নাইজুর-বোয়ালিয়া খাল। সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের স্মৃতি বিজড়িত ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইলের এই খাল। নিজে কোদাল দিয়ে মাটি কুপিয়ে এই খাল খননের কাজ শুরু করেন তিনি। এরপর শত শত মানুষ ঝাঁপিয়ে পড়েন খাল খননে। ৬-৭ কিলোমিটার দীর্ঘ এই খাল পাল্টে দেয় এলাকার কৃষিচিত্র। খাল দিয়ে আসা পানিতে এই এলাকায় প্রথম ইরি ধান চাষের সুযোগ হয়। বাম্পার ফলন হয় ইরির। নতুন সরকারের খাল খননের উদ্যোগে আলোচনায় এই খাল। এদিকে বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর জেলায় ২০টি খাল খননের জন্য বাছাই করা হয়েছে। সরাইল সদর থেকে প্রায় ৩ কিলোমিটার পশ্চিমে সরাইল সদর ইউনিয়নের শেষ সীমায় অবস্থান নাইজুর-বোয়ালিয়া খালের। স্থানীয়দের কাছে জিয়া খাল নামেও পরিচিত। ১৯৭৮ সালের ২৪শে এপ্রিল খাল খনন করতে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান সরাইল আসেন। তার আগমনে সাড়া পড়ে যায় গোটা মহকুমায়। সরাইল হাসপাতালের পাশের মাঠে অবতরণ করে রাষ্ট্রপতিকে বহনকারী হেলিকপ্টার। সেখান থেকে গাড়িতে মাটির রাস্তা দিয়ে খাল খননের স্থানে পৌঁছান। ৪৮ বছর আগে তার আগমন এবং খাল খননের স্মৃতি এখনো ঝলঝলে এলাকার মানুষের স্মৃতিতে। সে সময় রাষ্ট্রপতির হাতে ফুলের তোড়া তুলে দেন তৎকালীন সরাইল ইউপি চেয়ারম্যান মো. সাদেক ঠাকুরের চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ুয়া ছেলে মো. সোহেল ঠাকুর। মানপত্র পাঠ করেছিলেন তার পিতা। খালের বর্তমান অবস্থা দেখতে গত শনিবার সেখানে গেলে স্থানীয় কৃষকদের কয়েকজন এগিয়ে এসে জানান, জিয়ার খাল খননের সেদিনের কথা। এদের মধ্যে ৩/৪ জন ছিলেন যারা নিজেরা খাল খননে অংশ নিয়েছিলেন। খালটি এখন মরে গেছে। নেই পানি প্রবাহ। পাশের জাফর খালের তলানীতে থাকা পানি পাম্পের সাহায্যে তোলা হচ্ছে জমিতে। খালের ওখানে যেতে সরাইল সদর থেকে সঙ্গী হন সে সময় খনন কাজ দেখভালের দায়িত্বে থাকা সরাইল বিএনপি’র তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক ও বর্তমান উপজেলা বিএনপি’র সভাপতি মো. আনিসুল ইসলাম ঠাকুর, উপজেলা বিএনপি’র সাবেক সহ-সভাপতি জহিরুল ইসলাম জহির ও তৎকালীন সরাইল ইউপি চেয়ারম্যান মো. সাদেক ঠাকুরের ছেলে মো. সোহেল ঠাকুর। স্থানীয় কৃষকরা জানান, সরাইল, পানিশ্বর ও চুন্টা ইউনিয়নের কৃষকদের সুবিধা করতে নাইজুর-বোয়ালিয়া খাল খনন করার কাজে হাত দেয়া হয়। এই খালটি মেঘনা নদীর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। খননের পর একদিকে মেঘনা নদীর, অন্যদিকে আশুগঞ্জ সবুজ প্রকল্পের পানি আসতে শুরু করে এই খালে। খাল খননের আগে বর্ষার ধান, পাট আর শুষ্ক মৌসুমে গম ও সরিষার আবাদ হতো এখানকার বিস্তীর্ণ ফসলি জমিতে। খাল খননের পর শুরু হয় ব্যাপকভাবে ইরি চাষ। বাম্পার ফলন হতে শুরু করে ইরির। বিটঘর গ্রামের আমিনুল হকের বয়স ছিল তখন ১৬ বছর। খালকাটায় অংশ নেন তিনি। একটি জমি দেখিয়ে বলেন, এখানেই সব গাড়ি রাখা হয়েছিল। জিয়া আসবেন বলে সরাইল-পানিশ্বর সড়ক কিছুটা সংস্কার করে গাড়ি আসার উপযোগী করা হয়। রাষ্ট্রপতির আগমনকে কেন্দ্র করে ৩/৪ দিন আগে থেকেই তাকে স্বাগত জানাতে গানের রিহার্সেল করেন তারা। এক মাসের বেশি সময় ধরে চলে খাল খনন। খাল খননকারীদের খেতে দেয়া হতো চিঁড়া। খাবার পানির জন্য বসানো হয় টিউবওয়েল। পরে গম দেয়া হতো খননে শ্রম দেয়ার জন্য। তার নানা বলি বাড়ির আবদুল মন্নাফ এবং মন্নাফের আরেক ভাই খালেক মাস্টার খাল খনন কাজে অংশ নেন। একই গ্রামের আবুল বাশার বলেন, পয়সা ছাড়া খাল কাটছি। পুরো পানিশ্বর চুন্টা ইউনিয়নের মানুষ চলে আসছে খাল কাটতে। জিয়া আসার দিন মাগনা খাল কাটছি। এরপর থেকে গম পাইছি। তিনি নিজে প্রথমে খাল কাটেন এরপর আমরাও কাটা শুরু করছি। পানিশ্বরের সুলতানপুরে মঞ্চ করা হয়। সেখানে তিনি বক্তৃতা করেন। খাল খননে এলাকার তৎকালীন এমপি ডাক্তার ফরিদুল হুদা ছাড়াও স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যানদের মধ্যে সরাইল ৭নং ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান মো. সাদেক ঠাকুর, চুন্টা ইউপি চেয়ারম্যান এমদাদুল হক টাক্কাব আলীর ভূমিকার কথাও জানান কৃষকরা। চেয়ারম্যান সাদেক ঠাকুরের ছেলে সোহেল ঠাকুরের সংরক্ষণে রয়েছে রাষ্ট্রপতির সেদিনের স্থির ছবি, মানপত্র, স্বাগত জানানোর জন্য করা ব্যানারের ছবি। সোহেল ৪র্থ শ্রেণিতে পড়তেন তখন। জানান- জিয়াউর রহমান হাসপাতাল মোড়ে হেলিকপ্টার থেকে নামেন। সেখান থেকে অন্নদা স্কুল মাঠ পর্যন্ত হেঁটে আসেন। সেখানে সভায় যোগ দেন। সভায় আমার পিতা সাদেক ঠাকুর মানপত্র পাঠ করেন। স্কুল মাঠে ঢোকার মুখে আমি এবং তৎকালীন সার্কেল অফিসারের ছেলে টুটুল প্রেসিডেন্টের হাতে ফুলের তোড়া তুলে দেই। একজন প্রেসিডেন্টকে ফুল দিতে পেরেছি এটা মনে হলে গর্ব হয়। সোহেল আরও জানান, মনে পড়ে প্রেসিডেন্ট নিজে প্রথমে কোদাল দিয়ে কোপ দেন। এখন খালটা মরে গেছে। আবার বিএনপি সরকার আসছে। প্রকল্প হাতে নিলে এলাকার মানুষ উপকৃত হবে। সরাইল উপজেলা বিএনপি’র সভাপতি আনিসুল ইসলাম ঠাকুর বলেন- প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান সারা দেশে যখন খাল কাটা কর্মসূচি গ্রহণ করেন তখন আমাদের এই খাল কাটার উদ্বোধন করেন। আমি এটি দেখার দায়িত্বে ছিলাম। আমার গ্রাম বড় দেওয়ানপাড়ায় হেলিকপ্টারে নামেন এবং গাড়িতে এখানে আসেন। তখন রাস্তাটি সংস্কার করা হয়েছিল। খাল কাটার ফলে সরাইল, পানিশ্বর ও চুন্টা ইউনিয়নের কয়েক হাজার জমি চাষাবাদের আওতায় আসে। তাতে হাজার হাজার কৃষক সুবিধা পেয়েছে। তৎকালীন সময়ে কৃষকরা এবং আমরা একে জিয়া খালই বলতাম। তিনি এই খালটিসহ জাফর খাল খনন এবং সরাইল-পানিশ্বর রাস্তা নির্মাণের দাবি জানান। সরাইল-পানিশ্বর রাস্তা তেমনই আছে: পাকিস্তান পিরিয়ড থেকে খালি অইবো অইবো হুনতাছি। কতো লোক আইলো। কিন্তু আমাদের রাস্তা আর অইলোনা। এই রাস্তা নিয়ে আক্ষেপের শেষ নেই সরাইল ও পানিশ্বরের মানুষের। মাটির রাস্তা থাকলেও কোথাও কোথাও এটি জমির সমান হয়ে গেছে। উপজেলা বিএনপি’র সাবেক সহ-সভাপতি জহিরুল ইসলাম জহির বলেন- প্রান্তিক কৃষকদের কথা চিন্তা করে খাল খননের উদ্যোগ নেয়া হয়। এই খালের সঙ্গে সরাইল-পানিশ্বর রোডের অবস্থাও আসে। স্বাধীনতার পর ৫৫ বছর। আজ পর্যন্ত একটা রাস্তা হলো না। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়া এই রাস্তা দিয়েই এসেছিলেন। তার স্মৃতিবিজড়িত এই রাস্তাটিও নির্মাণের দাবি করি। খাল খননে নতুন সরকারের উদ্যোগ: বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর খাল খননে অগ্রাধিকার দিয়েছে। এ নিয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়াতেও আছে তোড়জোর। জেলা প্রশাসক শারমিন আক্তার জাহান জানান, সরকারিভাবে আমরা যে নির্দেশনা পেয়েছি সে অনুসারে প্রত্যেক উপজেলায় আমরা দুটি করে খাল বাছাই করে এর তথ্য দিয়েছি। তাছাড়া আমি এখানে যোগদান করার পরপরই জেলায় কতোগুলো খাল আছে সে তথ্য নিয়েছিলাম। পানি উন্নয়ন বোর্ডের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যমতে জেলায় মোট খালের সংখ্যা ৭৭টি। যেগুলো সংস্কার করা প্রয়োজন। এরমধ্যে থেকে ৯টি উপজেলার ১৮টি খাল এবং পৌরসভার দুটি খাল সংস্কারের জন্য আমরা তথ্য প্রেরণ করেছি।
৪৮ বছর আগে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার যে খাল খননে কোদাল চালিয়েছিলেন জিয়া
জাবেদ রহিম বিজন ও মাহবুব খান বাবুল, ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে
৭ মার্চ (শনিবার), ২০২৬
লিংক কপি হয়েছে!
ফন্ট সাইজ:
100%
