সারা দেশে উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণের ঘটনা। ভয়াবহ এই বিস্ফোরণে প্রাণহানি বেড়েই চলছে। দগ্ধ হয়ে অনেকে দিনের পর দিন হাসপাতালের বিছানায় কাতরাচ্ছে। শিশু থেকে শুরু করে নারী-পুরুষ কেউ রেহাই পাচ্ছে না। কেউ কেউ শরীরে আগুন নিয়ে দিগি¦দিক ছোটাছুটি করে। মুহূর্তের মধ্যে শেষ হয়ে যাচ্ছে অনেকের সাজানো সংসার। স্বজন হারিয়ে নিঃস্ব হচ্ছেন অনেক পরিবার। চিকিৎসকরা বলছেন, গ্যাস সিলিন্ডার, লিকেজ বা রাসায়নিক বিস্ফোরণে আক্রান্তদের শ্বাসনালি বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এসব ঘটনায় দগ্ধ অধিকাংশ রোগীকে বাঁচানো সম্ভব হয় না। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দুর্ঘটনাগুলো সাধারণত গ্যাসের লিকেজ থেকে ঘটে। সিলিন্ডারের গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশের ত্রুটির কারণে গ্যাস লিক হয়। এই লিকেজ থেকে গ্যাস বাইরে বেরিয়ে জমতে থাকে। কোনো আগুন সংস্পর্শে এলেই জমে থাকা সেই গ্যাসে ভয়াবহ বিস্ফোরণ ঘটে।
২০২৫ সালে সিলিন্ডার ও এর সঙ্গে যুক্ত উপকরণের লিকেজ থেকে ১ হাজার ৪১টি দুর্ঘটনা ঘটেছে। ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২০ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে গ্যাস লিকেজ থেকে সংঘটিত দুর্ঘটনা ছিল ১ হাজার ২০৭টি, যার মধ্যে ২০২৪ সালে ৭৪৮টি ঘটনা ঘটেছিল। ২০২৫ সালে এই সংখ্যা আরও বেড়ে গড়ে মাসে ৮৬টি দুর্ঘটনা ঘটেছে। অপরদিকে প্রাকৃতিক গ্যাস পাইপলাইনের লিকেজ থেকে ২০২৫ সালে ৫৫২টি দুর্ঘটনা ঘটেছে। ২০২০ থেকে ২০২৪-এর মধ্যে এ সংখ্যা ছিল ৩ হাজার ৫৪১টি। ফায়ার সার্ভিসের পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ২৭ হাজার ৫৯টির মধ্যে বৈদ্যুতিক গোলযোগে ৯ হাজার ৩৯২টি, বিড়ি-সিগারেটের জ¦লন্ত টুকরা থেকে চার হাজার ২৬৯টি, চুলা থেকে ২ হাজার ৯০৯টি, গ্যাস সিলিন্ডার লিকেজ থেকে ৯২০টি, গ্যাস সরবরাহ লাইন লিকেজ থেকে ৫৬২টি, গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণ থেকে ১২১টি, কেমিক্যাল বা রাসায়নিক দুর্ঘটনা থেকে ৩৮টি, ছোটদের আগুন নিয়ে খেলার কারণে ৬০৮টি, উত্তপ্ত ছাই থেকে ৩৫৬টি, কয়েল থেকে ৪৯৩টি এবং আতশবাজি, ফানুস বা পটকা পোড়ানো থেকে ১০৯টি আগুনের ঘটনা ঘটে।
২০২৫ সালে দেশে ২৭ হাজার ৫৯টি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। প্রতিদিন ৭৫টি করে অগ্নিকাণ্ড হয়েছে। এসব আগুনে ৮৫ জন নিহত ও ২৬৭ জন আহত হয়েছেন। আগুন নির্বাপণের সময় ফায়ার সার্ভিসের ১৭ জন বিভাগীয় কর্মী আহত এবং তিনজন নিহত হন। এতে বলা হয়, বৈদ্যুতিক গোলযোগ, বিড়ি-সিগারেটের জ¦লন্ত টুকরা, চুলা ও গ্যাসসংক্রান্ত কারণে আগুনের ঘটনা বেশি ঘটেছে। এসব অগ্নিকাণ্ডে আনুমানিক ৫৬৯ কোটি ৯৭ লাখ সাত হাজার ৮৬৪ টাকার সম্পদের ক্ষতি হয়েছে। ফায়ার সার্ভিস আগুন নির্বাপণের মাধ্যমে ৩ হাজার ২৬৩ কোটি ৬২ লাখ এক হাজার ৯১৬ টাকার সম্পদ রক্ষা করেছে। সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি ভিত্তিক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ২০২৫ সালে বাসাবাড়ি বা আবাসিক ভবনে সবচেয়ে বেশি অগ্নিকাণ্ড ঘটেছে।
সম্প্রতি চট্টগ্রামের হালিশহরে একটি ছয়তলা ভবনের তৃতীয় তলার একটি ফ্ল্যাটে বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় ওই ফ্ল্যাটের বাসিন্দা সাখাওয়াত হোসেনের পরিবারের ৯ জন দগ্ধ হন। দগ্ধদের মধ্যে সাখাওয়াত ও তার স্ত্রী নুরজাহান, ছেলে সাফায়াত, ভাই সামির ও সামিরের স্ত্রী আয়েশা চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। ২৫শে ফেব্রুয়ারি চাঁদপুরের কচুয়ার হোসেনপুর গ্রামের বোয়ালবাড়িতে ভোর রাতে সেহরির খাবার প্রস্তুতের সময় গ্যাস সিলিন্ডার লিকেজ থেকে বিস্ফোরণ হয়ে তিনজন দগ্ধ হয়েছেন।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সিলিন্ডার গ্যাস রিফিলের সময় সঠিক নিয়ম না মানা, মানহীন সুরক্ষা যন্ত্রাংশ ব্যবহার, সঠিক রক্ষণাবেক্ষণ না করা, মেয়াদোত্তীর্ণ সিলিন্ডার ব্যবহার ও ভুলভাবে সিলিন্ডার রাখা এসবই বড় দুর্ঘটনার মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। তারা বলছেন, সচেতনতার অভাব এবং নিম্নমানের সিলিন্ডার রেগুলেটর না ব্যবহারই এর প্রধান কারণ। বাসাবাড়িতে আগুন ধরলে বৈদ্যুতিক মেইন সুইচটি বন্ধ করতে হবে।
গত দুই মাসে রাজধানীর জাতীয় বার্ন ইনস্টিটিউটে চিকিৎসা নিয়েছেন ২ হাজার ৭০০ রোগী। তাদের বেশির ভাগই দগ্ধ হন রান্নাঘর থেকে। জাতীয় বার্ন ইনস্টিটিউটের তথ্য মতে, সারা দেশ থেকে প্রতিদিন হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসে ৭০ থেকে ৭৫ জন রোগী। সম্প্রতি গ্যাস সিলিন্ডার দুর্ঘটনায় দগ্ধের সংখ্যা বাড়ছে। চিকিৎসকরা বলেছেন, বিস্ফোরণে শ্বাসনালি পুড়ে যাওয়ায় অর্ধেকের বেশি রোগীকে বাঁচানো যায় না।
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের পরিচালক (অপারেশন ও মেইনটেন্যান্স) লেফটেন্যান্ট কর্নেল মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, নিম্নমানের হোসপাইপ, রেগুলেটর, নজল ও ভালভ ব্যবহারের কারণে লিকেজ সৃষ্টি হয়। অধিকাংশ দুর্ঘটনা সিলিন্ডার লিকেজ থেকে ঘটে।
জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের আবাসিক চিকিৎসক ডা. শাওন বিন রহমান মানবজমিনকে বলেন, প্রতিদিন আমাদের হাসপাতালের জরুরি বিভাগে সারা দেশ থেকে ৭০-৭৫ জন দগ্ধ রোগী আসে। দগ্ধ অবস্থায় যারা চিকিৎসা নিতে আসেন তাদের শরীরে অধিকাংশেরই মেজর বার্ন হয়। শরীরের অধিকাংশ অংশ এবং শ্বাসনালি পুড়ে যায়। শ্বাসনালি পুড়ে যাওয়ার কারণে তাদের জীবন সংকটাপন্ন হয়ে পড়ে। পরবর্তীতে অধিকাংশ রোগীকে আমাদের হারাতে হয়। তিনি আরও বলেন, মানুষকে সচেতন হতে হবে। কী কারণে এমন বিস্ফোরণ হচ্ছে সেটির বিষয়ে সচেতন হতে হবে। সবাইকে বলতে চাই, যেকোনো আগুনের ঘটনায় ভুক্তভোগীর শরীরে সঙ্গে সঙ্গে পানি ঢালতে হবে। ১৫-২০ মিনিট সময় নিয়ে এই কাজটি করতে হবে। যেকোনো রকম কাপড় বা বিছানা থাকে সেটি দিয়ে তাকে জড়িয়ে ধরতে হবে। আগুনটা নেভাতে হবে এবং ওয়াশ আউট করতে হবে তাহলে কিছুটা ক্ষত কম হবে। এছাড়া এই ধরনের ঘটনা ঘটলে যত দ্রুত সম্ভব চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক এবং সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক মানবজমিনকে বলেন, অসতর্কতা বা অসাবধানতার কারণে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে দুর্ঘটনাগুলো ঘটছে। নিরাপত্তার ক্ষেত্রে যদি তারা নিয়মিত সার্ভিসিং, পর্যবেক্ষণ এবং ব্যবহারবিধির সচেতনতা বাড়ানো হয় তাহলে অনেকটা কমে আসবে।
