প্রথমে যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ তেলসমৃদ্ধ এবং যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী এক দেশের নেতাকে খুঁজে বের করে। তিনি তার দেশের পাহাড়ঘেরা রাজধানীর কেন্দ্রে কঠোর নিরাপত্তায় ঘেরা একটি কম্পাউন্ডে অবস্থান করছেন। তারপর যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তির প্রাণঘাতী ও অপ্রতিরোধ্য প্রদর্শনের মাধ্যমে সেই নেতাকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেয়া হয়। শেষে ওয়াশিংটনের নির্দেশ মেনে চলবে, এমন তুলনামূলকভাবে অনুগত একজন উত্তরসূরিকে ক্ষমতায় বসানো হয়।
এটাই ছিল মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি ভেনেজুয়েলার শাসনব্যবস্থা দখলে নেয়ার যে কৌশল প্রয়োগ করেছেন, তার মূল রেসিপি। দেশটির প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে ৩রা জানুয়ারি ভোরের আগে রাজধানী কারাকাস থেকে অপহরণ করা হয়।
বিশেষ বাহিনী মাদুরোকে আটক করার পর তার ভাইস প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজ ট্রাম্পের আশীর্বাদে ক্ষমতায় আসেন। এর ফলে দক্ষিণ আমেরিকার সেই দেশে নতুন এক যুক্তরাষ্ট্রপন্থী যুগের সূচনা হয়। এ দেশের নেতারা দীর্ঘদিন ধরে ‘ইয়াঙ্কি’ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে তীব্র ভাষায় কথা বলতেন।
বৃহস্পতিবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেয়া এক পোস্টে রদ্রিগেজ লিখেছেন, একসঙ্গে কাজ করার জন্য প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের সরকারের আন্তরিক সদিচ্ছার জন্য আমি তাকে ধন্যবাদ জানাই।
তার ঘনিষ্ঠ মিত্রের পতনের পর এটাই সম্ভবত তার সবচেয়ে স্পষ্ট আনুগত্য প্রদর্শনের ঘটনা।
মাদুরোর পতনের দুই মাস পর ট্রাম্প এখন ইরানেও একই ধরনের ‘রেজিম দখল’ মডেল প্রয়োগ করতে আগ্রহী বলে মনে হচ্ছে। কারণ ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি তেহরানে তার ঘাঁটিতে চালানো ভয়াবহ যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলি অভিযানে নিহত হয়েছেন।
এ সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওস’কে ট্রাম্প বলেন, তার (খামেনির) উত্তরসূরি নিয়োগের ব্যাপারে আমাকে জড়িত থাকতে হবে- ভেনেজুয়েলায় ডেলসির ক্ষেত্রে যেমন হয়েছিল।
আর নিউইয়র্ক টাইমস’কে দেয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ভেনেজুয়েলায় আমরা যা করেছি, আমার মনে হয় সেটাই ছিল নিখুঁত পরিস্থিতি। মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল’কে বলেন, ট্রাম্পের কৌশল অর্থাৎ মাটিতে মার্কিন সেনা না নামিয়ে দূর থেকে কোনো শাসনব্যবস্থার আচরণ নিয়ন্ত্রণ করা- এক কথায় বলা যায় ‘ডিক্যাপিটেট অ্যান্ড ডেলিগেট। অর্থাৎ নেতাকে সরাও, দায়িত্ব অন্যকে দাও।
তবে দক্ষিণ আমেরিকা ও মধ্যপ্রাচ্য বিশেষজ্ঞরা গুরুতর সন্দেহ প্রকাশ করছেন কারাকাসে যে কৌশল কাজ করেছে, তেহরানে ৭ হাজার মাইল দূরে তা আদৌ কাজ করবে কি না তা নিয়ে। স্টিমসন সেন্টারের লাতিন আমেরিকা কর্মসূচির পরিচালক বেনজামিন গেদান আগে হোয়াইট হাউসের ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলে দক্ষিণ আমেরিকা বিষয়ক পরিচালক ছিলেন। তিনি বলেন, ইরানকে একটি নমনীয় পুতুল সরকারে পরিণত করা ভেনেজুয়েলার তুলনায় অনেক কম বাস্তবসম্মত। কারণ ভেনেজুয়েলায়, এমনকি মাদুরোর সময়েও সরকার ঐতিহাসিকভাবে জ্বালানি খাতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কাজ করতে আগ্রহী ছিল এবং যুক্তরাষ্ট্র অঞ্চলটির একটি গুরুত্বপূর্ণ শক্তি। তিনি আরও বলেন, ভেনেজুয়েলার পর যুক্তরাষ্ট্র পৃথিবীজুড়ে যেখানে তাদের বিমানবাহী রণতরী নোঙর করবে, সেখানে গিয়ে ডেলসি রদ্রিগেজের মতো কাউকে বসিয়ে দেবে, এমন ধারণা একেবারেই হাস্যকর।
ইরান বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের পরবর্তী নেতা বাছাইয়ে ট্রাম্পের জড়িত থাকার দাবি ইরানের অবশিষ্ট কর্মকর্তারা সরাসরি প্রত্যাখ্যান করবেন। কারণ এটিকে তারা তাদের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে প্রকাশ্য হস্তক্ষেপ হিসেবে দেখবেন। ইরানের ইতিহাসে বিদেশি শক্তির হস্তক্ষেপের তিক্ত স্মৃতি রয়েছে, বিশেষ করে বৃটেন, রাশিয়া এবং যুক্তরাষ্ট্রকে ঘিরে।
১৯৭৯ সালের বিপ্লব, যা ইসলামি শাসনব্যবস্থাকে ক্ষমতায় আনে, অনেকাংশেই বিদেশি হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে জাতীয়তাবাদী ক্ষোভ থেকে জন্ম নিয়েছিল। সেই সময়ের পশ্চিমাপন্থী সম্রাট শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভিকে ব্যাপকভাবে যুক্তরাষ্ট্রের পুতুল হিসেবে বিবেচনা করা হতো। বিপ্লবের আধ্যাত্মিক নেতা আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনি যুক্তরাষ্ট্রকে ‘মহাশয়তান’ বলে আখ্যা দেয়ার পর থেকেই যুক্তরাষ্ট্রবিরোধিতা এই শাসনব্যবস্থার মূল আদর্শের অংশ হয়ে ওঠে। ‘আমেরিকা নিপাত যাক’ স্লোগান এবং যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী দেয়ালচিত্র এখনও তেহরানসহ ইরানের বিভিন্ন শহরে দেখা যায়।
ট্রাম্পের এই দাবি আরও অবাস্তব মনে হয় কারণ দুই দেশের মধ্যে গত ৪৬ বছর ধরে কোনো কূটনৈতিক সম্পর্ক নেই। অন্যদিকে ভেনেজুয়েলার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক ছিল ২০১৯ সাল পর্যন্ত। ১৯৮০ সালে জিমি কার্টার প্রশাসন ইরানের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করে, যখন বিপ্লবীরা তেহরানে যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাস দখল করে ৫২ জন মার্কিন কূটনীতিককে জিম্মি করে।
ওয়াশিংটন ডিসির মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউটের ইরান কর্মসূচি বিষয়ক প্রধান অ্যালেক্স ভাতাঙ্কা ট্রাম্পের এই উদ্যোগকে ‘বাস্তবতা থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন’ বলে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, ইরানের বিদ্যমান শিয়া উগ্র ইসলামপন্থীদেরকে ট্রাম্পের মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন আন্দোলনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেয়ার চেষ্টা করার চেয়ে শাসনব্যবস্থা পরিবর্তন করা অনেক সহজ হতো। তিনি আরও বলেন, খামেনির অভ্যন্তরীণ ঘনিষ্ঠ মহলের অবশিষ্ট কিছু ব্যক্তি বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে কাজ করলে কিছু প্রভাব বিস্তার সম্ভব হতে পারে। তিনি বলেন, তবুও একটি সুস্পষ্ট পরিকল্পনা দরকার। আপনাকে ঠিক করতে হবে শাসনব্যবস্থার ভেতরে কার সঙ্গে কাজ করবেন। তারপর সেই গোষ্ঠীর সঙ্গে মিলে হয় অন্যদের বোঝাতে হবে, নয়তো আমেরিকানদের দিয়ে তাদের হত্যা করাতে হবে। এভাবে কেউ একজন সামনে এসে নেতৃত্ব নিতে পারে এবং ভেনেজুয়েলায় রদ্রিগেজ যা করছেন তা করতে পারে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র এখন যা করছে, তাতে এমন কোনো গভীর পরিকল্পনার ইঙ্গিত আমি দেখছি না।
তিনি আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্র শেষ পর্যন্ত হয়তো বলতেই পারে, আমরা খামেনিকে হত্যা করেছি, আর কোনো পারমাণবিক অস্ত্র নেই, ক্ষেপণাস্ত্র লঞ্চারগুলো ধ্বংস হয়েছে। এখন পরিস্থিতি খোলামেলা যুদ্ধের মতো। এমন পরিস্থিতিতে শাসনব্যবস্থার ভেতরে কেউ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কাজ করতে চাইলে পরদিন সকালে বিছানা থেকে ওঠার আগেই তাকে হত্যা করা হতে পারে।
ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপ-এর জ্যেষ্ঠ ইরান বিশ্লেষক নাইসান রাফাতি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র এবং শাসনব্যবস্থার ভেতরের অবশিষ্ট নেতাদের মধ্যে ধারাবাহিকতা বজায় রাখার একটি অভিন্ন স্বার্থ থাকতে পারে। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, এতে ইরানের সাধারণ জনগণের বড় অংশ আরও ক্ষুব্ধ হয়ে পড়তে পারে। কারণ সাম্প্রতিক বিক্ষোভ দমন করতে গিয়ে হাজার হাজার মানুষ নিহত হয়েছে।
তিনি বলেন, যদিও শাসনব্যবস্থার আদর্শিক সমর্থকদের সংখ্যা কমছে, তবুও তারা মনে করতে পারে, এটাই শেষ লড়াই। তাই তারা আরও বেশি ঐক্যবদ্ধ হতে পারে। রাফাতি আরও বলেন, ওয়াশিংটনের জন্য সবচেয়ে সুবিধাজনক ফলাফল হবে- ব্যবস্থার ধারাবাহিকতা বজায় রেখে ভেতর থেকেই পরিবর্তন আনা। এমন একজন অংশীদার খুঁজে পাওয়া, যিনি দ্রুত ইরানের শাসনব্যবস্থার একটি বড় অংশকে যুক্তরাষ্ট্রের গ্রহণযোগ্য শর্তে একত্র করতে পারবেন। কিন্তু এই লক্ষ্য দুইটি বড় চ্যালেঞ্জের মুখে- শাসনব্যবস্থার ভেতরে পরিবর্তন মেনে নেয়ার মতো যথেষ্ট কণ্ঠ খুঁজে পাওয়া এবং একই সঙ্গে বহু ইরানিকে এই ধারাবাহিকতা থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ইরানের পরবর্তী নেতা নির্বাচন করার প্রকৃত ক্ষমতা রয়েছে শক্তিশালী রেভল্যুশনারি গার্ডস বাহিনীর হাতে। এই বাহিনী শুধু সামরিক নীতিই নয়, অর্থনীতির বড় অংশও নিয়ন্ত্রণ করে। দক্ষিণ আমেরিকা বিশেষজ্ঞদের মতে, ‘ডেলসি মডেল’ পুনরাবৃত্তি করার ট্রাম্পের আগ্রহ আসলে ওয়াশিংটনের কাছে মাদুরোর স্বৈরাচারী শাসনের অবশিষ্টাংশ দখল করার সফলতা থেকে পাওয়া আত্মবিশ্বাসের ফল। গেদান বলেন, কোনো বিমান হারায়নি, কোনো মার্কিন সেনা নিহত হয়নি। আর যে সরকারকে তার কাছে অন্তত অত্যন্ত বৈরী হিসেবে তুলে ধরা হয়েছিল, সেটাই এখন অনেক সহযোগিতামূলক হয়ে উঠেছে। এছাড়া বিপুল প্রাকৃতিক সম্পদসমৃদ্ধ একটি দেশ, যা ট্রাম্পের দৃষ্টিতে এখন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য নতুন করে উন্মুক্ত হয়েছে।
তবে হোয়াইট হাউসের সাবেক এই উপদেষ্টা বলেন, ইরান ভেনেজুয়েলার তুলনায় অনেক দূরে এবং অনেক বেশি সশস্ত্র- এটাই শুধু পার্থক্য নয়। দক্ষিণ আমেরিকায় ট্রাম্পের পরিকল্পনা আদৌ সফল হয়েছে কি না, তা বলার সময় এখনও আসেনি। তিনি বলেন, এক বছর পর যদি মার্কিন নৌবাহিনী আর ক্যারিবীয় সাগরে অবস্থান না করে, তাহলে ভেনেজুয়েলার নেতারা ধীরে ধীরে আবার স্বাধীনভাবে শ্বাস নেয়ার সুযোগ পেতে পারেন।
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের দিকে যুক্তরাষ্ট্রের মনোযোগ সরে গেলে মাদুরোর উত্তরসূরিরাও লাভবান হতে পারেন, কারণ তারা ট্রাম্পের সময় পার করে তাদের ২৭ বছরের শাসন টিকিয়ে রাখতে চাইবেন। গেদান বলেন, তাদের পরিকল্পনা চিরকাল পুতুল সরকার হয়ে থাকা নয়। তাদের পরিকল্পনা হলো, আশা করা যে একসময় যুক্তরাষ্ট্র অন্যদিকে মনোযোগ দেবে।
(অনলাইন গার্ডিয়ান থেকে অনুবাদ)
