিক বিকাশ এবং উচ্চাঙ্গের সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের বিস্তৃত ক্ষেত্র পর্যন্ত। এই সৌভাগ্যের সম্ভাবনার স্বাস্থ্যকর জন্ম ও বিকাশ অনেকাংশে নির্ভর করবে রাষ্ট্রের গৃহীত নীতিমালা, প্রতিষ্ঠিত মানদণ্ড, নর্ম এবং বিস্তৃত পেশাদারি নৈতিক বিধির ওপর।

অর্থনীতির গভীরে অনেক সময় সুপ্ত শক্তি লুকিয়ে থাকে। সেই শক্তি যখন সঠিক নীতি, বিনিয়োগ ও মানবসম্পদের মাধ্যমে গতিতে রূপ নেয়, তখন শিল্প ও সমাজে এক নতুন গতিশক্তির সঞ্চার হয়।

সময়ের প্রবাহে তখন অনেক সমস্যাই নিজে থেকেই ঝরে পড়ে। অস্থিরতা কমে, উৎপাদনের শৃঙ্খলা সমাজকে স্থিতি দেয়। বাংলাদেশের শিল্প অর্থনীতি যদি এই নতুন গতির সূচনা করতে পারে, তবে আগামী দশকগুলোতে দেশের উন্নয়নের ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায় রচিত হতে পারে।

সম্ভাবনার সর্বোত্তম ব্যবহারের জন্য রাষ্ট্র কতটা সতর্ক এবং কতটা আগাম প্রস্তুত, সেটিই মুখ্য প্রশ্ন। অতীতে এ দেশে অনেক অসম্ভব পরিবর্তন সম্ভব হয়েছে। গত শতাব্দীর শেষে এবং এই শতাব্দীর শুরুতে অল্প সময়ের মধ্যেই মোবাইল নেটওয়ার্কের বিস্তার তার একটি উজ্জ্বল উদাহরণ।

এই খাতে বিনিয়োগ কল্পনার সীমা অতিক্রম করেছিল। দ্রুত কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়। এমনকি দক্ষ শ্রমিকের সরবরাহও একসময় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। শ্রমিক ও কর্মকর্তাদের মজুরি স্বল্প সময়ের ব্যবধানে পূর্বের রেকর্ডের তুলনায় বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছিল। যদিও সেই সুযোগকে রাষ্ট্রের বহুবিধ প্রয়োজনের সঙ্গে সুসংগঠিতভাবে সংযুক্ত করার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য সফলতা সবসময় দেখা যায়নি। তবু মোবাইল নেটওয়ার্কের কানেকটিভিটি উৎপাদনশীলতার নানা ক্ষেত্রে ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে, তা বলাই বাহুল্য।

শিল্পকারখানার বিপ্লবী প্রসার অর্থনীতির নানা সূচকে, বিশেষ করে গড় আয়, জীবনযাত্রার মান এবং গড় আয়ু বৃদ্ধিতে বিশ্ব ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে, যা শিল্প সম্প্রসারণ বাদে অন্য কোনো খাত থেকে এই অতুলনীয় পর্যায়ে হয় না। প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশ কতটা সুচিন্তিত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে সেই সম্ভাবনাকে স্বাগত জানাতে পারবে। একই সঙ্গে শিল্পায়নের উন্নয়ন যেন সারাদেশব্যাপী অংশগ্রহণমূলক হয় এবং তার সুফল যেন ন্যায্য ও সমবণ্টনের মাধ্যমে সমাজের সকল স্তরে পৌঁছে।

শিল্পপ্রসারের ফলাফল যেমন বিভিন্ন খাতের মধ্যে আন্তসম্পর্ক সৃষ্টি করে, তেমনি এর ভিত্তিও গড়ে ওঠে সমাজের নানা প্রতিষ্ঠান, বিভাগ ও সাংস্কৃতিক কাঠামোর স্তরে স্তরে সুনির্মিত গাঁথুনির উপর। সে কারণে সরকারকে এমন কিছু নীতিগত সিদ্ধান্ত নিতে হবে, যাতে একটি পদক্ষেপ থেকেই একাধিক খাতে কার্যকর ইতিবাচক প্রভাব সৃষ্টি হয়।

শিল্পবিপ্লব জাতির জন্য নতুন এক অধ্যায়ের সূচনা করতে পারে। এর ফলে সরকারি কর্মকাণ্ডে ব্যয় হ্রাস ও গতিশীলতা বৃদ্ধি পেতে পারে, এবং দেশীয় সেবা ও পণ্যের ব্যবহারিক প্রয়োগে প্রশাসনিক দুর্বলতা কাটিয়ে ওঠাও সম্ভব হতে পারে।

বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান, বিশাল শ্রমশক্তি, ক্রমবর্ধমান দেশীয় বাজার এবং সাম্প্রতিক অবকাঠামো উন্নয়ন, শিল্প বিনিয়োগের জন্য একটি শক্তিশালী ভিত্তি তৈরি করেছে। তবে প্রশাসনিক জটিলতা হ্রাস, দক্ষ প্রযুক্তিবিদ তৈরি এবং দীর্ঘমেয়াদি শিল্প অর্থায়ন নিশ্চিত করা জরুরি। প্রযুক্তিগত সক্ষমতা দ্রুত বাড়ানোর জন্য বহুজাতিক কোম্পানির সঙ্গে যৌথ উদ্যোগও গুরুত্বপূর্ণ। বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে হলে নীতির স্থিতিশীলতা, দ্রুত অনুমোদন-ব্যবস্থা, দক্ষ প্রযুক্তি শিক্ষা এবং শিল্প ক্লাস্টারভিত্তিক পরিকল্পনা প্রয়োজন।

শিল্প বিকাশের একটি দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য হওয়া উচিত নিজস্ব যন্ত্রপাতি শিল্প গড়ে তোলা। বর্তমানে বাংলাদেশের প্রায় সব শিল্পযন্ত্র বিদেশ থেকে আমদানি করা হয়। অথচ ঝুঁকি না নিয়েই এই বিদেশ-নির্ভরতা অনেকাংশে কাটিয়ে ওঠা যায়। শিল্প অর্থনীতির পরিণত স্তরে পৌঁছাতে হলে মেশিন টুল শিল্প অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

মেশিন তৈরিতে, মেশিনের কাঠামো বা মেইন ফ্রেম তৈরি করতে পারলে অতি জটিল অংশসমূহ প্রাথমিক পর্যায়ে আমদানিনির্ভর থাকতে পারে। তবে উপযুক্ত ভেন্ডর সংযুক্তি বড় ব্যাপার এবং শ্রমিকের দক্ষতা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

এই উদ্দেশ্যে দেশের বিভিন্ন জেলায় বেশ কয়েকটি শিল্প হাব তৈরি করা যেতে পারে, যেখানে ধাপে ধাপে তৈরি হবে ধাতব যন্ত্রাংশ, কাটিং টুল, সিএনসি মেশিন উপাদান, শিল্প অটোমেশন যন্ত্রাংশ এবং পরবর্তীতে সম্পূর্ণ শিল্পযন্ত্র। একবার এই ভিত্তি তৈরি হলে তার ওপর দাঁড়িয়ে অসংখ্য নতুন শিল্পখাত জন্ম নিতে পারে। এখনকার যুগে বাংলাদেশ সেই সক্ষমতা থেকে দূরে নয়, তবে কিছু সুনির্দিষ্ট দুর্বলতা স্বল্প সময়ে কাটিয়ে উঠতে হবে, যা সহজসাধ্য।

শিল্পকারখানা প্রতিষ্ঠা ও পরিচালনার ক্ষেত্রে কারখানা স্থাপন প্রকল্প ও অপারেশনাল কাজের বাইরের প্রকৌশল চর্চা দেশে খুব বেশি দৃশ্যমান হয়ে ওঠেনি। কিছু যন্ত্রাংশ ও মেশিনারি উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান এবং তুলনামূলক বড় আকারের লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কশপ গড়ে উঠলেও, সেখানে উচ্চতর শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কিংবা সরকারের কোনো তাৎপর্যপূর্ণ ও সমন্বিত ভূমিকা লক্ষ করা যায়নি। একইভাবে বৃহৎ আকারের কারখানা বা প্রসেস প্লান্টের পরিকল্পনা, নকশা প্রণয়ন ও উন্নয়ন কার্যক্রমের ক্ষেত্রেও প্রায় একই বাস্তবতা বিরাজমান ছিল।

কিন্তু শিল্প বিপ্লবের নতুন পর্যায়ে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করতে হলে এই অবস্থার পরিবর্তন অপরিহার্য। দেশের শিল্পকারখানা উন্নয়ন ও সম্প্রসারণের জন্য শক্তিশালী সক্ষমতা, মানসম্মত জ্ঞানভিত্তিক এবং সুসংগঠিত দক্ষতা নিয়ে ইঞ্জিনিয়ারিং ডিজাইন প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতিষ্ঠা ও বিকাশ এখন সময়ের দাবি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

তবে কারিগরি অগ্রযাত্রা ও সামাজিক-সাংস্কৃতিক অগ্রযাত্রা যদি সমান্তরালে অগ্রসর না হয়, তবে যে ভারসাম্যহীনতা সৃষ্টি হয়, তার লক্ষণও দৃশ্যমান হতে থাকে। ভবিষ্যতের প্রযুক্তিগত বিস্ফোরণের আগে তাই ব্যাপক সামাজিক প্রস্তুতির প্রয়োজন রয়েছে। স্মরণে রাখতে হবে, এই সুবর্ণ সুযোগের মুহূর্তে ভুল সিদ্ধান্ত গ্রহণের অবকাশ অত্যন্ত সীমিত। ভুল পথে এগোলে প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র থেকে ছিটকে পড়ার ঝুঁকি অনিবার্য।

বিপুল জনসংখ্যা ও সীমিত প্রাকৃতিক সম্পদের এই দেশে শিল্পায়নের দৃশ্যমান ও অদৃশ্য প্রতিবন্ধকতার মধ্যে দুর্নীতি, সীমিত সরবরাহব্যবস্থা এবং জ্বালানির অপ্রতুলতা বিশেষভাবে চিহ্নিত হয়েছে। কিন্তু সফটওয়্যার, ডেটা-নির্ভর সভ্যতা এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক আধুনিক প্রযুক্তির যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করা গেলে দুর্নীতির সুযোগ অনেকাংশেই কমিয়ে আনা সম্ভব। দুর্ভাগ্যজনকভাবে দেখা যায়, বহু শিক্ষিত মানুষও কখনো কখনো দুর্নীতির মতো নির্বোধ ও নির্লজ্জ কর্মকাণ্ডে যুক্ত হয়ে পড়েন।

ধর্মপ্রাণ মানুষের এই দেশে দুর্নীতির ব্যাপক বিস্তার যেমন দুঃখজনক, তেমনি এক শতাব্দী আগে আবির্ভূত মানবতাবাদী কবি-সাহিত্যিক রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও কাজী নজরুল ইসলামের মতো মনীষীদের উত্তরাধিকার থাকা সত্ত্বেও যদি আমলাতন্ত্র বা সর্বগ্রাসী অসাধু ব্যবসায়িক শক্তির পদতলে সম্ভাবনার গতি পিষ্ট হতে দেখা যায়, তবে মনে হয় শিক্ষার বিস্তার ঘটলেও সভ্যতার ভেতরে যেন কোনো মৌলিক ঘাটতি রয়ে গেছে। হয়তো শিক্ষিত মানুষের মধ্যেই উপলব্ধির সংস্কার জরুরি, রাষ্ট্র সংস্কারের অনেক আগেই। একই সঙ্গে একটি আশঙ্কাও রয়েছে, উন্নয়ন কি সমাজের প্রান্তিক জনগোষ্ঠী ও স্বচ্ছল শ্রেণির মধ্যে দূরত্ব আরও বাড়িয়ে দেবে কি না।

গত শতাব্দীর সত্তর ও আশির দশকে সদ্য স্বাধীন সিঙ্গাপুর কিংবা এক সময়ের দরিদ্র দেশ দক্ষিণ কোরিয়ার দ্রুত শিল্পোন্নয়নের অভিজ্ঞতা আমাদের আত্মবিশ্বাস জোগাতে পারে। তবে এটিও স্মরণীয়, সেই অর্ধশতাব্দী পূর্বের প্রযুক্তিগত বাস্তবতা এবং বর্তমান সময়ের জটিল প্রযুক্তি পরিবেশ এক নয়। একইভাবে বাংলাদেশের সামাজিক-অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটও ভিন্নতর। আমাদের অগ্রযাত্রা হবে অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে, কিন্তু নিজস্ব বাস্তবতার আলোকে নতুন পথ নির্মাণের মধ্য দিয়ে।

উদ্ভাবন ও গবেষণার পথ সম্পূর্ণ দুর্লঙ্ঘ্য নয়, তবে তা নিঃসন্দেহে দুর্গম। এই বাস্তবতা বিবেচনায় আন্তর্জাতিক ও বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কৌশলগত অংশীদারিত্ব এবং সহযোগিতা চুক্তির মাধ্যমে উচ্চতর ও জটিল প্রযুক্তি উৎপাদনের বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করা কার্যকর পথ হতে পারে।

একই সঙ্গে উৎপাদনশীলতা ও প্রাতিষ্ঠানিক গতিশীলতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে কেবল প্রশাসনিক কঠোরতার উপর নির্ভর না করে আরও কার্যকর প্রক্রিয়া বিশ্লেষণ ও প্রসেস ম্যাপিংয়ের প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। কারণ দক্ষ ব্যবস্থাপনা ও সুসংগঠিত প্রক্রিয়া কাঠামোই আধুনিক শিল্প অর্থনীতির অন্যতম ভিত্তি। এই ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অতীত ইতিহাস খুব দুর্বল।

বাংলাদেশের শিল্পায়নের প্রথম পর্যায় যেমন ছিল শ্রমনির্ভর পণ্যের ওপর ভিত্তি করে, ইতিহাসে প্রায় সব শিল্পোন্নত দেশ, দক্ষিণ কোরিয়া, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া কিংবা ইন্দোনেশিয়া, একই পথ অনুসরণ করেছে। প্রথমে সাধারণ ভোগ্যপণ্য, পরে ইলেকট্রনিকস, মেশিনারি, অটোমোবাইল উপকরণ, রাসায়নিক শিল্প। এই ধারাবাহিক উত্তরণই শিল্প উন্নয়নের স্বাভাবিক পথ। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও সেই পথ উন্মুক্ত। প্রশ্ন কেবল পরিকল্পনা ও গতি সঞ্চারের। অবশ্যই জটিল ও ভারী কারিগরি পণ্যের সফলতা প্রাপ্তি খুব দূরের বিষয় নয়।

এই বৃহৎ বিনিয়োগ কোথা থেকে আসতে পারে, তারও একটি বাস্তবসম্মত চিত্র কল্পনা করা যেতে পারে। আগামী পাঁচ বছরে যদি মোট ১০০ বিলিয়ন ডলার উৎপাদন যন্ত্রে বিনিয়োগ হয়, তবে তার একটি বড় অংশ আসতে পারে দেশীয় উদ্যোক্তাদের কাছ থেকে। শক্তিশালী শিল্পগোষ্ঠী ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগ মিলিয়ে প্রায় ৪০ থেকে ৪৫ বিলিয়ন ডলার সম্ভাব্য। বিদেশি প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ থেকে আসতে পারে ২৫ থেকে ৩০ বিলিয়ন ডলার। প্রবাসী বিনিয়োগ ও শিল্প বন্ডের মাধ্যমে ১০ থেকে ১৫ বিলিয়ন ডলার সংগ্রহ সম্ভব। অবশিষ্ট অংশ আসতে পারে সরকারি শিল্প-সহায়ক প্রকল্প ও পাবলিক-প্রাইভেট অংশীদারিত্ব থেকে। এই বিনিয়োগ বাস্তবায়নের পর্যায়ে নির্মাণ, যন্ত্র স্থাপন, উৎপাদন, সরবরাহব্যবস্থা, সব মিলিয়ে লক্ষ লক্ষ নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হতে পারে।

নির্মাণ শিল্পের ভারী যন্ত্রপাতি যেমন ক্রেন, ফর্কলিফ্ট, এক্সকাভেটরসহ আরও জটিল যন্ত্রপাতি বিদেশি কোম্পানির সঙ্গে জয়েন্ট ভেঞ্চারের মাধ্যমে এদেশেই তৈরি করা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে ভারী শিল্প, হেভি ইন্ডাস্ট্রি এবং ক্রমবর্ধমান স্বয়ংক্রিয় উৎপাদন ব্যবস্থার জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতির একটি উল্লেখযোগ্য অংশ দেশীয়ভাবে উৎপাদনের লক্ষ্যকে এখন কেবল স্বপ্ন নয়, বরং বাস্তব নীতিনির্ধারণের পরিসরে আনতে হবে।

পেশাদারী ইলেকট্রনিক্স পণ্য ও শিল্পকারখানার ইলেকট্রনিক্স পণ্য প্রস্তুতে এখন বিশেষ মনোযোগী হওয়ার সুযোগ আছে, সক্ষমতার অভাব থাকার কথা নয়। তবে সেই ক্ষেত্রেও ভেন্ডর কানেকশন ও টেস্টিং প্রক্রিয়া বিশেষ প্রয়োজন।

ইঞ্জিনিয়ারিং ডিজাইন ও টেস্টিং, বিশেষ করে নির্মাণ খাতে, গ্যাস, বিদ্যুৎ, টেলিকম, পানি পরিবহন ও সরবরাহ, এ ধরনের ট্রান্সমিশন ও ডিস্ট্রিবিউশনের বেলায় যে ধরনের সফটওয়্যার টুলস ব্যবহার হয়, তা দেশের প্রযুক্তিবিদদের দ্বারা হওয়া প্রয়োজন। সেক্ষেত্রে ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যানালাইসিস ও ডিজাইন আরও সূক্ষ্ম ও সঠিক হবে। কারণ সফটওয়্যার টুলস গঠনের সময় আমাদের পরিস্থিতি বেশি বিবেচনায় রাখা সম্ভব। অর্থ আয় ও অর্থ সাশ্রয়ের ব্যাপার তো রয়েছেই।

শিল্প রূপান্তরের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হতে পারে জাহাজ শিল্পের বিকাশ, প্রধানত রপ্তানির জন্য। বাংলাদেশের উপকূলীয় অবস্থান, শ্রমশক্তি এবং বিদ্যমান কিছু শিপইয়ার্ডের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে মাঝারি আকারের জাহাজ, কার্গো ভেসেল, নদী ও উপকূলীয় পরিবহন জাহাজ এবং বিশেষায়িত শিল্পজাহাজ নির্মাণের একটি শক্তিশালী শিল্পখাত গড়ে উঠতে পারে। জাহাজ নির্মাণ শিল্পের সঙ্গে ইস্পাত প্রক্রিয়াকরণ, মেরিন যন্ত্রাংশ, বৈদ্যুতিক সিস্টেম, নেভিগেশন প্রযুক্তি ও প্রকৌশল সেবার মতো বহু উপখাত যুক্ত হওয়ায় এটি শিল্পায়নের জন্য একটি শক্তিশালী বহুগুণক মাল্টিপ্লায়ার হিসেবে কাজ করতে পারে। বাংলাদেশের কিছু অগ্রগতি ইতিমধ্যে আছে।

সেবা খাত সাধারণত প্রযুক্তিনির্ভর শিল্পের বিকাশের পরে বড় আকার ধারণ করে। তবু কিছু বিশেষ কারিগরি সেবা খাতে বাংলাদেশ এখনই রপ্তানির জন্য প্রস্তুত। সফটওয়্যার উন্নয়ন, ডিজিটাল ডিজাইন, ইঞ্জিনিয়ারিং সাপোর্ট সার্ভিস, প্রযুক্তি রক্ষণাবেক্ষণ, মেডিকেল ব্যাক-অফিস সেবা। এসব ক্ষেত্রে তুলনামূলকভাবে কম মূলধন বিনিয়োগেই দ্রুত অগ্রগতি সম্ভব। এখানে মূল প্রয়োজন দক্ষ মানবসম্পদ। বাংলাদেশের তরুণ সমাজের বিশাল অংশকে প্রযুক্তি প্রশিক্ষণ দিলে স্বল্প সময়েই এই সক্ষমতা গড়ে উঠতে পারে। উদ্যোক্তাদের মনে রাখতে হবে, ব্যবস্থাপনাকে বেডরুম থেকে বোর্ডরুমে নিয়ে আসার মানসিকতা আগে থাকতে হবে।

শিল্পায়নের পরবর্তী ধাপের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো কারিগরি পণ্য গবেষণা, ইঞ্জিনিয়ারিং ও উৎপাদনে জড়িত বহুজাতিক কোম্পানিগুলোকে দেশে আমন্ত্রণ জানানো। সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়া বহু আগেই উপলব্ধি করেছিল যে উন্নত প্রযুক্তি দ্রুত অর্জনের জন্য বৈশ্বিক কোম্পানিগুলোকে উৎপাদনের অংশীদার করা জরুরি। বাংলাদেশও একই কৌশল গ্রহণ করতে পারে। নির্দিষ্ট কিছু আধুনিক পণ্য, যেমন ইন্ডাস্ট্রিয়াল ইলেকট্রনিক যন্ত্রাংশ, শিল্প সেন্সর, বৈদ্যুতিক মোটর, ব্যাটারি প্রযুক্তি, মেডিকেল ডিভাইস, পরীক্ষাগারের ইনস্ট্রুমেন্ট এবং উঁচু স্তরের সফটওয়্যার, এইসব ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক কোম্পানির সঙ্গে যৌথ উৎপাদন উদ্যোগ নতুন শিল্প সম্ভাবনা সৃষ্টি করতে পারে।

বিশাল জনসংখ্যার সর্বস্তরের অংশগ্রহণ ও উন্নয়ন-সুবিধার সুষম বণ্টন মাথায় রেখে শিল্প হাব শুধু ঢাকা, চট্টগ্রাম বা খুলনায় রাখলে হবে না। কমপক্ষে বিশটি হাব স্টেশন গড়ার প্রয়োজন আছে।

এই সম্ভাবনাগুলো কার্যকরভাবে কাজে লাগাতে সরকার কয়েকটি নীতিগত পদক্ষেপ বিবেচনায় নিতে পারে।

এক. রাজধানীর বাইরে দেশের মানচিত্রের কেন্দ্রবিন্দুর নিকটবর্তী কোনো শহরে একটি জাতীয় শিল্প নিয়ন্ত্রক কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করা। যদিও শিল্প মন্ত্রণালয়ের বহু শাখা-প্রশাখা আছে এবং তাদের সুনির্দিষ্ট কর্মপরিধি আছে, তবে এই বৈপ্লবিক রূপান্তরিত শিল্পযুগের জন্য সম্পূর্ণ গতানুগতিক মানসিকতামুক্ত নতুন চেতনার ব্যবস্থাপনা প্রয়োজন, যা বহু অংশীদারকে সমন্বয় করবে এবং প্রযুক্তির মূল্যায়ন, পরিবর্তনের গতিশক্তি বাড়াবে। এই কেন্দ্রের কাজগুলোর মধ্যে প্রধান কর্ম হবে বিদেশি উচ্চমানের প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন, যাতে দক্ষতা আমদানি এবং উচ্চ কারিগরি পণ্য ও সেবা রপ্তানির পথ প্রসারিত হয়।

দুই. দেশব্যাপী উদীয়মান শিল্পপ্রতিষ্ঠানের জন্য বিশেষায়িত কাঁচামাল সরবরাহ শৃঙ্খলা, জ্ঞানভিত্তিক সহায়তা এবং একটি সমন্বিত শিল্প ডাটা প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলার উদ্দেশ্যে একটি শিল্প-সহায়ক ব্যাকবোন প্রতিষ্ঠা করা।

তিন. একটি শক্তিশালী ইন্ডাস্ট্রিয়াল রিসার্চ সেন্টার প্রতিষ্ঠা করা, যা নতুন শিল্পের প্রয়োজনীয়তা চিহ্নিত করবে এবং প্রযুক্তি নির্বাচন ও বাস্তবায়নে নির্দেশনা দেবে; যা উন্নততর শিল্পের প্রসেস সেন্টার হিসেবে কাজ করতে পারে।

চার. পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) ব্যবস্থায় সেবাখাতের পাশাপাশি পণ্য উৎপাদন সংযুক্ত করা, বিশেষ করে চিকিৎসা ও জনসেবামূলক খাতে প্রয়োজনীয় পণ্য উৎপাদনের জন্য।

পাঁচ. শিল্পপ্রতিষ্ঠানের মূল্যায়ন এবং নতুন শিল্প প্রকল্পের মূল্য নির্ধারণে একটি স্বচ্ছ ও মানসম্মত মূল্যায়ন পদ্ধতি প্রতিষ্ঠা করা।

ছয়. সরকারি, আধা-সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের অব্যবহৃত উৎপাদনসম্পদ তালিকাভুক্ত করে তা স্বচ্ছভাবে ব্যবহারের জন্য উন্মুক্ত করা।

সাত. রুগ্ণ শিল্পপ্রতিষ্ঠান পুনর্বাসনের আগে কঠোর কারিগরি ও আর্থিক পুনর্মূল্যায়ন করা এবং অযোগ্য শিল্পকে পুনর্বাসনের পরিবর্তে বিকল্প সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা।

আট. প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত মানদণ্ড, নর্ম ও কোড দ্রুত প্রণয়ন এবং নিয়মিত পর্যালোচনা করা। এই বিষয়ের অপ্রতুলতা কারিগরি ক্ষেত্রের পিছিয়ে থাকার প্রধান কারণ। অথচ এই কাজটি মোটেও দুরূহ ছিল না।

নয়. পরিবেশ ও কার্বন নিঃসরণসংক্রান্ত নির্দেশনা বিস্তৃতভাবে প্রচার করা এবং গণসচেতনতা বৃদ্ধির জন্য গণমাধ্যম ও সামাজিক কর্মসূচি গ্রহণ করা।

দশ. শ্রমিক ও জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে একটি জাতীয় সেফটি ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠা এবং নিরাপত্তা সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য সামাজিক আন্দোলন শুরু করা। বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে এই উদ্যোগ বড় প্রভাব ফেলবে।

যে জাতি আন্দোলন, বিপ্লব ও যুদ্ধে এত সাফল্যের ইতিহাস বহন করে, তাদের শিল্পযুদ্ধে পিছিয়ে পড়ারতো কথা নয়। তবে সরকারকে এমন সিদ্ধান্ত ও পরামর্শ গ্রহণ করতে হবে, যার উৎস প্রকৃত বহুমাত্রিক জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার ভাণ্ডার এবং যার দৃঢ়তা প্রতিষ্ঠিত বাস্তব অভিজ্ঞতার উপর নির্ভরশীল। শিল্পায়নের ক্ষেত্রে সরকার যেমন সঠিক গতিপথ নির্বাচন করবে, তেমনি অংশীদার ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানগুলোকেও সেই সঠিক পথ বেছে নিতে সহায়তা প্রদান করবে। মনে রাখতে হবে, এই বৈপ্লবিক শিল্পরূপান্তর বহু স্তরে এবং বহু পর্যায়ে সমাজের উপর প্রভাব হবে বিস্তৃত।

নতুন কারখানা নির্মাণ, উন্নত যন্ত্রপাতি স্থাপন, উৎপাদন প্রক্রিয়ার আধুনিকীকরণ এবং সরবরাহ শৃঙ্খলার বিস্তার, সব মিলিয়ে লক্ষ লক্ষ নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হতে পারে। বিদেশে কর্মরত শ্রমিকদের ব্যক্তি ও পারিবারিক জীবনের স্বস্তি ও কষ্ট, গার্মেন্টস শ্রমিকের কাজের পরিবেশ এমন না হয় যাতে কার্টুনে দীর্ঘশ্বাস রপ্তানি হয়, এই ধারণা গুরুতের সাথে স্মরণে রাখা প্রয়োজন।

শক্তিশালী জ্ঞানের ভিত্তি ছাড়া উৎপাদনশীলতার দ্রুত বৃদ্ধি এবং রপ্তানি সক্ষমতার সম্প্রসারণ অনেক সময় সীমাবদ্ধ হয়ে যায়। প্রযুক্তি শিল্প ছাড়া অর্থনৈতিক স্বাধীনতা সম্ভব নয়। উন্নত প্রযুক্তির আধিপত্য রাষ্ট্রের সর্বভৌমত্বের হুমকি লাঘব করে।


তড়িৎ প্রকৌশলী ও লেখক
টরন্টো, কানাডা

Md. Rabiul Hasan Khan

২ মাস আগে

অসাধারণ,

মন্তব্য করুন