ক্যাম্পস’র আলোচনায় সভায় কিডনি রোগ নিয়ন্ত্রণে সমন্বিত ও পরিকল্পিত প্রয়াসের প্রতি গুরুত্বারোপ

ক্যাম্পস’র আলোচনায় সভায় কিডনি রোগ নিয়ন্ত্রণে সমন্বিত ও পরিকল্পিত প্রয়াসের প্রতি গুরুত্বারোপ

ফন্ট সাইজ:

কিডনি রোগ বিশ্বজুড়ে ক্রমাগত বেড়েই চলছে। বাংলাদেশেও এই রোগের প্রাদুর্ভাব উদ্বেগজনক হারে উর্ধ্বমুখী। কিডনি রোগের কারণে শুধু ব্যক্তিগত জীবনই বিপর্যস্ত হয় না বরং এই রোগ পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের উপরও বিশাল অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি করে। কিডনি রোগের মারাত্মক পরিণতি, অতিরিক্ত চিকিৎসা খরচ এবং চিকিৎসা ব্যয় সাধ্যাতীত হওয়ায় সিংহভাগ রোগী প্রায় বিনা চিকিৎসায় মৃত্যুর করুন চিত্র তুলে ধরেন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ক্যাম্পস আয়োজিত “জলবায়ু পরিবর্তন ও কিডনি রোগঃ ঝুঁকি ও করণীয়” শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকের আলোচকরা।
বক্তারা এ পরিস্থিতির উন্নয়নে সরকারি/ বেসরকারি ও স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা কিংবা প্রতিষ্ঠানগুলোর সমন্বিত ও পরিকল্পিত প্রয়াসের প্রতি গুরুত্ব আরোপ করেন।
‘‘বিশ্ব কিডনি দিবস-২০২৬’’ উদযাপন উপলক্ষ্যে আয়োজিত কর্মসূচীর অংশ হিসেবে দেশের শীর্ষস্থানীয় কিডনি বিষয়ক বেসরকারি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা কিডনি এওয়ারনেস মনিটরিং এন্ড প্রিভেনশন সোসাইটি (ক্যাম্পস) শনিবার জাতীয় প্রেস ক্লাবে গোলটেবিল বৈঠকের আয়োজন করে।
গোলটেবিল বৈঠকে মূল প্রবন্ধ পাঠ করেন ক্যাম্পস এর প্রতিষ্ঠাতা ও সভাপতি অধ্যাপক ডা. এম এ সামাদ। তিনি তার মূল প্রবন্ধে বলেন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এর তথ্য অনুযায়ী, কিডনি রোগ বিশ্বব্যাপী মৃত্যুর অন্যতম কারণ গুলোর মধ্যে একটি। উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলিতে কিডনি রোগের প্রকোপ বাড়ছে, বিশেষ করে ডায়াবেটিস, উচ্ছ রক্তচাপ এবং স্থ’ূলতার মতো অসংক্রামক রোগের কারণে। বিশ্বব্যাপী প্রায় ৮৫ কোটি মানুষ শুধু দীর্ঘ¯’ায়ী কিডনি রোগে আক্রান্ত। এই সংখ্যা ডায়াবেটিস রোগীদের চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ এবং ক্যান্সার রোগীদের চেয়ে প্রায় বিশ গুণ। মৃত্যুর কারণ হিসেবে কিডনি রোগ ১৯৯০ সালে ছিল ১৯তম স্থানে, বর্তমানে দাঁড়িয়েছে ৭ম স্থানে, এভাবে চলতে থাকলে ২০৪০ সালে দখল করে নেবে ৫ম স্থান। আবার উন্নয়নশীল বা স্বল্পোন্নত দেশে কিডনি রোগের হার সবচেয়ে বেশি।
তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশে কিডনি রোগ দ্রুত মহামারির দিকে এগুচ্ছে, যার মধ্যে জলবায়ু পরিবর্তন একটি নতুন ভয়াবহ হুমকি হিসেবে যুক্ত হয়েছে। ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, সংক্রমণ, ভেজাল খাদ্য, কীটনাশকের সঙ্গে তাপপ্রবাহ, লবণাক্ততা, বিশুদ্ধ পানির সংকট কিডনি রোগকে আরও ত্বরান্বিত করছে।



অধ্যাপক ডা. এম এ সামাদ বলেন, বাংলাশেও কিডনি রোগের প্রাদুর্ভাব উদ্বেগজনক। তথ্য মতে, প্রায় ৩ কোটি ৮০ লাখ লোক কোন না কোন কিডনি রোগে আক্রান্ত। এর মধ্যে প্রতি বছর প্রায় ৪০ হাজার কিডনি রোগী ডায়ালাইসিসের উপর নির্ভরশীল হয়। শহর ও গ্রামাঞ্চলে সমানভাবে এই রোগ ছড়িয়ে পড়ছে। দারিদ্র্য, অসচেতনতা, চিকিৎসা সেবার অপ্রতুলতা এবং অস্বা¯’্যকর জীবনযাপন এই সমস্যাকে আরও বাড়িয়ে তুলছে। আরো ২৪ থেকে ৩০ হাজার রোগী হঠাৎ কিডনি বিকল হয়ে সাময়িক ডায়ালাইসিস প্রয়োজন হয়। এই রোগ আমাদের দেশের জন্য একটি বড় অর্থনৈতিক ও স্বাস্থ্যগত সমস্যা। পক্ষান্তরে, সবাই যদি কিডনি রোগের ব্যাপকতা, ভয়াবহতা, পরিণতি ও কারণ সম্পর্কে সচেতন থাকে এবং স্বা¯’্য সম্মত জীবনযাপন করে তা হলে ৬০-৭০ ভাগ ক্ষেত্রে এই মরণঘাতী কিডনি বিকল প্রতিরোধ করা সম্ভব। কিডনি রোগের সাধারণ কারণ গুলো হল- অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস, উচ্চরক্তচাপ, স্থ’ূলতা, নেফ্রাইটিস, অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, ধূমপান, ব্যাথানাশক ঔষধের অতিরিক্ত ব্যবহার, জন্মগত ও বংশগত কিডনি রোগ, মূত্রতন্ত্রের প্রদাহ ও পাথুরে রোগী। আমরা একটু লক্ষ্য করলেই বুঝতে পারবো যে, প্রায় সবগুলো কারণই আমাদের অস্বাস্থ্যকর জীবন ধারার সাথে জড়িত, একটু সচেতন হলে প্রতিরোধ যোগ্য। তাছাড়া যারা ঝুঁকিতে আছেন যেমন যাদের ডায়াবেটিস, উ”চ রক্তচাপ, ওজন বেশী, বংশে কিডনি রোগ আছে, যারা ধূমপায়ী, যারা তীব্র মাত্রার ব্যাথার ঔষধ খেয়েছেন, যাদের পর্বে কোন কিডনি রোগের ঝুঁকি আছে তাদের বছরে অন্তত ২ বার প্রস্রাব ও রক্তের ক্রিয়েটিনিন পরীক্ষা করে নেয়া উচিৎ। কেননা প্রাথমিক অবস্থায় কিডনি রোগ শনাক্ত করতে পারলে চিকিৎসার মাধ্যমে তা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। দেশের প্রাপ্তবয়স্কদের ১৪-২২% কোনো না কোনো পর্যায়ের দীর্ঘস্থায়ী কিডনি রোগে আক্রান্ত। ডা. এম এ সামাদ বলেন, কিডনি বিকলের চিকিৎসা সর্বাধিক ব্যয়বহুল। ফলে চিকিৎসা করতে গিয়ে পুরো পরিবার নিঃস্ব হয়ে যায়। তাই ক্যাম্পস এর স্লোগান ‘‘কিডনি রোগ জীবননাশা-প্রতিরোধই বাঁচার আশা’’ ঘরে ঘরে পৌঁছে দিতে চাই। অর্থাৎ কিডনি রোগ প্রাথমিক অব¯’ায় সনাক্ত করে চিকিৎসার মাধ্যমে মরণব্যাধি কিডনি বিকল প্রতিরোধ করা যায়। এর জন্য প্রয়োজন গণসচেতনতা।
বাংলাদেশ কিডনি ফাউন্ডেশন এর সভাপতি অধ্যাপক ডা. হারুন-উর-রশিদ বলেন, ডায়াবেটিস আর উচ্চ রক্তচাপের হার কমাতে না পারলে কিডনি রোগ নিয়ন্ত্রণ করা অনেক কঠিন হবে। অসছেতনতাই মূল কারণ, আমরা জানি কিন্ত মানি না, ঝুঁকি জেনেও কেউ টেস্ট করাতে যাই না অথচ প্রথম এবং দ্বিতীয় ধাপে ধরা পরলে কিডনি রোগ নিরাময় করা সম্ভব।
বাংলাদেশ রেনাল এসোসিয়েশন এর সভাপতি অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম বলেন, কিডনি রোগীর সংখ্যা এখন প্রায় ৪ কোটি। ডায়ালাইসিস এর সুযোগ ৬৫ শতাংশই ঢাকাতে কেন্দ্রিভূত। তিনি বলেন, সরকার দ্রুত ঢাকার বাইরে জেলা পর্যায় ডায়ালাইসিস এর সুযোগ সম্প্রসারিত করার উদ্যোগ নিয়েছে।
বাংলাশে ক্রিকেট বোর্ড এর প্রধান নির্বাচক ও জাতীয় দলের সাবেক অধিনায়ক, গাজী আশরাফ হোসেন লিপু বলেন, ক্যাম্পস এর গৃহীত কর্মসূচী গুলো থেকে সাধারন মানুষ খুব উপকৃত হয়। তিনি বলেন, একটি পরিবারের একজন সদস্য কিডনি রোগে আক্রান্ত হলে পুরো পরিবার আর্থিক ভাবে বিপর্যস্ত’ হয়ে যায়।
এ ছাড়াও স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগের সচিব জোবায়দা বেগম, দৈনিক কালের কণ্ঠের সম্পাদক কবি হাসান হাফিজ, অধ্যাপক ডা. সৈয়দ জাকির হোসেন, ক্যাম্পস এর নির্বাহী পরিচালক রেজওয়ান সালেহীন প্রমুখ।



কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন