একই বৃত্তে বন্দি দুদক

একই বৃত্তে বন্দি দুদক

ফন্ট সাইজ:

রাষ্ট্রক্ষমতা পাল্টায়, কমিশন পাল্টায়। কিন্তু দুর্নীতি কমে না। যারা ক্ষমতার বাইরে তাদের ঘিরেই চলে অনুসন্ধান, তদন্ত। ক্ষমতাবানদের বেলায় নীরব। ২১ বছরে এই চরিত্রই দেখা গেছে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক)। কাগজে-কলমে স্বাধীন প্রতিষ্ঠান হলেও কখনোই তা স্বাধীন থাকে না। সরকারের আজ্ঞাবহ হয়ে কাজ করে সংস্থাটি। হাজার হাজার অনুসন্ধান, তদন্ত বছরের পর বছর ঝুলে। ক্ষমতার পালাবদলে নিষ্পত্তি হতেও দেখা যায়। এই বৃত্ত ভাঙতে পারেনি কোনো কমিশনই। দুদক প্রতিষ্ঠার ২১ বছরে সাতটি কমিশন দায়িত্ব পালন করেছে। এর মধ্যে চারটি কমিশন মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই বিদায় নেয়।

সম্প্রতি মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই পদত্যাগ করেছে ড. মোহাম্মদ আবদুল মোমেনের নেতৃত্বাধীন কমিশন। একই দিন চেয়ারম্যানসহ অপর দুই কমিশনারের পদত্যাগের ঘটনায় নানা প্রশ্নের জন্ম নিয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দুদকের এই নেতৃত্বটিও অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আজ্ঞাবহ হয়েই কাজ করেছে। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে পতন হওয়া আওয়ামী লীগ সরকারের আমলের মন্ত্রী-এমপি ও তাদের সংশ্লিষ্ট কিছু ব্যবসায়ী ছাড়া আর কোনো দুর্নীতির দিকে নজর ছিল না দুদকের। যদিও সাবেক উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার পিএস-এপিএস ও এনসিপি’র সাবেক এক নেতার দুর্নীতি অনুসন্ধান শুরু করে সংস্থাটি। তবে অনুসন্ধানের এক বছরেও প্রতিবেদন জমা হয়নি।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, সদ্য বিদায়ী কমিশন দায়িত্ব নেয়ার পরপর সর্ষের ভেতর ভূত তাড়ানোর নাম করে বিএনপি মনোভাবাপন্ন বেশ কিছু কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করে। বিশেষ করে বিদেশে বসে থাকা এক সাংবাদিকের ফেসবুক পোস্ট আমলে নিয়ে একাধিক কর্মকর্তাকে বরখাস্ত করার নজিরও সৃষ্টি করে মোমেন কমিশন। অথচ আইন অনুযায়ী দুদকের কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে তদন্ত করা সাপেক্ষে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার নজির রয়েছে। এ ছাড়া বেশ কয়েকজন অভিজ্ঞ কর্মকর্তাকে ডিসেম্বরে কমিশন গঠনের পরপরই বিভিন্ন জেলার দায়িত্ব দিয়ে বদলি করা হয়। এ নিয়ে মোমেন কমিশনের বিরুদ্ধে অভিযোগেরও শেষ নেই। দুদক সূত্র বলছে, মোমেন কমিশনের ভেতরে তিনজনের অন্তত দু’জন ছিলেন জামায়াত ইসলামী মনোভাবাপন্ন। যারা এসেই বেছে বেছে দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তার তকমা দিয়ে অনেক কর্মকর্তাকে বদলি, বরখাস্তের মতো কর্মকাণ্ডে ব্যস্ত ছিলেন।

দুদকের সাবেক মহাপরিচালক মঈদুল ইসলাম বলেন, ‘দুদক আইন-২০০৪’ অনুযায়ী কমিশন স্বাধীনভাবে তদন্ত, মামলা ও প্রসিকিউশনের সিদ্ধান্ত নেবে। কিন্তু চেয়ারম্যান ও কমিশনারদের নিয়োগ সবসময়ই রাজনৈতিক সরকার, ওয়ান-ইলেভেন সরকার বা অন্তর্বর্তী সরকারের সন্তুষ্টির ওপর নির্ভর করেছে বলে তার দাবি। নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বাধীন যাচাই-বাছাই হয়েছে- এমন নজির তিনি দেখেননি। তিনি বলেন, কোনো চেয়ারম্যান বা কমিশনারকে পুরোপুরি স্বাধীনভাবে কাজ করে টিকে থাকতে দেখা যায়নি। রাজনৈতিক বিবেচনায় নিয়োগ পাওয়ার কারণে কর্মকর্তাদের মধ্যে আনুগত্যের সংস্কৃতি গড়ে ওঠে। আইন অনুযায়ী সুপ্রিম কোর্টের বিচারকদের মতো অপসারণ প্রক্রিয়া থাকার কথা থাকলেও বাস্তবে তা মানা হয় না বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তার ভাষ্য, দেশে দুর্নীতিবান্ধব একটি পরিবেশ বিরাজ করছে। এমন বাস্তবতায় দুদক একা দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াই করতে পারে না। সমাজ ও রাষ্ট্রীয় কাঠামোয় পরিবর্তন না এলে প্রকৃত স্বাধীনতা সম্ভব নয়।

অন্যদিকে দুদকের সাবেক ও বর্তমান একাধিক কর্মকর্তা দাবি করেন, গত ২০ বছরে কমিশন হাজারো গুরুত্বপূর্ণ অভিযান ও তদন্ত সম্পন্ন করেছে। রাষ্ট্রীয় অর্থ আত্মসাৎ, ব্যাংক জালিয়াতি, নিয়োগ ও উন্নয়ন প্রকল্পে দুর্নীতির মতো স্পর্শকাতর বিষয়ে ভূমিকা রেখেছে সংস্থাটি। তবে হাতেগোনা কয়েকটি বিতর্কিত মামলা ও সিদ্ধান্তই পুরো প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তিকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।

প্রশাসনিক কাঠামো, বাজেট ও নিয়োগ প্রক্রিয়ায় সরকারের সম্পৃক্ততা থাকায় বাস্তব স্বাধীনতা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। ২০২৪ সালের ৫ই আগস্ট রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সময় দুদকের নতুন কমিশন গঠিত হয়। চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব নেন ড. মোহাম্মদ আবদুল মোমেন। কমিশনার হন মিঞা মুহাম্মদ আলী আকবার আজিজী ও হাফিজ আহসান ফরিদ। তবে দায়িত্ব নেয়ার অল্প সময়ের মধ্যেই গত ৩রা মার্চ তারা একযোগে পদত্যাগ করেন। নতুন নির্বাচিত সরকারের প্রত্যাশা পূরণে সুযোগ করে দেয়ার কথা উল্লেখ করে তারা সরে দাঁড়ান।
বর্তমান প্রেক্ষাপটে মূল প্রশ্ন-দুদককে নিয়ন্ত্রণ করবে কে, এবং কমিশন কি প্রকৃত অর্থে স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারবে? সমালোচকদের দাবি, বিরোধী নেতা, ব্যবসায়ী ও কিছু আমলার বিরুদ্ধে দুদকের তৎপরতা বেশি দেখা গেলেও ক্ষমতাসীন ঘনিষ্ঠদের ক্ষেত্রে একই মাত্রার সক্রিয়তা দেখা যায়নি। ব্যক্তিগত বা রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের জেরে কিছু মামলায় সাধারণ মানুষ হয়রানির শিকার হয়েছেন বলেও অভিযোগ আছে।
নতুন সরকারের আমলে দুদকের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে নিরপেক্ষতা প্রমাণ করা। উচ্চপর্যায়ের দুর্নীতির অভিযোগে দৃশ্যমান পদক্ষেপ নিতে হবে। তদন্তে স্বচ্ছতা ও রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত অবস্থান নিশ্চিত করতে হবে। সংবেদনশীল সময়ে মামলা দায়ের, তদন্তে অসামঞ্জস্য ও দীর্ঘদিন ঝুলে থাকা মামলার মতো বিষয়গুলোও আস্থার পরীক্ষায় ফেলেছে প্রতিষ্ঠানটিকে।

এদিকে হঠাৎ করে দুদক চেয়ারম্যান ও দুই কমিশনারের পদত্যাগের বিষয়টিকে হতাশাজনক বলে মন্তব্য করেছেন ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান। তিনি বলেন, দুদকের চেয়ারম্যান ও দুই কমিশনারের পদত্যাগ হতাশাজনক হলেও তা অপ্রত্যাশিত নয়। দেশের রাজনীতি ও আমলাতন্ত্রে গুরুত্বপূর্ণ নজরদারি সংস্থাগুলোকে পছন্দের নেতৃত্বের আওতায় রাখার সংস্কৃতি দীর্ঘদিনের। দুদকের মতো প্রতিষ্ঠানকে দলীয় ও আমলাতান্ত্রিক প্রভাবমুক্ত রাখার বাস্তব অনুশীলন এখনও ক্ষমতার কাঠামোর কাছে অগ্রহণযোগ্য বলেই প্রতীয়মান হয়। তিনি বলেন, স্বল্পমেয়াদি সুবিধার জন্য এমন চর্চা দীর্ঘমেয়াদে আত্মঘাতী পরিণতি ডেকে আনতে পারে। এখন দেখার বিষয়, নতুন নিয়োগ কীভাবে ও কাদের মাধ্যমে হয় এবং দুদকের স্বাধীনতা নিয়ে ঘোষিত অঙ্গীকারের বাস্তব প্রতিফলন কেমন দাঁড়ায়।

MD JAMAL

৩ মাস আগে

শুনিছি/পড়েছি, ৫০ বছর পর পর একটা দেশের ভাগ্যে একজন সুশাসক এসে দেশটাকে সুপথে পরিচালিত করে , দুর্ভাগ্য আমাদের জিয়া সাহেব ছাড়া আর কেউ এলোনা. মহান আল্লাহ যদি ঠিক করে দেন আমাদের, তাহলেই আমরা ভালো কিছু পাবো, অন্নথায় দুদুক বা ড. ইউনুস দিয়ে আমরা কিছু আশা করিনা. আমাদের কি পরিনিতি আমাদের অজানাই থেকে গেল.

জনতা

৩ মাস আগে

শুধু দুদক না, এই দেশে যদি মহা দুদক নামেও কোন সরকারি প্রতিষ্ঠান বানানো হয় তাহলেও একই কাহিনি দেখবে জনতা। কারণ এই দেশের আকাশ বাতাস ও মাটি বিষাক্ত, দুই নম্বর। এই দেশে আনদোলন সংগ্রামে মরে টোকাই, মধ্যবিও ও গরীবের সন্তান। কোন মন্ত্রী এমপির সন্তান কখনো কোন আনদোলনে মরে না, কারণ তারা থাকে ইউরোপ আমেরিকায়, ঐ খানে তারা পড়া লেখা করে আর এমপি মন্ত্রীর অবৈধ টাকার পাহাড় পাহারা দেয়। যুগে যুগে আনদোলনে আসাদ, নুর হোসেন, আবরার, আবু সাঈদ, মুগ্ধরাই মারা যায়, কোন রাষ্ট্রপতি বা প্রধানমন্ত্রীর সন্তানরা মারা যায় না। এই দেশে জন্ম হওয়াটা আজন্ম পাপ।

লিমা

৩ মাস আগে

এসব তামাশার প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়া ই ভালো।

আঁখি

৩ মাস আগে

দুর্নীতির দমন না,দুর্নীতি উৎপাদন কমিশন নাম রাখুন!বাংলাদেশে মানাবে!

মন্তব্য করুন