লন্ডনে বাংলাদেশের হাইকমিশন দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক মিশনগুলোর একটি। যুক্তরাজ্যে বসবাসরত বিশাল প্রবাসী বাংলাদেশি জনগোষ্ঠী, দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য, রাজনৈতিক যোগাযোগ এবং আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে এই মিশনের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ফলে এই মিশনের নেতৃত্ব শুধু প্রশাসনিক দায়িত্ব নয়; এটি দেশের ভাবমূর্তি, কূটনৈতিক দক্ষতা এবং রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।
১৯৮৫ সালের দিকে আমি যখন লন্ডনে যাই, তখন বাংলাদেশের হাইকমিশনার ছিলেন মরহুম ফখরুদ্দীন সাহেব। পরে তিনি বাংলাদেশের পররাষ্ট্র সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। সেই সময়ে হাইকমিশনের কর্মকাণ্ডে একটি পেশাদার কূটনৈতিক পরিবেশ লক্ষ্য করা যেত। তার পরবর্তী সময়ে লেফটেন্যান্ট জেনারেল মীর শওকত আলী হাইকমিশনার হিসেবে দায়িত্ব নেন। কিন্তু তৎকালীন রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের সঙ্গে মতবিরোধের কারণে তাকে পরে পদচ্যুত করা হয়। এরপর হাইকমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন জেনারেল সফিউল্লাহ। ১৯৯১ সালে বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর দলের স্ট্যান্ডিং কমিটির সদস্য ড. ইউসুফ লন্ডনে বাংলাদেশের হাইকমিশনার হিসেবে নিয়োগ পান। আবার ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর মাহমুদ আলী সাহেব এই দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তার সময়ে হাইকমিশনের কার্যক্রম নিয়ে নানা আলোচনা শুরু হয়। অনেকের মতে, সেই সময়ে কূটনৈতিক মিশনের পেশাদার চরিত্রের পাশাপাশি রাজনৈতিক প্রভাবও বেশ দৃশ্যমান হয়ে ওঠে।
লন্ডনের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ মিশনে হাইকমিশনের ভূমিকা কেবল আনুষ্ঠানিক কূটনীতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। যুক্তরাজ্যে বসবাসরত লক্ষাধিক প্রবাসী বাংলাদেশির সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা, তাদের বিভিন্ন প্রশাসনিক সেবা প্রদান, বাংলাদেশে বিনিয়োগ ও বাণিজ্য সমপ্রসারণে সহায়তা করা, বৃটিশ সরকার ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে নিয়মিত কূটনৈতিক যোগাযোগ বজায় রাখার সবকিছুই এই মিশনের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বের অংশ।
পরবর্তী সময়ে মুনা তাসনীম দীর্ঘ ছয় বছর লন্ডনে হাইকমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তার পরে আবিদা ইসলাম এই দায়িত্ব গ্রহণ করেন। সামপ্রতিক সময়ে তার কূটনৈতিক ভূমিকা নিয়ে বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন উঠেছে এবং বর্তমান সরকার তাকে প্রত্যাহার করেছে। এসব ঘটনাপ্রবাহ আমাদের আবারো মনে করিয়ে দেয় যে, গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক মিশনগুলোতে নিয়োগের ক্ষেত্রে সর্বাগ্রে পেশাদার দক্ষতা ও অভিজ্ঞতাকে গুরুত্ব দেয়া উচিত।
বিশ্বের অধিকাংশ দেশ তাদের গুরুত্বপূর্ণ মিশনগুলোতে অভিজ্ঞ পেশাদার কূটনীতিকদেরই নিয়োগ দিয়ে থাকে। কারণ কূটনীতি একটি বিশেষায়িত পেশা, যেখানে আন্তর্জাতিক রাজনীতি, কূটনৈতিক শিষ্টাচার, অর্থনৈতিক সম্পর্ক এবং প্রবাসী সমপ্রদায়ের সঙ্গে কার্যকর যোগাযোগ সবকিছুর সমন্বিত দক্ষতা প্রয়োজন। এই দক্ষতা দীর্ঘ অভিজ্ঞতা ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে অর্জিত হয়।
বিশেষ করে লন্ডন হাইকমিশনের কিছু বিশেষায়িত কাজ রয়েছে। প্রবাসী সমপ্রদায়ের সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক বজায় রাখা, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বৃদ্ধির জন্য কাজ করা, সাংস্কৃতিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ক জোরদার করা এসব ক্ষেত্রে দক্ষ সমন্বয় অপরিহার্য। এজন্য সেখানে অন্তত দুইজন অভিজ্ঞ ডেপুটি হাইকমিশনার নিয়োগ দেয়াও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এতে প্রশাসনিক দায়িত্ব ভাগাভাগি হবে এবং বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে কার্যক্রম আরও গতিশীল হবে।
বাংলাদেশের মতো একটি উন্নয়নশীল দেশের জন্য আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইতিবাচক ভাবমূর্তি অত্যন্ত মূল্যবান সম্পদ। সেই ভাবমূর্তি রক্ষা ও উন্নত করার ক্ষেত্রে কূটনৈতিক মিশনগুলোর ভূমিকা অপরিসীম। তাই লন্ডনের মতো গুরুত্বপূর্ণ মিশনে নেতৃত্ব নির্বাচনের ক্ষেত্রে দলীয় আনুগত্যের পরিবর্তে পেশাদার দক্ষতা, অভিজ্ঞতা এবং রাষ্ট্রের বৃহত্তর স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেয়াই সময়ের দাবি।
রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক মিশনগুলোকে দলীয় রাজনীতির প্রভাবমুক্ত রেখে পেশাদার কূটনীতির ধারায় পরিচালনা করা গেলে তা দেশের জন্যই মঙ্গলজনক হবে।
লন্ডন হাইকমিশন : পেশাদার কূটনীতির প্রয়োজনীয়তা
নজরুল ইসলাম বাসন
৯ মার্চ (সোমবার), ২০২৬
লিংক কপি হয়েছে!
ফন্ট সাইজ:
100%
