কণ্টকাকীর্ণ পথে আলোর মিছিল: সংঘাত ছাপিয়ে নারীর জয়গান

কণ্টকাকীর্ণ পথে আলোর মিছিল: সংঘাত ছাপিয়ে নারীর জয়গান

ফন্ট সাইজ:

আজ থেকে ১১৬ বছর আগে ক্লারা জেটকিন যখন নারী দিবসের ডাক দিয়েছিলেন, তখন দাবি ছিল স্রেফ ভোটাধিকার আর কাজের ন্যায্য পরিবেশ। আজ ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে সেই দাবির পরিধি বিস্তৃত হয়েছে মহাকাশ থেকে শুরু করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার গহন কোণ পর্যন্ত। কিন্তু পথটা কি মসৃণ হয়েছে? উত্তরটি না। নারী দিবসের এবারের মূল প্রতিপাদ্য ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক সমতা: সংঘাতমুক্ত আগামীর অঙ্গীকার’ আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় যে, এখনও পৃথিবীতে নারীর পথচলা মানেই এক নিরন্তর সংগ্রাম।

সংঘাতের বিপরীতে দাঁড়িয়ে নারী-বর্তমান বিশ্বরাজনীতিতে ইউ এস-ইরান কিংবা মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা যখন তেলের বাজার আর অর্থনীতির সূচককে কাঁপিয়ে দিচ্ছে, তখন সেই যুদ্ধের সবচেয়ে গভীর ক্ষত বয়ে বেড়াতে হচ্ছে নারীকে। ইতিহাসের প্রতিটি সংঘাতময় অধ্যায়ে দেখা গেছে, নারী কেবল শিকার নয়, বরং ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে জীবনের বীজ বোনা কারিগরও। ইরানের নারীদের কথাই ধরা যাক। দীর্ঘদিনের সামাজিক ও রাজনৈতিক কণ্টকাকীর্ণ পথ মাড়িয়ে তারা আজ যেভাবে নিজেদের অধিকার আর কণ্ঠস্বরকে বিশ্বমঞ্চে প্রতিষ্ঠিত করেছে, তা সমকালীন ইতিহাসের এক অনন্য অমরগাথা। নার্গিস মোহাম্মদী থেকে শুরু করে অগণিত নাম না জানা নারী- কারাগারের দেয়াল যাদের অদম্য ইচ্ছাকে দমিয়ে রাখতে পারেনি।

সাফল্যের আকাশে কতিপয় নক্ষত্র-পৃথিবীর অন্ধকার কোণগুলো যখন নারীবিদ্বেষ বা যুদ্ধের কালো মেঘে ঢেকে যায়, তখন কিছু নাম আমাদের আলোর পথ দেখায়। আমরা যদি মালালা ইউসুফজাইয়ের কথা বলি, তবে সেটি কেবল একটি মেয়ের পড়াশোনার গল্প নয়; সেটি ছিল বুলেটের বিপরীতে কলমের এক ঐতিহাসিক বিজয়।

আবার জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে যখন বিশ্ব হিমশিম খাচ্ছে, তখন গ্রেটা থুনবার্গের মতো তরুণীদের আপসহীন লড়াই আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, আগামীর পৃথিবী রক্ষার দায়ভার নারীরাই কাঁধে তুলে নিয়েছে। বিজ্ঞানের জগতে তাকালে দেখা যায়, অতিমারী উত্তর পৃথিবীতে প্রাণরক্ষাকারী প্রযুক্তির উদ্ভাবনে ক্যাটালিন কারিকোদের মতো নারীদের অবদান আজ স্বর্ণাক্ষরে লেখা। তারা প্রমাণ করেছেন, গবেষণাগারের নিভৃত কোণ থেকে শুরু করে যুদ্ধের ময়দান কোথাও নারী দ্বিতীয় সারির নয়।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট: মাটির কাছাকাছি সফলতার গল্প-আমাদের প্রিয় বাংলাদেশে নারীর অগ্রযাত্রা আজ বিশ্বের জন্য এক বিস্ময়। এ দেশের পোশাক কারখানার সেই শ্রমজীবী নারী, যিনি কাকডাকা ভোরে যুদ্ধের মতো করেই রাজপথে নামেন জীবিকার তরে, তিনিই আমাদের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি। হিমালয় জয়ী বাংলাদেশের মেয়েরা যখন এভারেস্টের চূড়ায় পা রাখে কিংবা সাফ জয়ী ফুটবলাররা যখন ট্রফি নিয়ে ঘরে ফেরে, তখন স্পষ্ট বোঝা যায়—বাধা যত কঠিনই হোক, বাঙালির নারীর মনোবল তার চেয়েও দৃঢ়।

তবে এই সাফল্যের পথ কুসুমাস্তীর্ণ ছিল না। যৌতুক, বাল্যবিবাহ আর সামাজিক কুসংস্কারের যে কাঁটা বিছানো ছিল পদে পদে, সেগুলোকে দু’পায়ে দলে আমাদের নারীরা আজ উদ্যোক্তা হচ্ছে, বিমান চালাচ্ছে, এমনকি শান্তিরক্ষা মিশনে বিদেশের মাটিতেও বীরত্ব দেখাচ্ছে।

সংগ্রাম ও অমরগাথা-নারীর জীবন মানেই এক হার না মানা অমরগাঁথা। এই গাঁথা কেবল অর্জনের নয়, এই গাঁথা টিকে থাকার। একজন নারী যখন সংসার আর ক্যারিয়ারের কঠিন ভারসাম্য রক্ষা করেন, যখন তিনি সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে সন্তান আগলে রাখেন, কিংবা যখন তিনি নীতি-নির্ধারণী টেবিলে পুরুষতন্ত্রের চোখে চোখ রেখে কথা বলেন—তখনই রচিত হয় ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ পঙ্ক্তিমালা।

২০২৬ সালের এই নারী দিবসে আমাদের শপথ হওয়া উচিত কেবল কাগজে-কলমে সমতা নয়, বরং মনস্তাত্ত্বিকভাবে নারীর সংগ্রামকে স্বীকৃতি দেয়া। কণ্টকাকীর্ণ পথ পেরিয়ে যে আলো নারীরা পৃথিবীতে ছড়িয়ে দিচ্ছেন, সেই আলোকে আরও প্রজ্জ্বলিত করতে সমাজ ও রাষ্ট্রকে প্রকৃত অর্থেই সহায়ক ভূমিকা পালন করতে হবে।

সংগ্রামের অবিনাশী গাথা ও আগামীর জয়গান । ইতিহাসের বাঁক বদলানো সংগ্রাম নারীর জয়যাত্রা কখনোই কুসুমাস্তীর্ণ ছিল না। বিংশ শতাব্দীর শুরু থেকে আজ পর্যন্ত, ভোটের অধিকার থেকে শুরু করে সমান মজুরির লড়াই—প্রতিটি অর্জনের পেছনে রয়েছে লক্ষ লক্ষ নারীর রক্ত ও চোখের জল।

শিক্ষা ও অধিকারের লড়াই: মালালা ইউসুফ জাইয়ের মতো অকুতোভয় কন্যারা আমাদের শিখিয়েছেন, বুলেটের চেয়ে কলম বেশি শক্তিশালী। আফগানিস্তানে আজ যখন নারী শিক্ষা অন্ধকার মেঘে ঢাকা, তখনো সেখানকার নারীদের নিঃশব্দ প্রতিবাদ বিশ্বকে মনে করিয়ে দেয় যে, স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা কখনো দমানো যায় না।

যুদ্ধ ও সংঘাতের মাঝে টিকে থাকা: প্যালেস্টাইন থেকে ইউক্রেন- ২০২৬ সালেও যুদ্ধের ময়দানে নারীরাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত। কিন্তু ধ্বংসস্তূপের মাঝেও সংসার আগলে রাখা এবং শান্তির দূত হিসেবে কাজ করার যে লড়াই তারা চালিয়ে যাচ্ছেন, তা অতুলনীয়।

সফলতার বৈশ্বিক মানচিত্র- আজকের বিশ্বে নারী কেবল অন্দরে সীমাবদ্ধ নয়, তারা এখন স্পেস স্টেশন থেকে শুরু করে গভীর সমুদ্রের তলদেশ পর্যন্ত বিচরণ করছেন।

বিজ্ঞানের শিখরে: ২০২৬ সালে আমরা দেখছি প্রযুক্তির কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (অও) এবং কোয়ান্টাম কম্পিউটিংয়ের জগতে নারীদের জয়জয়কার। ডাটা সায়েন্স থেকে জলবায়ু পরিবর্তনের সমাধান- সবখানেই নারী বিজ্ঞানীরা নেতৃত্ব দিচ্ছেন।

নেতৃত্বের নতুন রূপ: নিউজিল্যান্ডের জেসিন্ডা আরডার্ন থেকে শুরু করে বাংলাদেশের তৃণমূলের সফল উদ্যোক্তা নারী—তারা প্রমাণ করেছেন যে, সহমর্মিতা আর কঠোরতার সংমিশ্রণই হলো আধুনিক নেতৃত্বের আসল শক্তি।

এবারের থিম আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, উদ্ভাবন যদি সবার জন্য না হয়, তবে সেই অগ্রগতি অর্থহীন। প্রযুক্তি ও ডিজিটাল দুনিয়ায় নারীর সমান অংশগ্রহণ নিশ্চিত করাই এখনকার প্রধান চ্যালেঞ্জ। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে নারীর মেধা যেন কোনো জেন্ডার বায়াসের (এবহফবৎ ইরধং) শিকার না হয়, সেটিই এখন বিশ্বনেতাদের ভাবনার কেন্দ্রবিন্দু।

আমাদের ঘরের পাশের সংগ্রাম-আমরা যখন বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট নিয়ে কথা বলি, তখন আমাদের ভুলে গেলে চলবে না সেই গার্মেন্টস শ্রমিক বোনটির কথা, যিনি ভোরের আলো ফোটার আগে কাজে বের হন। কিংবা সেই নারী ফ্রিল্যান্সারের কথা, যিনি গ্রাম থেকে বিশ্বের বড় বড় প্রজেক্টে কাজ করছেন। বাংলাদেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে এই নারীদের অবদানই সবচেয়ে বড়।

‘আমি আমার চারপাশের নারীদের দিকে তাকাই এবং সেখানে এমন এক শক্তি দেখি যা বিশ্বকে বদলে দিতে পারে। আমাদের দরকার শুধু সেই সুযোগ যা আমাদের প্রাপ্য।’

নারীর লড়াইটা কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে নয়, বরং এক দীর্ঘস্থায়ী কুসংস্কার ও অসম ব্যবস্থার বিরুদ্ধে। ২০২৬ সালের এই নারী দিবসে আমাদের অঙ্গীকার হোক—এমন এক পৃথিবী গড়া, যেখানে কোনো কন্যাসন্তানকে তার স্বপ্নের সীমানা নির্ধারণ করে দিতে হবে না।

আজকের সংগ্রামই হোক আগামী দিনের সফলতার ভিত্তি। শুভ হোক আন্তর্জাতিক নারী দিবস!

মনে রাখতে হবে, পৃথিবীটা কেবল পুরুষের নয়, পৃথিবীটা মানুষের। আর সেই মানবিক পৃথিবীর অর্ধেক আকাশ আগলে রাখা নারীর সম্মান আর সুরক্ষা নিশ্চিত না হলে কোনো জয়ই পূর্ণতা পাবে না।
লেখক: ব্যাংকার

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন