যুক্তরাজ্য থেকে বাংলাদেশ হাইকমিশনার মিস আবিদা ইসলামকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। একইসঙ্গে পর্তুগাল, পোল্যান্ড, মেক্সিকো ও মালদ্বীপের রাষ্ট্রদূতদেরকেও প্রত্যাহার করা হয়েছে। সরকার যেকোনো সময় এটা করতে পারে। এটাকে শাস্তি বা ডিমোশন হিসেবে দেখা ঠিক নয়। অনেক সময় প্রত্যাহার করে সমান র্যাংকে ভিন্ন দায়িত্ব দেয়া হতে পারে অথবা প্রমোশন দিয়ে আরও অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ পদে পদায়ন করা হতে পারে। কূটনৈতিক অঙ্গনে রাষ্ট্রদূত প্রত্যাহার, তলব বা পদায়ন একেবারে স্বাভাবিক ব্যাপার। অনেক সময় এটাকে রুটিন বিষয় হিসেবে দেখা হয়। তবে রাষ্ট্রদূত বা হাইকমিশনার প্রত্যাহার নিয়ে কটাক্ষ করে পাবলিক স্টেটমেন্ট দেয়ার রেওয়াজ কোথাও দেখা যায় না। না উন্নত দেশে, না উন্নয়নশীল দেশে।
সরকার পরিবর্তন হলে নতুন সরকার তার পররাষ্ট্রনীতি, মেনোফেস্টু কমিটমেন্ট, বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সম্পর্ক ও যোগাযোগের গাঢ়ত্ব বা শিথিলতা, আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ইস্যুর প্রতি নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি ইত্যাদি বিষয়গুলোর বিবেচনায় বিভিন্ন ক্ষেত্রে সমন্বয় করতে হাইকমিশনার বা রাষ্ট্রদূতদের প্রত্যাহার বা শূন্য পদে অন্য বা নতুন কাউকে পদায়ন করতে পারে। এতে উদ্বিগ্ন বা শঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই।
যুক্তরাজ্য থেকে বাংলাদেশ হাইকমিশনার প্রত্যাহার করার পর এখন এখানে কাকে হাইকমিশনার হিসেবে সরকার নিয়োগ দেবেন-এ নিয়ে চলছে দেশে ও বিদেশে নানা জল্পনা-কল্পনা। বাংলাদেশের জন্য যুক্তরাজ্য হচ্ছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি ডিপ্লোম্যাটিক মিশন, সম্ভবত যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত ও জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধির পরই যুক্তরাজ্যের হাইকমিশনারের স্থান। আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও সংস্থা এবং বিশ্বের দৃশ্যত একমাত্র পরাশক্তির সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক ও দৃষ্টিভঙ্গির বিবেচনায় জাতিসংঘ ও যুক্তরাষ্ট্র গুরুত্বপূর্ণ হলেও বাংলাদেশের সাথে যুক্তরাজ্যের ঐতিহাসিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্কের গভীর সেতুবন্ধন একেবারে ফেলে দিয়ার মতো নয়। বিশেষ করে আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধে তৎকালীন বৃটিশ সরকারের অবদান ও ভূমিকা অনস্বীকার্য।
রাষ্ট্রদূত বা হাইকমিশনার বহির্বিশ্বে একটি দেশের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পদ, কেননা তিনি রাষ্ট্রকে সংশ্লিষ্ট দেশে রিপ্রেজেন্ট করেন। বৃটেনে সবচেয়ে মেধাবী ও যোগ্যদের কঠিন পরীক্ষা ও এসেসমেন্টের মাধ্যমে ফরেন সার্ভিসে নেয়া হয়। ধাপে ধাপে যোগ্যতা ও দক্ষতার ভিত্তিতে প্রমোশন ও পদায়ন করা হয়। কিছু কিছু ক্ষেত্রে ফরেন সার্ভিস ক্যাডারের বাইরে থেকে কাউকে নিয়োগ বা পদায়ন করা হলেও সংশ্লিষ্ট ফিল্ডে সেরাদের সেরা বা স্ব স্ব ক্ষেত্রে সফল ও প্রতিষ্ঠিতদেরই নিয়োগ দেয়া হয়। বৃটেনে হাইকমিশনার বা রাষ্ট্রদূত পদে নিয়োগে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ নাই বললেই চলে। ফলে এখানে মেধাবীরা ফরেন সার্ভিসে ঢুকে দক্ষতা ও যোগ্যতা প্রমাণ সাপেক্ষে স্বপ্ন দেখতে পারে ফরেন সার্ভিসের একেবারে সর্বোচ্চ চূড়ায় যেতে। বাংলাদেশেও কঠিন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার মাধ্যমে সেরা মেধাবীদের পররাষ্ট্র ক্যাডারে নিয়োগ দেয়া হয়। কিন্তু বিপত্তি ঘটে সিনিয়র পদ তথা রাষ্ট্রদূত বা হাইকমিশনার পদে পদায়নের ক্ষেত্রে।
যুক্তরাজ্যের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ দেশে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ কূটনৈতিক পদ তথা হাইকমিশনার পদে পদায়ন হওয়া উচিৎ যোগ্যতা, দক্ষতা ও ট্রাক রেকর্ডের ভিত্তিতে। দুঃখজনক হলেও সত্য যে অতীতে হাইকমিশনার পদে বেশিরভাগ পদায়নগুলো ছিল অস্বচ্ছ, অস্পষ্ট, প্রশ্নবিদ্ধ, রাজনৈতিক বিবেচনায় ও বিতর্কিত। অতীতে এমন লোকদেরকে যুক্তরাজ্যের হাইকমিশনার হিসেবে পাঠানো হয়েছিল, যাদের অধিকাংশ আসলেই কোনো কাজের ছিলেন না। কেউ কেউ শারীরিকভাবে অনেকটা অক্ষমও ছিলেন।
আশ্চর্যজনক হলেও সত্য যে, অতীতে যুক্তরাজ্যে হাইকমিশনারের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদে বৃদ্ধ বয়সে অনেকটা ডাম্পিং প্লেস বা চিকিৎসার জন্য পদায়ন করে পাঠানো হয়েছিল। প্রায় ৮০’র কাছাকাছি বয়সের বাংলাদেশের ওয়ারেন্ট অব প্রেসিডেন্স অনুযায়ী রাষ্ট্রের তৃতীয় সর্বোচ্চ পদের অধিকারী (যিনি রাষ্ট্রপতির অনুপস্থিতিতে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন) সাবেক স্পিকার কিংবা অবসরপ্রাপ্ত সাবেক সেনাপ্রধান বা ঊর্ধ্বতন সামরিক কর্মকর্তা কমান্ড থেকে সরিয়ে এখানে ডাম্পিং করা বা একটি পাবলিক ইউনিভার্সিটির অবসরপ্রাপ্ত ভিসি বা অবসরের পর গুরুতর অসুস্থ একজন সচিবকে দৃশ্যত চিকিৎসার জন্য (যিনি কিছুদিন পর ইন্তেকাল করেন) চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দিয়ে যুক্তরাজ্যে পাঠিয়ে কূটনৈতিকভাবে কী অর্জন করা হয়েছিল তা বোধগম্য নয়।
শুধু হাইকমিশনার লেভেলেরই পদই নয়, এর নিচের পদগুলোতেও অতীতে দেখেছি চিকিৎসার জন্য বা অন্য কারণে পাঠানো হয়েছিল। যেমন একজন নামকরা সাংবাদিক শেষ বয়সে চিকিৎসার জন্য প্রেস মিনিস্টার হিসেবে এসেছিলেন। আরেকজন তো ছোট একটি পজিশনে এসে দস্তুর মতো ফুল-টাইম পড়াশোনা করে বার-এট-ল পর্যন্ত করে ফেলেছিলেন! এভাবে আরও বেশ কয়েকটি উদাহরণ দেয়া যাবে। মোট কথা-রাষ্ট্রের জন্য তারা কতটুকু সার্ভিস দিয়েছেন বা দেয়ার সক্ষমতা ও যোগ্যতা ছিল এ নিয়ে বিস্তর প্রশ্ন থাকলেও তারা তাদের নিজেদের আখের গোছাতে বা স্বার্থ ঠিকই উদ্ধার করেছেন। একটি গুরুত্বপূর্ণ দেশে কূটনৈতিক সার্ভিসে এভাবে নিয়োগ দেয়া কতটুকু যুক্তিযুক্ত?
গোটা বিশ্বের মধ্যে যুক্তরাজ্যে বাংলাদেশিদের আলাদা একটা অবস্থান আছে। এখানে প্রায় এক মিলিয়ন বাংলাদেশির বসবাস। এখানে অনেক দক্ষ, উচ্চশিক্ষিত, স্মার্ট, যোগ্য ও অভিজ্ঞ ব্যক্তিত্ব ও প্রতিষ্ঠিত প্রফেশনালরা আছেন, যারা অত্যন্ত চমৎকারভাবে বাংলাদেশকে যুক্তরাজ্যে রিপ্রেজেন্ট করতে পারবেন। এর সাথে তারা এখানে বসবাসকারী মিলিয়ন বাংলাদেশি ও বাংলাদেশ সরকারের মধ্যে এক সেতুবন্ধন হিসেবে কাজ করতে পারবেন। বাংলাদেশ থেকে কোনো ক্যারিয়ার ডিপ্লোম্যাটকে পাঠালে বা অন্য দেশে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগকৃত কাউকে পদায়ন করলে এখানের কমিউনিটির প্রকৃত অবস্থা জানতে ও এই পরিবেশের সাথে নিজেকে খাপ খাইয়ে নিতে অনেক সময় চলে যাবে।
যুক্তরাজ্যে অনেক দক্ষ, উচ্চশিক্ষিত, স্মার্ট, যোগ্য ও অভিজ্ঞ ব্যক্তিত্ব ও প্রফেশনালরা আছেন যারা শুধু হাইকমিশনার বা রাষ্ট্রদূত হিসেবে নয় বরং বাংলাদেশ সরকারের মন্ত্রণালয়ের যেকোনো ডিপার্টমেন্ট অনায়াসে দক্ষতার সাথে চালাতে পারবেন। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বৃটেনে সুদীর্ঘ প্রায় ১৭ বছর বসবাস করেছেন। বৃটেনে বসবাসরত বাংলাদেশীদের সম্ভাবনা (potential) কতটুকু তাঁর চেয়ে বেশি আর কে জানবে!
সুতরাং সব কিছুর বিবেচনায় বৃটেনে পরবর্তী বাংলাদেশ হাইকমিশনার যেন যুক্তরাজ্যের বাংলাদেশী কমিউনিটি থেকে নিয়োগ দেয়া হয় - এটা একটি যৌক্তিক ও প্রাসঙ্গিক দাবী। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সদয় বিবেচনায় রাখলাম।
লেখক: বিশিষ্ট আইনজীবী, রাষ্ট্রচিন্তক, সংবিধান বিশেষজ্ঞ, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের আইনজীবী এবং ইংল্যান্ডের প্র্যাকটিসিং ব্যারিস্টার।
Email: [email protected]
যুক্তরাজ্যে পরবর্তী বাংলাদেশ হাইকমিশনার বৃটেনের বাংলাদেশি কমিউনিটি থেকে নিয়োগের যৌক্তিকতা
ব্যারিস্টার নাজির আহমদ
মত-মতান্তর
৩ মাস আগে
৯ মার্চ (সোমবার), ২০২৬, ১১ঃ২৪ (পূর্বাহ্ণ)
লিংক কপি হয়েছে!
ফন্ট সাইজ:
100%
