পরিকল্পিত যাকাত ব্যবস্থাপনায় দারিদ্র্য বিমোচনে ভূমিকা রাখা সম্ভব বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। শনিবার রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় এতিম শিশু ও ওলামা-মাশায়েখদের সম্মানে প্রধানমন্ত্রীর আয়োজনে ইফতার মাহফিলপূর্ব সংক্ষিপ্ত বক্তব্য তিনি এ মন্তব্য করেন। প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্যে রমজানে নিত্যপণ্যের দাম বাড়িয়ে মানুষের কষ্ট না দিতে ব্যবসায়ীদের প্রতি আহ্বান জানান। বলেন, অসৎপন্থা অবলম্বন করে মানুষের কষ্টের কারণ হবেন না। ধনী ও দরিদ্র সবমিলিয়ে দেশে বর্তমানে পরিবারের সংখ্যা কমবেশি চারকোটি উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এসব পরিবারগুলোর মধ্যে যদি দরিদ্র কিংবা হত দরিদ্র পরিবারগুলোকে চিহ্নিত করে প্রতি বছর পর্যায়ক্রমে ৫ লাখ পরিবারকে এক লাখ করে টাকা করে যাকাত দেয়া হয়, আমার বিশ্বাস-এসব পরিবারগুলোর মধ্যে বেশির ভাগ পরিবারকে পরের বছর আর যাকাত নাও দিতে হতে পারে। লক্ষ্যভিত্তিক এবং সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার মাধ্যমে যাকাত দেয়া হলে ১০ থেকে ১৫ বছরের মধ্যে শুধুমাত্র যাকাত ব্যবস্থাপনার মাধ্যমেই দেশে দারিদ্র্য বিমোচনে কার্যকর ভূমিকা রাখা সম্ভব। ইসলামী ঐতিহ্য এবং সংস্কৃতি অনুযায়ী অতীতের প্রতিটি রমজানের প্রায় প্রতিদিনই আমরা বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের জন্য ইফতারের আয়োজন করে আসার বিষয় উল্লেখ করে তারেক রহমান বলেন, আলেম-ওলামা-মাশায়েখ এবং এতিমদের সম্মানে আমরা সাধারণত পবিত্র রমজানের প্রথম দিনেই ইফতার মাহফিলের আয়োজন করে থাকি। তবে দেশের চলমান বাস্তবতায় এবার আমাদেরকে একটু দেরি করেই আপনাদের সঙ্গে নিয়ে ইফতারের আয়োজন করতে হয়েছে। তবে বৈশ্বিক পরিস্থিতিটির কারণে গ্যাস, বিদ্যুৎ এবং জ্বালানিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে ব্যয়সংকোচন এবং কৃচ্ছ্রতা সাধনের অংশ হিসেবে এবারের রমজানে আজ (শনিবার এবং গতকালের (শুক্রবার) ইফতার মাহফিলসহ মোট দু’টি ইফতার মাহফিলের আয়োজন করেছি। বৈশ্বিক পরিস্থিতির উন্নতি না হলে এবারের রমজানে এটিই হয়তো শেষ ইফতার মাহফিল উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, এই ইফতার মাহফিলের অংশগ্রহণকারী ‘এতিম সন্তানেরাই’ আজকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মেহমান। পবিত্র কোরআন এবং হাদিসে ‘এতিমের হক’ আদায়ের ব্যাপারে মুমিন মুসলমানদের প্রতি ইসলামের কঠোর নির্দেশনা রয়েছে।
এতিমের প্রতি ‘হক আদায়ে’র গুরুত্ব এবং এতিমদের নিয়ে আজকের এই ইফতার মাহফিলের আয়োজন। আজকের এই ইফতার মাহফিলে সঙ্গত কারণেই সকল ‘এতিম’ সন্তানদেরকে আমন্ত্রণ জানানো সম্ভব হয়নি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এতিমদের ব্যাপারে রাষ্ট্র এবং সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরার ক্ষেত্রে এই ইফতার মাহফিলের অবশ্যই প্রতীকী তাৎপর্য রয়েছে। এই ইফতার মাহফিল এতিমদের প্রতি বিত্তবানদের দৃষ্টিভঙ্গি এবং দায়-দায়িত্ব পালনের ব্যাপারে একটি ইতিবাচক বার্তা দেবে বলে আমি বিশ্বাস করি। প্রতিজন বিত্তবান যদি অসহায় এতিমদের প্রতি পবিত্র কোরআন-হাদিসের নির্দেশনা অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করতে সচেষ্ট থাকেন, তাহলে আমি বিশ্বাস করি- পিতৃহারা এতিম সন্তানেরা একবুক বেদনা নিয়েও রাষ্ট্র এবং সমাজে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে এগিয়ে যাওয়ার প্রেরণা খুঁজে পাবে।
তিনি বলেন, পবিত্র রমজান ত্যাগ এবং সংযমের মাস। রহমত-বরকাত-সংযমের মাস। অথচ অপ্রিয় হলেও সত্য, রমজান আসলেই আমাদের কেউ কেউ নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম বাড়িয়ে দেন। রমজান মাসকে লোভ-লাভের মাস বানিয়ে ফেলেন। পবিত্র রমজান মাসেও যারা অসাধুপন্থা অবলম্বন করছেন, আপনাদের প্রতি আমার বিনীত আহ্বান, অনুগ্রহ করে আপনারা মানুষের কষ্টের কারণ হবেন না।
ইসলামের পাঁচটি ভিত্তির আরেকটি হচ্ছে যাকাত উল্লেখ করে তারেক রহমান বলেন, দেশে যাকাত ব্যবস্থাপনা নিয়ে আমি আমার একটি পরিকল্পনার কথা আপনাদের সঙ্গে শেয়ার করতে চাই। ইসলামের বিধান অনুযায়ী আমাদের সমাজে অনেক বিত্তবান নিজ উদ্যোগেই যাকাত দিয়ে থাকেন। কেউ কেউ সরকারের ‘যাকাত বোর্ডের’ মাধ্যমেও যাকাত পরিশোধ করে থাকেন। বিভিন্ন গবেষণা রিপোর্টে দেখা গেছে, প্রতি বছর বাংলাদেশে এই যাকাতের পরিমাণ ২০ থেকে ২৫ হাজার কোটি টাকার বেশি হয়ে থাকে। কেউ কেউ এর পরিমাণ আরও অনেক বেশি বলেছেন। তবে সুপরিকল্পিত এবং সুসংগঠিতভাবে যাকাত বণ্টন না করায় বিত্তবান ব্যক্তির যাকাত আদায় হয়ে গেলেও যাকাতের অর্থ দারিদ্র্য বিমোচনে কতোটা ভূমিকা রাখতে সক্ষম হচ্ছে, এটি একটি বড় প্রশ্ন।
তিনি বলেন, যতদূর জানি, যাকাতদাতাদেরকে ইসলামী বিধান এমনভাবে যাকাত বণ্টনে উৎসাহিত করে-যাতে একজন যাকাত গ্রহীতা প্রথম বছর যাকাত গ্রহণের পর পরের বছর আর যাকাত গ্রহণ করতে না হয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পরিকল্পিতভাবে যাকাত বণ্টন করা গেলে দারিদ্র্য বিমোচনে যাকাত যুগান্তকারী ভূমিকা পালন করতে পারে। এমন বাস্তবতায় সরকার যাকাত ব্যবস্থাপনাকে আরও কার্যকর এবং লক্ষ্যভিত্তিক করার পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, দারিদ্র্য বিমোচনে যাকাত ব্যবস্থাপনার বিষয়টি আপনাদের কাছে যৌক্তিক মনে হলে এ ব্যাপারে বিত্তবানদের সচেতন করার ক্ষেত্রে আপনারা আলেম-ওলামা-মাশায়েখরা সবচেয়ে বেশি ভূমিকা পালন করতে পারেন। যাকাত ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে দারিদ্র্য বিমোচন করার লক্ষ্যে দেশের শীর্ষস্থানীয় আলেম, ওলামা, ইসলামিক স্কলার এবং সরকারি কর্মকর্তাসহ সংশ্লিষ্টদের নিয়ে ধর্ম মন্ত্রণালয়ের অধীনে বিদ্যমান ‘যাকাত বোর্ড’কে পুনর্গঠন সম্ভব। ‘যাকাত’কে দারিদ্র্য বিমোচনে ব্যবহার করে ইসলামী বিশ্বে বাংলাদেশকে একটি মডেল হিসেবে উপস্থাপনের সুযোগ রয়েছে বলেও আমি মনে করি। আর দেশ এবং জনগণের কল্যাণে নেয়া প্রতিটি কর্মসূচি যেন আমরা সুন্দরভাবে বাস্তবায়ন করতে পারি, আল্লাহর দরবারে সেই প্রার্থনা জানাচ্ছি।
ইফতার মাহফিলে উপস্থিত ছিলেন ধর্মমন্ত্রী শাহ মোফাজ্জল হোসেন কায়কোবাদ, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ, সমাজকল্যাণ বিষয়ক মন্ত্রী ডা. এজেডএম জাহিদ হোসেন, এলজিআরডি প্রতিমন্ত্রী মীর শাহ আলম, জাতীয় সংসদের হুইপ মিয়া নুরুদ্দিন আহাম্মেদ অপু, আসসুন্নাহ ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান শায়খ আহমাদুল্লাহ, জাতীয় মসজিদ বাইতুল মোকাররমের খতিব মুফতি আব্দুল মালেক প্রমুখ।
এছাড়া প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল অব. ড. এ কে এম শামছুল ইসলাম, মুখ্য সচিব এ বি এম আব্দুস সাত্তার, প্রেস সচিব ছালেহ শিবলী ও অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন ইফতার মাহফিলে উপস্থিত ছিলেন। এছাড়াও ইফতারে বিভিন্ন আলেম-ওলামা-মাশায়েখ উপস্থিত ছিলেন।
