তেহরানের অস্থিরতা ও মধ্যপ্রাচ্যে চীনের কৌশলগত সীমাবদ্ধতা

তেহরানের অস্থিরতা ও মধ্যপ্রাচ্যে চীনের কৌশলগত সীমাবদ্ধতা

ফন্ট সাইজ:

ইসরায়েল, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে ক্রমবর্ধমান সংঘাত মধ্যপ্রাচ্যকে আবারও এক অনিশ্চিত ও বিপজ্জনক পরিস্থিতির মুখে ঠেলে দিয়েছে। বিমান হামলা, পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র আক্রমণ এবং তেহরানের রাজনৈতিক অস্থিরতার খবর গোটা অঞ্চলে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। এই সংঘাত শুধু মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিকেই নাড়িয়ে দিচ্ছে না, বরং এর প্রভাব ছড়িয়ে পড়ছে বৈশ্বিক শক্তির ভারসাম্যেও। আর এই পরিস্থিতি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে বিশ্বের আরেকটি বড় শক্তি চীন।

বেইজিংয়ের জন্য ইরানে অস্থিরতা শুধু আরেকটি আঞ্চলিক সংঘাত নয়। এটি মধ্যপ্রাচ্যে গত এক দশকে গড়ে তোলা চীনের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্কের ওপর বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করছে। ফলে প্রশ্ন উঠছে মধ্যপ্রাচ্যে চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব কতটা টেকসই?

গত কয়েক বছরে চীন মধ্যপ্রাচ্যে তার উপস্থিতি বাড়িয়েছে মূলত অর্থনৈতিক সম্পৃক্ততার মাধ্যমে। বাণিজ্য, অবকাঠামো বিনিয়োগ এবং জ্বালানি সহযোগিতার মধ্য দিয়ে বেইজিং ধীরে ধীরে অঞ্চলটিতে গুরুত্বপূর্ণ এক বাহ্যিক অংশীদারে পরিণত হয়েছে। এই কৌশলের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল ইরান।

চীন-ইরান দীর্ঘমেয়াদি সহযোগিতা চুক্তি এবং ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’-এর আওতায় বিভিন্ন অবকাঠামো প্রকল্পের মাধ্যমে দুই দেশের সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ হয়েছে। এসব উদ্যোগের লক্ষ্য ছিল পূর্ব এশিয়া থেকে মধ্যপ্রাচ্য হয়ে ইউরোপ পর্যন্ত অর্থনৈতিক সংযোগ শক্তিশালী করা এবং একই সঙ্গে এই অঞ্চলে চীনের প্রভাব বাড়ানো।

কিন্তু যুদ্ধ ও অস্থিরতা প্রায়ই দীর্ঘমেয়াদি ভূ-রাজনৈতিক পরিকল্পনাকে ভেঙে দেয়। চলমান সংঘাত ইরানের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। যদি তেহরানের ক্ষমতার কাঠামো দুর্বল হয়ে পড়ে অথবা দেশটি দীর্ঘমেয়াদি অস্থিরতার মধ্যে পড়ে, তবে সেখানে চীনের বহু বিনিয়োগ ও পরিকল্পনা ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। কারণ অবকাঠামো ও বাণিজ্যিক প্রকল্প টিকে থাকতে হলে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা অপরিহার্য।

চীনের জন্য আরেকটি বড় উদ্বেগ জ্বালানি নিরাপত্তা। বিশ্বের সবচেয়ে বড় তেল আমদানিকারক দেশ হিসেবে চীন মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানির ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। এই অঞ্চলের বিপুল পরিমাণ তেল পারস্য উপসাগর থেকে হরমুজ প্রণালী হয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছায়। বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্য এই সামুদ্রিক পথ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

বর্তমান সংঘাতের কারণে যদি এই পথের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হয়, তাহলে তা সরাসরি প্রভাব ফেলবে এশিয়ার বড় বড় অর্থনীতিতে। চীনের শিল্প ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অনেকাংশেই নির্ভর করে স্থিতিশীল জ্বালানি সরবরাহের ওপর। ফলে মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিরতা বেইজিংয়ের জন্য একটি বড় কৌশলগত ঝুঁকি তৈরি করছে।

এই সংকট আরেকটি বাস্তবতাও সামনে এনে দিয়েছে মধ্যপ্রাচ্যে চীনের প্রভাব মূলত অর্থনৈতিক, সামরিক নয়। যুক্তরাষ্ট্রের মতো এই অঞ্চলে চীনের বিস্তৃত সামরিক ঘাঁটি বা নিরাপত্তা জোট নেই। বেইজিং দীর্ঘদিন ধরে কূটনীতি, বাণিজ্য ও উন্নয়ন সহযোগিতার ওপর ভর করে তার উপস্থিতি বাড়িয়েছে।

শান্তিপূর্ণ সময়ে এই কৌশল কার্যকর হলেও সংঘাতের সময়ে এর সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। যখন যুদ্ধ শুরু হয় এবং নিরাপত্তা পরিস্থিতি অনিশ্চিত হয়ে ওঠে, তখন সামরিক উপস্থিতি ও জোটই পরিস্থিতিকে প্রভাবিত করার বড় হাতিয়ার হয়ে দাঁড়ায়। মধ্যপ্রাচ্যে সেই প্রভাব এখনো প্রধানত যুক্তরাষ্ট্রের হাতেই রয়েছে।

ফলে চীন এখন একটি সূক্ষ্ম ভারসাম্যের রাজনীতির মুখোমুখি। একদিকে ইরানের সঙ্গে তার কৌশলগত সম্পর্ক রয়েছে, অন্যদিকে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ইসরায়েলের মতো দেশগুলোর সঙ্গেও তার গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে। এক পক্ষের পক্ষে সরাসরি অবস্থান নিলে অন্য অংশীদারদের সঙ্গে সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।

এই কারণেই চীনের প্রতিক্রিয়া এখন পর্যন্ত সতর্ক ও সংযত। বেইজিং সংলাপ ও সংযমের আহ্বান জানিয়েছে এবং সরাসরি সংঘাতে জড়ানোর পথ এড়িয়ে চলছে। কারণ চীন জানে, মধ্যপ্রাচ্যের জটিল সামরিক দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়া তার দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক কৌশলকে দুর্বল করে দিতে পারে।

তবে এই সংকট ভবিষ্যতে নতুন বাস্তবতাও তৈরি করতে পারে। যদি সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হয় এবং অঞ্চলটি অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তবে অনেক দেশ হয়তো তাদের আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্ব বৈচিত্র্যময় করার চেষ্টা করবে। সেই পরিস্থিতিতে উন্নয়ন ও বিনিয়োগের অংশীদার হিসেবে চীনের গুরুত্ব আরও বাড়তে পারে।

দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর জন্যও এই পরিস্থিতির তাৎপর্য কম নয়। এই অঞ্চলের বহু দেশ মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল এবং একই সঙ্গে চীনের সঙ্গে তাদের অর্থনৈতিক সম্পর্কও ক্রমশ গভীর হচ্ছে। ফলে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ যদি দীর্ঘায়িত হয়, তার অর্থনৈতিক অভিঘাত দ্রুতই দক্ষিণ এশিয়ায় পৌঁছাতে পারে।

তেহরানের অস্থিরতা তাই শুধু একটি দেশের সংকট নয়। এটি বৈশ্বিক শক্তির রাজনীতি, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের জটিল বাস্তবতাকে নতুন করে সামনে এনে দিয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে চীনের ক্রমবর্ধমান উপস্থিতি নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু বর্তমান সংঘাত মনে করিয়ে দিচ্ছে বাণিজ্য ও বিনিয়োগের শক্তি যত বড়ই হোক, ভূ-রাজনীতির কঠিন বাস্তবতায় সামরিক শক্তি ও নিরাপত্তা কাঠামোর প্রভাব এখনো নির্ধারক।

লেখক: সুইজারল্যান্ডভিত্তিক বেসরকারি ব্যাংকিং আর্থিক অপরাধ বিশেষজ্ঞ কলামিস্ট ও কবি

ইমেইল: [email protected]





কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন