মূল্যস্ফীতি আবার ৯ শতাংশ ছাড়িয়েছে। ফেব্রুয়ারি মাসে সার্বিক মূল্যস্ফীতি হয়েছে ৯.১৩ শতাংশ। ৯ মাস পর মূল্যস্ফীতি আবার ৯ শতাংশের ঘরে গেল। গত বছরের মে মাসে ৯.০৫ শতাংশ মূল্যস্ফীতি হয়েছিল।
অন্যদিকে গত ফেব্রুয়ারি মাসে মূল্যস্ফীতি ছিল গত ১০ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ। গত বছরের এপ্রিল মাসে মূল্যস্ফীতি ছিল ৯.১৭ শতাংশ। গত বছরের এপ্রিল মাসের পর এই ফেব্রুয়ারি মাসের মূল্যস্ফীতিই সর্বোচ্চ।
রোববার বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ফেব্রুয়ারি মাসের মূল্যস্ফীতির চিত্র প্রকাশ করেছে। টানা চার মাস ধরে মূল্যস্ফীতি বেড়েছে। এর ফলে মধ্যবিত্ত ও সীমিত আয়ের মানুষের ওপর চাপ আরও বাড়লো।
বিবিএসের হিসাব অনুসারে, চাল, ডাল, সবজি, মাছ, মাংসসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম হঠাৎ করেই বেড়েছে। ফলে ফেব্রুয়ারিতে খাদ্য খাতে মূল্যস্ফীতি বেড়ে হয়েছে ৯.৩০ শতাংশ, যা জানুয়ারি মাসে ছিল ৮.২৯ শতাংশ। ফলে এক মাসের ব্যবধানে শুধু খাদ্য খাতে মূল্যস্ফীতি বেড়েছে ১ শতাংশ। আর খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি হয় ৯.০১ শতাংশ। টানা পাঁচ মাস ধরে খাদ্য মূল্যস্ফীতি বেড়েছে। তিন বছর ধরে দেশে উচ্চ মূল্যস্ফীতি বিরাজ করছে। ২০২৫ সালে গড় মূল্যস্ফীতি হয়েছে ৮.৭৭ শতাংশ।
ফেব্রুয়ারিতে গ্রামাঞ্চলে সার্বিক মূল্যস্ফীতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ২১ শতাংশে, যা জানুয়ারিতে ৮ দশমিক ৬৩ শতাংশ ছিল। অন্যদিকে, শহরাঞ্চলে সার্বিক মূল্যস্ফীতি জানুয়ারির ৮ দশমিক ৫৭ শতাংশ থেকে বেড়ে ৯ দশমিক ০৭ শতাংশ হয়েছে। এর মূলে রয়েছে শহরে খাদ্যপণ্যের দাম অস্বাভাবিক বেড়ে যাওয়া।
ফেব্রুয়ারিতে শহরাঞ্চলে খাদ্য খাতে মূল্যস্ফীতি বেড়ে হয়েছে ৯ দশমিক ৮৭ শতাংশ, যা জানুয়ারিতে ৮ দশমিক ৬১ শতাংশ ছিল। অর্থাৎ মাসের ব্যবধানে বেড়েছে ১ দশমিক ২৬ শতাংশ পয়েন্ট। আর, খাদ্যবহির্ভূত খাতে মূল্যস্ফীতি সামান্য বেড়ে জানুয়ারির ৮ দশমিক ৫৪ শতাংশ থেকে ফেব্রুয়ারিতে ৮ দশমিক ৫৭ শতাংশ হয়েছে।
মূল্যস্ফীতি বাড়ায় খেটে খাওয়া মানুষের পকেটের ওপর চাপ বাড়লেও মজুরি হারের সূচকে কোনো সুখবর নেই।
সার্বিক মূল্যস্ফীতির হার যেখানে ৯ দশমিক ১৩, সেখানে ফেব্রুয়ারি মজুরি বৃদ্ধির হার ৮ দশমিক ০৬ শতাংশ। যা আগের জানুয়ারি মাসের তুলনায়ও কম। ওই মাসে মজুরি বৃদ্ধির হার ছিল ৮ দশমিক ০৮ শতাংশ। এর অর্থ হলো, জীবযাত্রার ব্যয় যে হারে বাড়ছে, মানুষের আয় সেভাবে বাড়ছে না। উল্টো আগের তুলনায় কমছে।
পরিসংখ্যান বলছে, সাম্প্রতিক মাসগুলোতে খাদ্যপণ্যের দাম বাড়ার প্রবণতার কারণেই সামগ্রিক মূল্যস্ফীতির ওপর চাপ তৈরি হয়েছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, বাজার ব্যবস্থাপনা, সরবরাহ পরিস্থিতি এবং আমদানি ব্যয়ের পরিবর্তনের ওপর মূল্যস্ফীতির গতিপ্রকৃতি অনেকটাই নির্ভর করছে।
এদিকে মানুষের আয় বেশি বাড়লে জিনিসপত্রের দাম বাড়লেও তা কিনতে তেমন সমস্যা হয় না। কিন্তু দেশে প্রায় চার বছর ধরে মূল্যস্ফীতির চেয়ে মজুরি বৃদ্ধির হার কম।
বিবিএসের তথ্যে দেখা যায়, ফেব্রুয়ারি মাসে জাতীয় মজুরি হার ছিল ৮ দশমিক শূন্য ছয় শতাংশ। আর সার্বিক মূল্যস্ফীতি হয়েছে ৯ দশমিক ১৩ শতাংশ। জানুয়ারিতে জাতীয় মজুরি হার ছিল ৮ দশমিক শূন্য ছয় শতাংশ। আর মূল্যস্ফীতি হয়েছিল ৮ দশমিক ৫৮ শতাংশ। এর মানে মূল্যস্ফীতি যে হারে বেড়েছে, মজুরি সেই হারে বাড়েনি।
বিশ্বব্যাংক ঢাকা অফিসের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন বলেন, গত কয়েক মাস ধরে মূল্যস্ফীতি বাড়ছে। এখন ৯ শতাংশ ছাড়ালো। রোজার মাস চলছে। মার্চে মূল্যস্ফীতি আরও কিছুটা বাড়তে পারে। কিন্তু এরই মধ্যে যুদ্ধের প্রভাব পড়তে শুরু করেছে আমাদের অর্থনীতিতে। যুদ্ধটা দীর্ঘায়িত হলে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেল, খাদ্যপণ্যসহ সব জিনিসের দাম বাড়বে; বাড়বে পরিবহন খরচ। তার প্রভাব বাংলাদেশেও পড়বে; বাড়বে মূল্যস্ফীতি।
