নারী ও কন্যার নিরাপদ বাংলাদেশ ; আজকের পদক্ষেপ আগামীর ন্যায় বিচার

নারী ও কন্যার নিরাপদ বাংলাদেশ ; আজকের পদক্ষেপ আগামীর ন্যায় বিচার

ফন্ট সাইজ:

৮ মার্চ— আন্তর্জাতিক নারী দিবস। এবারের প্রতিপাদ্য “Rights, Justice, Action – For all women and girls”। বাংলায় যার অর্থ করা হয়েছে—“আজকের পদক্ষেপ, আগামীর ন্যায় বিচার; সুরক্ষিত হোক নারী ও কন্যার অধিকার।” এই প্রতিপাদ্য শুধু একটি স্লোগান নয়; এটি আমাদের সমাজের জন্য একটি স্পষ্ট বার্তা। অধিকার, ন্যায়বিচার ও কার্যকর পদক্ষেপ—এই তিনটি শব্দ বাস্তবায়িত না হলে নারী ও কন্যাশিশুর নিরাপত্তা কাগজেই সীমাবদ্ধ থাকবে।
বাংলাদেশে এখনো প্রতিনিয়ত নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা ঘটছে। সংবাদপত্রের পাতা খুললেই দেখা যায় ধর্ষণ, পারিবারিক সহিংসতা, বাল্যবিবাহ, যৌন হয়রানি কিংবা অনলাইন নির্যাতনের খবর। আইনের কঠোরতা কিছুটা প্রতিরোধ গড়ে তুললেও বাস্তবতা হলো—শুধু আইন প্রণয়ন করলেই সমস্যার সমাধান হয় না। আইনের প্রয়োগ, সামাজিক সচেতনতা এবং মানসিকতার পরিবর্তন একসাথে না ঘটলে নারী সুরক্ষা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।
নারী নির্যাতনের বিষয়টি আমরা সাধারণত তরুণী বা কন্যাশিশুর ক্ষেত্রে বেশি দেখি। কিন্তু আরেকটি নীরব বাস্তবতা হলো—প্রবীণ নারীরাও নির্যাতনের শিকার হন। পরিবারেই কখনো অবহেলা, কখনো সম্পত্তি নিয়ে চাপ, কখনো মানসিক হেনস্তা তাঁদের জীবনের অংশ হয়ে দাঁড়ায়। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আর্থিক ও শারীরিক নির্ভরশীলতা বাড়ে; সেই সুযোগে অনেকেই প্রবীণ নারীর অধিকারকে উপেক্ষা করেন। অথচ একজন প্রবীণ নারী তাঁর সারাজীবনের শ্রম, ত্যাগ ও মমতায় একটি পরিবারকে দাঁড় করান। জীবনের শেষ প্রান্তে এসে তিনি যদি নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন, তবে সেটি শুধু পারিবারিক ব্যর্থতা নয়, সামাজিক ব্যর্থতাও।
সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলোতেও প্রবীণ নারীর অবস্থান দুর্বল। অনেক সময় তাঁরা সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় অংশ নিতে পারেন না। স্থানীয় কমিটি, ধর্মীয় বা সাংস্কৃতিক সংগঠনে তাঁদের প্রতিনিধিত্ব কম। ফলে তাঁদের সমস্যা ও অভিজ্ঞতা আলোচনায় আসে না। নারী অধিকার নিয়ে যখন কথা বলি, তখন প্রবীণ নারীর বিশেষ চাহিদা—স্বাস্থ্যসেবা, নিরাপদ আশ্রয়, মানসিক সঙ্গ—এসব বিষয়ও সমান গুরুত্ব পাওয়া উচিত।
নারী ও শিশু সুরক্ষায় সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলা সময়ের দাবি। পরিবার থেকেই শুরু হতে পারে এই পরিবর্তন। ছেলেশিশুকে ছোটবেলা থেকে শেখাতে হবে—নারীকে সম্মান করা মানবিকতার অংশ। কন্যাশিশুকে শেখাতে হবে—নিজের অধিকার সম্পর্কে সচেতন হতে। স্কুল, মসজিদ, মন্দির, ক্লাব—সব জায়গায় নারী নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিয়ে খোলামেলা আলোচনা হওয়া প্রয়োজন। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও নাগরিক সমাজ একসাথে কাজ করলে সচেতনতা বাড়বে।
আইন অবশ্যই প্রয়োজন। কিন্তু আইনের পাশাপাশি দরকার দ্রুত বিচার ও ভুক্তভোগীর সহায়ক পরিবেশ। নির্যাতনের শিকার নারী যাতে লজ্জা বা ভয় না পেয়ে অভিযোগ করতে পারেন, সেই নিরাপদ কাঠামো গড়ে তুলতে হবে। থানায়, হাসপাতালে, আদালতে নারী-বান্ধব ব্যবস্থা থাকতে হবে। বিশেষ করে প্রবীণ নারীর ক্ষেত্রে অভিযোগ জানানোর প্রক্রিয়া সহজ ও মানবিক হওয়া জরুরি।
অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নও নারী সুরক্ষার একটি বড় ভিত্তি। স্বনির্ভর নারী নিজেকে রক্ষা করতে তুলনামূলকভাবে বেশি সক্ষম। ক্ষুদ্রঋণ, প্রশিক্ষণ, কর্মসংস্থান—এসব উদ্যোগ নারীদের আত্মবিশ্বাস বাড়ায়। প্রবীণ নারীদের জন্য ভাতা, স্বাস্থ্যবিমা ও সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি আরও কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে। তাঁদের আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত হলে পারিবারিক নির্যাতনের ঝুঁকিও কমে।
সবচেয়ে বড় কথা—মানসিকতার পরিবর্তন। নারীকে দুর্বল বা নির্ভরশীল হিসেবে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে হবে। নারী শুধু মা, স্ত্রী বা কন্যা নন; তিনি একজন পূর্ণাঙ্গ নাগরিক। তাঁর মতামত, ইচ্ছা ও স্বপ্নের মূল্য আছে। প্রবীণ নারীও একজন অভিজ্ঞ মানুষ; তাঁর জীবনজ্ঞান সমাজের সম্পদ। তাঁকে অবহেলা নয়, সম্মান দিতে হবে।
আজকের প্রতিপাদ্য আমাদের মনে করিয়ে দেয়—অধিকার ও ন্যায়বিচার কেবল দাবির বিষয় নয়, তা নিশ্চিত করতে কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন। যদি আমরা পরিবারে সম্মান, সমাজে সচেতনতা এবং রাষ্ট্রে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে পারি, তবে নারী ও কন্যাশিশুর জন্য একটি নিরাপদ ভবিষ্যৎ গড়া সম্ভব। একই সঙ্গে প্রবীণ নারীর মর্যাদাপূর্ণ জীবন নিশ্চিত করা যাবে।
আসুন, ৮ মার্চকে শুধু আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ না রেখে প্রতিজ্ঞার দিনে পরিণত করি। আজকের ছোট ছোট পদক্ষেপ—একটি প্রতিবাদ, একটি সচেতনতা সভা, একটি সহানুভূতির হাত—আগামীর ন্যায়বিচারের ভিত্তি হতে পারে। নারী নিরাপদ হলে পরিবার নিরাপদ হবে; পরিবার নিরাপদ হলে সমাজ হবে মানবিক।
নারী ও কন্যার অধিকার সুরক্ষিত হোক—এই প্রত্যাশায়, এই অঙ্গীকারেই আন্তর্জাতিক নারী দিবসের সত্যিকারের তাৎপর্য।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন