জামানত হারিয়েছেন ১,৩৪৭ প্রার্থী

সংসদ নির্বাচন

জামানত হারিয়েছেন ১,৩৪৭ প্রার্থী

ফন্ট সাইজ:

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে গত ১২ই ফেব্রুয়ারি। ব্যালটের যুদ্ধে ব্যাপক সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করে বিএনপি। অন্যদিকে জামায়াতের নেতৃত্বাধীন এগারো দলীয় জোট যায় সংসদে বিরোধী দল হিসেবে। সদ্য অনুষ্ঠিত এই ভোটে ৫০টি দলের ও স্বতন্ত্র মিলে ভোটে প্রার্থী ছিলেন ২০২৮ জন। এর মধ্যে জামানত হারিয়েছেন ১,৩৪৭ জন প্রার্থী। এবার প্রার্থীদের জামানত ছিল ৫০ হাজার টাকা। প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী ১৩৪৭ জন (৬৬% প্রতিদ্বন্দ্বী) প্রায় পৌনে সাত কোটি টাকার জামানত খুইয়েছেন। সম্প্রতি ২৯৭ আসনের কেন্দ্রভিত্তিক বিস্তারিত ফল নিজস্ব ওয়েবসাইটে প্রকাশ করেছে নির্বাচন কমিশন। ফলাফল বিশ্লেষণেও এসব তথ্য দেয়া হয়েছে।

ইসি’র জনসংযোগ পরিচালক রুহুল আমিন মল্লিক জানান, ভোটের ফলাফলের গেজেট প্রকাশের পর আদালতে চ্যালেঞ্জ করতে পারেন সংক্ষুব্ধ যে কেউ। এ জন্য ৪৫ দিন সময় রয়েছে। এ সময়সীমা পার হওয়ার পর জামানতের অর্থ ফেরতের যোগ্যরা আবেদন করতে পারেন।
এদিকে ইসি’র ওয়েব সাইটে প্রকাশ হওয়া ফলাফলে বলা হয়, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর প্রাপ্ত ভোটের ব্যবধান এক কোটি ৩৬ লাখ ৪৩ হাজার ৭৩৫। ২৯৯টি আসনে ৪২ হাজার ৬৫১টি কেন্দ্রে ভোট গ্রহণ করা হয়েছে। এর মধ্যে ২৯৭টি আসনের আনুষ্ঠানিক ফলাফল ঘোষণা করা হয়। চট্টগ্রাম-২ ও চট্টগ্রাম-৪ আসনের ফলাফল আদালতে মামলা নিষ্পত্তি হলে ঘোষণা করা হবে।

ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা বিএনপি প্রার্থীরা মোট ৩ কোটি ৭৪ লাখ ৬৮ হাজার ৯৯৪ ভোট পেয়েছেন। দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীরা পেয়েছেন ২ কোটি ৩৮ লাখ ২৫ হাজার ২৫৯ ভোট। ২৯৯ আসনে মোট ভোটার ১২ কোটি ৭২ লাখ ৯৮ হাজার ৫৮৫। এর মধ্যে ভোট দিয়েছেন ৭ কোটি ৬৬ লাখ ৮১ হাজার ১৯৩ জন। ভোট পড়ার হার ৬০ দশমিক ২৪ শতাংশ। প্রদত্ত ভোটের মধ্যে বৈধ ৭ কোটি ৪৯ লাখ ৯০ হাজার ১১৩টি।

ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থীরা ২১১টি আসন পেয়েছেন (চট্টগ্রাম-২ ও চট্টগ্রাম-৪ আসনসহ)। এই প্রতীকের প্রার্থীরা সব আসনে পেয়েছেন বৈধ ভোটের ৪৯ দশমিক ৯৭ শতাংশ। জামায়াতের দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের প্রার্থীরা ৬৮টি আসন পেয়েছেন। দলটির প্রাপ্ত ভোটের হার ৩১ দশমিক ৭৭ শতাংশ।
জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ছয়টি আসনে জয়লাভ করেছে। দলটির প্রার্থীরা পেয়েছেন ২২ লাখ ৮৬ হাজার ৭৯৫ ভোট, যা বৈধ ভোটের ৩ দশমিক শূন্য ৫ শতাংশ। বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস দু’টি আসন পেলেও দলটির সব প্রার্থী মোট ভোট পেয়েছেন ১৫ লাখ ৬৪ হাজার ১৮৭টি, শতকরা হার দুই দশমিক শূন্য ৯ শতাংশ। খেলাফত মজলিস পেয়েছে একটি আসন। ভোট পেয়েছে ৫ লাখ ৬৯ হাজার ৭৩০টি, শতকরা হার শূন্য দশমিক ৭৬ শতাংশ। গণসংহতি আন্দোলন একটি আসনে জয়লাভ করেছে। মোট ভোট পেয়েছে ১ লাখ ৪ হাজার ৮১২টি, শতকরা হার দশমিক ১৪ শতাংশ। গণঅধিকার পরিষদ পেয়েছে দুই লাখ ৪৩ হাজার ৫১১ ভোট। একটি আসনে জয়লাভ করলেও দলটির ভোটের হার দশমিক ৩২ শতাংশ। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ একটি আসনে জয়লাভ করলেও মোট ভোট পেয়েছে ২০ লাখ ২৪ হাজার ১৪০টি। একটি আসনে জয়লাভ করে বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি। মোট ভোট পেয়েছে ১ লাখ ৫ হাজার ৭৭৯টি, শতকরা হার দশমিক ১৪ শতাংশ। নির্বাচনে অংশ নেয়া ৫০টি দলের মধ্যে বাকি ৪১টি দলের কোনোটি ১ শতাংশ ভোটও পায়নি।

যে ব্যবধান গড়ে পোস্টাল ব্যালট
দেশে ও বিদেশ থেকে ১৫ লাখ ২০ হাজার ৯৩ জন পোস্টাল ব্যালটে ভোট দিয়েছেন। এর মধ্যে বাতিল ভোট ৫৭ হাজার ৮৯৮টি। ১০ লাখ ৬৩ হাজার ৮৭৪টি ভোট রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে পৌঁছেছে। সে হিসাবে প্রদত্ত ভোটের হার ৬৯ দশমিক ৯৯ শতাংশ। প্রতিটি আসনে পোস্টাল ব্যালটের ভোট গণনার জন্য রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয়ে আলাদা একটি ভোটকেন্দ্র রাখা হয়।

নির্বাচন কর্মকর্তারা বলেন, পোস্টাল ব্যালটের অধিকাংশ কেন্দ্রে বিএনপি’র চেয়ে এগিয়ে ছিল জামায়াত, এনসিপি ও তাদের জোটের প্রার্থীরা। তবে দু’টি আসনে পোস্টাল ব্যালটের ভোটেই জয়-পরাজয় নির্ধারিত হয়েছে। মাদারীপুর-১ আসনে ৩৮৫ এবং সিরাজগঞ্জ-৪ আসনে ৫৯৪ ভোটের ব্যবধানে জয় পেয়েছেন দুই প্রার্থী। মাদারীপুর-১ আসনে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের প্রার্থী জয় পেয়েছেন ৬৪,৯০৯ ভোটে। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপি প্রার্থীর ভোট ছিল ৬৪,৫২৪টি। এ আসনে পোস্টাল ব্যালটের ভোট ব্যবধান গড়েছে বলে আলোচনা রয়েছে। খেলাফত মজলিসের প্রার্থী পোস্টাল ব্যালটে ভোট পান ১,৩৯৮টি এবং বিএনপি প্রার্থী পান ২৩৩ ভোট। সিরাজগঞ্জ-৪ আসনে দাঁড়িপাল্লার প্রার্থী জিতেছেন ১,৬১,৮৭২ ভোট পেয়ে; বিএনপি প্রার্থী পান ১,৬১,২৭৮ ভোট। এখানে জামায়াত প্রার্থী পোস্টাল ব্যালটে ভোট পান ২১৭৯ আর ধানের শীষ প্রার্থী পান ৮২০ ভোট।

৬০ আসনে ভোট পড়ে ৭০ শতাংশের বেশি
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৬০টি আসনে ভোট পড়েছে ৭০ শতাংশের বেশি। সবচেয়ে বেশি ৭৮ দশমিক ২৭ শতাংশ ভোট পড়েছে চুয়াডাঙ্গা-২ আসনে। সর্বনিম্ন ৩৭ দশমিক ৪২ শতাংশ ভোট পড়ে ঢাকা-১২ আসনে।
ইসি’র প্রকাশিত ফলাফলে যেসব আসনে ৭০ শতাংশের বেশি ভোট পড়েছে, সেগুলো হলো- পঞ্চগড়-১, পঞ্চগড়-২, ঠাকুরগাঁও-১, ঠাকুরগাঁও-২, ঠাকুরগাঁও-৩, দিনাজপুর-১, দিনাজপুর-২, দিনাজপুর-৪, দিনাজপুর-৫, দিনাজপুর-৬, নীলফামারী-২, নীলফামারী-৩, লালমনিরহাট-১, জয়পুরহাট-১, জয়পুরহাট-২, বগুড়া-২, বগুড়া-৩, বগুড়া-৪, বগুড়া-৫, বগুড়া-৬, বগুড়া-৭, চাঁপাইনবাবগঞ্জ-১, চাঁপাইনবাবগঞ্জ-২, নওগাঁ-১, নওগাঁ-২, নওগাঁ-৩, নওগাঁ-৪, রাজশাহী-১, রাজশাহী-৩, রাজশাহী-৪, রাজশাহী-৬, নাটোর-১, নাটোর-২, নাটোর-৩, নাটোর-৪, সিরাজগঞ্জ-৪, পাবনা-১, পাবনা-৩, পাবনা-৪, মেহেরপুর-১, কুষ্টিয়া-২, কুষ্টিয়া-৩, কুষ্টিয়া-৪, চুয়াডাঙ্গা-১, চুয়াডাঙ্গা-২, ঝিনাইদহ-১, ঝিনাইদহ-২, ঝিনাইদহ-৩, ঝিনাইদহ-৪, যশোর-১, যশোর-২, যশোর-৪, যশোর-৫, যশোর-৬, বাগেরহাট-২, বাগেরহাট-৩, খুলনা-৫, সাতক্ষীরা-১, সাতক্ষীরা-২ ও সাতক্ষীরা-৩ আসন।

উল্লেখ্য, গত ১২ই ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৩০০ আসনের মধ্যে ২৯৯টিতে ভোটগ্রহণ করে ইসি। শেরপুর-৩ আসনের বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী নুরুজ্জামান বাদলের মৃত্যুতে এই আসনের নির্বাচন বাতিল করে নির্বাচন কমিশন। আগামী ৯ই এপ্রিল এই আসনের এবং তারেক রহমানের ছেড়ে দেয়া বগুড়া-৬ আসনে ভোট হবে। এ ছাড়া চট্টগ্রাম-২ ও চট্টগ্রাম-৪ আসনের ফলাফল আদালতের আদেশে স্থগিত থাকায় ২৯৭টি আসনের ফল ঘোষণা করে ইসি।

ইসি’র দেয়া তথ্যমতে জানা গেছে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নেয় ৫০টি রাজনৈতিক দল। আর ২৯৯ আসনে অংশ নেয় ২ হাজার ২৮ জন প্রার্থী। এরমধ্যে রাজনৈতিক দলের ১ হাজার ৭৫৫ জন এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী ২৭৩ জন। এই প্রার্থীদের মধ্যে পুরুষের সংখ্যা ১ হাজার ৯৪৬। তাদের মধ্যে বিভিন্ন দলের ১ হাজার ৬৯২ জন এবং স্বতন্ত্র ২৫৩ জন। আর নারী প্রার্থীর সংখ্যা ৮৩। তাদের মধ্যে বিভিন্ন দলের ৬৩ জন এবং স্বতন্ত্র ২০ জন।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন