পারস্য উপসাগরে বাংলাদেশি ৪ নাবিকের বীরত্বগাথা গল্প

ফন্ট সাইজ:

পারস্য উপসাগরের নীল জলরাশি তখন তপ্ত আগ্নেয়গিরি। চারিদিকে বিষাক্ত ধোঁয়া, মুহুর্মুহু বিস্ফোরণ আর জ্বলন্ত গ্যাসোলিনের লেলিহান শিখা। চোখের সামনে সহকর্মীর নিথর দেহ, আর পায়ের নিচে ৬০ হাজার টন দাহ্য পদার্থের ওপর ভাসমান এক মৃত্যুফাঁদ। এমন এক নরককুণ্ড থেকে অলৌকিকভাবে ও অসীম সাহসিকতায় প্রাণ নিয়ে ফিরেছেন চার বাংলাদেশি নাবিক। ১লা মার্চ ‘গকউ ঠণঙগ’ জাহাজে ঘটা সেই লোমহর্ষক ঘটনার বর্ণনা এখন সমুদ্রগামী নাবিকদের মুখে মুখে।

বেঁচে ফেরা নাবিকরা জানান, গত ১লা মার্চ স্থানীয় সময় বেলা ১১:৪৫ মিনিটে ভি-শিপ ম্যানেজমেন্টের আওতাধীন জাহাজটি পার্সিয়ান গাল্ফে ড্রিফটিং অবস্থায় ছিল। হঠাৎ একটি শক্তিশালী মিসাইল জাহাজের স্টারবোর্ড কোয়ার্টারে (ইঞ্জিন রুম জেনারেটর ফ্লোর) আঘাত হানে। বিস্ফোরণের তীব্রতায় ইঞ্জিন রুমে ১০-১২ ফুট ব্যাসের বিশাল গর্ত তৈরি হয় এবং মুহূর্তেই পুরো জাহাজ কেঁপে ওঠে। জাহাজটিতে চারজন বাংলাদেশি সেকেন্ড ইঞ্জিনিয়ার হাবিবুর রহমান, থার্ড অফিসার মো. মনিরুল আলম জয়, থার্ড ইঞ্জিনিয়ার রিফাত মাহমুদ ও ইলেকট্রিশিয়ান মোহাম্মদ আবু নাছেরসহ মোট ২২ জন নাবিক ছিলেন। হামলায় একজন অয়েলার নিখোঁজ হন।

নাবিকরা জানান, বিস্ফোরণের সময় সেকেন্ড ইঞ্জিনিয়ার হাবিবুর রহমান ইঞ্জিন রুমের একদম নিচে ছিলেন। আগুনের শিখায় তার মাথা ও হাত দগ্ধ হয়, বিষাক্ত গ্যাসে বন্ধ হয়ে আসছিল শ্বাসনালি। কিন্তু অদম্য ইচ্ছাশক্তিতে অন্ধকার আর ধোঁয়ার মাঝে পথ হাতড়ে তিনি ব্রিজে পৌঁছান। প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়েই তিনি ফের ঝাঁপিয়ে পড়েন সহকর্মীদের উদ্ধারে। তার ও চিফ অফিসারের নেতৃত্বে দুটি দল গঠন করে শুরু হয় ‘রেসকিউ অপারেশন’। ধ্বংসস্তূপের ভেতর থেকে নিখোঁজ অয়েলারের মৃতদেহ উদ্ধার করে যখন উপরে তোলার প্রস্তুতি চলছিল, ঠিক তখনই ঘটে ভয়াবহ ‘সেকেন্ডারি বিস্ফোরণ’। চারদিকে লুব অয়েল ছড়িয়ে পড়ে আগুনের তীব্রতা বহুগুণ বেড়ে যায়। বাধ্য হয়ে সহকর্মীর মরদেহ রেখেই জীবন বাঁচাতে ইঞ্জিন রুম ছাড়েন তারা।

এরপর যা ঘটলো তা আরও লোমহর্ষক। নাবিকরা টানা ৪-৫ ঘণ্টা ফায়ার ফাইটিং করার পর একসময় জাহাজের পোর্টেবল এক্সটিংগুইশার শেষ হয়ে যায়। বিদ্যুৎ ব্যবস্থা অকেজো, পাম্প বন্ধ। এই চরম সংকটে নাবিকেরা চিরাচরিত পদ্ধতির বাইরে গিয়ে অসীম সাহসিকতার পরিচয় দেন। রশির সাহায্যে সমুদ্র থেকে বালতি দিয়ে পানি তুলে তারা আগুন নেভানোর চেষ্টা চালান। দড়ি টানতে গিয়ে তাদের হাতের গ্লাভস ছিঁড়ে যায়, রক্তাক্ত হয় হাত, তবুও থামেনি লড়াই। সন্ধ্যায় জাহাজের ভেন্টিলেশন বন্ধ করে ঈঙথ২ রিলিজ করা হলেও কারিগরি ত্রুটির কারণে তা ব্যর্থ হয়।

গ্যাসোলিনবাহী কার্গো যেকোনো সময় বিস্ফোরিত হওয়ার ঝুঁকিতে রাত ৭:২০ মিনিটে ক্যাপ্টেন ‘অনধহফড়হ ঝযরঢ়’ বা জাহাজ ত্যাগের নির্দেশ দেন। বাংলাদেশি কর্মকর্তাদের দক্ষ নেতৃত্বে দুটি লাইফ বোটের মাধ্যমে তারা উত্তাল সমুদ্রে ভাসেন এবং পরবর্তীতে ভিয়েতনামী জাহাজ ‘গঞ ঝধহফ’ তাদের উদ্ধার করে ওমানের মাস্কট বন্দরে পৌঁছে দেয়।
ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি ও মেরিন বিশেষজ্ঞরা এই উদ্ধার তৎপরতায় বিস্মিত। তাদের মতে, ধ্বংসপ্রায় জাহাজ বাঁচাতে বালতি দিয়ে পানি তোলার মতো বুদ্ধিদীপ্ত ও সাহসী কাজ বিরল। বাংলাদেশ মার্চেন্ট মেরিন অফিসার্স এসোসিয়েশনের (বিএমএমওএ) সাধারণ সম্পাদক মো. সাখাওয়াৎ হোসেন মানবজমিনকে বলেন, এই ঘটনা বিশ্বদরবারে বাংলাদেশি নাবিকদের দক্ষতা ও পেশাদারিত্বকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে। গত ৪ঠা মার্চ রাতে সব আতঙ্ক পেছনে ফেলে নিরাপদে দেশে ফিরেছেন এই ৪ বীর নাবিক। সংগঠনটির সভাপতি ক্যাপ্টেন মো. আনাম চৌধুরী বলেন, এমন ভয়াবহ পরিস্থিতিতে সাহসিকতার সঙ্গে ফায়ার ফাইটিংয়ের উদাহরণ খুব কমই আছে। আমাদের নাবিকেরা এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত সৃষ্টি করেছেন।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন