বাংলাদেশের অর্থনীতি গত দুই দশকে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। দারিদ্র্যের হার কমেছে, অবকাঠামো উন্নয়ন হয়েছে, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবায় প্রবেশাধিকার বেড়েছে। তবুও বাস্তবতা হলো—সমাজের একটি বড় অংশ এখনও অনিশ্চয়তার প্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে। বাজারে দ্রব্যমূল্যের ওঠানামা, অনানুষ্ঠানিক শ্রমবাজারের অস্থিরতা এবং সামাজিক বৈষম্যের চাপ অনেক পরিবারকে প্রতিনিয়ত অর্থনৈতিক ঝুঁকির মুখে ফেলছে। এই বাস্তবতার মধ্যেই সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর, লক্ষ্যভিত্তিক ও আধুনিক করার প্রশ্ন সামনে এসেছে। আর সেই প্রেক্ষাপটে “ফ্যামিলি কার্ড” ধারণাটি নতুন করে আলোচনায় এসেছে- যা দারিদ্র্য বিমোচনকে আরও সুসংগঠিত ও মানবিক করতে পারে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে বিএনপি তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে দেশের মানুষের, বিশেষত নারীদের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কর্মসূচির প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। সেই অঙ্গীকার বাস্তবে রূপ নিতে যাচ্ছে। আগামী ১০ মার্চ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আনুষ্ঠানিকভাবে এই কর্মসূচির উদ্বোধন করবেন। শুরুতে এটি একটি পাইলট প্রকল্প হিসেবে চালু হচ্ছে। দেশের ১৪টি উপজেলায়—প্রতিটিতে একটি ইউনিয়নের একটি করে ওয়ার্ডে—প্রায় ৬ হাজার ৫০০ পরিবার এই সুবিধার আওতায় আসবে। চার মাসের পরীক্ষামূলক বাস্তবায়নের পর যদি এটি সফল হয়, তবে ধাপে ধাপে সারা দেশে বিস্তৃত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
এই কর্মসূচির মৌলিক ধারণা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ—“ব্যক্তি নয়, পরিবারই উন্নয়নের মূল একক।” সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় ও সমাজসেবা অধিদপ্তর এই দর্শনকে সামনে রেখে তৈরি করেছে ‘ফ্যামিলি কার্ড পাইলটিং বাস্তবায়ন গাইডলাইন-২০২৬’। প্রকল্পটির বাস্তবায়নের দায়িত্বে রয়েছে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় এবং এর আর্থিক ও নীতিগত তদারকির জন্য অর্থমন্ত্রীর নেতৃত্বে একটি উচ্চপর্যায়ের মন্ত্রিসভা কমিটি গঠন করা হয়েছে। অর্থাৎ এটি কেবল একটি সহায়তা কর্মসূচি নয়, বরং একটি সমন্বিত সামাজিক সুরক্ষা কাঠামোর সূচনা।
ফ্যামিলি কার্ড মূলত একটি ডিজিটাল ডেটাবেজ-ভিত্তিক স্মার্ট কার্ড। এর মাধ্যমে নির্দিষ্ট পরিবারগুলো সাশ্রয়ী মূল্যে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য সংগ্রহের পাশাপাশি সরাসরি নগদ আর্থিক সহায়তাও পাবে। এর প্রধান লক্ষ্য নারীদের অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নকে কেন্দ্র করে সমাজের প্রান্তিক, হতদরিদ্র ও নিম্নআয়ের পরিবারের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা ও খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত কর।
তবে এই কার্ড সবার জন্য নয়। নীতিমালায় স্পষ্ট করে বলা হয়েছে, মূলত হতদরিদ্র, দরিদ্র ও নিম্নবিত্ত পরিবারের নারীরাই এই কার্ডের সুবিধাভোগী হবেন। বিশেষভাবে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে ভূমিহীন ও গৃহহীন পরিবার, প্রতিবন্ধী সদস্য থাকা পরিবার, হিজড়া সম্প্রদায়, বেদে জনগোষ্ঠী, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর পরিবার এবং যাদের জমির পরিমাণ শূন্য দশমিক ৫ একর বা তার কম। এই অগ্রাধিকার নীতি সামাজিক অন্তর্ভুক্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরে—কারণ সমাজের সবচেয়ে প্রান্তিক মানুষদের উন্নয়ন প্রক্রিয়ার কেন্দ্রে আনা না গেলে দারিদ্র্য বিমোচনের লক্ষ্য পূর্ণতা পায় না।
নীতিমালায় আরও বলা হয়েছে, প্রতি পরিবারের সর্বোচ্চ পাঁচজন সদস্যকে এই কার্ডের আওতায় বিবেচনা করা হবে। তবে একান্নবর্তী পরিবার হলে প্রতি পাঁচজন সদস্যের জন্য আলাদা কার্ড দেওয়া হবে। পরিবারের প্রধান নারী—অর্থাৎ মা বা নারী অভিভাবক—এই কার্ডের মালিক হবেন। একই ব্যক্তি একাধিক ভাতা বা সুবিধা পাবেন না। ফলে সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থায় সমতা বজায় রাখার একটি কাঠামো তৈরি হবে বলে আশা করা যায়।
অন্যদিকে, এই সুবিধা পাওয়ার ক্ষেত্রে কিছু স্পষ্ট সীমাবদ্ধতাও নির্ধারণ করা হয়েছে। সরকারি চাকরিজীবী, নিয়মিত পেনশনভোগী, বাড়িতে এসি ব্যবহারকারী, ব্যক্তিগত গাড়ির মালিক, বিলাসবহুল সম্পদের অধিকারী কিংবা বড় ব্যবসা বা বাণিজ্যিক লাইসেন্সধারীরা এই কর্মসূচির আওতায় আসবেন না। অর্থাৎ প্রকৃত দরিদ্র পরিবারগুলোকে লক্ষ্য করেই এই কর্মসূচি সাজানো হয়েছে।
২০২৬ সালের পাইলট প্রকল্প অনুযায়ী কার্ডধারী পরিবার দুটি প্রধান সুবিধা পাবে। প্রথমত, প্রত্যেক পরিবারকে প্রতি মাসে আড়াই হাজার টাকা করে সরাসরি নগদ সহায়তা দেওয়া হবে। কোনো মধ্যস্বত্বভোগী ছাড়াই এই অর্থ সরাসরি সুবিধাভোগীর ব্যাংক অ্যাকাউন্ট বা মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস—যেমন বিকাশ বা অন্যান্য বৈধ চ্যানেলের মাধ্যমে পৌঁছে যাবে। এই ডিজিটাল পদ্ধতি স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার একটি আধুনিক উপায়।
দ্বিতীয়ত, কার্ডধারীরা বাজারদরের তুলনায় অনেক কম দামে চাল, ডাল, সয়াবিন তেল ও চিনি কিনতে পারবেন। অর্থাৎ এটি শুধু নগদ সহায়তা নয় বরং একটি সমন্বিত খাদ্য নিরাপত্তা কর্মসূচিও বটে।
কার্ড বিতরণের প্রক্রিয়াটিও প্রযুক্তিনির্ভর ও বহুস্তর যাচাইভিত্তিক। নির্বাচিত ওয়ার্ডগুলোতে সরকারি প্রতিনিধিরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে সম্ভাব্য সুবিধাভোগী পরিবার চিহ্নিত করবেন। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) নেতৃত্বে উপজেলা পর্যায়ে এবং ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায়ে সরকারি কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে গঠিত কমিটি এই কার্যক্রম পরিচালনা করবে। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে—এ ক্ষেত্রে কোনো তদবির বা রাজনৈতিক প্রভাবের সুযোগ থাকবে না।
মাঠ পর্যায়ে সংগ্রহ করা তথ্য ইউনিয়ন ও উপজেলা পর্যায়ের আইসিটি কর্মকর্তা এবং সমাজসেবা কর্মকর্তারা কয়েক স্তরে যাচাই করবেন। এরপর তথ্যগুলো নির্বাচন কমিশনের জাতীয় পরিচয়পত্র ডেটাবেজের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হবে, যাতে কোনো দ্বৈত সুবিধাভোগী না থাকে।
সর্বশেষে প্রথম শ্রেণির গেজেটেড কর্মকর্তার সুপারিশের ভিত্তিতে চূড়ান্ত তালিকা অনুমোদিত হবে।
আবেদন প্রক্রিয়া পুরোপুরি শুরু না হলেও প্রাথমিক নির্দেশনা ইতোমধ্যেই দেওয়া হয়েছে।
আবেদনকারীর জাতীয় পরিচয়পত্র, পাসপোর্ট সাইজের রঙিন ছবি এবং নিবন্ধিত সচল মোবাইল নম্বর বা ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থাকতে হবে। স্থানীয় সিটি করপোরেশন, পৌরসভা বা ইউনিয়ন পরিষদ কার্যালয় এবং সরকারের অনলাইন পোর্টাল থেকে আবেদন ফরম পাওয়া যাবে।
পুরো ব্যবস্থাটি একটি কেন্দ্রীয় ডিজিটাল ডেটাবেজের মাধ্যমে পরিচালিত হবে, যাতে নিয়মিতভাবে তদারকি করা যায় যে সুবিধাভোগীরা ঠিকমতো সহায়তা পাচ্ছেন কিনা।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পরিবারভিত্তিক সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি ইতোমধ্যেই উল্লেখযোগ্য সাফল্য দেখিয়েছে। ব্রাজিলের Bolsa Família, মেক্সিকোর Prospera কিংবা ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে চালু হওয়া খাদ্য ও নগদ সহায়তা কর্মসূচি দারিদ্র্য কমাতে কার্যকর ভূমিকা রেখেছে। এসব অভিজ্ঞতা বলছে—যদি সহায়তা কর্মসূচি সঠিকভাবে লক্ষ্যভিত্তিক, প্রযুক্তিনির্ভর এবং স্বচ্ছভাবে পরিচালিত হয়, তবে তা সমাজের সবচেয়ে দুর্বল মানুষদের জীবনমান উন্নত করতে পারে।
বাংলাদেশে ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচিও সেই সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিতে পারে। তবে এর সফলতা নির্ভর করবে বাস্তবায়নের স্বচ্ছতা, তথ্যের সঠিকতা এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছার ওপর। যদি প্রকৃত দরিদ্র পরিবারগুলোকে সঠিকভাবে শনাক্ত করা যায় এবং সহায়তা নিয়মিতভাবে পৌঁছে দেওয়া যায়, তবে এটি দেশের সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থাকে নতুন মাত্রা দিতে পারে। এতে কোনো সন্দেহ নেই।
শেষ কথা:
ফ্যামিলি কার্ড কেবল একটি প্রশাসনিক উদ্যোগ নয় বরং এটি হতে পারে সামাজিক ন্যায়বিচারের একটি নতুন অধ্যায়। রাষ্ট্র যদি সত্যিই পরিবারকে উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দুতে রাখতে চায়, তবে এই কর্মসূচিকে স্বচ্ছতা, প্রযুক্তি এবং মানবিক দৃষ্টিভঙ্গির সমন্বয়ে বাস্তবায়ন করতে হবে।
কারণ দারিদ্র্য বিমোচনের প্রকৃত লক্ষ্য কেবল মানুষকে সহায়তা দেওয়া নয়—বরং তাদের জন্য এমন একটি নিরাপত্তা বলয় তৈরি করা, যাতে তারা নিজেদের শক্তিতে দাঁড়াতে পারে। তাহলেই ফ্যামিলি কার্ড সত্যিকার অর্থেই হয়ে উঠতে পারে দারিদ্র বিমোচনের হাতিয়ার।
লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক,ঢাকা।
ই-মেইল: [email protected]
ফ্যামিলি কার্ড হতে পারে দারিদ্র্য বিমোচনের হাতিয়ার
আহসান হাবিব বরুন
মত-মতান্তর
৩ মাস আগে
৮ মার্চ (রবিবার), ২০২৬, ১১ঃ৪৫ (পূর্বাহ্ণ)
লিংক কপি হয়েছে!
ফন্ট সাইজ:
100%
