২০২৭ ওয়ানডে বিশ্বকাপে সরাসরি খেলার দৌড়ে বাংলাদেশ এখন কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে। আইসিসি র্যাঙ্কিংয়ে দশম স্থানে থাকা ফিল সিমন্সের শিষ্যদের জন্য প্রতিটি ম্যাচই এখন মহাগুরুত্বপূর্ণ। নিয়ম অনুযায়ী, স্বাগতিক দক্ষিণ আফ্রিকা ও জিম্বাবুয়ে সরাসরি খেলবে। বাকি দলগুলোর মধ্যে যারা ২০২৭ সালের ৩১শে মার্চের মধ্যে শীর্ষ আটে থাকবে, তারাই সরাসরি মূল পর্বে জায়গা পাবে। জিম্বাবুয়ে আয়োজক হিসেবে সরাসরি খেলছে এবং তাদের বর্তমান অবস্থান ১১তম। ফলে বাংলাদেশ অন্তত নবম স্থানে উঠতে পারলে এবং দক্ষিণ আফ্রিকা শীর্ষ আটে থাকলে সরাসরি খেলার সুযোগ তৈরি হবে। বর্তমানে বাংলাদেশের রেটিং পয়েন্ট ৭৬, আর নবম স্থানে থাকা ওয়েস্ট ইন্ডিজের ৭৭। মাত্র দুই পয়েন্টের ব্যবধানে পিছিয়ে থাকা বাংলাদেশকে ৩১শে মার্চের সময়সীমা পর্যন্ত প্রতিটি সিরিজে জিততে হবে। ওয়ানডে সুপার লীগ পদ্ধতি বাতিল হওয়ায় এখন র্যাঙ্কিংই সরাসরি বিশ্বকাপে যাওয়ার একমাত্র মানদণ্ড। সামনের দীর্ঘ পথে পাকিস্তান, নিউজিল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া ও ভারতের মতো শক্তিশালী দলের মোকাবিলা করতে হবে। প্রতিটি জয়ই বাংলাদেশকে সরাসরি বিশ্বকাপের মূল মঞ্চের কাছাকাছি নিয়ে যাবে।
আগামী ১১ই মার্চ ২০২৬ থেকে ঘরের মাঠে পাকিস্তানের বিপক্ষে ওয়ানডে সিরিজটি বাংলাদেশের ভাগ্য নির্ধারণে তুরুপের তাস হতে পারে। ঐতিহাসিক পরিসংখ্যানে পাকিস্তান অনেক এগিয়ে। দুই দেশের ৬টি দ্বিপাক্ষিক সিরিজের ৫টিতেই তারা জিতেছে। ২০টি ম্যাচের ১৭টিতেই জয় পাকিস্তানের। তবে ২০১৫ সালে ঘরের মাঠে তাদের ৩-০ ব্যবধানে হোয়াইটওয়াশ করার সেই স্মৃতি এখনও বাংলাদেশের প্রেরণা। আসন্ন সিরিজে বাংলাদেশকে ৩-০ ব্যবধানে জিততে হবে। এতে বাংলাদেশের রেটিং পয়েন্ট বেড়ে ৮০ হবে এবং সরাসরি নবম স্থানে উঠে যাবে। ২-১ ব্যবধানে সিরিজ জিতলেও বাংলাদেশ ৭৯ পয়েন্ট নিয়ে ওয়েস্ট ইন্ডিজকে টপকে যাবে। তবে সিরিজ হারলে বা হোয়াইটওয়াশ হলে পয়েন্ট ৭৪-এ নেমে আসবে। এতে সরাসরি কোয়ালিফিকেশনের স্বপ্ন প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়বে। ওয়ানডে চ্যাম্পিয়নশিপ বা বর্তমান র্যাঙ্কিং চক্রে এই সিরিজটিই ঘুরে দাঁড়ানোর সেরা সুযোগ। পাকিস্তানের শক্তিশালী ব্যাটিংয়ের বিপরীতে মিরপুরের চেনা কন্ডিশন কাজে লাগিয়ে জয় ছিনিয়ে নিতে পারলে বিশ্বকাপের পথ অনেকখানি মসৃণ হবে। এটি কেবল একটি সিরিজ নয়, বরং ২০২৭ বিশ্বকাপের টিকিট নিশ্চিত করার বড় ধাপ।
২০২৭ ওয়ানডে বিশ্বকাপ যৌথভাবে দক্ষিণ আফ্রিকা, জিম্বাবুয়ে ও নামিবিয়া আয়োজন করবে। স্বাগতিক নামিবিয়াকে কোয়ালিফায়ার খেলে আসতে হলেও বাকি দুই আয়োজক সরাসরি খেলবে। সরাসরি কোয়ালিফাই করতে বাংলাদেশকে ২০২৭ সালের ৩১ মার্চের মধ্যে আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ সিরিজ খেলতে হবে। এই সময়ের মধ্যে ঘরের মাঠে আয়ারল্যান্ড ও জিম্বাবুয়ে ছাড়াও বড় দলগুলোর বিপক্ষে লড়তে হবে। সরাসরি খেলার টিকিট পেতে আসন্ন ম্যাচগুলোতে অন্তত ৬০ শতাংশ জয় অপরিহার্য. বিশেষ করে ভারতের মতো বড় দলের বিপক্ষে সিরিজ জয় বা লড়াকু ক্রিকেট খেলে পয়েন্ট অর্জন জরুরি। আয়ারল্যান্ড ও জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে অ্যাওয়ে সিরিজে ক্লিন সুইপ করতে পারলে র্যাঙ্কিংয়ে বড় লাফ দেওয়া সম্ভব হবে। নির্দিষ্ট ডেডলাইনের মধ্যে নিরাপদ অবস্থানে না থাকতে পারলে বাংলাদেশকে বাছাইপর্বের কঠিন পথ পাড়ি দিতে হবে। ওয়ানডে ক্রিকেটে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক উত্থান-পতনের প্রেক্ষাপটে সরাসরি অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। আসন্ন ওয়ানডে ক্যালেন্ডার অনুযায়ী বাংলাদেশকে এই সময়ের মধ্যে অন্তত আরও ১৫ থেকে ১৮টি ম্যাচ খেলতে হবে।
পাকিস্তানের বিপক্ষে ঘোষিত বাংলাদেশ স্কোয়াডটি তারুণ্য ও অভিজ্ঞতার এক দারুণ সমন্বয়। অধিনায়ক মেহেদী হাসান মিরাজের নেতৃত্বে লিটন কুমার দাস, মোস্তাফিজুর রহমান ও তাসকিন আহমেদের মতো অভিজ্ঞদের পাশাপাশি রিশাদ হোসেন ও তানভীর ইসলামের মতো প্রতিভাবানরা রয়েছেন। গত এক বছরের পারফরম্যান্স বিবেচনায় তাওহীদ হৃদয় (২৮.৮ গড়) সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য। তবে নাজমুল হোসেন শান্তর ২১.৭ গড় কিছুটা উদ্বেগের কারণ। বোলিংয়ে তানভীর ইসলাম ও রিশাদ হোসেনের স্পিন আক্রমণ বর্তমানে দুর্দান্ত। রিশাদ হোসেন হতে পারেন সিরিজের বড় ব্যবধান গড়ে দেয়া খেলোয়াড়। পেস ইউনিটে নাহিদ রানার গতি এবং শরিফুলের সুইং পাকিস্তানের টপ-অর্ডারকে চাপে রাখার জন্য যথেষ্ট। এই দলটি দলীয় সংহতি বজায় রেখে মাঠে সেরাটা দিতে পারলে ২০১৫ সালের পুনরাবৃত্তি ঘটানো অসম্ভব নয়। বিশেষ করে অলরাউন্ডার হিসেবে মিরাজ, আফিফ ও সৌম্য সরকারের উপস্থিতি দলে ব্যাটিং গভীরতা বাড়িয়েছে। এই ভারসাম্যপূর্ণ দলটিই পাকিস্তানের বিপক্ষে জয়ের মূল শক্তি হবে।
সামগ্রিকভাবে, ২০২৭ বিশ্বকাপের মূল মঞ্চে সরাসরি পৌঁছানো বাংলাদেশের জন্য এক অগ্নিপরীক্ষা। শীর্ষ দলগুলোর বিপক্ষে ধারাবাহিক সাফল্য ছাড়া লক্ষ্য অর্জন কঠিন। পাকিস্তানের বিপক্ষে ৩-০ বা ২-১ ব্যবধানে জয় বাংলাদেশকে নিরাপদ জোনে নিয়ে যাওয়ার প্রথম ধাপ। এরপর অস্ট্রেলিয়া বা ভারতের বিপক্ষে হোম কন্ডিশন কাজে লাগিয়ে সিরিজ জিততে পারলে লক্ষ্য সহজ হবে। আসন্ন ম্যাচগুলোর বড় অংশ ঘরের মাঠে হওয়া বাংলাদেশের জন্য বড় সুবিধা। তবে ব্যাটিং ইউনিটে ধারাবাহিকতা এবং লিটন-শান্তর রানে ফেরা অত্যন্ত জরুরি। র্যাঙ্কিংয়ের উন্নতির গ্রাফ ঊর্ধ্বমূখী থাকলে ২০২৭ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার মাটিতে সরাসরি খেলবে বাংলাদেশ- এমন প্রত্যাশা করাই যায়। অন্যথায় কোয়ালিফায়ারের পিচ্ছিল পথ পাড়ি দেয়া হবে অনেক বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। তাই ২০২৭ বিশ্বকাপের সরাসরি টিকিট নিশ্চিত করতে আসন্ন প্রতিটি ওয়ানডে সিরিজই বাংলাদেশের জন্য অঘোষিত ফাইনাল।
